ডোপামিন ডিটক্স: নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনবেন যেভাবে

নিজের নেশাকে বাগে আনতে কাজে লাগতে পারে ডোপামিন ডিটক্স পদ্ধতি
Dopamine-Detoxing

গত ৯ এপ্রিল আমি আমার ফেসবুক আইডিটা ডিএক্টিভেট করে দেই। ২০১৩ সাল থেকে নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহার করলেও এটাই ছিল আমার প্রথম আইডি ডিএক্টিভেশন। টানা ৯ বছরের ফেসবুকিও যাত্রায় অনেক বড়ো বড়ো পরীক্ষাই (এইচএসসি, এডমিশন টেস্ট, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার ফাইনাল) গিয়েছে যেসব সময়ে প্রায় সবাই-ই কমবেশি আইডি ডিএক্টিভেট করেছে। কিন্তু আমি কখনও এই কাজটা করিনি। এর কারণ হলো ফেসবুক ব্যবহারটা কখনই আমার জন্য সেরকম সমস্যার কারণ হয়ে দাড়ায়নি। তারমানে এখন কি ফেসবুক আমার জন্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যার কারণে আমি আইডি ডিএক্টিভেট করতে বাধ্য হলাম?

উত্তরটা হলো, হ্যাঁ। বেশকিছু দিন ধরে আমি একটা ব্যাপার খেয়াল করছিলাম। বারবার কোনো কারণ ছাড়াই আমি ফেসবুকে আসি। অনবরত নিউজফিড স্ক্রল করতে থাকি ঠিকই কিন্তু মনোযোগী হয়ে কিছুই পড়ি না বা দেখি না। ফলাফল, অকারণে সময় নষ্ট। এই বদঅভ্যাসটা আমার অন্যান্য কাজেও সমস্যা তৈরি করছিল। এই যেমন: কোনো কাজে আমার মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাটা বেশ কমে গিয়েছিল। পাশাপাশি টানা কাজটা করার ধৈর্যও কমে গিয়েছিল। সামান্য একটু কাজ করেই আমি ফেসবুকে দৌড়াই।

সমস্যাটা উপলব্ধি করার পর আমি অ্যাপ্লিকেশন ম্যানেজার থেকে ফেসবুকের ক্যাশ এবং সবরকমের ডেটা ক্লিয়ার দিয়েছি। উদ্দেশ্য এখন থেকে অ্যাপে ফেসবুক ব্যবহার না করে ব্রাউজার থেকে করব। ব্রাউজার থেকে বেশি সময় ধরে ফেসবুক ব্যবহার সুবিধাজনক না বলে আমি হাত থেকে স্মার্টফোন রেখে দিব। দুর্ভাগ্যবশত আমার এই কৌশলটা কাজ করেনি। আমি ঠিকই আবার লগইন করে অ্যাপে ফিরে যাই বারবার। এমন সময়েই হঠাৎ একদিন ইউটিউবে Niklas Christl নামের একজনের একটা ভিডিও দেখলাম। ডোপামিন ডিটক্সের সাথে আমার প্রথম পরিচয় সেই ভিডিও দেখেই। ভিডিও দেখে নিজের ওপর ডোপামিন ডিটক্স এক্সপেরিমেন্ট করার ইচ্ছা থাকলেও আমি এতদিন সেটা করতে পারিনি। যাইহোক, ৯ এপ্রিল রাতে আমি আমার এক সপ্তাহব্যাপী ডোপামিন ডিটক্স শুরু করতে সক্ষম হই।

তা কী এই ডোপামিন ডিটক্স?

ডোপামিন ডিটক্স কী সেটা জানার আগে ডোপামিন কী সেটা জানা জরুরি। ডোপামিন মূলত এক ধরণের নিউরোট্রান্সমিটার। আমাদের মস্তিষ্কে উৎপাদিত এই নিউরোট্রান্সমিটার বিভিন্ন স্নায়ুকোষের মধ্যে তথ্য-আদানপ্রদানের কাজ করে থাকে। ডোপামিন আমাদের শরীরে বহুরকম কাজ করলেও এর প্রধান কাজগুলো আমাদের স্মৃতি, মনোযোগ, মোড এবং প্রেরণা ইত্যাদি সম্পর্কিত।

নিউরোট্রান্সমিটার ছাড়া ডোপামিন আমাদের শরীরে হরমোন হিসেবেও কাজ করে। ডোপামিনকে ‘ফিল গুড’ হরমোন বলা হয়। ভালো লাগা, উত্তেজিত হওয়া, সুখী হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে এই হরমোনের সাথে। আমরা যখন কোনো কাজ করে আনন্দ পাই, আমাদের মস্তিষ্ক তখন প্রচুর ডোপামিন নিঃসরণ করে। এই ডোপামিন নিঃসরণের ফলেই আমরা ভালোলাগা অনুভব করি। কোনো কাজ করে একবার আনন্দ পেয়ে গেলে ডোপামিন পুনরায় আমাদের দিয়ে কাজটা করিয়ে শরীরকে পুরস্কৃত করতে চায়।

এইটুকু পড়েই বুঝে ফেলার কথা বিভিন্ন জিনিসের প্রতি আসক্তি তৈরি হওয়ার পেছনে এই ডোপামিন হরমোনের বিরাট একটা ভূমিকা আছে। উদাহরণ দিয়ে বলি। আপনি ফেসবুক ব্যবহার করে আনন্দ পেলে মস্তিষ্ক ডোপামিন নিঃসরণ করে। বেশি ডোপামিন নিঃসরণ হওয়ার কারণে আপনি কাজটা আরো বেশি করে করার প্রেরণা পেয়ে যান। আগে সামান্য একটু ফেসবুক ব্যবহার করলেই যেখানে আপনার মধ্যে ভালোলাগার একটা ভাব চলে আসত আস্তে আস্তে সেটা আর সামান্যতে আসবে না। আপনি ঘনঘন ফেসবুক ব্যবহার করতে শুরু করবেন। বারবার একই কাজ করে নিজেকে পুরস্কৃত করার কারণে একসময় ফেসবুক ব্যবহারটা আপনার কাছে নেশার মতো হয়ে যাবে।

অন্য আরো অনেক কারণ জড়িত থাকলেও বিভিন্ন ধরণের আসক্তি (মাদক, পর্ন, মাস্টারবেশন, ফাস্টফুড ইত্যাদি) তৈরি হয় মূলত এভাবেই। সোশ্যাল মিডিয়া, পর্ন ওয়েবসাইট, গেমসহ অন্যান্য অ্যাপ্লিকেশনের এলগরিদম ভিত্তিক ডিজাইনে চলে যাওয়ার মূল কারণ হলো এই ডোপামিন কৌশলটাকে কাজে লাগানো। মানে ব্যাপারটা হলো আপনি যেসব জিনিস পছন্দ করেন ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম কিংবা ইউটিউব সেসব জিনিসই বারবার আপনাকে দেখাবে। বেশি বেশি ডোপামিন নিঃসরণ হওয়ার কারণে আপনি যাতে দীর্ঘসময় ধরে এই অ্যাপসগুলো ব্যবহার করেন এবং বারবার এসব জায়গাগুলোতে ফিরে আসেন।

ডোপামিন সম্পর্কে যারা এই প্রথম জানছেন তাদের মনে হতে পারে, তাহলে ডোপামিন বোধহয় পুরোটাই একটা শয়তান হরমোন। মোটেই না। আমাদের জীবনে চলাফেরায় স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে এই হরমোনের বিরাট ভূমিকা আছে। কথা হলো জীবনের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় থাকার জন্য ডোপামিনের ভারসাম্যও স্বাভাবিক থাকতে হবে। কম-বেশি হলেই বিপদ। শরীরে অতিরিক্ত ডোপামিন তৈরি হলে আসক্তি ছাড়াও আরো যেসব সমস্যা হতে পারে- Schizophrenia, hallucinations, delusions ইত্যাদি। অন্যদিকে শরীরে ডোপামিনের ঘাটতি দেখা দিলে পারকিনসন্সের মতো রোগ হতে পারে।

ডোপামিন নিয়ে মোটামোটি জানা হলো। এবার ডোপামিন ডিটক্স কী সংক্ষেপে বলে ফেলি। সহজ কথায় ডোপামিন ডিটক্স হলো ডোপামিনের উপবাস (শতভাগ ডোপামিনের উপবাস বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব)। বারবার অতিরিক্ত ডোপামিন নিঃসরণের ফলে যেসব অভ্যাস রীতিমতো আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে আপনাকে সেসব কাজ কয়েক ঘন্টা বা কয়েক দিনের জন্য বন্ধ করে ফেলতে হবে। উদ্দেশ্য শরীরে যাতে ডোপামিনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ডোপামিনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে আনার এই প্রক্রিয়াটাকেই ডোপামিন ডিটক্স বলা হয়।

এই জিনিস করলে কী উপকার পাওয়া যাবে?

ডোপামিন ডিটক্সের সবচেয়ে বড়ো উপকার হলো, না চাইতেও আপনার মস্তিষ্ক আপনাকে দিয়ে যেসব আসক্তিকর কাজ করাত, আপনি সেগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হবেন। ডোপামিন ডিটক্স করলে তাত্ত্বিকভাবে কী কী উপকার পাওয়ার কথা আমি সেগুলো নিয়ে আর কথা বাড়াচ্ছি না। একটা গুগল সার্চ করলেই আপনি এসব জানতে পারবেন। আমি বরং নিজে কী উপকার পেলাম সেটা একটু বলে ফেলি।

ডোপামিন ডিটক্স করার পেছনে আমার মূল উদ্দেশ্য ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি আসক্তি কমানো। আমি এই জায়গায় ভালোই ফল পেয়েছি মনে হচ্ছে। ডিটক্সের প্রথম দিন বারবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ফিরে আসতে ইচ্ছে করলেও দ্বিতীয় দিন থেকে এই ইচ্ছাটা আস্তে আস্তে কমতে থাকে। তৃতীয় দিন থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার কথা আমার একেবারেই মনে পড়েনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় এক্সেস থাকলে যেসব সময়ে আমি হয়তো অকারণেই নিউজফিডে ঘুরাঘুরি করতাম সেসব সময়ে আমি বই পড়েছি, কাজ করেছি, পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটিয়েছি। পুরো সপ্তাহ সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকার কারণে আমার মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা বেশ ভালো হয়েছে। পাশাপাশি একটানা কোনো কাজ করার ধৈর্যেরও বেশ উন্নতি হয়েছে। কিছুদিন পর পরিস্থিতি কীরকম হবে জানিনা কিন্তু এখন আমি অনেক মোটিভেট বোধ করছি।

এখানে একটা কথা বলে রাখি, ডোপামিন ডিটক্স নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। অনেক আর্টিকেলে পড়েছি, এই ধারণাটা বা এটার উপকারগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত না।

যাই হোক, যেভাবে কাজটা করতে হবে

কয়েকদিনের জন্য আসক্তিকর কাজগুলো পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। আপনি যদি গেমে আসক্ত হোন তাহলে গেম বন্ধ রাখতে হবে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত হলে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার বন্ধ রাখতে হবে বা অন্যকোনো আসক্তি থাকলে কাজটা আপনাকে বন্ধ রাখতে হবে। মোটকথা হলো, যেসব কাজ আপনার শরীরে ডোপামিনের নিঃসরণ মাত্রাতিরিক্ত করে ফেলে আপনাকে সেইসব কাজগুলো থেকে বিরতি নিতে হবে।

আমার ক্ষেত্রে পুরো সপ্তাহজুড়ে আমি একবারও যেসব কাজ করিনি সেগুলো হলো: সোশ্যাল মিডিয়ায় আসিনি, মুভি দেখিনি, গান শুনিনি, ফাস্টফুডের ধারে-কাছে যাইনি।

ডোপামিনের ভারসাম্য ঠিক করে আমাদের জীবনের ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ডোপামিন ডিটক্স একটা জনপ্রিয় পদ্ধতি। বৈজ্ঞানিকভাবে যদিও পুরোপুরি ডোপামিন ডিটক্স সম্ভব না তথাপি আসক্তিকর কাজগুলো নির্দিষ্ট একটা সময় পর্যন্ত বন্ধ রাখতে পারলে ভালোই ফল পাওয়ার কথা। ডোপামিন ডিটক্স চলাকালীন সময়ে আসক্তিকর কাজ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখতে হবে এবং যথাসম্ভব খারাপ এই অভ্যাসগুলোকে ভালো অভ্যাস যেমন: বই পড়া, নিজের শখ নিয়ে কাজ করা, পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়া, কাজে মনোযোগী হওয়া দ্বারা রূপান্তর করে ফেলতে হবে। তাহলেই কেবল ডোপামিন ডিটক্সের দীর্ঘস্থায়ী উপকার পাওয়া সম্ভব।

আরও পড়ুন- ঝিমুনি ছাড়াই জেগে ওঠার ৫টি ধাপ

আত্মোন্নয়নমূলক বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

 

Muhit Ahamed Jamil

Muhit Ahamed Jamil

An optimistic dreamer

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading