সাদাত হাসান মান্টো – একজন অন্ধকার সময়ের গল্পকার

সাদাত হাসান মান্টো

১৯৪৯ সালের মার্চ মাস। উপমহাদেশে সদ্য দেশভাগের ক্ষত তখনো দগদগে, নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের লাহোরে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন একজন লেখক। তার আপরাধ, দেশভাগের প্রেক্ষাপটে অশ্লীল সাহিত্য রচনা। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ তো বটেই এমনকি প্রগতিশীল সমাজের সিংহভাগও তাকে তখন খারিজ করে বসে আছে। আত্মপক্ষ সমর্থনে লেখকের বক্তব্য, তিনি অসত্য কোনো কিছু লেখেননি। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নবগঠিত দুটি রাষ্ট্রের লাখ লাখ মানুষের জীবনে যে বিরাট ক্ষত তৈরি করে গেছে, তিনি সেই ক্ষতের কথাই লিখেছেন। এখন সেই ক্ষত যদি কুৎসিত, কদর্য হয় সেই দায়ভার তো তিনি নেবেন না। তাই তাঁর বক্তব্য, তিনি যা দেখেছেন, তার অভিজ্ঞতায় যা রপ্ত হয়েছে তাই লিখেছেন, সত্য লিখেছেন, একনিষ্ঠ থেকেছেন। কোনো ধরণের রাখঢাক করার প্রয়োজন অনুভব করেননি। কিন্তু সেসব অপ্রিয় সত্য নব্যগঠিত পাকিস্তান সরকার কিংবা তারও পূর্বে বৃটিশ শাসকগোষ্ঠির কেউই হজম করতে পারে নি। বলছি, লেখক সাদাত হাসান মান্টো’ র কথা।

১৯৪৯ সালে “ঠাণ্ডা গোশত” গল্পের জন্য  সাদাত হাসান মান্টোকে যখন লাহোরের আদালতে তোলা হয়, তখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেন,

“আমার লেখা আয়নার মত, যেখানে সমকাল আর সমাজের মুখ প্রতিফলিত হচ্ছে। যদি তা দেখতে কুৎসিত হয়, তাহলে বুঝতে হবে সময়টাই কুৎসিত।“

সাদাত হাসান মান্টো জন্মগ্রহন করেন পাঞ্জাবের লুধিয়ানার পাপরউদি গ্রামে। তার কৈশোর কিছুটা অস্পষ্ট। ছাত্র হিসেবে মোটেই ভালো ছিলেন না তিনি। যার ছোটগল্পগুলোকে উর্দু সাহিত্যের অন্যতম সেরা সম্পদ বলে বিবেচনা করা হয়, অথচ সেই তিনিই উর্দুতেই তিনবার ফেল করে চতুর্থবার কোনো রকমে এনট্রান্স পাশ করেছিলেন। তবে তার সাহিত্য প্রতিভার বিকাশ খুব সম্ভবত শৈশব থেকেই প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল। কলেজে থাকাকালীন পালন করেছেন কলেজ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব। এছাড়া ছোটবেলা থেকেই ঝোঁক ছিল গল্প উপন্যাসের প্রতি। ছোটোবেলায় গল্প পড়ার লোভে রেলস্টেশনের দোকান থেকে বইও চুরি করেছেন। তবে তার জীবনে চিন্তার মোড় ঘুরে যায় লেখক আবদুল বারি আলিগের সাথে দেখা হওয়ার পর। বিশেষত এই মানুষটির প্রভাব মান্টোর পরবর্তী জীবনে অনেক। তিনি মান্টোকে রাশিয়ান আর ফরাসী পড়তে এবং শিখতে উদ্বুদ্ধ করেন যার মাধ্যমে মান্টো বিশ্ব সাহিত্যের সাথে পরিচিত হন এবং পরবর্তীতে অনেক বিদেশী সাহিত্য উর্দুতে অনুবাদ করেন।

BUY NOW

একসময় বোম্বে চলচ্চিত্র জগতে মান্টোর বিচরণ শুরু হয়। তিনি মূলত ছোট গল্প লিখতেন, এছাড়া বহু সিনেমার স্ক্রিপ্টও লিখেছেন। ‘আট দিন’, ‘চল চলরে নওজোয়ান’, ‘মির্জা গালিব’ ইত্যাদি বিখ্যাত সিনেমার চিত্রনাট্য মান্টোর লেখা। বলা যায়, বোম্বে ইন্ডাস্ট্রিতে কাটানো সময়গুলোই মান্টোর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ছিল যে সোনালী দিনের স্মৃতিচারণ তাকে মৃত্যু অবদি করতে দেখা গেছে। বোম্বেতে সমাজের সবচেয়ে খ্যাতিমান সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকার, চলচ্চিত্রশিল্পী, গায়ক, নায়কদের সাথে তখন তার নিত্য যাঁর সাক্ষাৎ, আড্ডা এবং কাজ। সে সময়ের আলোচিত লেখক ইসমত চুগতাই, অভিনেতা অশোক কুমার, অভিনেতা ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু শ্যাম চাড্ডার সাথে আড্ডায়, আলোচনায়, লেখালেখিতে মান্টো তখন বোম্বে শহর চষে ফিরছেন। তবে বোম্বের পরিস্থিতি তখন বেশী সুবিধার নয়। অখণ্ড ভারতের রাজনীতিতে স্বাধীকার আন্দোলন চলছে, সাথে ধুমায়িত হতে শুরু করেছে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প, ঘনিয়ে আসছে দাঙ্গা। বছরের পর বছর একসঙ্গে বসবাস করা মানুষগুলো একে অপেরকে চিনছে “হিন্দু”, “মুসলমান” পরিচয় দিয়ে। তবে স্বাধীনতা, দেশভাগ, দ্বিজাতিতত্ত্ব , জাত, ধর্মের  জটিল রাজনীতির মধ্যে তখন মান্টোর অংশগ্রহন দেখা যায়না। দাঙ্গা শুরু হলে মান্টো বোহেমিয়ানের মত ঘুরে বেড়াচ্ছেন শহরের অন্ধকার গণিকালয়, লাল-নীল সুরার দোকান আর মাতাল-বেশ্যাদের ডেরায়। তুলে আনছেন মানুষের খুনি-লুটেরা হওয়ার নৃশংস আর শরীর হীম করা সব গল্প। মান্টোর গল্প তৎকালীন পশ্চাদপদ সমাজে তুমুল অস্বস্তির জন্ম দেয়। গল্পের বিষয়বস্তু, প্রকাশভঙ্গী নিয়ে শুরু হয় নানা আলোচনা সমালোচনা যা একসময় শাসকগোষ্ঠীরও নজর এড়ায় না । অতঃপর তার নামে গল্পে অশ্লীলতা ছড়াবার অভিযোগে মামলা করে বসে বৃটিশ সরকার।

দেশভাগের সেই তুমুল স্রোত, অস্থির সময়কে সামাল দিতে পারেননি মান্টো। পরিচয়ে মুসলমান হওয়ায় পরিবারসমেত একসময় তাকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়। প্রাণের শহর বোম্বে ছেড়ে চলে যান নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের লাহোরে। লাহোরে শুরু হয় মান্টোর নতুন জীবন সংগ্রাম।

BUY NOW

পাকিস্তানে এসে মান্টো তার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্মগুলো লেখেন। ‘বু’, ‘ঠাণ্ডা গোশত‘, ‘টোবা টেক সিং’ এর মত শক্তিমান ছোটগল্পগুলো তিনি এ সময়ে সৃষ্টি করেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ঠিক সে সময়ই তিনি সবচেয়ে বেশি অসমাদৃত হয়েছেন। পরিবার পরিজন নিয়ে ভুগেছেন প্রচণ্ড অর্থকষ্টে। জীবিকা উপার্জনের জন্য পাকিস্তানেও যোগ দিয়েছিলেন ফিল্ম কম্পানিতে। কিন্তু পরপর দুটি চলচ্চিত্র ফ্লপ হওয়ায় সে রাস্তায় বেশিদূর এগোতে পারেননি। একমাত্র অবলম্বন তখন পত্রিকায় লিখে রোজগার। কিন্তু দেশভাগের পূর্বে তিনি যে অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছিলেন সেই একই অভিযোগে লাহোরে তাকে আবার অভিযুক্ত করা হয়। আমৃত্যু তাঁকে সেই বোঝা বইতে হয়েছে। তার লেখা পত্রিকার সম্পাদকরা ছাপতে ভয় পেতেন। নিজের লেখা ছাপতে না পেরে তা নিয়ে বহু পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে তাকে দিনের পর দিন ঘুর ঘুর করতে হয়েছে । তবুও তিনি লিখেছেন। ১৯৪৮ সালে ৩২ টি গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর বই “সিয়াহ হাশিয়ে” বা “কালো সীমানা” । এই কালো সীমানা দেশভাগের তৈরী নতুন বর্ডার , যাকে তিনি কালোই বলতেন।

BUY NOW

মাত্র ৪৩ বছর বেঁচেছিলেন সাদাত হাসান মান্টো। এই স্বল্প আয়ুষ্কালে বিপুল দর্পে লিখে গেছেন জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত। বলা হয়, প্রথাগত সাহিত্যের নৃশংসতা ফুটিয়ে তোলার জন্য রোমান্টিক সমাজ-বাস্তবতার ধরনে আটকে থাকেননি তিনি।মান্টো লিখে গেছেন এক অদ্ভুত নির্বিকার ঢঙয়ে, যে ঢঙ্গয়ে কঠিনতম মর্মান্তিক গল্পটিও উঠে আসে অতি নির্লিপ্তে, স্বাভাবিক ভঙ্গিতে। প্রখ্যাত উর্দু লেখক আলী সর্দার জাফরী একবার মান্টোর লেখা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বলেছিলেন, “মধ্যবিত্ত মানুষের বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা অপরাধীদের গল্প বলে মান্টো।“

নিজের ৪৩ বছরের জীবদ্দশায় রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্মবাদী কিংবা প্রগতিশীল কোনো জায়গাতেই সমাদৃত হতে পারেননি মান্টো। তবে এতসব কিছুর পরও তিনি নিজের অবস্থান জানতেন। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে  স্বভাবসুলভ বিদ্রুপে বলে গেছেন, “একদিন হয়তো পাকিস্তানের সরকার আমার কফিনের উপর একটা মেডেলও পরিয়ে দেবে। সেটাই হবে আমার জন্য চরম আপমান।” আদতে হয়েছিলোও তাই। পাকিস্তানের জন্মের ৬৫ বছর উপলক্ষে পাক সরকার সেই গল্পকারকেই  “নিশানে ইমতিয়াজ” উপাধিতে ভূষিত করেছে যে গল্পকার তাঁর জীবদ্দশাতেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক সমাজ বাস্তবতার তিনি এবং বারবার প্রাসঙ্গিক আর অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠবেন।

মৃত্যুর আগে এই মহান লেখক নিজের এপিটাফে লিখে গেছেন, ‘এই সমাধিতে টন-টন মাটির তলায় শুয়ে আছে সেই ছোটগল্পকার, যে ভাবছে, খোদা, নাকি সে নিজে, কে বেশি ভাল গল্পকার ! ’

– আম্মার বিন আসাদ

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading