কেন হত্যা করা হয়েছিল শার্লক হোমসকে?

শার্লক হোমস

গোয়েন্দা-গল্পের ভক্ত থেকে শুরু করে টুকটাক গোয়েন্দা-গল্প পড়েন, অথচ শার্লক হোমসের নাম শোনেননি, এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া সত্যিই বিরল। বয়োবৃদ্ধ, প্রাপ্তবয়ষ্ক থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর বয়সী সকলেরই কমবেশি শার্লক হোমসের বৃত্তান্ত জানা। কিন্তু ক’জন জানেন শার্লক হোমস এর স্রষ্টার কথা? ক’জন-ই বা জানেন তাঁর নাম!

স্যার আর্থার কোনান ডয়েল এর ‘এ স্টাডি ইন স্কারলেট’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে ১৮৮৭ সালে সাহিত্যের আঙ্গিনায় আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল শার্লক হোমস এর। শার্লককে নিয়ে লেখা সেই প্রথম উপন্যাসটি থেকে অবশ্য খুব বেশি আয় হয় নি কোনান ডয়েলের। তাঁর পকেটে ঢুকেছিল মাত্র ২৫ পাউন্ড। তবে পাঠকরা বেশ পছন্দই করেছিলেন তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও পর্যবেক্ষণশক্তি সম্পন্ন এই নতুন গোয়েন্দাকে। একটু আধটু প্রশংসাবাণীও জুটেছিল কোনান ডয়েলের কপালে। সেই অনুপ্রেরণাতেই তিনি শার্লককে নিয়ে লিখে ফেললেন আরো একটি উপন্যাস। সেটিও পাঠকসমাজের একাংশ সাদরে গ্রহণ করলে, সাহস করে দ্য স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনে শার্লককে নিয়ে একের পর এক ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন ডয়েল। যদিও তখন কোনান ডয়েল ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি যে, এই শার্লকই একদিন এমন মাত্রার জনপ্রিয়তা অর্জন করবে যে, সেজন্য কপাল চাপড়াতে হবে খোদ এর স্রষ্টাকে।

BUY NOW

আসলে ঘটনা হলো, নিজেকে একজন ঐতিহাসিক উপন্যাসিক হিসেবে ভাবতেই পছন্দ করতেন কোনান ডয়েল। গোয়েন্দা উপন্যাস বা গল্প লিখলেও, এই ঘরানার লেখক পরিচয়ে চিরকালের জন্য আটকা পড়বেন, এমন মনোবাসনা কস্মিনকালেও ছিল না তাঁর। অথচ একপর্যায়ে কোনান ডয়েল পরম বিস্ময়ের সাথে আবিষ্কার করলেন যে, নিজের লক্ষ্য থেকে ক্রমশই বিচ্যুতি ঘটছে তাঁর। তিনি যা লিখতে চান, তা লেখা হয়ে উঠছে না। কিংবা লিখলেও সেগুলোকে কেউ তেমন একটা পুঁছছে না। সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শুধুই শার্লক হোমস। প্রকাশকও তাই ডয়েলের কলম থেকে শার্লক বিষয়ক গল্পই চাচ্ছেন। আর তাদের চাহিদা পূরণ করতে ডয়েলকেও বাধ্য হয়ে শার্লক বিষয়ক গল্পই লিখতে হচ্ছে বারবার।

শার্লকের কারণে সঠিকভাবে নিজ প্রতিভা ও সৃজনশীলতার বিচ্ছুরণ ঘটাতে পারছেন না ডয়েল। একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়েই বরং থাকতে হচ্ছে তাঁকে, যা তাঁর মতো লেখকের জন্য মেনে নেয়া কোনোভাবেই আর সম্ভব হচ্ছে না। এমতাবস্থায় কি করেছিলেন শার্লকের স্রষ্টা! — জানা আছে কারও?

১৮৯৩ সালে স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের হাতে একটি খুন হয়। এই খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র কোনান ডয়েলের নিরীহ কলম; যে কলমের কয়েকটি আঁচড়ে তিনি শেষ করে দিয়েছিলেন একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্র। চরিত্রটি অন্য কেউ নন। কোনান ডয়েলের নিজের সেই বিশ্ববিখ্যাত সৃষ্টি — শার্লক হোমস! সর্বকালের সবচেয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র!

কিন্তু এই নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত! এমন নিষ্ঠুর আচরণ! তাও আবার স্রষ্টা হয়ে নিজ সৃষ্টির প্রতি!

অনেক ভাবনা-চিন্তার পর ডয়েল এই কঠিন সিদ্ধান্তে আসেন — আর লিখবেন না শার্লকাখ্যান। তবে সরাসরি ‘না’ বলার পরিবর্তে, বিষয়টিকে সামলাবেন একটু বুদ্ধি খাটিয়ে।

যেই ভাবা, সেই কাজ। পরের বার দ্য স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনের সম্পাদক ডয়েলের কাছে শার্লক হোমসের নতুন গোয়েন্দা কাহিনী চাইলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন — গল্পপ্রতি ৫০ পাউন্ড করে চাই তাঁর। ডয়েল ভেবেছিলেন, তাঁর এই দাবি কিছুতেই মানা হবে না। কিন্তু কী আশ্চর্য! দ্য স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন তাঁর এই দাবি মানল তো বটেই, পাশাপাশি তাঁর সাথে চুক্তি করে ফেলল শার্লককে নিয়ে ছয়-ছয়টি নতুন গল্প তৈরি করার!

যে কাজটি করতে ডয়েল একদমই পছন্দ করছেন না, সেই কাজটিই তাঁকে একবার নয়, দুবার নয়, পরপর ছয়বার করতে হবে! সবকিছু কেমন স্নায়ুবিধ্বংসী হয়ে উঠলো কোনান ডয়েলের জন্য। তিনি রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠলেন। মাকে এক চিঠিতে তিনি লিখলেন — “এই হোমস আমার মনকে অন্য সব শ্রেয়তর জিনিস থেকে ফিরিয়ে আনছে।”

শার্লক হোমসকে নিয়ে ছয়টি নতুন গল্প লেখা ডয়েলের জন্য নেহাত সহজ কাজ ছিল না। এই ছয়টি গল্পের চুক্তি শেষ হওয়ার পর আর শার্লক হোমস না লেখাটাই অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এবারও তিনি নতুন বুদ্ধি বের করলেন। দ্য স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনকে জানালেন — তিনি লিখবেন বটে, তবে পরের বারোটি গল্পের জন্য তাঁকে এক হাজার পাউন্ড দিতে হবে।

ফলাফলঃ এবারও এক বাক্যে রাজি দ্য স্ট্র্যান্ড।

আসলে ততদিনে দ্য স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনের জন্য শার্লক হোমসের কাহিনী হয়ে উঠেছে সোনার ডিম। আর কোনান ডয়েল সেই সোনার ডিম পাড়া হাঁস। ডয়েলের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে কেন-ই বা দ্বিমত থাকবে তাদের!

এদিকে মনের হাজারো বিদ্রোহ সত্ত্বেও অর্থের দুর্নিবার আকর্ষণকে কোনান ডয়েলই বা কী করে অগ্রাহ্য করেন! খেটেখুটে অন্য লেখা লিখে সামান্য কিছু অর্থোপার্জনের চেয়ে শার্লককে নিয়ে এক ডজন গল্পে হাজার পাউন্ড পেয়ে যাওয়া তো একজন লেখকের জন্য লটারি জেতার শামিল। তাই কোনান ডয়েল লিখতে শুরু করলেন শার্লককে নিয়ে নতুন বারোটি গল্প। “তবে এ-ই শেষ, আর না” — দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ কোনান ডয়েল। এমনকি কেউ যেন পুনরায় তাঁকে শার্লক-কাহিনী লেখার জন্য পীড়াপীড়ি করতে না পারে, সেই বন্দোবস্ত করার প্রস্তুতিও নিয়ে ফেললেন তিনি।

শার্লক হোমসকে খুন করবেন আর্থার কোনান ডয়েল।

হ্যাঁ। এবার একদম এই পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেবেন, যাতে সে আর ডয়েলের রাতের ঘুম হারাম করতে না পারে। নিজের এই উদ্দেশ্যের কথা চিঠি লিখে মাকেও জানালেন — “আমি ঠিক করে ফেলেছি, খুন করব ওকে। চিরতরে শেষ করে দেব ওর চিহ্ন।”

এমন চিঠি পেয়ে আঁতকে উঠলেন কোনান ডয়েলের মা। চিঠির উত্তরে লিখলেন — “তুমি এটা করবে না! এটা তুমি করতে পারো না! অবশ্যই এটা করবে না!”

কিন্তু কোনান ডয়েল নিজ লক্ষ্যে অবিচল রইলেন। সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েই ফেলেছেন।

“It is with a heavy heart that I take up my pen to write these the last words in which I shall ever record the singular gifts by which my friend Mr. Sherlock Holmes was distinguished”

(“খুবই দুঃখ-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আজ আমি কলম ধরছি শেষবারের মতো আমার অনন্যসাধারণ গুণাবলিতে বিভূষিত বন্ধু শার্লক হোমসের কথা লিপিবদ্ধ করার জন্য”)

লম্বা এই বাক্যটির মাধ্যমেই ‘দ্য ফাইনাল প্রবলেম’ নামক চুক্তির দ্বাদশ ও সর্বশেষ গল্পে শার্লকের মৃত্যুসংবাদ লিখতে শুরু করেন ডয়েল। সৃষ্টি করেন শার্লকের সবচেয়ে বড় শত্রু, প্রফেসর মরিয়ার্টির চরিত্রটি। এই মরিয়ার্টিকে দিয়েই রাইকেনবাক জলপ্রপাত থেকে শার্লককে নিচে ফেলে দেন। মৃত্যু হয় দুজনেরই।

অবশেষে শার্লককে হত্যা করে গভীর আত্মসুখে ছেয়ে গেল কোনান ডয়েলের মন। কত-ই বা আর তাঁর বয়স তখন। সবে তো ৩৪। ইতোমধ্যেই একজন সুলেখক হিসেবে তাঁর খ্যাতির জুড়ি নেই। আবার এখন-তো নিজের সবচেয়ে বড় শত্রুটিকেও শেষ করে দিয়েছেন। কোনান ডয়েল মনে মনে ভাবলেন — “এখন আমার স্যার ওয়াল্টার স্কট হওয়া কে আটকায়!”

জানিয়ে রাখা ভালো, স্কট ছিলেন একজন ঐতিহাসিক উপন্যাসিক; ডয়েলও ঠিক তার মতো হতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু স্যার আর্থার কোনান ডয়েল হয়তো ভুলে গিয়েছিলেন যে — মানুষ যা চায়, বাস্তবে সবসময় তা হয় না। তিনি চাইলেন আর অমনি শার্লকের সমস্ত অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেল, তা যে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পাঠকের মনে শার্লক হোমস অমর। ছাপার অক্ষরে শার্লকের মৃত্যুকে তারা কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি ছিলেন না।

তীব্র রোষে ফেটে পড়তে শুরু করলেন শার্লক-ভক্তরা। পাঠকের ক্রোধানলে জ্বলেপুড়ে ছারখার হতে লাগলেন কোনান ডয়েল। দ্য স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকেও ক্রমাগত চাপ আসতে লাগল। কারণ শার্লকের মৃত্যুর পর তাদের সাবস্ক্রিপশন একরকম তলানিতে এসে ঠেকেছে। তবু ডয়েল হাল ছাড়লেন না। বহুদিন লড়ে গেলেন। আশায় বুক বেঁধে রইলেন — একদিন না একদিন ঠিক স্তিমিত হয়ে আসবে সব বিক্ষোভ। পাঠক মেনে নেবে, শার্লক আর নেই। ইতি ঘটবে শার্লককে নিয়ে যাবতীয় উন্মাদনার।

কিন্তু সে দিন আর আসলো না। একপর্যায়ে চরম এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হলো শার্লকের স্রষ্টাকে। এমন এক সত্য যা তাঁর হৃদয়কে ক্ষত-বিক্ষত করে দিল। কে বড়? কোনান ডয়েল না শার্লক হোমস? ডয়েল সহজেই সে প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে — নিজের কল্পনায় গড়া চরিত্রের সাথে লড়ে অবশেষে হেরে গেছেন স্রষ্টা নিজেই। পালাবার আর কোনো পথ নেই। ফলে আত্মসমর্পণ-ই শ্রেয়।

আট বছর বাদে তাই, ১৯০১ সালে, শার্লককে নিয়ে নতুন গল্প লিখলেন আর্থার কোনান ডয়েল। ‘দ্য হাউণ্ড অব দ্য বাস্কারভিলস’ নামের সেই গল্পে বর্ণিত হলো শার্লকের মৃত্যু-পূর্ববর্তী সময়কালের কাহিনী। এরপর ১৯০৩ সালে, ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অব দ্য এম্পটি হাউজ’ এর মাধ্যমে পুনরুত্থান ঘটল শার্লকের। গোটা বিষয়টিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য সবধরণের চেষ্টাও করলেন লেখক। ব্যাখ্যা দিলেন, রাইকেনবাক থেকে নিচে পড়ে শুধু প্রফেসর মরিয়ার্টিরই মৃত্যু হয়েছিল। আর শার্লক কেবল মৃত্যুর ভান করেছিল।

অতিমাত্রার অনুমেয় ও অনির্ভরযোগ্য এই ব্যাখ্যাকেও পাঠকসমাজ দু’হাত মেলে আলিঙ্গন করল। প্রমাণ হলো, শার্লকের প্রতি তাদের ভালোবাসা সকল যুক্তি-তর্কের উর্ধ্বে। এভাবেই শার্লকের কাছে আরো একবার হার মানতে বাধ্য হলেন কোনান ডয়েল। একইভাবে বৃথা গেল ডয়েলের লেখা শেষ গল্পে শার্লককে অবসর নেয়ানোর প্রচেষ্টাও।

আজ এতদিন বাদেও আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাব, শার্লক হোমস আসলেই হারিয়ে দিয়েছে কোনান ডয়েলকে। বিশ্বব্যাপী শার্লক হোমস নামটি যতজনের পরিচিত, কোনান ডয়েল নামটি সম্ভবত তার অর্ধেকেরও পরিচিত নয়। সৃষ্টি যে কখনো কখনো স্রষ্টার চেয়েও উপরে উঠে যেতে পারে, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এটি।

আজ আর শার্লক হোমস কোনান ডয়েলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। এটি বরং পরিণত হয়েছে একটি পাবলিক ডোমেইনে। অর্থাৎ যার যা খুশি করতে পারবে শার্লক হোমস চরিত্রটিকে নিয়ে। বই, ভিডিও গেমস, চলচ্চিত্র, কমিকস, অ্যাকশন ফিগার, ওয়েব সিরিজ — কোনোকিছুতেই কোনো বাধা নেই এখন। কোনান ডয়েলকে যদিও চলে যেতে হয়েছে, কিন্তু শতাব্দী পেরিয়ে আজও পৃথিবীর বুকে শার্লক হোমস পুরোমাত্রায় জীবিত ও তরুণ এক সত্তা।

স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের সকল বই সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading