ছোটদের বই , কিন্তু বড়দেরও পড়া উচিত অবশ্যই! (১ম পর্ব)

সবাই পড়তে পারে এমন বই

দুনিয়াজুড়ে কত কত বই লেখা হচ্ছে, তার কোনো হিশেব কি কেউ রেখেছে? নাকি রাখছে? এমনিতেই আমাদের পড়ার অভ্যেস বড্ড কম, তার ওপর বয়স বিভাজন করেও অনেক ভালো বই থেকে আমরা দূরে সরে থাকি। কেউ যদি বলে, অমুক বইটা ছোটদের বই (শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা), তাহলেই হলো–আমরা প্রাপ্তবয়স্করা বইটির প্রতি সব আগ্রহ হারিয়ে বসে থাকি। এই করে করে কতো সরেস, মজার আর উত্তেজনাভরা বই যে আমরা পড়তেই পারলাম না, তা হয়তো ভেবেও দেখিনি কখনো। তার চেয়েও বড়ো কথা, এমন কিছু বইয়ে পাওয়া যায় লেখকের এমন সব অভিজ্ঞতা আর অন্তর্দৃষ্টির বয়ান, যা যে কোনো বয়সের মানুষকে সমৃদ্ধ করতে পারে। নতুন করে কিছু ভাবাতে পারে অনেক কিছু।

তাছাড়া, ছোটদের বই কি আমরা শুধু আমাদের সেই আনন্দ আর শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যেই পড়ব? আমাদের আশেপাশে যে গাবলু-গুবলু, টুকিস-টাকিস, হাসি-আনন্দে টই-টম্বুর শিশুরা বাস করে, যারা কেউ আমাদের সন্তান, কেউ ছোট ভাই বা বোন কিংবা আমাদের আশেপাশেই বাস করা কেউ, তাদের নিয়ে নতুন করে কিছু ভাবার জন্যেও তো সেই বইগুলো আমরা উল্টে দেখতে পারি, নাকি? এখানে সেরকম কিছু বইয়ের কথাই বলি-

১। তোত্তোচান:জানালার ধারে ছোট্ট মেয়েটি

জাপানের এক ছোট্ট শহরের এক উচ্ছ্বল ছোট্ট মেয়ে ‘তোত্তোচান’। আর তার স্কুলটা হলো পৃথিবীর সবচে মজার স্কুল; এমন এক স্কুল, যেখানে বাচ্চারা শুধু স্কুলেই থাকতে চায়। স্কুল থেকে বাসায় ফিরে যেতেই তাদের বেশি মন খারাপ হয়। স্কুলটির নাম ‘তোময়ে গাকুয়েন’। যিনি হেড টিচার, তিনিই স্কুলটি গড়েছেন নিজের হাতে। হেড টিচারের নাম ‘শোসাকু কোবায়াশি’। বাচ্চাদের কাছে ঋষিতুল্য কিন্তু তাদেরই মতোন একজন নিষ্পাপ আর হাসিখুশি মানুষ কোবায়াশি মশাই। আর এই মজার স্কুলটিও খুব অদ্ভুত। ক্লাস হয় একটা রেলগাড়ির ভেতরে। মিষ্টি মেয়ে তোত্তোচান এর আগে টিকতে পারেনি কোনো স্কুলেই। টিচারদের ভাষায় ও এত দুষ্টু যে, ওকে নিয়ে ক্লাস করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। সেই দুষ্টু তোত্তোচান তার নতুন স্কুলের প্রেমে কী করে এত মজে গেল তাহলে? এটাই তো রহস্য! সেই রহস্য জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে বইটি। কেউ যদি পেশায় শিক্ষক হয়ে থাকেন, তার জন্য এই বই অবশ্য অবশ্য পাঠ্য।

BUY NOW

বলে রাখি, তোত্তোচান কিন্তু মিথ্যে কোনো গল্প নয়। সেদিনের সেই ছোট্ট তোত্তোচানই হলো আজকের জনপ্রিয় লেখিকা তেৎসুকো কুরোয়ানাগি। তার নিজেরই স্কুলের গল্প এটি, যে স্কুলটি বোমা হামলায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল একদিন। বইটির ফ্ল্যাপে লেখা আছে-

” ‘তােত্তোচান’ ১৯৮১ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। তার আগে এটি ধারাবাহিকভাবে পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল। পরবর্তীতে বইটির অনুবাদ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। তােত্তোচান আমাদের দুই বাংলায়ও অনূদিত হয়েছে। বইটি পৃথিবীর সকল দেশের পাঠকের চিন্তাজগতে দাগ কেটেছে। কারণ- এই বই আমাদের দেখিয়ে দেয় শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কত সুন্দর সব চিন্তাভাবনা করা সম্ভব, যেমন করতেন প্রধানশিক্ষক সােশাকু কোবাইয়াশি। লেখক আমাদের জানিয়েছেন , কোবাইয়াশি মশাই খুব তেতাে একটি কথা বলতেন—শিশুরা জন্মায় খুব ভালাে মানুষ হিশেবে, কিন্তু বড়ােদের কুপ্রভাব তাদের স্বভাব বদলে দেয়, তাই শিশুদের সম্পূর্ণ স্বাধীন মানুষ হিশেবে চিন্তা করতে দেওয়াই মানবিক শিক্ষাব্যবস্থার মূল।” 

২। মাতিল্ডা

মাত্র চার বছর বয়সেই পড়তে শিখে যায় মাতিল্ডা, অথচ তার জন্ম এমন এক পরিবারে, যেখানে বই পড়ার কোনোই অভ্যেস কারো নেই। সেই পরিবারে টেলিভিশন দেখা ভালো অভ্যেস, বই পড়া বাজে অভ্যেস। অথচ মাতিল্ডা হলো ঠিক বইয়ের পোকা। যা পায়, তাই সে পড়ে। বাসার পুরনো ম্যাগাজিন, এমনকি একমাত্র রান্নার বইটিও তার মুখস্থ। বয়সে চার হলেও ম্যাচুরিটি তার ৮৪ বছর হতে পারে! বাবাকে বই কিনে দিতে বলে একদিন ভীষণ অপমানিত হতে হয় মাতিল্ডাকে। বেশ জেদ চেপে যায় মনে। আরেকটু বড় হলে নিজেই খুঁজে নেয় এলাকার লাইব্রেরি। দিন-রাত কেবল বইয়ে ডুবে থাকে। লাইব্রেরিয়ানও অবাক! এত্তটুকুন মেয়ে, ঐ বয়সেই পড়ে ফেলেছে চার্লস ডিকেন্স আর রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর মতো লেখকদের বড়োদের জন্য লেখা বই, এবং তা অবিশ্বাস্য দ্রুততায়। লাইব্রেরিয়ান ভাবলেন, মাতিল্ডা বুঝি শুধু বইয়ের ছবিগুলো দেখেছে। কিন্তু না! মাতিল্ডা জানালো, সে বইগুলো পড়েছেও। কী, অবাক লাগছে?

BUY NOW

অবাক লাগার মতোই বিষয়। আরও অবাক করা ব্যাপার হলো, পরিবারে এই উজ্জ্বল শিশুটির বিন্দুমাত্র প্রাধান্য না থাকা। কেউ ভালো তো বাসেই না ওকে, এমনকি খেয়ালও রাখে না! ভাবছেন, সৎ বাবা-মায়ের সন্তান? নাহ! সেরকম কিছুই না। মোটামুটি বিষাক্ত এক পারিবারিক পরিবেশ থেকে মাতিল্ডা শুধুমাত্র নিজের বুদ্ধি ও ইচ্ছের জোরে একদিন খুঁজে নেয় তার জীবনের শান্তি ও আনন্দ। ছোটদের বই হলেও বইটিতে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রয়েছে অনেক ভাবনার খোরাক। আমরা কি শিশুদের সঙ্গে সব সময় সুবিচার করি? একবার হলেও পাঠক ভাববেন নিশ্চয়ই।

৩। পিটার প্যান 

এই হচ্ছে বড়দের দোষ–ওরা ভুলেই গেছে পিটার প্যানকে। বড় হলেই তো লোকে ভুলে যায়, অথচ পিটার প্যান তো আসবেই! তার মারাত্মক সব অভিযান তো ঘটবেই! 

পিটার প্যানের গল্পটা শুরু হয়েছে এভাবেই। পিটার প্যান এক বিস্ময় বালকের গল্প, যার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় পৃথিবীর প্রতিটি বাচ্চার। থাকে সে নেদারল্যান্ডের এক জাদুময় জগতে। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় শহরের এক মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় মেয়ে ওয়েন্ডিরও। একদিন সবার অবিশ্বাসকে মিথ্যে করে দিয়ে পিটার প্যান আসে ওয়েন্ডির ঘরে, আর ওয়েন্ডিও পিটার প্যানের পিছু পিছু উড়তে উড়তে হাপিস।

BUY NOW

শুনতে একদমই মামুলি লাগছে, তাই না? এইসব তো জাদুজগতের ভোজবাজির গল্প। এটা তো আসলেই ছোটদের বই । কিন্তু প্রিয় পাঠক, খুব সাবধানে বিচার করুন। একটি শিশু আমাদের কাছে আসলে কী চায়? হ্যাঁ, শিশুদের মনোজগত বোঝার জন্য পিটার প্যান অত্যন্ত চমৎকার একটি বই। আপনার ছোট্ট শিশুটিকে বুকের কাছে নিয়ে বইটি পড়ে শোনান, আর দেখুন, মনের আকাশের সব কালো মেঘ কেমন ভোজবাজির মতোই দূর হয়ে যায় নিমেষেই!

আরও পড়ুন- বই পড়া কেন গুরুত্বপূর্ণ? 

৪। দ্য এ্যাডভেঞ্জারস অব হাকলবেরি ফিন

এই বইয়ের প্রধান চরিত্র হাকলবেরি ফিন নামের এক কিশোর, যার ভালো লাগে না কোনো শাসন-বারণ। ঘর ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ার নেশায় মত্ত ফিন। বাবার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন সে ঠিকই বেরিয়ে যায় অজানার উদ্দেশ্যে। বেরিয়ে যাবার সময় তার সঙ্গী হয় কৃষ্ণাঙ্গ চাকর জিম। ফিনের মতো জিমেরও ভীষণ স্বাধীনতার নেশা! বলতে ভুল না করি, আমেরিকার দক্ষিণে এ্যালাবামা অঞ্চলে তখনো দাসপ্রথার প্রচলন থাকলেও উত্তরে তা তখন নিষিদ্ধ প্রায়। জিমের উদ্দেশ্য কোনো রকমে পালিয়ে উত্তরে চলে যাওয়া। তাই সে সঙ্গী হয় ফিনের। দাসপ্রথা নিয়ে ফিনের কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। কিন্তু যত দিন যায় ফিন আবিষ্কার করতে থাকে, জিম অত্যন্ত চমৎকার একজন মানুষ।

BUY NOW

এভাবেই নানান রকমের রুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চ, মানবিকতা আর মার্ক টোয়েনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে ‘এ্যাডভেঞ্জারস অব হাকলবেরি ফিন’ হয়ে উঠেছে অনন্য সাধারণ এক ক্লাসিক উপন্যাস! একটা তথ্য দিয়ে রাখি, এই বইয়ের প্রধান চরিত্র হাকলবেরি ফিনও কিন্তু লেখকের শৈশব থেকে উঠে আসা এক সত্যিকারের চরিত্র। লেখক চরিত্রটি নির্মাণ করেছেন তাঁর শৈশবের বন্ধু ‘শি’কে নিয়ে। বাস্তবের ‘শি’ যেমন ছিলো উদ্ভ্রান্ত আর উদাসীন, আমাদের হাকলবেরি ফিনও ঠিক তেমনই।

বইটি যে সেসময় শুধু তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তাই নয়, আমেরিকান সমাজকেও নাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি বর্ণবাদের দায়ে নিষিদ্ধও হতে হয়েছিল এই অসাধারণ বইটিকে! কেননা- এতে ‘নিগার’ (নিগ্রো/কালো) শব্দটি উচ্চারিত হয়েছে বহু সংখ্যক বার। সমালোচকরা বলে থাকেন- “টোয়েন কেবল সেই সমাজটিকেই এঁকেছেন, এর বেশি কিছু নয়।”

৫। হোয়াইট ফ্যাং

মার্কিন ঔপন্যাসিক জ্যাক লন্ডনের লেখা একটি বিখ্যাত কিশোর অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস ‘হোয়াইট ফ্যাং’। এটি প্রথমে পর্বক্রমে আউটিং ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় ১৯০৬ সালে। এই বইটি ১৯ শতকের কানাডার ইউকন টেরিটোরির ক্লন্ডিক গোল্ড রাশের সময়কে নিয়ে লেখা, এবং মূল চরিত্রে রয়েছে হোয়াইট ফ্যাঙ নামের এক নেকড়েকুকুর, উত্তরমেরুর তুষারমগ্ন প্রান্তরে যার জন্ম; প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে, অসংখ্য বিপদ পেরিয়ে খাদ্য খুঁজে আনার কৌশল সে শিখেছে একটু একটু করে।

BUY NOW

তারপর একদিন…… হোয়াইট ফ্যাং গিয়ে পড়লো দো পেয়ে দৈত্য মানুষের হাতে। তাদের নির্দেশে সে টেনে গেছে মালবাহী স্লেজ। হারিয়েছে নিজের মাকে। তারপর আবার নতুন প্রভু…লড়াই…অত্যাচার! জীবনের প্রতি, চারপাশের পৃথিবীর প্রতি ফ্যাং-এর মনে জমে ওঠে অপরিসীম ঘৃণা। সেই ঘৃণা থেকেই কী করে পুনরায় ভালোবাসার পুনরুজ্জীবন ঘটে, সেই গল্পই লেখক বলেছেন হোয়াইট ফ্যাং উপন্যাসে। লেখক দেখিয়েছেন- ঘৃণার নয়, জয় শেষ পর্যন্ত ভালোবাসারই হয়। ছোটদের বই হলেও এই চমৎকার ক্লাসিকটি তাই বড়দেরও পড়তে বাধা নেই।

শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা মজার মজার বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading