কেমন হবে এই অনিশ্চিত সময়ে পড়ালেখার ধরন ?

অনিশ্চিত সময়ে সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে দুঃশ্চিন্তা না করে নেয়া উচিত সঠিক পদক্ষেপ
অনিশ্চিত সময়ে পড়ালেখা

মোবাইল ফোন টেপাটেপি করে পড়াশোনা?

শুনেই কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন মা। এই প্রজন্ম আর কী কী শোনাবে বাবা-মায়েদের? যেখানে পেট ব্যাথা হলেও মা বলে ওঠেন, ‘সারাদিন ফোন টিপলে তো পেট ব্যাথাই হবে’। সেখানে আজকে ফোনের মধ্যেই হচ্ছে ক্লাস!

করোনার অনিশ্চিত সময়ে পৃথিবীর সকল কর্মকান্ড থমকে যাওয়া অবস্থাতে অন্যান্য বিষয়ের মত পড়াশোনাতেও প্রভাব পরেছে। অনলাইনে পড়াশোনা চালিয়ে যাবার মত এরকম অসম্ভব কাজও বছরের পর বছর করতে দেখা গেছে। কিন্তু বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এতদিনেও অনলাইনে পড়াশোনার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি। সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি খানিকটা উন্নতি হয়ে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে গেলেও শিক্ষার্থীরা আগের ট্রমা থেকে বের হতে পারেননি। তাছাড়া করোনা পরবর্তী সময়ে পূর্বের তুলনায় অনেক ভাবেই শিক্ষার পদ্ধতিগত পরিবর্তন এসেছে। আর তাই আজ আমরা আলোচনা করবো অনিশ্চিত সময়ে আমাদের পড়ালেখার ধরণ কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে।

করোনাকালের অভিজ্ঞতার নিরিখে কেমন হবে করোনা-পরবর্তী আগামীর শিক্ষাব্যবস্থা? বাস্তবমুখী, কর্মমুখী আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করতে হবে শিক্ষা কারিকুলাম। দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলামের পাশাপাশি বাস্তবমুখী নানা কার্যক্রমও কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। অনলাইনে আয় কিংবা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় কোর্সগুলো কারিকুলামের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীদের পাঠ্য বই আরো যুগোপযোগী ও বিস্তৃত করে তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য শিক্ষার্থীদের একুশ শতকের দক্ষতায় দক্ষ করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে আরো সুদৃঢ় ও আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার জন্য মনস্তাত্ত্বিক শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ও উপায় খুঁজছে কিভাবে প্রাথমিকের ছোট বাচ্চাদের পড়াশোনার মধ্যে রাখা যায়। প্রাথমিকের এক কোটি ৪০ লাখ বাচ্চাদের একাডেমিক স্পর্শে রাখা ছাড়াও তাদের মায়েদের কাছে এসএমএসের মাধ্যমে করোনার সতর্কতামুলক বার্তা পৌঁছানোর চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। আরও যেসব বিষয় যুক্ত করা যায়-

১. শিক্ষা বিষয়ক উপকরণ দেয়া

শিক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন উপকরণ বাজারে পাওয়া যায়, যেগুলো বাচ্চাদেরকে খেলাধুলার ভেতর দিয়ে শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। তার মধ্যে সায়েন্স কিটগুলো অন্যতম। বাংলাদেশের সর্বপ্রথম সায়েন্স কিট অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্সতে পাওয়া যায় বিভিন্ন রকমের আলাদা ও ভিন্ন সায়েন্স কিট। যেমন-

আগে সোহমের গল্প শুনুন! ক্লাশ ওয়ানে পড়া এই শিশুটি এখনই আলোর প্রতিফলনের সূত্র ভালোভাবে বুঝে গেছে পেরিস্কোপের এক্সপেরিমেন্ট করে। তার ভাবনার জগৎটা কতখানি সমৃদ্ধ হলো ভেবে দেখেছেন? আমরা চাই আমাদের শিশুদের ভাবনার জগৎটা রঙিন হোক। আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, বিচ্ছুরণের মত কঠিন কঠিন তত্ত্বগুলো যে আসলে খুব মজার বিষয় এ কথাটি যখন একটি শিশু জানতে পারবে তার নিশ্চয়ই আনন্দের সীমা থাকবে না! এই যে সোহম শিখে গেছে পেরিস্কোপের আয়নাগুলো ৪৫ ডিগ্রি কোণে মুখোমুখি বসালে যে দৃশ্যসীমার বাইরের বস্তু দেখা যায়, বড় হলে সে তো ফিজিক্স বইয়ের আলোর অধ্যায়টি হাসতে হাসতে শিখে যাবে। নিউটনের বর্ণ চাকতির এক্সপেরিমেন্ট করে জেনে গেছে মৌলিক রঙ কাকে বলে, কীভাবে এক রঙের সাথে আরেক রঙ মিশিয়ে নতুন রঙ তৈরি করা যায়। বিজ্ঞান শিক্ষা তাঁর কাছে এখন সহজ আর আনন্দময়!

আলোর ঝলক
BUY NOW -আলোর ঝলক

ছোট্ট একটা গল্প শুনুন। আয়ান নামে আট বছর বয়সী ছোট্ট একটি ছেলে একদিন চুম্বকের চমক থেকে দুটি দন্ড চুম্বক নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, দুটো সমধর্মী চুম্বক তো পরস্পরকে বিকর্ষণ করে, কী হবে যদি তাদেরকে সে সবসময় চেপে ধরে থাকে? এরই মাঝে চুম্বক ডোমেইন সম্পর্কেও তারা জানা হয়ে গেছে বেশ! এই যে বাচ্চা একটি ছেলের প্রশ্নের উদয় হচ্ছে, জানছে, এই প্রশ্নগুলো জাগাবার জন্যেই চুম্বকের চমক বিজ্ঞানবাক্সটি। চুম্বক এক অসাধারণ পদার্থ, এটা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করতে গেলে শিশুমনে নানারকম প্রশ্ন জাগবেই, শিখবেই, আর সময়টাও খুব ভালো কাটবে। নিয়োডিমিয়াম চুম্বক, ব্যাটারি এবং পেরেক ব্যবহার করে ম্যাজিক মোটর তৈরি, চুম্বকের চারপাশে লোহার গুড়ো ছড়িয়ে দিয়ে বলরেখা দৃশ্যায়ন, ডিম্বচুম্বক ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের সঙ্গীত তৈরি করা, বড় চুম্বক থেকে বাচ্চা চুম্বক তৈরির মাধ্যমে পাঠ্যবইয়ের ডোমেইন তত্ব প্রয়োগ করা , হাতের স্পর্শ ছাড়াই কোন বস্তুকে সরানো, ম্যাগনেটিক নিক্তি তৈরি, অচুম্বক পদার্থের সাথে চুম্বকের সংস্পর্শে স্লো মোশন ম্যাজিক দেখা, কলিং বেল তৈরি, তারকে লাফাতে সাহায্য করা ইত্যাদি।

চুম্বকের চমক
BUY NOW -চুম্বকের চমক

মিতিন যেদিন নিজে নিজে ছোট্ট একটা ফ্যান বানিয়ে তার মাকে বাতাস দিলো, তখন সে যে আনন্দটা পেয়েছিলো, তা হয়তো বা আলেকজান্ডার গ্রাহামবেলের টেলিফোন আবিষ্কারের মুহূর্তটার চেয়ে কম ছিলো না! কারণ মিতিনের বয়স মাত্র ৫!

ফল মূল অথবা শাকসবজি দিয়ে লাইট জ্বালানো, চুল দিয়ে বেলুন ঘষে ভেতরে স্থির তড়িৎ তৈরি করে তা দিয়ে পানির ধারাকে বাঁকানো, পরিবর্তনশীল রোধের সূত্র ব্যবহার করে লাইট দিয়ে লাইট জ্বালানো, সরল বর্তনীর সূত্র প্রয়োগের মাধ্যমে শব্দ সংকেত তৈরি, সিরিজ ও প্যারালাল কানেকশন বানাতে শেখা, ইত্যাদি। এমন মোট ২০টি পরীক্ষণ রয়েছে।

তড়িৎ তান্ডব
BUY NOW – তড়িৎ তান্ডব

এগুলো ছাড়াও অদ্ভুত মাপজোখ, রসায়ন রহস্য, শব্দকল্প  নামে রয়েছে বিজ্ঞানবাক্সের আরও তিনটি প্যাকেজ! সবচে’ আনন্দের খবর হচ্ছে, খুব শীঘ্রই বিজ্ঞানবাক্স নিয়ে আসতে যাচ্ছে শ্রেণিভিত্তিক বিজ্ঞানবাক্স! কিন্তু এই ৬ টি বিজ্ঞানবাক্সও আপনার সন্তানের গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা শানিত করতে সাহায্য করবে দারুণভাবে।

২. বই পড়ার অভ্যাস করানো

একটি ভালো বই মানুষের মনশ্চক্ষু যেমন খুলে দেয় তেমনি জ্ঞান ও বুদ্ধিকে প্রসারিত ও বিকশিত করে মনের ভিতরে আলো জ্বালাতে সাহায্য করে। বিল গেটস প্রতিবছর ৫০টি বই শেষ করেন। এলন মাস্ক রকেট সায়েন্সের বিদ্যা বই পড়ার মাধ্যমে অর্জন করেছেন।

ব্যায়াম যেমন আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে তেমনি বই পড়ার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মনকে সুস্থ ও আনন্দিত রাখতে পারি । করোনার অনিশ্চিত সময়ে পড়াশোনাই শুধু নয়; বরং পড়াশোনার বাইরেও নিজের মনকে সতেজ রাখতে পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গী হয়েছিলো বই। সুতরাং এমনিতে যাদের বই পড়ার অভ্যাস নেই তাদের কাছেও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো বই পড়া কতটা জরুরী। কোমলমতি শিশুদের জন্য দারুণ সব বই পাওয়া যায় ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষাতেই। যদি শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে বই পৌছে দেয়া হয় তবে অনিশ্চিত সময়ের বাইরেও করোনা পরবর্তী সময়েও বই পড়ার অভ্যাস খুবই কাজে লাগবে।

শিশুদের উপযোগী দারুণ সব বই এখন পাওয়া যায়। যেমনঃ

১. তোত্তোচান

২. ছোট্ট রাজপুত্র

৩. বোকাবাবা ও কিডন্যাপার

এছাড়া যারা স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী তারা দেশের সাহিত্যের পাশাপাশি বিশ্ব সাহিত্যের অনেক স্বচ্ছ ও সাবলীল অনুবাদও পড়তে পারে। যেমনঃ

১. রাশিয়ার দশটি গল্প

২. দি আউটসাইডার

৩. শ্রেষ্ঠ গল্প (মার্ক টোয়েন)

বই পড়ানোর অভ্যাসের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতনতা বেশি জরুরী। অভিভাবকরা সন্তানকে বই পড়ানোর ব্যাপারে যেসব বিষয়গুলো মাথায় রাখতে পারেন-

  • সন্তানের বয়স উপযোগী বই দিন
  • তার পছন্দ অনুযায়ী বইয়ের ধরণ, জনরা ইত্যাদি বুঝে বই বাছাই করুন
  • একসাথে অনেকগুলো বই পড়তে না দিয়ে ধারাবাহিকভাবে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন
  • শুরুর দিকে বই না পড়তে চাইলে নিজে বই পড়ে তাদেরকে শোনান
  • বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করুন

৩. পড়াশোনায় ভিজ্যুয়াল মাধ্যমের ব্যবহার

রাজউক কলেজ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জনাব মাসুম বিল্লাহ বাংলাদেশের দৈনিক সংবাদপত্র প্রথম আলোতে লেখেন, ভিডিও শেয়ারিং ভিত্তিক সবচেয়ে বড় সাইট হচ্ছে ইউটিউটব ব্যবহার। নির্ধারিত চ্যানেলে শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক ক্লাসের ভিডিও আপলোড করা হয়। সেই ভিডিওতে প্রাইভেট অপশন চালু করে শুধু নির্ধারিত শিক্ষার্থীদের দেখানো হয়। আবার একবারে সব ভিডিও আপলোড করে কোর্সে নির্ধারিত সময়ে ভিডিও প্রিমিয়ার করা যায়। কোর্সোরা হচ্ছে নির্ধারিত ফির মাধ্যমে বিশ্বের নামিদামি শিক্ষকদের ক্লাসগুলো পাওয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু কোভিড-১৯ বা করোনা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার পর এই সময়ের শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে ৪০০ বিষয়ে তিন হাজার ৮০০টি কোর্স বিনামূল্যে দিচ্ছে কোর্সেরা। ওই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তারা বাছাই করা যেসব কোর্সগুলোর মান তুলনামূলক ভালো সেই ভিডিও ক্লাসের অনলাইনের মধ্যেমে পড়াচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

জুম ও মাইক্রোসফট টিম বিভিন্ন অফিসের টিমভিত্তিক কাজে ব্যবহার করা হলেও এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার বেলায় ব্যবহার করছেন। এসব পদ্ধতিতে শিক্ষকরা দিনের শিট নিয়ে আলোচনা করছেন। সেখানে কোনো অংশ বুঝতে সমস্যা হলে সরাসরি ভিডিও ক্লাসে থাকা শিক্ষার্থী লাইভ প্রশ্ন, অনুপস্থিত শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে কমেন্টের অপশনে আলোচনা করার সুযোগ পাচেছ। প্রতিটি লেকচারের ওপর নেওয়া ক্লাসগুলো ভিডিও রেকর্ড করে আপলোড করে দেওয়া যাবে। ফলে ওই সময় কোন শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলেও পরে ভিডিও টিউটরিয়েল ও লেকচার দেখতে পারবে। সেখানে তার কোন সমস্যা থাকলে কমেন্ট লিখতে পারবে এবং শিক্ষক সেটির উত্তর দিতে পারবেন। একই সঙ্গে পরের দিনের লেকচারগুলো ওয়েবসাইটে দিয়ে দিবেন। ওয়েবসাইট ভিত্তিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেকচার প্রকাশ করার ব্যবস্থাও আছে। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট কিছু লিংক থাকবে যেখানে ক্লিক করেই একজন শিক্ষার্থী তার প্রয়োজনীয় লেকচার ও ভিডিওগুলো পেয়ে যাবে। তার সুবিধামতো সময় এগুলো দেখে একজন শিক্ষার্থী লেকচারগুলো পড়তে পারবে।কিছু কিছু ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ও এগুলোর দুএকটি পদ্ধতি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যুক্ত থাকছে।

পড়াশোনায় ভিজুয়াল মাধ্যমের ব্যবহার কিংবা শিক্ষার উপকরণ শিক্ষার্থীদের দেয়ার পাশাপাশি বই পড়ানোর অভ্যাসের মাধ্যমে অনিশ্চিত সময়ে পড়ালেখার এক নতুন মাত্রা উন্মোচন করা সম্ভব। অনিশিচত সময়ে পড়াশোনার ধরন কেমন হবে, সে সম্পর্কে অভিভাবকদের নিজেদেরও কিছুটা সচেতন হয়ে কিছু রিসার্চ এবং পড়াশোনা করতে হবে।

প্যারেন্টিং বুঝতে সহায়ক বইগুলো 

 

Zubayer Ibn Kamal

Zubayer Ibn Kamal

For the last half a decade, I have been writing stories, articles, features, and other content in various national level magazines. I am most interested in creative writing. I have read thousands of fiction books in the last few years. I have memorized the book of the last revelation of God. My day goes by reading books and thinking.

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading