‘জলপরানি’ প্রকাশের কোনো ইচ্ছেই ছিল না কিঙ্কর আহ্সানের

2021-04-11 ‘জলপরানি’ প্রকাশের কোনো ইচ্ছেই ছিল না কিঙ্কর আহসানের

লেখালেখির শুরু দেশের একটি জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে। টানা পাঁচ বছর বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালের কন্ঠ, বাংলানিউজ, পরিবর্তনসহ দেশের প্রায় সব শীর্ষ দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালে লিখেছেন। এছাড়া কাজ করেছেন বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও বিজ্ঞাপন সংস্থায়। সবকিছুর পরও লেখালেখিই যেন কিঙ্কর আহ্সান এর ভালোবাসার জায়গা। বইমেলায় প্রকাশিত ‘আঙ্গারধানি‘, ‘কাঠের শরীর’, ‘রঙিলা কিতাব‘, ‘স্বর্ণভূমি’, ‘মকবরা‘, ‘বিবিয়ানা‘ ইত্যাদি বইসমূহ ইতিমধ্যেই বেশ পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেছে।

২০২১ অমর একুশে বইমেলায় তার নতুন উপন্যাস ‘জলপরানি‘ প্রকাশিত হয়েছে। বইটি নিয়ে কথা বলতেই রকমারি ব্লগের মুখোমুখি হয়েছেন এই জনপ্রিয় লেখক।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, নুহিয়াতুল ইসলাম। 

কিঙ্কর আহ্সান
লেখক কিঙ্কর আহ্সান
অসুস্থতা’র জন্য কিছুদিন সময় দিতে পারছিলেন না। এখন কেমন আছেন?

– আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আমি আসলে রবি এবং নেসলে’র একটি কাজে মুম্বাই গিয়েছিলাম। সেখান থেকে পরবর্তীতে কক্সবাজারে যাই। টানা এই কাজের চাপে আমি আসলে অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমার ইনসোমনিয়া’র সমস্যা আছে। আমি অনেকদিন ঘুমোতে পারি নি। এজন্যই মূলত অসুস্থ হয়ে যাই। তাই ক’টা দিন আমার একমাত্র ঠিকানা ছিল বিছানা। মাথা তুলতে পারছিলাম না, এতটাই দুর্বল ছিলাম। এখন আপাতত সুস্থ।

মেলায় কী এ কারণেই (অসুস্থতা) খুব বেশি যাওয়া হয় নি?

– মেলায় আসলে কয়েকটি কারণে যাওয়া হয়নি। প্রথমত আমার বই ‘জলপরানি‘ আসতে একটু দেরি হয়। ১৮ ই মার্চ থেকে মেলা শুরু হলেও আমার বই আসে ২৬ শে মার্চ। এছাড়া করোনা’র কারণে আমি আসলে মেলায় একদমই যেতে চাচ্ছিলাম না। তবে প্রকাশকের অনুরোধে আমাকে কয়েকবার মেলায় যেতে হয়েছে।

লকডাউন চলছে, অথচ বইমেলা খোলা! ব্যাপারটি কীভাবে দেখছেন?

– এ বছর বইমেলার আয়োজনটা আমার অনেক অগোছালো মনে হয়েছে। প্রথমত মার্চের প্রচন্ড গরম, তাছাড়া ঝড়ের ভয় থাকে এসময়। মেলার সময় নিয়েও অনেক বিভ্রান্তিকর সংবাদ ছড়িয়েছে। পরবর্তীতে যে সময়টা বেঁধে দেওয়া হয়, সে সময়টায় প্রচন্ড গরম থাকায় মানুষ খুব একটা মেলায় আসে না। সন্ধ্যার পর দেখা যায় ভীড়টা একটু বেশি হয়, কিন্তু সেই সময়েই মেলা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর বাইরেও লকডাউনে মেলা খোলা রাখার বিষয়টি আমার কাছে খুব উদ্ভট সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়েছে। মানুষ কীভাবে যাবে? আর গেলেও করোনা’র সময় আমাদের জন্য তা কতোটা ভালো? এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখা উচিত ছিল।

কিঙ্কর আহ্সান এর জনপ্রিয় উপন্যাস 'মেঘডুবি'
তার ‘মেঘডুবি’ উপন্যাসটি বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিল।
মেলায় কি আর যাওয়া হবে তাহলে?

– আমার মন আসলে মেলায় পড়ে থাকে। কিন্তু এই লকডাউনের মধ্যে আমার আর মেলায় যাবার ইচ্ছে নেই। প্রকাশকের অনুরোধ থাকে, পাঠকের একটা অনুরোধ থাকে। কিন্তু আমি কেউকে আসলে ঝুঁকি’র মধ্যে ফেলতে চাই না। তাই আপাতত আর মেলায় যাবার ইচ্ছে নেই।

বইমেলাকে ঘিরে আপনার নানা ব্যস্ততা তৈরি হয়। বইয়ের কথা ছড়িয়ে দিতে কখনও কখনও দেশের বাইরেও যাওয়া হয়। করোনা তো সব থামিয়ে দিল….

– অবশ্যই লেখকদের যে উৎসাহ, উদ্দীপনা দরকার তা বইমেলা ঘিরেই তৈরী হয়। অনেক পাঠক আসেন। তাদের ভালোবাসা টের পাওয়া যায়। জমজমাট আড্ডার আমেজ সারাক্ষণ। এই সবকিছু ঘিরেই বই নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়। এই বছর সবকিছু থামিয়ে দিল। কোলকাতা বইমেলায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। এর আগে অস্ট্রেলিয়া’র বইমেলা, টোকিও’র বইমেলা। সে সবকিছু থমকে আছে। সত্যি বলতে আমাদের জীবনটাই থমকে আছে করোনা’র কারণে। আর আমি প্রবল ভাবে চাই আমরা যেন করোনা’র কাছে হার না মানি। আর খুব শীঘ্রই যেন আমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারি। বই নিয়ে আমাদের ব্যস্ততা যেন আবার ফিরে আসে।

আপনার নতুন উপন্যাস ‘জলপরানি’। বইটি’র প্রেক্ষাপট সম্পর্কে যদি বলতেন….

– ‘জলপরানি‘ আসলে আমার দীর্ঘদিনের চেষ্টার ফসল। আজ থেকে এগারো বছর আগে আমি যখন একটি শীর্ষ দৈনিকে কাজ করি, তখন আমি এক বিখ্যাত সংগীত শিল্পী’র সাক্ষাৎকার নেবার সুযোগ পাই। তার মাদকের কাছে হেরে যাওয়া, তার পরিবারের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া, এই গল্পগুলো সেখানে উঠে আসে। সেই ঝাপসা চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারি, এত শক্তিশালী, খ্যাতিমান শিল্পী হয়েও তিনি আসলে কতোটা অসহায়, কতোটা একা। সেই বেদনা বিধুর গল্প লেখার ইচ্ছে ছিল আমার।

মায়ানমারের মংডু শহর থেকে টেকনাফ এবং উখিয়া হয়ে একটা রুট ধরে ইয়াবা আসে। এছাড়াও আরও অনেক মাদক ঢাকা শহরে এসে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মাদক যখন কোনো পরিবারে প্রবেশ করে তা পরিবারের জন্য একটা অভিশাপ।

আরেকটি কথা না বললেই নয়, আমি চাকরি’র সুবাদে র‍্যাবে’র সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাই। সেখানে কমান্ডারসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে এই মাদক নিয়ে বিস্তারিত কথা বলা হয়। সেখান থেকে দারূণ সব গল্প উঠে আসে। শুধু মাদকই না, এখানে প্রেম আছে স্বপ্ন আছে, স্বপ্ন বুননের জন্য লড়াই আছে। এই সবকিছু মিলিয়েই আসলে গড়ে উঠেছে বিষাদের এক আখ্যান ‘জলপরানি’ উপন্যাস।

জলপরানি
কিঙ্কর আহ্সানের নতুন উপন্যাস ‘জলপরানি’।
বইটি’র ব্যাপারে সাড়া কেমন পাচ্ছেন?

– আমি নিজেকে সেইসব ভাগ্যবান লেখকদের একজন মনে করি, যাদের ঘিরে পাঠকদের সবসময় একটা আগ্রহ থাকে। সেই জায়গা থেকে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে অনলাইন। এগারোটা অনলাইন বুকশপ থেকে প্রি অর্ডার হয়েছে। সেই অর্ডারগুলো পৌঁছে দেওয়ার কাজ চলছে এখনও। আর এর বাইরে বইমেলা’র কথা যদি বলি, আগে দেখা যেত বইমেলার মাঝামাঝি সময়ে এসে পাঁচ ছয়টি মুদ্রণ চলে যেত। শেষের দিকে দেখা যেত আটটি মুদ্রণ বা নয়টি মুদ্রণ চলে গেল। সে জায়গা থেকে এবারের সংগ্রামটা অনেক বেশি ছিল, বইমেলায় এবার অনেক কম বিক্রি হয়েছে। তবে অনলাইনে অনেক বই গিয়েছে। আমার জায়গা থেকে হয়তো প্রকাশক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। তিনি খুবই আশাবাদী। কারণ লকডাউনের পর অনলাইনে সাড়া আরও বাড়ছে।

শুনেছি, বইটি লিখতে নাকি আপনার সমস্যা হচ্ছিল?

– আমার প্রকাশক, শ্রদ্ধেয় কাজী নজরুল ইসলাম বাহার ভাই করোনায় মারা যান। এটা আমার জন্য অনেক বড় ধাক্কা ছিল। তার সাথে আমি অনেক সময় কাটিয়েছি। টোকিও বইমেলা, কোলকাতা বইমেলা। প্রতিদিন আমরা কথা বলতাম, বই নিয়ে আমাদের দারূণ দারূণ সব স্বপ্ন ছিল। এক সপ্তাহ আগেও আমার যার সাথে কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে। তিনি মারা যাবার পর আমার হুট করে জীবনটাকে অর্থহীন মনে হয়।

এরপর আমি আসলে একদমই লিখতে পারতাম না। ‘জলপরানি’ বের করার কোনো ইচ্ছে ছিল না আমার। আমি ঢাকার বাইরে গিয়ে কিছুদিন চুপচাপ থেকেছিলাম।

আমি আসলে থমকে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল এই উপন্যাস লিখে কী হবে? আজ আছি, কাল নেই। এই রকম ভাবনা আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

চারপাশের প্রিয় মানুষগুলো যখন তাড়া দিতে থাকে, তখন আমি উপন্যাসটি লিখে শেষ করি।

শেষ প্রশ্ন, লেখক কিঙ্কর আহ্সান এখন কী নিয়ে ব্যস্ত?

– আমার এখন একটু বিশ্রাম দরকার। ১৪ টি বই লিখে ফেলেছি। গতবছর আসলে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমার প্রকাশক মারা যান, শ্রদ্ধেয় নজরুল ইসলাম বাহার ভাই। সে জায়গা থেকে শিখা প্রকাশনী’র দায়িত্বও কাঁধে তুলে নিতে হয়। লেখালেখি’র বাইরে আরও অনেক কিছু নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। আমার বই থেকে ওয়েব সিরিজ হচ্ছে, সে জন্যেও অনেকটাই ক্লান্ত। শরীরের উপর অনেক ঝড়ঝাপটা গিয়েছে। আপাতত আমি বিশ্রামে থাকবো। আগামী পাঁচ ছয় মাস আমি লেখালেখি থেকে দূরে থাকতে চাই। তারপর কী হবে সেটা এখনও বলতে পারছি না। হয়তো লম্বা সময়ের জন্যেও বিশ্রামটা হতে পারে।

  কিঙ্কর আহ্সান এর সকল বই পড়তে

 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading