কিভাবে শিশু অংকের ভয় করবে জয়?

fear of math

ফরাসি স্কুলছাত্র লরেন সোয়াজ, অঙ্ক করতে বসলেই তার হাত-পা ঘেমে একাকার হয়ে যেতো। শুধু এই লরেন সোয়াজই নয়, দুনিয়া জোড়া শত সহস্র মানুষের এই একই সমস্যা। অঙ্কের সমাধান করতে বসলেই হাত-পা ঘামতে শুরু করে, মস্তিষ্ক কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করে, চরম পরাজয়ের মতো অস্বস্তি বোধ হয়। গবেষকদের মতে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় বিশ শতাংশ এই ধরনের গণিত ভীতিতে ভুগে থাকে। তবে এই সমস্যায় ভুক্তভোগী ব্যক্তি যে গণিতে ভালো করতে পারে না, তা মোটেও সত্য নয়। গণিতকে ভয় পাওয়া সেই ফরাসি স্কুলছাত্র লরেন সোয়াজ-ই পরবর্তীতে গণিতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ফিল্ডস মেডেলে’ ভূষিত হয়েছিলেন।

মেরি ফিডেস গফ নামের এক গবেষক গণিত-ভীতি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি প্রথম তাঁর লেখায় ‘Mathemaphobia (ম্যাথেমাফোবিয়া)’ শব্দটির প্রচলন করেন।

গণিতের বিষয়টি এমন যে, যদি শিশুদের মনে ছোটবেলা থেকেই এর প্রতি ভয় বা আতঙ্ক তৈরি হয়, তাহলে সারা জীবন তাকে এই আতঙ্ক বা ভয় তাড়া করে ফেরে। ছেলেবেলাতে একমাত্র অভিভাবকগণই পারেন তাদের শিশুটিকে ভয় বা আতঙ্ক বিহীন গণিত শেখাতে।

বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত কিছু কৌশল তুলে ধরা হলো যা শিশুদের ভয়হীন গণিত শেখাতে সাহায্য করবেঃ

১। বাস্তবে গণিত হয়তো একমাত্র বিষয় যার সাথে রিয়েল লাইফের কানেকশন একটি শিশু সহজে করতে পারে না। এই কানেকশনটা তাকে দেখানো, গণিত যেভাবে আমাদের জীবনের সকল স্তরে প্রভাব ফেলে তা তাকে দেখিয়ে দেওয়া — এই কাজগুলো করতে পারে তার বাবা-মা, বড় ভাই-বোন, অথবা তার স্কুল-শিক্ষক। রিয়েল লাইফ এপ্লিকেশান দেখাতে পারলে সেটি শিশুর জন্য যেমন সহজবোধ্য হবে, তেমনি তার গনিত-ভীতি ধীরে ধীরে লোপ পাবে।

২। স্বভাবতই শিশুদের মনে অনেক জিজ্ঞাসা। শিশুরা জানতে চায়, বুঝতে চায়, তাদের মনে জন্ম নেওয়া প্রশ্নের উত্তর চায়, সমাধানও করতে চায়। এই আরো জানতে চাওয়ার প্রবণতাটিকে আপনি জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করবেন, দমিয়ে দেবেন না। তবে অবশ্যই জোরও করবেন না। আর এটি কেবল গণিতে সীমাবদ্ধ নয়, যে কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম কাজে লাগানো যায়।

৩। অনেকেই বাচ্চাদেরকে প্রাইভেট টিউটর দিয়ে দায়িত্বটি শেষ করতে চান। দয়া করে এমনটি  করবেন না। ধৈর্যের সাথে তাকে সময় দিতে হবে, যা একজন টিউটর করবেন না, তিনি ঘড়ি ধরে কাজ করবেন। এতে বাচ্চাটির মন ভেঙ্গে যেতে পারে, ভেবে বসতে পারে তাকে দিয়ে এটা হবে না আর তাতেই ফাইনাল সিল গালাটা হয়ে যাবে। তাই প্রাণবন্ত উপায়ে রিয়েল লাইফের তার চাহিদার বা প্রিয় বস্তুগুলোকে কাজে লাগিয়ে তাকে শেখাতে হবে, শিখতে সময় দিতে হবে।

৪। গণিত ভীতি দূর করতে চাইলে শিশুকে চাপিয়ে দিয়ে নয়, বরং মজা করে গণিত শেখানো যেতে পারে। যেহেতু মজা করে গণিত শেখানো বড্ড সহজ ব্যাপার নয়, সেজন্য আগে নিজে এই বিষয়ে ঘাটাঘাটি করে মাঠে নামতে হবে। গণিতের ম্যাজিক, সহজেই ক্যালকুলেশন করে ফেলার ট্রিকস, গণিত বিষয়ক পাজেল ইত্যাদি নিয়ে শিশুর সাথে বসুন। এছাড়াও অ্যান্ড্রয়েডের এই জামানায় প্লে স্টোরে একটু ঢুঁ মারলেই হাজার হাজার এডুকেশনাল অ্যাপ পাবেন। যেহেতু মোবাইল ঘাটাঘাটি  সব বাচ্চার-ই প্রিয়, তাই এই সুযোগে আপনি রথ দেখার সাথে কলাও বেচতে পারবেন!

৫। খেলতে খেলতে গনিত শেখালে ভীতি থাকবে কেন? সিসিমপুরের মত প্রোগ্রামগুলো বাচ্চাদের দেখার অভ্যাস করালে ওরা খুশিমনেই অঙ্ক করা শিখবে। তাছাড়া তাদেরকে গঠনমূলক শিক্ষা দিতে হবে। বকা ঝকা না করে ওদের ভুল শুদ্ধ বুঝিয়ে দিতে হবে। ভীতিটা অঙ্কের প্রতি না হয়ে যারা শেখাচ্ছে তাদের প্রতিও হতে পারে কিন্তু! অনেক ক্ষেত্রে গণিতের চেয়ে গণিতের মাষ্টার মশাইকে বাচ্চারা বেশি ভয় পায়। ভয়-ই যদি পায়! তাহলে যেটুকু বুঝতে পারছে না, তা জানাবে কি করে? তাদের এই ভীতি কাটাতে প্রয়োজন বন্ধুসুলভ আচরণ। ভুল হলে বকা খাওয়ার ভয় না থাকলে তারা নতুন নতুন কৌশল ‘প্রচেষ্টা ও ভুল সংশোধন’ – এর মাধ্যমে শিখতে পারবে।

৬। কোনো কোনো শিশু অঙ্কের নাম শুনলেও ভয় পায়। এসব শিশুর জন্য একটু অন্য রকমভাবে প্রচেষ্টা করা দরকার। যেমনঃ অঙ্কের খেলা। শুধু যে কাগজ-কলমে করেই অঙ্ক শিখতে হবে, তা নয়। খেলার মাধ্যমেও শিশুর অঙ্কের দক্ষতা বৃদ্ধি করা সম্ভব। এমন কিছু খেলা রয়েছে, যেগুলো খেললে শিশুর অঙ্কভীতি দূর হয়ে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। খেলাগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা থাকে, যাতে শিশুরা মজা পায় অথচ অঙ্ক ভুল করার দুশ্চিন্তা থাকে না। তাই সেগুলোর প্রতি তারা আকর্ষণ অনুভব করে।

অঙ্কের খেলাগুলো খেললে শিশু বাস্তবজীবনে অঙ্কের জ্ঞানকে কাজে লাগাতে শেখে। শুধু তাই-ই নয়, শিশুরা একে অপরের কাছ থেকে অঙ্কের জ্ঞান ও দক্ষতা শিখে থাকে। নিচে কয়েক ধরনের খেলার কথা উল্লেখ করা হলো, যেগুলোতে অঙ্কের দক্ষতা বৃদ্ধি পেতে পারেঃ

  • কিছু উপকরণ যেমনঃ পুতুল, কাঠি, ছোট ছোট বল, মার্বেল ইত্যাদির মাধ্যমে গল্পের ছলে, খেলার মাধ্যমে একজন শিশুকে অঙ্কের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগের নিয়ম গুলি শেখানো যায়। এভাবে অঙ্কের জটিল নিয়মগুলি শিশু তার মনের অজান্তেই শিখে ফেলতে পারবে।

 

  • পাজলঃ শিশুদের দিয়ে পাজল করাতে পারেন। পাজল কিন্তু একধরনের ম্যাথ, এতে শিশুর অ্যানালিটিক্যাল অ্যাবিলিটি বাড়বে, ফলে সে গণিতের মারপ্যাঁচ সহজে বুঝতে পারবে। দোকানে গিয়ে চকলেট কেনার সময় তাকেই হিসেব করে টাকা দিতে বলুন। টাকার হিসাব মনে হয় সবাই-ই একটু বেশি দ্রুত বুঝে ফেলে!
  • বোর্ড গেইমঃ লুডু, দাবা, সঠিক জিনিসগুলো লাইন করে সাজানোর খেলা, ম্যাচিং বা ব্লক বসানোর খেলা ইত্যাদি শিশুর গোনার অভ্যাস তৈরি ও স্থানগত ক্ষমতা বৃদ্ধি করে অঙ্কের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ নানাভাবে সাহায্য করে। তাই শিশুকে এ ধরণের খেলা স্কুলে ভর্তির আগে থেকেই দেওয়া যেতে পারে।
  • কার্ড গেইমঃ অনেক শিশু কার্ড গেইম খেলতে পছন্দ করে। বিভিন্ন ধরনের কার্ড গেইম শিশুকে দেওয়া যেতে পারে। যেমনঃ একই রকম কার্ড মেলানো, ক্রমানুসারে সাজানো ইত্যাদি। এসব গেইমে বাড়ির বড়দের অংশগ্রহণে তারা আনন্দিত হবে এবং একই সঙ্গে বাসাতেই তাদের কৌতূহল মেটাতে পারবে।
  • কম্পিউটার বা ট্যাব গেইমঃ কিছু কিছু কম্পিউটার গেইম আছে, যেগুলোতে নম্বর ও অঙ্কের ধারণা ব্যবহার করা হয়, স্থানগত দক্ষতার ব্যবহার করতে হয়, পরবর্তী লেভেলে যাওয়ার জন্য স্কোর অর্জন করতে হয়, পরিকল্পনা ও সমস্যার সমাধান করতে হয়। এসব খেলা শিশুর গাণিতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। শিশুর জন্য কম্পিউটার ও ট্যাব গেইম পছন্দ করার সময় এ বিষয়গুলো মাথায় রাখা যেতে পারে।

৭। যে কোনো শিশু-ই গল্প ও মজার মজার কবিতা শুনতে খুব ভালবাসে। তাই অভিভাবকেরও উচিত এই পথেই হাটা। শিশুর নিকট অঙ্ককে যত রসালো গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপন করা যাবে, শিশু ততই আগ্রহভরে গল্পের ফাদে পরে অংকের নিয়মগুলি শিখতে থাকবে। এক্ষেত্রে আপনাকে বেশি কষ্ট করতে হবেনা। চাইলেই আপনার শিশুর হাতে তুলে দিতে পারেন মহামূল্যবান কিছু বই। চাইলে আপনিও বইগুলোর সহায়তায় খুব সহজেই শিখে নিতে পারেন অঙ্কের মজার মজার ট্রিকস। শেখা এবং শেখানো দুটোই হলো!

  • মুনির হাসান এর ‘গড়ের মাঠে গড়াগড়ি’
  • চমক হাসান এর ‘গণিতের রঙ্গে হাসিখুশি গণিত’
  • মুনির হাসান এর ‘যারা গণিত ভালবাসে’
  • চমক হাসান এর ‘অঙ্ক ভাইয়া’
  • তামিম শাহরিয়ার সুবিন ও তাহমিদ রাফি এর ‘গণিত করব জয়’

৮। শিশুর দক্ষতা যখন কিছুটা বৃদ্ধি পাবে বা যেসব শিশুর মধ্যে অঙ্ক নিয়ে অতটা ভয় নেই, তাদের নিজে নিজে অঙ্ক তৈরি ও তা সমাধান করতে দেওয়া যেতে পারে। এতে তাঁর অঙ্ক নিয়ে অস্বস্তি ও ভয় কমবে আর আত্মবিশ্বাস বাড়বে। এই খেলা সহজ থেকে কঠিন করে দেওয়া যেতে পারে। সহজ অঙ্কের একটি উদাহরণ হলোঃ ‘রহিম ও কাজলের মোট ২০টি কলম আছে। রহিমের যদি ১২টি কলম থাকে, তবে কাজলের কয়টি কলম আছে?’ এই অঙ্কটি বইয়ে থাকলে তার উত্তর হবে ৮টি। এরপর শিশুকে নতুন একটি অঙ্ক তৈরি করতে শেখানো যেতে পারে। যেমনঃ ‘কাজলের ৮টি ও রহিমের ১২টি কলম থাকলে দুজনের মোট কয়টি কলম আছে?’ এভাবে উত্তরের দিক থেকে উল্টোভাবে অঙ্কটি করানো শেখালে শিশুর অঙ্কের ধারণাগুলো ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়। দক্ষতা যত বাড়বে তত জটিল সমস্যা তৈরি ও তা সমাধান করতে শেখাতে হবে। শিশু অঙ্ক তৈরি করবে ও অন্যকে তা সমাধান করতে দেবে। অন্যজন না পারলে সে নিজেই তা সমাধান করে দেবে।

শেখা বা শেখানোর ধরন যা-ই হোক না কেন, অঙ্কের ভয়কে জয় করতে সবার আগে প্রয়োজন গণিতের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন। বাচ্চার ভয় কমাতে গিয়ে নিজে প্যানিক শুরু করবেন না কিন্তু! তাতে সমস্যা বাড়বে। শিশুদেরকে যেকোনো অবস্থাতেই আশ্বাস দিতে হবে, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে গণিতের প্রতি বিদ্যমান ভয় উল্লেখযোগ্য হারে দূর করা সম্ভব। অনেকটা নতুন ভাষা শেখার মতো করেই প্রকৃতির এই ভাষা শেখার চেষ্টা করলে গণিত মোটেই কঠিন কিছু নয়। বহু বাচ্চা যুগে যুগে চল্লিশ-পঞ্চাশ শতাংশ থেকে স্থায়ীভাবে আশি-নব্বইয়ের কোঠায় উঠেছে। বিশ্বাস রাখুন, আপনার সন্তানও পারবে।

শিশু-কিশোরদের জন্য সহজ শিক্ষার বইগুলো দেখুন 

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading