নেরুদার মৃত্যু রহস্য – বিষপ্রয়োগ নাকি ক্যান্সার?

pablo neruda

২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩, মাতৃভূমি চিলির বড় দুঃসময়ে মৃত্যু হয় সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ী কবি পাবলো নেরুদার। নেরুদার মৃত্যুর মাত্র ১২ দিন আগে রক্তক্ষয়ী এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে চিলির ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল আগুস্তো পিনোশে। এই রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানে প্রাণ হারান নেরুদার একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও চিলি’র অবিস্মরণীয় নেতা ‘কমরেড প্রেসিডেন্ট’ সালভাদর আলেন্দে। আলেন্দে এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সহযোদ্ধাদের রক্তস্নাত সান্তিয়াগো তখন এক ভয়ানক আতঙ্ক-নগর। পিনোশের ঘাতক বাহিনী টহল দিচ্ছে রাজধানীতে। গুম করে ফেলা হচ্ছে আলেন্দের আস্থাভাজন মানুষদের।

সাম্প্রতিক সময়ে আইনি কারণেই বেশ কিছু চিকিৎসাগত অনুসন্ধান ও কমরেড আলেন্দের মৃত্যুর মাত্র ১২ দিন পরই নেরুদারও মৃত্যু জনমনে জল্পনার উদ্রেক করে যে — নেরুদার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না; বরং সালভাদর আলেন্দের মতো তাঁকেও মেরে ফেলা হয়েছিল। যদিও নেরুদার মৃত্যুসনদ বলে, প্রোস্টেট ক্যান্সারের কারণে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর।

বিশ শতকে পাবলো নেরুদার চেয়ে বেশি পঠিত কোনো কবি নেই, এটাই সত্য। এই নেরুদার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাহিত্যের অনুরাগী পাঠক ছিলেন সালভাদর আলেন্দে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টির এদুয়ার্দো ফ্রেয়িকে পরাজিত করে তিনি চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এ ক্ষেত্রে প্রিয় বন্ধু নেরুদার অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছিলেন তিনি। মূলত নেরুদার কারণেই সব কমিউনিস্ট ভোট আলেন্দের জন্য নিশ্চিত হয়ে যায়। ডানপন্থীদের বাধা ও সামরিক বাহিনীর অসন্তোষের মুখে ১৯৭০ এর ৩ নভেম্বর প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন সালভাদর আলেন্দে।

১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩, প্রিয় বন্ধু আলেন্দের মৃত্যুতে গভীরভাবে ভেঙ্গে পড়েন নেরুদা। আলেন্দের বাসভবন যখন বোমাবর্ষণে ধ্বংস হলো, নেরুদার তখন মনে পড়ছিল নাৎসি বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের কথা। তিনি লিখলেন-

“আজ তিন দিন হয়ে গেল, আমার প্রিয়তম বন্ধু কমরেড সালভাদর আলেন্দে তারই স্বদেশবাসীর চক্রান্তে নিহত হয়েছেন। আমার এই অনুস্মৃতি দ্রুত শেষ করার জন্য আমি লিখে চলেছি। আলেন্দেকে হত্যার খবর সমগ্র বিশ্বের কাছে গোপন রেখে তার অমর দেহকে গোপনে সমাহিত করার সময় একমাত্র তার পত্নী ছাড়া আর কাউকেই সেদিন কাছে থাকতে দেওয়া হয়নি। নির্লজ্জ শয়তান হত্যাকারীরা প্রচার করতে লাগল, আলেন্দে যে আত্মহত্যা করেছেন তার সব প্রমাণই নাকি তাদের কাছে রয়েছে। …(বোমাবিধ্বস্ত ভবনে শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার জন্য অপেক্ষমান আলেন্দে)… এমন একটি চমৎকার মুহূর্তকে কি ফ্যাসিস্ট দস্যুরা হাতছাড়া করতে পারে! মেশিনগানের একঝাঁক গুলি তার দেহকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। মহিমান্বিত এই শবদেহের সর্বাঙ্গে ছিল বুলেটের চিহ্ন, যে বুলেট বেরিয়ে এসেছিল চিলির’ই সেনাবাহিনীর মেশিনগানের নল থেকে — চিলির সেনাবাহিনী বিদেশি প্রভুদের খুশি করতে তাদের আরও একবার প্রতারিত করল।”

অনুস্মৃতিতে এই ছিল নেরুদার শেষ লেখা। আলেন্দের মৃত্যুর প্রকৃতি নিশ্চিত হওয়া গেলেও প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায় তার প্রিয় বন্ধু, প্রিয় কবি পাবলো নেরুদার মৃত্যুর কারণ।

১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, সান্তিয়াগোর সান্তা মারিয়া হাসপাতালে মারা যান শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি পাবলো নেরুদা। কিন্তু তাঁর মৃত্যুসংবাদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল ১২ তারিখেই! ‘১১ সেপ্টেম্বরের সেনা অভ্যুত্থানে আলেন্দের ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে নিহত হয়েছেন পাবলো নেরুদা।’ তাঁর স্ত্রী উরুটিয়া মাতিলদে লিখেছেন, তিনি সারা দিন টেলিফোনে জবাব দিচ্ছেন — জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স বিভিন্ন স্থান থেকে বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রশ্নের জবাবে বলছেন, ‘পাবলো মরেনি, পাবলো বেঁচে আছে।’

১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে নেরুদার শরীর একটু তেতে ওঠে। জ্বর এসেছে। মাতিলদে সান্তিয়াগোর একজন ডাক্তারকে ফোন করলে তিনি একটি ইনজেকশনের নাম বলেন আর বড্ড সরলভাবে বলতে থাকেন, দেশে যা-ই ঘটেছে তা পাবলোকে জানানোর দরকার নেই, তাতে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়লে পাবলোর ক্ষতি হবে।

কিন্তু তাঁর চোখের সামনেই টেলিভিশন। সবই দেখছেন, জানছেন। ১৪ সেপ্টেম্বর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলো। স্ত্রীকে ডাকলেন নেরুদা, কাগজ-কলম আনতে বললেন। হুড়োহুড়ি করে কাগজ-কলম নিয়ে ডিকটেশন নিতে বসে গেলেন মাতিলদে। নেরুদা তাঁর স্মৃতিকথার শেষ অধ্যায় বলে যাচ্ছেন।

১৮ সেপ্টেম্বর চিলির স্বাধীনতা দিবস। বিকেলের দিকে নেরুদার জ্বর বাড়তে শুরু করে। মাতিলদে হাসপাতালে ফোন করলে তাঁকে বলা হয়, পরদিন অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হবে। তাঁদের নিবাস ইস্লা নেগ্রা থেকে সান্তা মারিয়া ক্লিনিক দুই ঘণ্টার পথ।

চিলিতে নিযুক্ত মেক্সিকোর রাষ্ট্রদূত নেরুদাকে দেখতে হাসপাতালে এলেন। তিনি বললেন, ‘অবিলম্বে পাবলোর দেশ ছাড়া উচিত’।

প্রস্তাবটি মাতিলদের পছন্দ হয়। কিন্তু স্ত্রীকে নেরুদা বলেন, ‘আমি চিলি ছেড়ে যাব না। আমার ভাগ্য এখানেই লেখা। এটা আমাদের দেশ, আমাদের জায়গা।’ সেনাবাহিনী যে সান্তিয়াগোতে নেরুদার বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে, মাতিলদে স্বামীকে তা জানালেন না।

২০ সেপ্টেম্বর নেরুদা-পরিবারের একজন বন্ধুকে নিয়ে রাষ্ট্রদূত আবার এলেন। স্বল্পকালের জন্য দেশ ছাড়তে রাজি হলেন নেরুদা। দেশ ছাড়ার সময় নেরুদা সঙ্গে যেসব বই নিতে চান সেগুলো আনার জন্য মাতিলদে ইস্লা নেগ্রা চলে গেলেন। মাত্র কটা বই একত্র করতেই স্বামীর ফোন পেলেন তিনি, ‘এখনই চলে এসো। আমি এর বেশি কিছু বলতে পারব না।’

মাতিলদে আবার ছুটলেন সান্তা মারিয়া ক্লিনিকের পথে। যখন হাসপাতালে পৌঁছালেন, দেখলেন — নেরুদা বেশ উত্তেজিত। তিনি জানতে পেরেছেন, সামরিক জান্তা ধরে ধরে বহু মানুষকে খুন করছে। লোকসংগীতশিল্পী ভিক্তর হারাকেও হত্যা করা হয়েছে।

নেরুদার জ্বর বাড়ছে। জ্বরের ঘোরে তিনি বলছেন, ‘ওদের গুলি করে মারছে, গুলি করে মারছে।’ নার্স এসে স্নায়ু শীতলকারী ইঞ্জেকশন দিয়ে যায়। তিনি ঘুমিয়ে পড়েন।

২৩ সেপ্টেম্বর – অপরাহ্ন। তখনো নেরুদার ঘুম ভাঙেনি। উদ্বিগ্ন মাতিলদে, পাবলোর বোন লরা এবং নিজের বান্ধবী টেরেসা হামেলকে সঙ্গে রাখলেন। তিনজন নারীর নিবিড় চোখ একজন ঘুমন্ত মানুষের ওপর। মাতিলদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ল — কবি একটু কেঁপে উঠেছেন, মুখটা কেমন দুমড়ে যাচ্ছে। তিনি আরও কাছে এলেন। নিঃশ্বাসের শব্দ আর আসছে না। তিনি নেই। রাত তখন সাড়ে ১১টা।

বিতর্ক শুরু হলো নেরুদার মৃত্যু নিয়ে। অভিযোগ উঠল, বিষাক্ত ইনজেকশন প্রয়োগে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে — তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ম্যানুয়েল আরায়া বললেন, ‘আমি মরে গেলেও এ দাবি থেকে সরে আসব না।’ তবে হাসপাতালের বুলেটিনে জানানো হয়, হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু। কিন্তু এটাও সত্য, তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন।

ক্যান্সার নাকি বিষপ্রয়োগ? — বিরোধ আদালতে গড়ায়। কমিউনিস্ট নেরুদার প্রাক্তন গাড়িচালক ও ব্যক্তিগত সহকারী ম্যানুয়েল আরায়া তদন্তকারী বিচারক মারিও কারোজাকে জানিয়েছিলেন যে, মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও নেরুদা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করছিলেন ও কথা বলছিলেন। আরায়া দাবি করেছিলেন যে, ক্যান্সার নয়, বরং বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়েছে নেরুদাকে। তার অভিযোগ — নেরুদা যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন জেনারেল আগুস্তো পিনোশের নির্দেশে গোয়েন্দারা হাসপাতালে এসে নেরুদার শরীরে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে বিষপ্রয়োগ করেছিল। আর এতেই মৃত্যু ঘটে ‍নেরুদার।

উল্লেখ্য, চিলিতে আগুস্তো পিনোশের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানের সময়েই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন নেরুদা। নেরুদার মৃত্যুর কারণ হিসেবে অন্য কোনো কিছুর প্রমাণ পাওয়া যায় নি দাবি করে পাবলো নেরুদা ফাউন্ডেশন জানিয়েছিল, ক্যান্সারেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

আবার, বিবিসি এক বিবৃতিতে জানায়, চিলির কমিউনিস্ট পার্টির আইনজীবী এদ্যুয়ার্দু কন্তেরাস দাবি করেছেন, পাবলো নেরুদার মৃত্যু নিয়ে সন্দেহ আছে। কন্তেরাস জানান, যে হাসপাতালে নেরুদা ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন সেখান থেকে বলা হয়েছে, একটি ব্যাথানাশক ইঞ্জেকশন দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান নেরুদা।

তবে কন্তেরাসের দাবি, ৬৯ বছর বয়সী নেরুদাকে ব্যাথানাশক নয়, সম্ভবত বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছিল।

মৃত্যুর ৪০ বছর পর, ২০১৩ সালে, আদালতের আদেশে ইস্লা নেগ্রায় সমাহিত পাবলো নেরুদার দেহাবশেষ উত্তোলন করা হয় এবং সেটি উন্নততর পরীক্ষার জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্রে। সেখান থেকে পাওয়া একটি প্রতিবেদনে জানানো হয় — পাবলো নেরুদা প্রোস্টেট ক্যান্সারে ভুগছিলেন এবং ক্যান্সারে অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছিল।

সরকারি ভাষ্য নিয়ে ৪৪ বছর ধরে সন্দেহ আর অবিশ্বাসের মধ্যে ২০১৭ সালে একদল ফরেনসিক গবেষক দাবি করেন, প্রোস্টেটের ক্যান্সারে মৃত্যু হয়নি নেরুদার। নেরুদার দেহাবশেষ থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করে গবেষক দল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বলে জানায় বিবিসি। তবে ঠিক কী কারণে নেরুদার মৃত্যু হয়েছে, সেই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গবেষক দল দিতে পারেন নি। তবে নেরুদাকে পরিকল্পিত খুনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা।

মৃত্যু যেভাবেই হোক, পিনোশের অভ্যুত্থান, আলেন্দের মৃত্যু, চিলির দুর্যোগ — এমনিতেই কবিকে মরণাপন্ন করে তুলেছিল। তাঁর কবিতায়ও আছে সে কথা — “শেষ হয়ে আসে মানবতার বসন্তকাল”।

নোবেলজয়ী কবি পাবলো নেরুদাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী লেখক মনে করা হয়। বিশ্বব্যাপী প্রবল জনপ্রিয় কবি নেরুদা আজীবন চিলির কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। তিনি একজন আইনজীবী ও একজন সফল কূটনীতিকও ছিলেন। চিলিয়ান এই কবি ও রাজনীতিবিদ রচনা করেছেন পরাবাস্তববাদী কবিতা, ঐতিহাসিক মহাকাব্য, এমনকি প্রকাশ্য রাজনৈতিক ইস্তাস্তেহারও। তাঁর রচনা অনূদিত হয়েছে একাধিক ভাষায়। বিশ্বসাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান ‘গণমানুষের কবি’ বলে খ্যাত পাবলো নেরুদা।

পাবলো নেরুদার জীবন ও কবিতা সম্পর্কে জানতে ক্লিক করুন 

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading