যুদ্ধশিশুদের ব্যাপারে কখনও কি ভেবেছেন কিছু?

বনি ক্যাপাচিনো ও ক্যাটরিনা ক্যাপাচিনোর চাঞ্চল্যকর গল্প
juddhoshishu

মুক্তিযুদ্ধে শত্রুপক্ষের দ্বারা ধর্ষণের ফলে যেসব সন্তানের জন্ম হয়েছিল তাদেরকে যুদ্ধশিশু হিসেবে অভিহিত করা হয়। এবং যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তাদেরকে বলা হয় বীরাঙ্গনা। এই যাত্রার আগে ধর্ষনের ভয়াবহতা সম্পর্কে জানা জরুরী। চাইলে পরবর্তী অনুচ্ছেদটি এড়িয়ে যেতে পারেন।

পাকিস্তান ক্যাম্পের বিভিন্ন দেয়ালে আঁকা ছবি ও লেখা দেখে এসব ধর্ষনের ভয়াবহতা টের পাওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ডকুমেন্টারি বানাতে আসা একজন জার্নালিস্টের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি এমন অনেককে দেখেছি যারা স্টকহোম সিন্ড্রোমে ভুগছিলেন। মা এবং মেয়েকে পাশাপাশি বেধে গণধর্ষণ এবং পরবর্তীতে গর্ভবতী হবার পর বেয়োনেট দিয়ে পেটে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মা এবং পেটে থাকা সন্তানকে হত্যা করার কাজ তারা করেছিলো পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। পাকিস্তানি আর্মি বাংলাদেশী নারীদের এত পরিমান ধর্ষণ করেছিলো যে, ইতালীয় একটি চিকিৎসক দলের সমীক্ষা অনুযায়ী শুধুমাত্র ১৯৭১ সালের শেষেই ধর্ষনের কারণে জন্ম নিয়েছিলো চল্লিশ হাজার শিশু। সন্তানসম্ভবা হবার সাথে সাথে ‘অকেজো’ ভেবে অসংখ্য নারীকে বাজেভাবে হত্যা করা হয়। যখন আমি এসব লেখার চেষ্টা করি, আমার হাত কাঁপে।

সমস্যা হয়েছিলো দু’রকম। যেহেতু এটা এমন একটি অঞ্চল যেখানে পিতৃপরিচয়হীন এবং ধর্ষণের ফলে জন্ম নেয়া সন্তানকে সমাজ কখনই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে দেবে না। এবং সাথে সাথে যুদ্ধে প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই দেশে এসব সন্তানকে লালন করার মত অবস্থা সরকারের নিজেরও ছিলো না। অপরদিকে যেসব নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন তারা নিজেরাই সামাজিক বুলিংয়ের শিকার হতে থাকেন। সরকার তাদের নিয়ে কী পরিকল্পনা করেছিলেন, কীভাবে তারা হয়ে উঠলেন বীরঙ্গনা সেই গল্প আরেকদিন। তবে একটা কথা বলে রাখা দরকার, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পাশবিক নির্যাতনের শিকার হওয়া এসব নারীকে মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দেয়ার জন্য সময় লেগেছে ৪৪ বছর! বলতে খারাপ লাগলেও সত্য, আওয়ামীলীগের আগে কোন সরকারের কাছে এটি তেমন কনসার্নের কোন বিষয় ছিলো না।

এসব যুদ্ধশিশু কোথায় গেলো? এই প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরতো। বিভিন্ন সময় স্বাভাবিক ভাবে শুধু শুনতাম যে কানাডা কিছু সন্তানের দত্তক নিয়েছিলো। কিন্তু তারা কীভাবে দত্তক নিলো? অন্য দেশ থেকে তারা এসে সন্তান চাইলো আর দিয়ে দিলো? এই পুরো প্রসেসটা কী ছিলো? কারা এসব প্রসেস পরিচালনা করেছিলো? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ একদিন একটা খবর চোখে পড়লো।

বাংলাদেশে ঘুরতে এসেছেন এমন একজন মানুষ, যিনি একাই ১৯৭১ সালে প্রায় আঠারোজন যুদ্ধ শিশুকে দত্তক নিয়েছিলেন। তিনি এখন বৃদ্ধ। তার নাম বনী ক্যাপাচিনো। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন একজন যুদ্ধশিশুর পরবর্তীতে হওয়া কন্যা সন্তানকে। সময়টা ২০১৫। অর্থাৎ দত্তক নেয়া সন্তানের কন্যা এবং বনী ক্যাপাচিনোর নাতী। মেয়েটার নাম ক্যাটরিনা ক্যাপাচিনো।

বনি ক্যাপাচিনো এবং ক্যাটরিনা ক্যাপাচিনো
বনি ক্যাপাচিনো এবং ক্যাটরিনা ক্যাপাচিনো

এই খবরটা বেশ সাড়া জাগিয়েছিলো। কারণ ক্যাটরিনা বাংলাদেশের সেসময়কার ভয়ংকর দিনগুলোর কথা শুনে এবং নিজের মায়ের জন্ম সম্পর্কে শুনে আবেগ তাড়িত হয়ে সেখানেই কান্না করেছিলেন। তার পরদিন প্রায় সব নিউজ পত্রিকার লিড নিউজের ছবি ছিলো ক্যাটরিনা ক্যাপাচিনোর কান্নার ছবি।

মায়ের কথা জেনে কাঁদছেন ক্যাটরিনা
মায়ের কথা জেনে কাঁদছেন ক্যাটরিনা

আমি গুগলে সার্চ করলাম বনী ক্যাপাচিনো। কিছুই এলো না। ভাবলাম ক্যাটরিনা যেহেতু এই সময়ের মেয়ে, থাকে অন্টারিওতে। নিশ্চয়ই তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চালান। আমি টুইটার, ইনস্টা এমনকি ফেসবুকেও সার্চ করলাম। সেরকম কিছুই পেলাম না। প্রায় বেশ কিছুদিন ঘাটাঘাটি করার পর হুট করে একটা ব্লগ সাইট দেখলাম। আনাড়ি সাইট, যেখানে একজন তার বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা লেখেন। তিনি বাংলাদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন ২০১৫ সালে। আমি তার ছবি দেখে মেলানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ব্লগ সাইটের নামটা দেখে মেরুদন্ডে শীতল শ্রোত বয়ে গেলো। ব্লগ সাইটের নাম ডাবল ক্যাপাচিনো ডট……

ক্যাটরিনা ক্যাপাচিনো এবং তার নানী বনী ক্যাপাচিনো যেসব জায়গায় ভ্রমন করতে যান সেগুলো লিখে রাখার জন্যই এই ব্লগ সাইটটা খোলা হয়েছিলো। তাই নাম দেয়া হয়েছে ডাবল ক্যাপাচিনো। আমি ব্লগ সাইটের কোথাও কোন যোগাযোগের জায়গা পেলাম না। শুধু পেলাম, তারা চাইল্ড হ্যাভেন নামে একটি সংস্থা চালান। আমি খোঁজ করে জানলাম আমাদের চট্টগ্রামে এটির শাখা আছে। কিন্তু সেখানেও যোগাযোগ করার কোন উপায় পেলাম না।

ক্যাটরিনা ক্যাপাচিনোকে খুঁজে পেয়ে আমার তেমন কোন লাভ হলো না। আমি অনেক ঘেটে জানতে পারলাম, তার মা অর্থাৎ যুদ্ধশিশুটির নাম ছিলো শিখা। শিখা কখনও বাংলাদেশে না এলেও কোনো কোনো যুদ্ধশিশু কিন্তু বাংলাদেশে এসেছিলেন। তার মধ্যে একজন শ্যামা হাট।

১৯৭২ সালে যুদ্ধশিশুদের দত্তক নিতে আসা নারী শ্যামাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে

শ্যামার গল্পটা মজার। মুস্তফা চৌধুরী নামের একজন প্রবাসী নব্বইয়ের দশকে কানাডার আর্কাইভে চাকরি করতেন। তিনি একদিন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ থেকে কানাডায় দত্তক নেয়া যুদ্ধশিশুদের একটি ডকুমেন্ট খুঁজে পান। তিনি সেসময়ই সবকিছু রেখে তাদেরকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন। কারণ ততদিনে প্রায় সবাই বেশ বড় হয়ে গেছে। মুস্তফা চৌধুরী যাদেরকে খুঁজে পেয়েছিলেন শ্যামা তাদের মধ্যে একজন। তিনি শ্যামাকে বাংলাদেশে আসার আহবান জানিয়েছিলেন নব্বইয়ের দশকে। মুস্তফা চৌধুরী সেইসব অভিজ্ঞতা নিয়ে দারুণ একটি বই লিখেছিলেন, যার নাম- ‘আনকন্ডিশনাল লাভঃ স্টোরি অব এডাপশন অব নাইন্টিন সেভেন্টি ওয়ান ওয়ার বেবি’জ’।

যুদ্ধশিশু শিখা এবং তার কন্যা

২০১৭ সালের দিকে শ্যামা হাট, মুস্তফা চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানান যে, তিনি বাংলাদেশে ঘুরতে আসতে চান। তিনি বাংলাদেশে এসে এখানে আর্কাইভে থাকা একটি পত্রিকা দেখতে পান, যেখানের একটি পাতায় বড় করে দেয়া ছবি। যাতে দত্তক নিচ্ছেন একজন দম্পতি, কোলে সেই ছোট্ট শ্যামা।

আমি সব ভাবেই যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হই। হাল ছেড়ে না দিয়ে ভাবি, নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও কিছু ডকুমেন্টস তো থাকবেই। ফিরে যাই সেই প্রথম প্রশ্নে। কী প্রসেসে তাদের দত্তক নেয়া হয়েছিলো? যুদ্ধ শেষ হওয়া দেশে অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি এই যুদ্ধশিশু সম্পর্কিত সংকট নিরসন কীভাবে করা যায়? এটা নিয়ে দারুণ একটি বুদ্ধি বের করা হয়। আজকে পৃথিবীজুড়ে এত সুবিধা থাকার পরও আমরা সংকট নিরসন করতে গবেষকদের ডাকি না। সেসময় এই সংকট নিরসনের জন্য ইন্টারন্যাশনাল সোশাল সার্ভিস নামে একটি সংস্থাকে ডাকা হয় এই বিষয়ের উপর পড়াশোনা করে একটি সমাধান দেবার জন্য। সেসময় এই বুদ্ধিটা বের করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এই সংস্থা মোটামুটি তিনমাস বিভিন্ন কেস স্ট্যাডি করে দত্তক দেয়ার একটি সমাধান দেয়। এর বিভিন্ন কারণ ছিলো। আগেই বলেছি অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন স্টেরিওটাইপের কারণে এখানে যুদ্ধশিশুদের বেড়ে ওঠা ছিলো চ্যালেঞ্জিং। অন্যদিকে তাদের দত্তক নিলে তাদের যদি আবার দেশে আনা হয় সেক্ষেত্রে অন্য সমস্যা শুরু হতে পারে। তাই এই ক্ষেত্রে শর্ত দেয়া হয়, যেই দেশে দত্তক নেয়া হবে সেই দেশের নাগরিকত্ব দেয়া বাধ্যতামূলক। এই প্রসেসে বেশ ভালো ভূমিকা রেখেছিলো মিশন অব চ্যারিটি নামের একটি মিশনারি সংগঠন। আমি পরলাম বিরাট বিপদে। খ্রিস্টান মিশনারিদের সংগঠনে আমি কেমনে যাবো সেসময় আমি মেসেজ দিলাম আমার বান্ধবী সীথি রোজ গোমেজকে। কিন্তু এই লকডাউন এই ব্যাপারটাকেও ভেস্তে দিলো।

আল্টিমেটলি এই নয়শো শব্দের লেখায় কিছুই নেই। কিন্তু আমি লিখতে গিয়ে খুঁজে পাই ক্যাটরিনা ক্যাপাচিনোর মা শিখাকে। কিংবা শ্যামা হাটকে যিনি বাংলাদেশে ঘুরতে এসে অবাক হয়েছেন, জেনেছেন নিজের দেশ সম্পর্কে। নিজের মায়েদের সম্পর্কে তারা জানেন না, তারা বড় হয়েছেন অন্য পৃথিবীতে।

কিন্তু আপনাদের মায়েদের সম্পর্কে আমরা জানি। তারা আপনার একার মা নয়; তারা আমাদের অনেকের মা।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখাগুলো দেখুন 

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading