দু’শো বছর পেরিয়ে মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেস্টাইন

লেখক মেরি শেলির ছবি

মেরি শেলির নাম শুনলেই মাথায় যেন একটা নামই ঘুরতে থাকে, ফ্রাঙ্কেস্টাইন। ফ্রাঙ্কেস্টাইন শব্দটি মাথায় ঘুরতে থাকার কারণ হলো, ছোটবেলায় বইটি অনেকের মনেই দাগ কেটেছিলো। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই বইটি কীভাবে লেখা হয়েছিলো? গল্পটা বলা যাক তাহলে।

বিখ্যাত কবি পার্সি বিসির সঙ্গে মেরির তখন খানিকটা প্রণয় চলছে। পরবর্তীতে তারা দু’জন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তো সেবার পার্সি বিসির সঙ্গে সুইজারল্যান্ডে বেড়াতে গিয়েছিলেন মেরি। পার্সি বিসি নিজে কবি হওয়ায় তার সঙ্গে আড্ডা দিতে কিংবা তার ভ্রমনের সঙ্গী হতে আসতেন অনেক কবি লেখক। সেবার তাদের সঙ্গী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন আরেকজন বিখ্যাত সাহিত্যিক লর্ড বায়রন ও তার বন্ধু ডাক্তার জন পলিডরি। কিন্তু দুর্ভাগ্য! আবহাওয়ার অবস্থা যাচ্ছেতাই হওয়ায় শেষ পর্যন্ত সারাদিন ঘরের ভেতর বন্দী হয়ে থাকতে হয়েছিলো সবার। ঘুরতে এসে এভাবে কি দিনের পর দিন ঘরবন্দী থাকা যায়? তাই এক রাতে লর্ড বায়রন সময় কাটানোর জন্য বের করলেন অন্যরকম এক খেলা। সেখানে থাকা সবাইকে ভূতের গল্প লেখার জন্য তিনি আহবান করলেন। কবি-সাহিত্যিকদের খেলা যেরকম হয় আর কি! অবশ্য ঘরবন্দী থেকে সবাই রাজি হয়ে গেলো সানন্দে। চিকিৎসক পলিডরি এবং সাহিত্যিক বায়রন দু’জনই ভ্যাম্পায়ার এবং ড্রাকুলা ভিত্তিক গল্প লিখতে গেলেন। কিন্তু মেরি এসবের ধার ধারলেন না।

মেরি শেলি ভৌতিক গল্প লিখতে বসে ভাবলেন গতানুগতিক ড্রাকুলা কিংবা রক্তচোষা ভ্যাম্পায়ারের দিকে তিনি মনোযোগ দেবেন না। তিনি তার লেখায় নিয়ে আসলেন এক অদ্ভুত দানবের কথা। যার জন্ম হয়েছে বৈজ্ঞানিক উপায়ে। আর এই দানবের বীভৎস এবং একইসাথে রোমাঞ্চকর কাহিনী নিয়ে সাজিয়ে ফেললেন আস্ত এক গল্প। তিনি প্রচলিত ভৌতিক ও রোমাঞ্চকর গল্প থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু লিখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তখনও জানতেন না, ইতোমধ্যে তিনি লিখে ফেলেছেন পৃথিবীর প্রথম সায়েন্স ফিকশন। যার জন্য তাকে স্মরণ করা হবে শত শত বছর পরেও। এটিই সেই গল্প, যার নাম- ফ্রাঙ্কেস্টাইন

মেরি শেলি

মজার ব্যাপার হলো, মেরি শেলি তখনও বুঝতে পারেননি গল্পটি অসাধারণ ছিলো। এবং তার এই গল্পের মাধ্যমেই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর ধারা সূচিত হতে চলেছে। অপর দু’জন সঙ্গী অর্থাৎ লর্ড বায়রন এবং তার প্রেমিক পার্সি বিসি শেলি দু’জনই গল্পটি পড়ে বেশ বিস্ময় প্রকাশ করেন। স্বাভাবিকভাবেই তারা এরকম গল্প এর আগে কখনও পড়েননি। শুধু এটুকুই নয়; বরং মেরির ভেতর যে লেখালেখির এক স্বতন্ত্র প্রতিভা ঘাপটি মেরে আছে তার সন্ধান পান লর্ড বায়রন এবং পার্সি বিসি শেলি দু’জনই। প্রথম পর্যায়ে এটি একটি ছোটগল্প ছিলো। পার্সিই তাকে অনুরোধ করেন এটিকে অন্তত ছোটগল্পের পরিসর ভেঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে রূপ দেবার জন্য। পরবর্তীতে ১৮১৮ সালে তিনি এটি প্রকাশ করেন ঠিকই কিন্তু ফ্রাঙ্কেস্টাইনের লেখকের নামের জায়াগায় স্পষ্ট অক্ষরে লেখা ছিলো ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’। এটির মাধ্যমে পৃথিবীর পাঠক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বা সায়েন্স ফিকশন নামক নতুন এক সাহিত্য ধারার সঙ্গে পরিচিত হন। আর এই অসাধারণ কৃতিত্বের কারণেই স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জনক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ‘দ্য লাস্ট ম্যান’ নামক আরও একটি উপন্যাস রচনা করেন। কিন্তু শত বছর পেরিয়ে গেলেও সাহিত্যপ্রেমিদের কাছে তিনি ফ্রাঙ্কেস্টাইনের রচয়িতা হিসেবেই পরিচিত হয়ে আসছেন।

এই বাড়িতেই রচিত হয়েছিল বিখ্যাত ‘ফ্রাঙ্কেস্টাইন’।

মেরি শেলি ছিলেন প্রথম নারীবাদী এবং চিন্তাবিদ মেরি ওলস্টোনক্রাফট এবং দার্শনিক উইলিয়াম গডউইনের মেয়ে। তাঁর বাবা উইলিয়াম গডউইন (১৭৫৬-১৮৩৬) ছিলেন একজন মুক্তমনা দার্শনিক, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক লেখক। ‘এনকুইরি কনসার্নিং পলিটিক্যাল জাস্টিস’ (১৭৯৩) হচ্ছে তাঁর লেখা বহুল জনপ্রিয় রাজনৈতিক বই। তাঁর মা মেরি উলস্টনক্রাফট গডউইন (১৭৫৯-১৭৯৭) ছিলেন একজন নারীবাদী অ্যাডভোকেট, যিনি ‘দি ভিনডিকেশন অব দ্য রাইটস অব উইমেন’ (১৭৯২) বইটি লেখার জন্য বিখ্যাত। স্বাভাবিকভাবেই তাই মেরির বেড়ে ওঠা ছিলো লন্ডনের উদার অভিজাতবলয়ে। মেরির জন্মের খুব কম সময়ের ব্যবধানে মারা যান তাঁর মা ওলস্টোনক্রাফট; এবং বাবার নতুন স্ত্রী তাঁকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা দিতে আগ্রহী ছিলেন না। সত্যি বলতে আঠারো শতাব্দীর শেষের দিকে অন্যান্য ইংরেজ নারীর মতো তিনিও তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করতে পারেননি। তবে তাঁর বাবা উইলিয়াম গডউইনের প্রেরণায় লিখতে ও পড়তে শিখেছেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর পিতামাতার লেখা দ্বারা তিনি প্রভাবিত হন, যা পরবর্তীকালে তাঁর লেখায় লক্ষ্য করা যায়। তাঁর বাবার বিশাল পাঠাগারটির সদ্ব্যবহার করেছেন প্রতিনিয়তই। এখান থেকে তাঁর বাবা ও মায়ের সংগ্রহ করা অসংখ্য বই পড়েন তিনি। বিবাহ-পরবর্তী জীবনে তাঁর স্বামী পার্সি বিসি শেলির থেকে গ্রিক, ল্যাটিন এবং অন্যান্য ভাষায় পারদর্শিতা লাভ করেন। মেরির পড়াশোনা শেখাটা সম্পূর্ণ ছিল বাড়িতে থেকে, মায়ের কবরের পাশে বই পড়ে। ১৬ বছর বয়সেই মেরি শেলির সঙ্গে দেখা হয় কবি পার্সি বিসি শেলির। পার্সি শেলি বিবাহিত জানার পরও মেরি তাঁর প্রেমে পড়েন। মেয়ে পার্সি শেলির প্রেমে পড়েছেন, খবরটি শোনামাত্র মেরির বাবা এই সম্পর্ককে নাকচ করলেও তাঁরা পালিয়ে গিয়ে ইউরোপ ভ্রমণ করেন এবং বিয়ে করেন।

২০১৮ সালে প্রথম আলো ফ্রাঙ্কেস্টাইন সম্পর্কে মন্তব্য করে এভাবে, ‘এই উপন্যাস থেকে যে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ কথাটির উৎপত্তি কেবল তা–ই নয়, সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে জীবন্ত চরিত্র এক পাগল বৈজ্ঞানিককে সৃষ্টি করে নতুন এক ধারা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জন্ম দিয়েছিলেন মেরি শেলি। সে সময় বেশির ভাগ নারী–লেখক লিখতেন পুরুষের ছদ্মনামে, কিন্তু মেরি প্রকাশিত হয়েছিলেন স্ব–নামেই । তবে প্রথমে অনেকে ভেবেছিলো এটি তাঁর স্বামীর লেখা। অচিরেই সেই ভুল ভাঙে। মেরি মারা যান ১৮৫১ সালে। কিন্তু আজ থেকে দুই শ বছর আগে ১৮১৮ সালে তিনি যে সৃষ্টি করলেন একটি চরিত্র, একটি শব্দ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, সেই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের স্রষ্টা হিসেবে চিরকাল বেঁচে থাকবেন মেরি শেলি’।

BUY NOW

সেসময় গথিক উপন্যাস অনেক বেশি প্রচলিত ছিলো। এ ধরনের উপন্যাসে লেখকেরা সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তোলেন। তাঁরা মৃত্যু ও প্রাকৃতিক শক্তিকে মানুষের থেকে বেশি শক্তিশালী রূপে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু ফ্রাঙ্কেস্টাইন প্রকাশের পরপরই এটি গথিক উপন্যাসের জগতে বিপ্লবের সূচনা করে। এসব উপন্যাসের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এসব উপন্যাসে আমরা অতিপ্রাকৃতিক বা রহস্যময়ী উপাদান দেখতে পাই। যেমন ডাক্তার ফ্রাঙ্কেনস্টাইন একটি রহস্যময়ী চরিত্র ছিলেন, যিনি একটি অতিমানবীয় দানব সৃষ্টি করেন। গথিক উপন্যাসের পরিবেশেও এক ধরনের অন্ধকারময় বা তিমিরাচ্ছন্ন ভাব থাকে। সাধারণত লোকচক্ষুর আড়ালে পুরনো ও পরিত্যক্ত কোনো বাড়ি, সুড়ঙ্গ কিংবা প্রাসাদে এ ধরনের ঘটনাগুলো চিত্রায়িত করা হয়। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ল্যাবরেটরিটিও এমন এক পরিবেশে চিত্রায়িত করা হয়েছে। এসব উপন্যাসের চরিত্রে স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যই লক্ষ্য করা যায়। বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে বিবেচনা করলে মেরি শেলির ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ পুরোপুরি সার্থক একটি গথিক উপন্যাস।

মেরি শেলির দাম্পত্য জীবন অবশ্য খুব সুখের হয়নি। স্বামীর বোহেমিয়ান জীবনযাপনে ব্যথিত হয়েছিলেন মেরি। বিপর্যয় এসেছে দুই সন্তানের মৃত্যুতেও। কিন্তু তা তাদের ভালবাসায় কখনও চিড় ধরাতে পারেনি। ১৮২২ সালের ৮ জুলাই। ৩০তম জন্মদিনের আগে বন্ধু এডওয়ার্ড উইলিয়ামসের সঙ্গে নৌকায় ফিরছিলেন কবি পার্সি বিসি শেলি। হঠাৎই ছন্দপতন। মাঝসমুদ্রে ডুবে গেলো নৌকা। পরে ভেসে উঠলো পার্সি বিসি শেলির দেহ। অকস্মাৎ থেমে গেলো রঙিন এক জীবন। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষকে হারালেন মেরি। মেরি শেলির শেষ জীবনে বেদনার যাত্রা অবশ্য শুরু হয়েছিলো অনেক আগেই। মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মেরি শেলিও চলে গেলেন নীরবে।

মেরি শেলির সমাধি

১৮১৮ সালে প্রকাশিত মেরি শেলির অমর সৃষ্টি ফ্রাঙ্কেস্টাইন, আজ প্রায় দু’শো বছর পেরিয়ে গেলেও আমাদের মাঝে টিকে আছে। সাহিত্য হয়তো হারিয়ে যায় না, যেমনটা হারিয়ে যায়নি ডক্টর ফ্রাঙ্কেস্টাইন।

মেরি শেলির বইগুলো সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading