কাজী আনোয়ার হোসেন: সেবার অগ্রপথিক

১৯৬৪ সালের জুনে 'কুয়াশা' সিরিজের প্রথম বই দিয়ে আত্মপ্রকাশ করলো সেবা প্রকাশনী৷ সেই সাথে বাংলা সাহিত্য পেল একজন নতুন থ্রিলার লেখক –কাজী আনোয়ার হোসেন৷ সেগুনের ‘সে' আর বাগিচার ‘বা' নিয়ে যে ‘সেবা' গঠিত হলো, আর যাত্রা শুরু করলো সাহিত্যের এক নতুন জগৎ।
কাজী আনোয়ার

বই রাখার বাক্সগুলো ঘাঁটতে যেয়ে একগাদা মলিন পেপারব্যাক বই চোখে পড়লো। ধুলোও ঝাড়া লাগলো না, দেখেই বুঝলাম এগুলো সেবা প্রকাশনীর। ‘পেপারব্যাক’ শব্দটা শুনলেই কেন জানি চোখের সামনে সবার আগে সেবা প্রকাশনীর ওই প্রজাপতির ছবিটা ভেসে ওঠে।

বাংলাদেশের বইপ্রেমিরা একটা সময় পেপারব্যাক বলতেই বুঝতেন সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, কুয়াশা সিরিজ, কিশোর হরর সিরিজ, কিশোর ক্লাসিক সিরিজ, ওয়েস্টার্ন সিরিজ, রহস্য পত্রিকা। একসময় ক্লাসিক বই মানেই ছিল যেন সেবার অনুবাদ

লেখালেখির সূচনা যেভাবে হলো

কাজী আনোয়ার হোসেন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। আমাদের চোখে সাহিত্যের শিক্ষার্থী মানেই যেকোনো কিছু নিয়েই সে পাতার পর পাতা লিখে যেতে পারে। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে ছিল সম্পূর্ণ উল্টো ঘটনা।

তাঁর বিভাগের খ্যাতনামা অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল হাই তাঁকে টিউটোরিয়ালে নম্বরই দিতে পারছিলেন না। অন্যরা যেখানে কয়েক পৃষ্ঠা ভরে লিখেছে, সেখানে তিনি লিখেছেন মাত্র আধা পৃষ্ঠা! জরুরি তলব করা হলো তাঁকে। যতই বোঝানো হোক যে আরও লিখতে হবে, তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অনড়। তাঁর কথা হচ্ছে, প্রশ্নে যা চাওয়া হয়েছে, সবই লেখা আছে এই আধখান পাতায়। আবারো খাতায় চোখ বুলিয়ে অধ্যাপক বললেন, “এটা তো সাহিত্য। জ্যামিতি না। তোমাকে তো কিছু নম্বর দিতে হবে। তাই বাড়িয়ে লিখে আনো।’ শেষ পর্যন্ত টেনেটুনে দেড় পৃষ্ঠা লিখে জমা দেওয়ায় কিছু নম্বর জুটেছিল।

এই অল্প কথায় সব গুছিয়ে লেখার ব্যাপারটাই পরবর্তীতে সেবা প্রকাশনীর একটা ধারা হয়ে যায়।

তিনি এমন এক পরিবেশে বড় হয়েছিলেন, যেখানে প্রতিদিনই সংগীতচর্চা চলতো। তাঁর তিন বোন সানজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন ও মাহমুদা খাতুন রবীন্দ্র সঙ্গীতের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বেতারের সঙ্গীত শিল্পী ছিলেন। তবে গানের চেয়ে বেশি লেখালেখিই তাঁকে বেশি টানতো।

তাঁর বাবা ছিলেন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কাজী মোতাহার হোসেন। এই কারণে তিনি নিজেও ছেলেকে লেখালেখি চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছিলেন। এমনকি একবার তাঁকে রহস্য-রোমাঞ্চ-অ্যাডভেঞ্চারের নেশা এমনই বুঁদ করেছিল যে বাসা থেকে পালিয়ে ট্রেনে করে চলে গিয়েছিলেন সোজা ভৈরবে! অবশ্য পরদিন ঢাকায় ফেরার পথে হাতেনাতে ধরা খেয়েছিলেন। এগুলোই কি তাঁকে মাসুদ রানা সিরিজ লিখতে উৎসাহিত করেছিল?

সেবার শুরু:

কিশোর বয়স থেকেই রহস্য-রোমাঞ্চ কাজী আনোয়ার হোসেনকে বেশ আকর্ষণ করতো। শিকারের দিকেও ছিল তাঁর বিশেষ ঝোঁক। পাখি শিকারের জন্য একটা বন্দুক কেনার টাকার জোগাড় করতে যেয়েই বই লেখার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল পান্ডুলিপি জমা দিলেই টাকা পাবেন। ঝটপট দুটো পান্ডুলিপি তৈরিও করে ফেললেন। কিন্তু প্রকাশকেরা তাঁকে হতাশ করলো। একজন তো টাকা দিতেই চাইলেন না, আরেকজন বললেন ১০টা পান্ডুলিপি দিলে কিছু হয়তো দিতে পারেন।

সুতরাং, বই প্রকাশ করা হলো না তখনই। তবে পাণ্ডুলিপি দুটো রেখে দিয়েছিলেন। কে জানতো যে পরে তিনি নিজেই হয়ে যাবেন এক আস্ত ছাপাখানার মালিক?

১৯৬১ সালের কথা, তিনি তখন মাস্টার্সের শেষ পরীক্ষাটা দিয়ে হল থেকে বের হলেন। অবশেষে পড়াশুনা শেষ হলো ভেবে যেমন খুশি লাগছে, তেমনি মাথার মধ্যে ঘুরছে ক্যারিয়ারের চিন্তাও। কারণ গান গেয়ে তো বেশি রোজগার হবে না। চাকরির ধরা-বাঁধা জীবনে তাঁর ভয়। তাই সেটাও বাদ। একটু ঝোঁকের বসেই জীবিকা হিসেবে নিয়ে নিলেন ছাপাখানার ব্যবসা, যেখানে চাকরির চেয়ে দ্বিগুণ খাটনি। ১৯৬৩ সালের মে মাসে বাবার দেওয়া ১০ হাজার টাকায় সেগুনবাগিচায় একটা প্রেস বসালেন। আট হাজার টাকা দিয়ে কিনলেন একটা ট্রেডল মেশিন, আর বাকি দুই হাজারে টাইপরাইটার৷

বছরখানেক যেতে না যেতেই ব্যাপারটা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেলেন। এখন তো এই পথ থেকে বেরিয়েও আসা যাবে না। তাই এর সাথে জড়িয়ে ফেললেন নিজের শখ লেখা ও প্রকাশনা। তারও এক বছর পর ১৯৬৪ সালের জুনে ‘কুয়াশা’ সিরিজের প্রথম বই দিয়ে আত্মপ্রকাশ করলো সেবা প্রকাশনী৷ সেই সাথে বাংলা সাহিত্য পেল একজন নতুন থ্রিলার লেখক –কাজী আনোয়ার হোসেন৷ সেগুনের ‘সে’ আর বাগিচার ‘বা’ নিয়ে যে ‘সেবা’ গঠিত হলো, আর যাত্রা শুরু করলো সাহিত্যের এক নতুন জগৎ।

সেবার সেবা:

হ্যালো ,কিশোর বন্ধুরা আমি কিশোর পাশা  বলছি, আমেরিকার রকি বীচ থেকে।

কিছু কি মনে পড়ছে? জ্বী, ‘তিন গোয়েন্দা’র কথাই বলছি। আমাদের সেবা প্রকাশনীর বই পড়া শুরু এই কিশোর গোয়েন্দা সিরিজটি দিয়ে। ১৯৮৫ সালের আগস্টে তিন গোয়েন্দা নাম নিয়ে তিন গোয়েন্দা সিরিজের প্রথম বইটি বের হয় এবং সিরিজটি এখনো চলমান।

তবে কাজী আনোয়ার হোসেনের হাত ধরে যেই সিরিজটা উঠে এসেছে, তা হলো ‘মাসুদ রানা’।

পরবর্তীতে তাঁর প্রকাশনা সংস্থা বাংলাদেশে পেপারব্যাক গ্রন্থ প্রকাশ, বিশ্ব সাহিত্যের ক্লাসিক উপন্যাসের অনুবাদ এবং কিশোর সাহিত্যের ধারাকে অগ্রসর করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পাঠককে ভিন্ন স্বাদ দিতে সেবা প্রকাশনী আনলো ওয়েস্টার্ন ও ক্লাসিক সিরিজ। বিশ্ববিখ্যাত ক্ল্যাসিকগুলো কখনো সংক্ষিপ্ত রূপান্তর, কখনো বা পূর্ণ অনুবাদের মাধ্যমে তারা পাঠকের হাতে তুলে দিতে শুরু করল। দুর্গেশনন্দিনী থেকে শুরু করে একে একে বেনহার, রবিনসন ক্রশো, সলোমানের গুপ্তধন, সুইস ফ্যামিলি রবিনসন, কপালকুণ্ডলাসহ বিশ্বসাহিত্যে নামীদামি গ্রন্থগুলো বাংলা ভাষাভাষী কিশোর পাঠকদের কাছে নিয়ে আসা হলো।

সেই সাথে হাজির হলো ট্রেজার আইল্যান্ড, বাস্কারভিলের হাউন্ড, শি, রিটার্ন অব শি, অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, জুলভার্নের সায়েন্স ফিকশনসহ আরও কিছু অসাধারণ, সাবলীল ও সংক্ষিপ্ত অনুবাদ।

সেবা প্রকাশনী কেবল পাঠক নয়, লেখক তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছে। এখান থেকেই শুরু হয়েছে রকিব হাসান, নিয়াজ মোরশেদ, রওশন জামিলর, আবদুল হাকিমদের যাত্রা। এমনকি স্বয়ং হুমায়ূন আহমেদও এই প্রকাশনীতে লিখেছেন।

মাসুদ রানা: 

‘বিদ্যুৎ মিত্র’ ছিল কাজী আনোয়ার হোসেনের ছদ্মনাম। বন্ধু মাহবুব আমিন তাঁর হাতে ধরিয়ে দিলেন জেমস বন্ডের ‘ডক্টর নো’। বইটি পড়ার পর তাঁর মনে হলো এমন মানের থ্রিলার বাংলাতেও থাকা প্রয়োজন। তাই পড়তে শুরু করলেন বিভিন্ন বিদেশি থ্রিলার বই। পাঠকের সামনে হুবহু দৃশ্যপট তুলে ধরতে সেই ১৯৬৫ সালে মোটর সাইকেলে করে তিনি কাহিনি সাজানোর জন্য ঘুরে এসেছিলেন চট্টগ্রাম, কাপ্তাই ও রাঙামাটি!

এরপর সাত মাস সময় নিয়ে লিখলেন ‘ধ্বংস পাহাড়’। ১৯৬৬ সালের মে মাসে বাজারে এলো বাংলা ভাষার প্রথম মৌলিক স্পাই থ্রিলার ‘ধ্বংস পাহাড়’। মাসুদ রানার চরিত্রটিকে মূলত ইয়ান ফ্লেমিংয়ের সৃষ্ট জেমস বন্ড চরিত্রটির বাঙালি সংস্করণ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে সিরিজের প্রথম বই ‘ধ্বংসপাহাড়’ বের হবার পর কিছুটা সমালোচনা হলেও পরের বই ‘ভরতনাট্যম’ তা পুষিয়ে নিয়েছিল।

সমালোচনার কারণ হলো এতে আছে বাঙালির গুপ্তচরবৃত্তি ও অ্যাডভেঞ্চার আর যৌনতা। কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই সিরিজ, ছোটরা যেন না পড়ে- এই বুলি আওড়াতে লাগলেন বয়স্করা। তবে মাসুদ রানার জনপ্রিয়তা কিন্তু কেউই ঠেকাতে পারেনি।

তবে মৌলিক স্পাই থ্রিলারের প্লট খোঁজা বেশ কঠিন কাজ। এর জন্য প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা আর প্রচুর পড়াশোনা, যেটা প্রকাশনী সামলানোর জন্য করাও যাচ্ছে না।

পাঠকের মধ্যেও চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং, শুরু হলো ‘বিদেশি কাহিনী অবলম্বনে’ লেখা। এভাবে মাসুদ রানার কাহিনী সংগ্রহ করা হয়েছে অ্যালিস্টেয়ার ম্যাকলিন, জেমস হেডলি চেজ, রবার্ট লুডলাম, উইলবার স্মিথ, ইয়ান ফ্লেমিংসহ অসংখ্য লেখকের বই থেকে। প্রথম বই থেকে শুরু করে সেবা প্রকাশনী থেকে মাসুদ রানা সিরিজে এই চরিত্রকে নিয়ে চার শতাধিকেরও বেশি গুপ্তচরবৃত্তীয় কাহিনীর বই প্রকাশিত হয়েছে। সিরিজের প্রথম দুইটি বই বাদে বাকিগুলো ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার বইয়ের ভাবানুবাদ বা ছায়া অবলম্বনে রচিত।

সেবা এখন:

এখন কাজীদার দুই ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন ও কাজী মায়মুর হোসেন হাল ধরেছেন রহস্য পত্রিকার। সেবা প্রকাশনীরও অনেক কিছু দেখভাল করতে হয় তাঁদের।

বছরব্যাপী বই প্রকাশ করে থাকে সেবা প্রকাশনী। বই বিক্রিতেও নিজস্ব ব্যবসানীতি আছে সেবার নগদ কারবারের প্রথা। যার কারণে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পাওয়া যায় সেবার বই। এইজন্যই প্রায়ই দেখা যায় সেবার কাছে পাঠকদের চিঠিগুলো আসে দেশের প্রত্যন্ত সব অঞ্চল থেকে। আর সেখানে ছেলে-বুড়ো সবাই আনোয়ার হোসেনকে ‘কাজীদা’ বলেই ডাকে।

এখনো বইমেলায় গেলে তাদের স্টলের সামনে দেখা যায় উপচে পড়া ভীড়। কাউকে বলেও দিতে হয় না যে স্টলটা কোন জায়গায়। ভীড় দেখলেই বোঝা যায়! স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এমন অনেক গ্রাহক আছে যারা শুধুমাত্র বইমেলা থেকে তাদের বই কেনার জন্য টাকা জমিয়ে রাখে। আর তাদের বইয়ের দামগুলোও হাতের নাগালে। ৬৯ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২৫৬ টাকা।

একুশে মেলায় টাকার অঙ্কে বিক্রির দিক থেকে অনেকটা পিছিয়ে থাকলেও পরিমাণে একেবারে প্রথম সারিতেই আসে সেবা প্রকাশনীর নাম। লেখক ও অনুবাদকদের নির্দিষ্ট হারে নিয়মিত সম্মানী প্রদানের চলটা দীর্ঘদিন ধরেই বজায় রয়েছে।

তাই তো বহু বছর পরেও যখন কোনো লেখক অফিসে ঘুরতে আসেন, তার হাতেও কিস্তির টাকা ধরিতে দেওয়া হয়। তবে সেবা প্রকাশনীর বর্তমান জৌলুশ এখন অনেকটা ম্লান।

প্রজাপতি মার্কা পেপারব্যাকের দুই মলাটের মাঝে লুকিয়ে ডুব দিতে যেয়ে ধরা খাননি, এমন পাঠক খুবই কম। এরপরেও আমরা চাই এই প্রজাপতির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে, চাই আরো অনেক বছর বেঁচে থাকুক বাঙালির মননশীলতার বাতিঘর এবং সেবা প্রকাশনীর কাণ্ডারী আমাদের কাজীদা।

সেবা প্রকাশনীর বই সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading