ঢাকার সড়কে যেভাবে এলো মোটর গাড়ি

হাতে টানা রিক্সা থেকে মোটরগাড়ি আগমনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
motorgari in dhaka 1

ঢাকাইয়াদের মধ্যে প্রথম মোটর গাড়ির ব্যবসা করেন মমিন সাহেব। যিনি ঢাকার জিঞ্জিরা থেকে নিজস্ব খরচে সৈয়দপুর পর্যন্ত মমিন মোটর কোম্পানি নামে নিজস্ব পরিবহন ব্যবসা চালু করেন। ঢাকায় ইঞ্জিন গাড়ি আসার বহু বছর পর এর যাত্রা শুরু হয়। পালকিই ছিল ঢাকার আদি বাহন। ইঞ্জিনচালিত গাড়ি রাস্তায় নামার আগে পরে ঘোড়ার গাড়ি চলেছে দীর্ঘকাল। ১৭৯০ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া রেজিস্ট্রার থেকে সারা বাংলায় মাত্র ১০ জন ঘোড়ার গাড়ি নির্মাতার সন্ধান পাওয়া যায়। ঘোড়ার গাড়িতে ইঞ্জিন জুড়ে দিয়েই বাংলার প্রথম দিককার মোটরগাড়ির উদ্ভব।

ঘোড়ার গাড়ি
ঘোড়ার গাড়ি

এই নগরে পা রেখেই এখন প্রথমেই চোখে পড়বে সেটা হল তিন চাকার বাহন রিকশা। মানববাহী এই বাহন রিকশার উদ্ভব কিন্তু বাংলাদেশে হয়নি। হয়েছে জাপানে। বেশিরভাগ গবেষণা তাই বলছে। আবার কোনো কোনো গবেষকদের মতে এই রিকশা তৈরি করেছেন মার্কিনীরা। রিকশা আবিষ্কারের সঠিক ইতিহাস নিয়ে এমন অনেক মতভেদ আছে। যে প্যাডেল দেয়া সাইকেল রিকশার প্রচলন সেটা সিঙ্গাপুর থেকে এসেছে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের ২০১৫ সালের প্রকাশনা অনুযায়ী, ঢাকার ৪০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত চলাচলের ক্ষেত্রে রিকশার ওপর নির্ভরশীল।

পালকির বিকল্প হিসেবে হাতে টানা রিকশা ঢাকায় আসে বলে মনে করা হয়। ‘রিকশা’ শব্দটি এসেছে জাপানি ‘জিন্রিকিশা’ শব্দ থেকে। যেখানে জিন্ অর্থ মানুষ, রিকি অর্থ শক্তি এবং শা অর্থ বাহন। শব্দগুলোকে যোগ করলে রিকশার আভিধানিক অর্থ দাঁড়ায় মানুষের শক্তিতে চলা বাহন বা মানুষ চালিত বাহন। তবে শুরুর দিকে কোন রিকশাই তিন চাকার ছিল না। সেগুলো মূলত দুই চাকায় ভর করে চলতো এবং সামনে ছিল লম্বা হাতল। এই হাতল ধরে একজন মানুষ ঠেলাগাড়ির মতো হেঁটে বা দৌড়ে এই রিকশা টেনে নিতেন। সে সময় ‘রিকশা’ বলতে এ ধরনের হাতে টানা রিকশাকেই বোঝানো হতো। পরে দুই চাকার রিকশার ডিজাইন তিন চাকার রিকশায় বিকশিত হয়।

হাতে টানা রিক্সা
হাতে টানা রিক্সা, এখনো প্রচলিত কলকাতায়

তবে মুনতাসির মামুনের গবেষণা প্রবন্ধে এই সময়কাল কিছুটা ভিন্নভাবে উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে ১৯৩০ এর দশকে কলকাতায় প্যাডেল চালিত সাইকেল রিকশা চালু হয়েছিল। এরপর ১৯৩০ এর দশকের মাঝামাঝি সেই রিকশা বাংলাদেশে আসে এবং ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে আসে ঢাকায়। বাংলাদেশে শুরু থেকে এই সাইকেল রিকশার প্রচলন ঘটে, মানুষের হাতে টানা রিকশা নয়।

অন্যদিকে মোমিনুল হকের আত্মজীবনীতে এ সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ১৯৪০ সালের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জের পাট কোম্পানি রেলি ব্রাদার্সের এক কেরানি কলকাতা থেকে একটি রিকশা নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসেন। প্রথম রিকশার মালিক ছিলেন যদু গোপাল দত্ত। প্রথম রিকশা চালকের নাম নরেশ বলে মোমিনুল হকের আত্মজীবনীতে উল্লেখ আছে। এরপর যদু গোপাল দত্তের প্রতিবেশী শিশির মিত্র চারটি রিকশা আমদানি করেন। সেই থেকেই অল্প অল্প করে রিকশা আমদানি শুরু হয়। হাতে টানা কিছু রিকশাও আমদানি করা হয়েছিল কিন্তু তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ায় পৌরসভা তা বন্ধ করে দেয়। মূলত আমদানি করা রিকশাগুলোয় চেইন লাগানো ছিল বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়। যেন মানুষের পরিশ্রম কম হয়।

নারায়ণগঞ্জ এবং নেত্রকোনা শহরে বসবাসরত ইউরোপীয় পাট রপ্তানিকারকরা তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য, ১৯৩৮ সালে প্রথম কলকাতা থেকে চেইন লাগানো রিকশা আমদানি করে। এরপর ঢাকার সূত্রাপুর এলাকার একজন বাঙালি জমিদার এবং ওয়ারীর এক গণ্যমান্য ব্যক্তি রিকশা কিনে ঢাকায় প্রচলন করেন। এভাবেই বাংলাদেশে রিকশা চলাচল শুরু হয়।
পৌরসভার রেকর্ড মতে, ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭টি। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে সেটি বেড়ে ১৮১টিতে দাঁড়ায়। ঢাকাতে প্রথম রিকশার লাইসেন্স ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে দেয়া হয় বলে জানা যায়।

তিন চাকার চেইন লাগানো রিক্সা
তিন চাকার চেইন লাগানো রিক্সা

ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সংযোজন মেট্রোরেল। ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিসম্পন্ন মেট্রোরেল ৩৭ থেকে ৪০ মিনিটে উত্তরা থেকে মতিঝিল পৌঁছবে। অচিরেই নগরবাসি চলাচলে মেট্রোরেলের সুবিধা পাবেন।

ঢাকায় প্রথম গাড়ী এসেছিল নবাবদের হাত ধরেই! সেই গাড়ি ঢাকায় আসার পেছনে আছে ঘটনা। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছেন স্ত্রী লেডি মেরি কার্জনকে নিয়ে। তাঁদের আগমন উপলক্ষে মনোরম ভাবে সাজানো হয় নবাবের শাহবাগের বাগানবাড়ি। আর তড়িঘড়ি করে নবাব বেশ কয়েকটি গাড়ি কিনে আনলেন কলকাতা থেকে। সেই গাড়িবহরের একটিতে লেডি কার্জন গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে বসলেন, লর্ড কার্জন দাঁড়ালেন পাশে; চারটি গাড়ি সারিবদ্ধ ভাবে বাড়ির সামনের চত্বরে দাঁড় করানো। এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের ছবি তুললেন সে সময়ের বিখ্যাত জার্মান ফটোগ্রাফার ফ্রিৎস কাপ।

নবাবের মোটর গাড়ি
নবাবের মোটর গাড়ি

ঢাকার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী নবাবের মোটরগাড়ি। ধনী ব্যক্তিরাও নিজেদের আভিজাত্য দেখানোর নতুন কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন অটোমোবাইলকেই। বিশ শতকের প্রথম থেকেই ঢাকার ধনাঢ্য ব্যক্তি ও জমিদাররা তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য গাড়ি কেনা শুরু করেছিলেন। তবে ঢাকার সাধারণ জনগণকে নতুন এই যন্ত্রটিতে চড়তে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরও কিছুটা সময়। ত্রিশের দশকে জনসাধারণের জন্য ট্যাক্সি সার্ভিসের শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে।

ঢাকায় প্রথম বাস সার্ভিস চালু হয় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে। পরিবহণ ব্যবসায় নিযুক্ত ছিলেন অনেকেই। প্রথমদিকে সর্দার মাওলা বকশ, আর ছিলেন হাবিবুর রহমান খান, যাঁর পরিচিতি ছিল এইচ আর খান নামে। মাওলা বকশের গাড়ি চলত ঢাকা-কালিয়াকৈর, ঢাকা-নয়ারহাট, ঢাকা-মিরপুর, ঢাকা-ডেমরা ও ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে। সেকালের ঢাকার বড় মোটর কোম্পানির নাম ছিল মোমিন মোটর ওয়ার্কস, লোকে যাকে মোমিন কোম্পানি বলত। অরফানেজ রোডে ছিল তাদের ওয়ার্কশপ।

ঢাকায় ইঞ্জিন গাড়ি আসার বহু বছর পর যাত্রা শুরু হয় পেট্রোল পাম্পের। মেসার্স কিউ জি, সামদানী অ্যান্ড কোম্পানি বাহাদুর শাহ পার্ক মোড়ে ঢাকার ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে এই পেট্রোল পাম্পটি।

  • এম মামুন হোসেন, সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

আরও পড়ুন – ট্রেন সমাচার , যেভাবে ট্রেন এলো বাংলায়

ঢাকার ইতিহাস নির্ভর উল্লেখযোগ্য বইগুলো দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading