যেভাবে গঠিত হয়েছিল মুজিব নগর সরকার

0001-5870747820_20210813_150503_0000

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। গুরুত্বপূর্ণ ছয়জন যাত্রী নিয়ে কলকাতা থেকে একটি গাড়ি যাত্রা শুরু  করেছে। গন্তব্য—বৃহত্তর কুষ্টিয়ার মেহেরপুর। এই ছয়জন জানতেন, তাদের হাত ধরেই রচিত হতে যাচ্ছে নতুন ইতিহাস। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এম এ জি ওসমানীকে সেই গাড়িটি মেহেরপুর পৌঁছানোর আগে আমরা একটু ইতিহাসটা জেনে আসি।

গন্তব্য মেহেরপুর

নিজ ভূখণ্ডে তাদের একটা নিরাপদ অঞ্চলের প্রয়োজন ছিল। যেখানে ভারত থেকে প্রবেশ করাটা সহজ হবে। যে এলাকায় শত্রুর হামলার সম্ভাবনা কম থাকবে – বিশেষ করে আকাশ পথ দিয়ে। বাংলাদেশের দিক থেকেও পথটা দূর্গম হতে হবে। এই সবকিছু বিবেচনা করেই মুক্তাঞ্চল মেহেরপুরকে নির্বাচন করা হয়।

ভারতীয় এক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মেহেরপুরে আসেন। বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে সরেজমিনে সব দেখেন তিনি। এরপর কুষ্টিয়ায় অবস্থানরত পাবনার সে সময়ের ডিসি নূরুল কাদের খান এবং মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর সঙ্গে সব বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে এক সমঝোতায় পৌঁছেন। পুরো বিষয়টি নিরাপত্তার খাতিরে এতোটাই গোপনীয়তার সাথে সম্পন্ন করতে হয়েছিলো যে অনুষ্ঠানের সময়-তারিখও নির্ধারণ করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন,

”লেফটেন্যান্ট কর্নেল চক্রবর্তী নামে বিএসএফের একজন কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। এরই ধারাবাহিকতায় বৈদ্যনাথতলার আমবাগানটি বাছাই করা হলো। সেখানে আমবাগান থাকায় আকাশ থেকে সহজে দেখা যায় না। মেহেরপুর থেকে ১০/১২ কিলোমিটার দূরত্বে হলেও রাস্তাঘাট নষ্ট থাকায় সহজে যাওয়া যায় না। আবার ভারত থেকে সহজেই সেখানে প্রবেশ করা যায়।”

অখ্যাত এক আমবাগান

স্থান নির্বাচনের পর, আমবাগানের ঘন আচ্ছাদনে অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু হলো। তীব্র উদ্বেগে আয়োজকরা।

তৌফিক-ই-ইলাহির ভাষ্যমতে, ছোট একটা মঞ্চের মতো ব্যবস্থা করা হলো। কাছাকাছি ভবেরপাড়ার একটি মিশনারি হাসপাতাল থেকে কিছু চেয়ার টেবিলও ধার করে নিয়ে আসা হয়েছিলো। শত্রুপক্ষ হঠাৎ বিমান হামলা করে বসলে যাতে প্রতিহত করা যায়, সে জন্য ভারতীয় আর্মির কিছু লোককে যেতে দেয়া হয়েছিলো।

তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, ”আমাদের লোকজনকে নিয়েও একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলো, যাতে শত্রু আক্রমণ করলে প্রতিরোধ করে সবাই নিরাপদে চলে যেতে পারেন। ওই সময় যুদ্ধের পরিস্থিতিতে গ্রামেগঞ্জে খুবই সীমিতভাবে আয়োজন করতে হয়েছিল।”

অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদেরকে উপস্থিত করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিলো মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক ও বিশেষ সহায়ক এম আমীর-উল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের তৎকালীন হুইপ আবদুল মান্নানের ওপর।

এ প্রসঙ্গে এম আমীর-উল ইসলাম লিখেছেন,

“১৬ এপ্রিল আমরা দুজনে মিলে কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। এই প্রথম বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দুজন প্রতিনিধি বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিত হলেন। পুরো প্রেসক্লাব লোকে লোকারণ্য। সার্চলাইটের মতো অসংখ্য চোখ আমাদের দিকে নিবদ্ধ। ক্লাবের সেক্রেটারি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন।”

সমবেত হওয়া সাংবাদিকদেরকে পরদিন ভোরে প্রেসক্লাবে হাজির হতে অনুরোধ জানানো হয়েছিলো। তাঁদের বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের একটি বিশেষ বার্তা তখন জানানো হবে। সাংবাদিকদেরকে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁরা দুইজন গাড়ি তৈরি রাখবেন বলে জানিয়েছিলেন।

কর্মসূচি অনুযায়ী পরদিন কলকাতা প্রেসক্লাবে সকলে উপস্থিত হলেন। অত ভোরেও ক্লাব ছিল লোকে লোকারণ্য। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ক্লাবের বাইরেও কিছু সাংবাদিক দাঁড়িয়ে।

সকলের উদ্দেশ্যে আমীর-উল ইসলাম যা বলেছেন সে প্রসঙ্গে তিনি বলেন,

“তাঁদের জানালাম স্বাধীন বাংলার মাটিতে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করবে। আপনারা সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। এ সময় কেউ কেউ জানতে চাইলেন, কোথায় যাবেন, কীভাবে যাবেন? আমি আবার বললাম, ‘আমরা আপনাদের সঙ্গে রয়েছি। পথ দেখিয়ে নিয়ে যাব।’ আমাদের গাড়িগুলো তখন প্রেসক্লাবের সামনে। উৎসাহী সাংবাদিকেরা গাড়িতে উঠলেন। অনেকের কাঁধে ক্যামেরা। ৫০-৬০টি গাড়ি নিয়ে আমরা রওনা দিলাম গন্তব্যস্থলের দিকে। আমি ও আবদুল মান্নান দুজন দুই গাড়িতে।”

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান

সকাল নয়টায় আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করেন। প্রায় একশো জন সাংবাদিকসহ বাকি সকলে বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে উপস্থিত হলে, সকাল এগারোটায় স্বল্প পরিসরে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। ছোট্ট মঞ্চটিতে সাতটি বা আটটি চেয়ার রাখা হয়, যার একটি খালি রাখা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্য।

শপথ গ্রহন

শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের তৎকালীন হুইপ আবদুল মান্নান পরিচালনা করেন। সেখানে ‘ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেন্ডেন্স’ বা ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পাঠ করেন গণপরিষদের স্পিকার অধ্যাপক ইউসুফ আলী। তিনিই ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীদের শপথ বাক্য পাঠ করান। সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তার মন্ত্রিসভার মন্ত্রীদের পরিচয় করিয়ে দেন। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠের আগে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন ঝিনাইদহ মহকুমার পুলিশ প্রধান মাহবুব উদ্দিন আহমদ। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেবে কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীর নাম ঘোষণা করেন।

উপস্থিত ছিলেন যারা

মন্ত্রীসভার সদস্য, কলকাতা থেকে আগত সাংবাদিক আর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ছাড়াও সেদিন আমবাগানের অনুষ্ঠানে ভরদুপুরে  পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার লোক জমায়েত হয়। হাজারো কণ্ঠে তখন উচ্চারিত হচ্ছিল ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ ইত্যাদি স্লোগান। সেই হাজার মানুষের ভিড়ে একটা নির্মম গল্পকে আমরা পেছনে ফেলে এসেছি।

গল্পের ভেতরে যে গল্প

বৈদ্যনাথতলা থেকে পৌনে এক মাইল দূরে—মহেশনগর। সেই মহেশনগরের বাসিন্দা বাকের আলী তখন ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের ছাত্র। মুজিবনগর নাম নিয়ে বৈদ্যনাথতলায় যখন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়, তখন অন্যদের মতো জয় বাংলা ধ্বনি তুলে সরকার গঠনের অনুষ্ঠানে তিনিও চএসেছিলেন।

শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের শুরুতে যখন কোরআন তিলাওয়াতের জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন এগিয়ে আসেন বাকের আলী। এই গল্পটা এখানেই শেষ হলেও পারতো। কিন্তু গল্পটা শেষ হয়েছে নির্মমতার উদাহরণ হয়ে।

পাকবাহিনী যখন মুজিবনগর আক্রমণ করে, সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন বাকের আলী। বাংলাদেশ সরকার গঠনের অনুষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াতের অপরাধে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে। আমগাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে তার শরীরের নানা জায়গা চিরে ফেলা হয় বেয়োনেট দিয়ে। চিরে ফেলা ক্ষতস্থানের ওপর শুকনো মরিচের গুঁড়ো আর লবণ ছড়িয়ে দেয়া হয়। অত্যাচারের মাত্রা এখানেই থেমে থাকেনি। চারদিকে জড়ো হওয়া পাকসেনাদের দোসরদের দিয়ে আমগাছ থেকে পিঁপড়ার বাসা এনে ছড়িয়ে দেয়া হয় বাকের আলীর সারা গায়ে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে একসময় তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তার সৌভাগ্য এটুকুই, পাকসেনারা তাকে মৃত ভেবে ফেলে যায়। গ্রামবাসী এসে উদ্ধার করেন বাকের আলীকে।

মুজিবনগর সরকার মন্ত্রণালয়

ঊনিশশো একাত্তর সালের দশই এপ্রিল আগরতলায় যে গণপ্রজাতন্ত্রী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সতেরোই এপ্রিল শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় তারই বাস্তবায়ন ঘটে। এই ধারাবাহিকতায় পরদিন, মন্ত্রীদের মধ্যে দফতর বণ্টন হয়। মুজিবনগর সরকারকে ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ভাগ করা হয়। এছাড়া কয়েকটি বিভাগ মন্ত্রিপরিষদের কর্তৃত্বাধীন থাকে।

সেই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে বন্দী থাকার কারণে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন উপরাষ্ট্রপতি—সৈয়দ নজরুল ইসলাম।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে প্রতিরক্ষা, তথ্য, সম্প্রচার ও যোগাযোগ, অর্থনৈতিক বিষয়াবলি, পরিকল্পনা বিভাগ, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য, শ্রম, সমাজকল্যাণ, সংস্থাপন এবং অন্যান্য যেসব বিষয় কারও ওপর ন্যস্ত হয়নি তার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী করা হয়। পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন খন্দকার মোশতাক। আর অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন এম মনসুর আলী। সর্বশেষে স্বরাষ্ট্র, সরবরাহ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত হন এ এইচ এম কামরুজ্জামান।

স্বাধীনতার গনগনে সূর্য

সতেরোশ সাতান্ন সালে ইংরেজদের কাছে বাঙালি জাতি তার স্বাধীনতা হারিয়েছিলো এক আমবাগানে। ইতিহাসের খাতায় যার নাম পলাশীর আম্রকানন। দুইশ বছর পর আরেক আম্রকাননে, দখলদার বাহিনীকে দেশছাড়া করার মহান ব্রতের মাধ্যমে নতুন করে উদিত হয় স্বাধীনতার গনগনে সূর্য।

মুজিবনগর সরকার সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুন

Leave a Comment

You May Also Like This Article


Notice: Undefined offset: 3 in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-includes/class-wp-query.php on line 3300

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 30

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 31

Notice: Trying to access array offset on value of type bool in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 33
Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading