হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প : কী ছিল নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির কারণ?

nianderthal

প্রাণীজগতের সকল প্রাণীরই আছে আলাদা আলাদা প্রজাতি। আমরা মানুষও তার ব্যতিক্রম নই। আমাদেরও আছে বেশ কয়েকটি প্রজাতি। পরিবার বৃক্ষতে মানুষের (হোমো স্যাপিয়েন্স) সবচেয়ে কাছের প্রজাতি হল নিয়ান্ডারথাল বা হোমো-নিয়ান্ডারথাল, যাদের আবাসস্থল ছিল ইউরোপ এবং এশিয়ার মধ্য ও পশ্চিম অঞ্চল। আজ থেকে প্রায় ৩০ বা ৪০ হাজার বছর আগে তারা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমান সময়ে তাদের অসংখ্য ফসিল উদ্ধার করা হয়েছে। কেমন ছিল তাদের জীবনযাপন? কেনই বা তারা হয়েছে বিলুপ্ত?

প্রথম নিয়ান্ডারথাল ফসিল উদ্ধার এবং নামকরণ

বেলজিয়ামের এঞ্জিসের কাছে অবস্থিত এক গুহা থেকে ১৮২৯ সালে একটি নিয়ান্ডারথাল শিশুর মাথার খুলি আবিষ্কার করা হয়, যা ছিল নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির পাওয়া সর্বপ্রথম ফসিল। এরপর ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে হাজার হাজার ফসিল আবিষ্কৃত হয়েছে, যার মধ্যে শিশু থেকে শুরু করে ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত প্রাপ্তবয়স্কের ফসিল অন্তর্ভুক্ত আছে। যদিও ১৮২৯ সালে নিয়ান্ডারথালদের প্রথম ফসিল আবিষ্কৃত হয়েছিল, তবুও ১৮৫৬ সালে জার্মানির নিয়ান্ডারথাল উপত্যকা থেকে আবিষ্কৃত ফসিলটিকেই নিয়ান্ডারথালদের আদর্শ ফসিল হিসেবে গণ্য করা হয়। আর এই নিয়ান্ডার উপত্যকার নামানুসারেই এই প্রজাতিটির নামকরণ করা হয়েছে নিয়ান্ডারথাল।

বসতি স্থাপন ও দৈহিক গঠন

আমাদের সমসাময়িক ও প্রায় একই বৈশিষ্ট্যধারী নিয়ান্ডারথালদের বিকাশ ঘটেছিলো মূলত ইউরোপ এবং এশিয়াতে। আবিষ্কৃত ফসিলের গবেষণালব্ধ ফলাফল অনুসারে নিয়ান্ডারথালদের পূর্ণ বিকাশ হয়েছিলো আজ থেকে প্রায় ৪ লক্ষ বছর আগে ইউরোপে। প্রখর অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন এই প্রজাতিটি ইউরেশিয়া, পশ্চিম পর্তুগাল এবং ওয়েলস থেকে সাইবেরিয়ার আলটাই পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। ঠাণ্ডা জলবায়ুতেও কয়েক লাখ বছর ধরে সফলভাবে বসতি স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিল তারা।

যেহেতু নিয়ান্ডারথালদের আবির্ভাব ঘটেছিল শেষ তুষার যুগে, তাদের দৈহিক গঠন ও জীবন যাত্রা ছিল শীতল আবহাওয়ার উপযোগী। তাদের মুখের কেন্দ্রীয় অংশটি সামনের দিকে প্রসারিত ছিলো। তাদের চেহারার মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি নজরে পড়তো তা হল তাদের লম্বা এবং প্রশস্ত নাক। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ঠান্ডা এবং শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকার জন্যই তাদের চেহারার এইরকম বিশেষ ধরণের গঠন ছিল। তারা যে নিশ্বাস নিতো তা আর্দ্র এবং উষ্ণ করতে তাদের এই অপেক্ষাকৃত প্রশস্ত নাককে কাজে লাগাত। তাদের ছোট হাত-পা সম্বলিত গাট্টাগোট্টা ধরণের শরীর ঠান্ডা পরিবেশে টিকে থাকার জন্য সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিল।

এখন প্রশ্ন জাগতে পারে, তাদের দেহের গড়ন ঠাণ্ডা পরিবেশে বসবাসের উপযোগী হলেও তাদের বিলুপ্তি ঘটল কেন! এমন প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক।

বিলুপ্তির কারণ

প্রখর অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্ন নিয়ান্ডারথাল প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ বছর বেঁচে থাকার পর কিভাবে বিলুপ্ত হলো সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাদের বিলুপ্তির সঠিক কারণ এখনো অজানা থাকলেও তাদের বিলুপ্তি নিয়ে বেশ কিছু ধারণা প্রচলিত রয়েছে।

অনেকে মনে করেন, নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির পেছনে বৈরী আবহাওয়া দায়ী। তাদের দৈহিক গঠন যদিওবা ঠাণ্ডা পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর উপযোগী ছিল, প্রায় পঁচিশ হাজার বছর আগে শেষ বরফ যুগের অবসান ও আবহাওয়া বিপর্যয়ের ফলে পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে নিয়ান্ডারথালরা ব্যর্থ হয়েছিল। ক্রমশ আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে তাদের অভিযোজন ক্ষমতাও হ্রাস পেতে থাকে। বিরুপ আবহাওয়ার ফলে নিয়ান্ডারথালরা খন্ড খন্ড দল উপদলে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদের বংশবৃদ্ধির মাত্রাও অনেকখানি হ্রাস পায়। আর তাদের সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে।

শীতল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তাদের বিশেষ ধরণের দৈহিক গঠন শরীরে তাপ ধারণ করে রাখার উপযোগী ছিল। তবে সে জন্য প্রত্যহ প্রায় পাঁচ হাজার কিলোক্যালরি পরিমাণ খাদ্য গ্রহণের প্রয়োজন হতো। এই পরিমাণ ক্যালোরির চাহিদা তারা ম্যামথ, বল্গা হরিণ বা পাহাড়ী ভাল্লুকের মতো বড় বড় প্রাণী শিকার করার মাধ্যমে পূরণ করতো। শেষ বরফ যুগের অবসানের সাথে সাথে অনেক প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে নিয়ান্ডারথালদের প্রয়োজনীয় ক্যালোরির চাহিদা পূরণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। খাদ্যবস্তুর অভাব বাড়তে থাকে। আর তারাও অতিসত্বর নতুন খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হতে পারেনি।

কারো কারো মতে, নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির পেছনে হোমো স্যাপিয়েন্স অর্থাৎ আধুনিক মানুষরাই দায়ী। ৪০ থেকে ৬০ হাজার বছর আগে ইউরোপে হোমো স্যাপিয়েন্সদের আবির্ভাব ঘটে। সে সময় হোমো স্যাপিয়েন্স এবং নিয়ান্ডারথালরা সহাবস্থানই করতো। কিন্তু হোমো স্যাপিয়েন্সরা তাদের বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগে প্রতীকী শিল্পকর্মে উন্নতি করতে থাকলে নিয়ান্ডারথাল এবং হোমো স্যাপিয়েন্সদের মধ্যে প্রতিযোগিতার সূচনা ঘটে। হয়তো আধুনিক মানুষের বুদ্ধিমত্তার সাথে টেক্কা দিতে না পেরে তাদের বিলুপ্তির সূচনা ঘটেছিল। এছাড়াও নিয়ান্ডারথালরা প্রজননের দিক দিয়ে হোমো স্যাপিয়েন্সদের থেকে পিছিয়ে থাকার ফলে হোমো স্যাপিয়েন্সদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়তে থাকে। ফলে টিকে থাকার লড়াইয়ে নিয়ান্ডারথালরা পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা মতে জিনগতভাবে নিয়ান্ডারথালরা হোমো স্যাপিয়েন্সদের তুলনায় দুর্বল ছিলো। ফলে তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারেনি।

ক্রমাগত জলবায়ুর পরিবর্তন ও অসহায় নিয়ান্ডারথাল

আমরা আগেই জেনেছি, নিয়ান্ডারথালরা তাদের রাজত্ব করেছিল মূলত তুষার যুগে। আর শীতল পরিবেশের উপযোগী তাদের বিশেষ ধরণের দৈহিক গঠন তাদের টিকে থাকার বোনাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছিল। তবুও জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ান্ডারথালরা সহ্য করতে পারেনি। এর কারণ কি?

আসলে, জলবায়ুর ভয়াবহ তীব্রতা আগে কখনো এই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এর পূর্বে জলবায়ু যতবার রুক্ষ হয়েছে, ততবার আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। ফলে তীব্র প্রতিকূল অবস্থা কেটে যাওয়ার পর নিয়ান্ডারথালরা সময় পেতো সেরে উঠার। কিন্তু এবার সেরে উঠার আগেই জলবায়ু আরো প্রতিকূল হয়ে গেছে। ফলে দৈহিক সহনশীলতার পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, যার সাথে তারা পেরে উঠেনি। খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্যও ছিল কম, ফলে অন্য কিছু খেয়ে বেঁচে থাকাটা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শুধু অত্যধিক ঠাণ্ডা পরিবেশই নয়, আরও অনেক ধরণের জলবায়ুগত পরিবর্তন কাবু করে ফেলেছিল নিয়ান্ডারথালদের। বলা যায়, জলবায়ুর ক্রমবর্ধমান পরিবর্তনের ফলে আচার-অভ্যাস ও খাদ্যাভ্যাসে যে ধরণের পরিবর্তন আনার দরকার ছিল, তারা তাতে ব্যর্থ হয়েছিল।

আধুনিকদের সাথে টিকে থাকার প্রতিযোগিতা

নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তিতে জলবায়ুর প্রভাব তো ছিলই, পাশাপাশি আমাদের এও মানতে হবে যে হোমো স্যাপিয়েন্স তথা আধুনিক মানুষও তাদের বিলুপ্তিকে ত্বরান্বিত করেছিল। কারণ তাদের বিলুপ্তির সূচনাই ঘটে আধুনিক মানুষ যখন আফ্রিকার ক্রান্তীয় পরিবেশ ছেড়ে ইউরোপে বসতি স্থাপন শুরু করে। শুরু হয় টিকে থাকার লড়াই। কিন্তু ঠিক কি কারণে আধুনিকরা টিকে থাকলেও প্রবল অভিযোজন ক্ষমতাসম্পন্ন নিয়ান্ডারথালরা পা বাড়াল বিলুপ্তির পথে? বিজ্ঞানীদের এ ব্যাপারে নানামত থাকলেও খাদ্যের প্রতিযোগিতা যে নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির একটি বড় কারণ তা নিয়ে সন্দেহ নেই।

একে তো জলবায়ুর ক্রমাগত পরিবর্তনের ফলে নিয়ান্ডারথালদের আহার যোগ্য বড় বড় ম্যামথ, বল্গা হরিণ বা পাহাড়ী ভাল্লুকের বিলুপ্তি ঘটতে শুরু করে। তার উপর এসে যুক্ত হল আধুনিক মানুষ। ফলে ভাগ বসল নিয়ান্ডারথালদের আহারে। এসব প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটতে থাকলে আধুনিক মানুষ পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে অন্য উপায়ে খাদ্যের চাহিদা মেটাতে থাকে। আর এই জায়গায় ব্যর্থ হয় নিয়ান্ডারথালরা। তারা নতুন খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে তারা ধীরে ধীরে ঢলে পড়ে বিলুপ্তির মুখে।

ক্যানিবালিজম

ক্যানিবালিজমকেও তাদের বিলুপ্তির একটি কারণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। ক্যানিবালিজম হল নিজ প্রজাতির মাংস খাওয়া। একসময় নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে এই ক্যানিবালিজমের চর্চা শুরু হয়। তারা যে নিজ প্রজাতির মাংস খেতো, তার প্রমাণ মিলেছে বেলজিয়ামের গোয়েত গুহা থেকে প্রাপ্ত মানুষের হাড়ে। এসব হাড় বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন যে নিয়ান্ডারথালরা শেষ পর্যায়ে নিজ প্রজাতির মাংস খাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। প্রাপ্ত হাড়গুলো নিয়ান্ডারথালরা যে সময় পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হতে বসেছিল সে সময়ের। এমনকি এক পর্যায়ে তারা মৃতদেহ পর্যন্ত খাওয়া শুরু করেছিল। হয়তো পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাব তাদের এ নিকৃষ্টতম কাজে বাধ্য করেছিল।

বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে তারা কতটা নিষ্ঠুরভাবে নিজ প্রজাতির মাংস খেতো তাও উঠে এসেছে। নিয়ান্ডারথালরা তাদের নিজ প্রজাতির হাড়গুলো এমনভাবে ভেঙেছে যেভাবে তারা ঘোড়া এবং হরিণের হাড় ভাঙতো। হাড় থেকে এমনভাবে মাংস বিচ্ছিন্ন করেছে যেভাবে ঘোড়া এবং হরিণের মাংস বিচ্ছিন্ন করতো। কিন্তু ঠিক কী কারণে তারা নিজেদের মাংস খাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল তা এখনো রহস্যের বিষয় বৈকি! তাদের বিলুপ্তিতে তাদের এই অতি আগ্রাসী জীবনযাপনও যথেষ্ট পরিমাণে দায়ী।

তবে ঠিক কি কারণে নিয়ান্ডারথালরা বিলুপ্ত হয়েছিল তা স্পষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে আমরা সম্ভাবনার কাঁধে ভর দিয়ে ধারণা করতে পারি শুধু। কারণ প্রতিটি ফসিল আবিষ্কারের সাথে সাথে কোন বিষয়ে নিশ্চিত হলে আবার নতুন বিষয়ে সন্দেহের জন্ম হয়। হয়তো নিয়ান্ডারথালরা বিলুপ্ত হয়নি, হয়তো তারা আমাদের পূর্বপুরুষ! কিংবা হয়তো তাদের বিলুপ্তির পিছনে আরো বড় কারণ আছে যা এখনো আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়নি। কোন বিষয়ই নিশ্চিত করে বলা যায় না আসলে। তবে যে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যায় তা হল ইউরেশিয়ার সকল স্থানের নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তি এক কারণে হয়নি। তারা যেহেতু অনেক দল উপদলে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, ফলে তাদের বিলুপ্তিতেও স্থানভেদে আলাদা প্রভাব বিরাজ করেছিল। যেমন, ২৮,০০০ বছর আগে জিব্রাল্টার থেকে বিলুপ্তদের যে হোমো স্যাপিয়েন্সদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়নি এটা নিশ্চিত। কারণ এখানে নিয়ান্ডারথালদের বিলুপ্তির বহু পরে আধুনিকদের আগমন ঘটেছে।

বিজ্ঞান বিষয়ক বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

মজার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading