সন্তানের স্ক্রিনের মোহ কিভাবে ভাঙাবেন? মাত্র ১টি কৌশল!

screen addiction

‘জনি খেতে এসো। টেবিলে খাবার দিচ্ছি।’ ‘জনি, পড়তে বসো। অনেক টিভি দেখা হয়েছে।’ কিন্তু মায়ের কথা শোনার সময় কোথায় জনির? সে তো মেতে আছে কার্টুন নেটওয়ার্ক চ্যানেলে ‘টম এন্ড জেরি’ কিংবা কম্পিউটারে ‘কুংফু পাণ্ডা’ নিয়ে। বলে বলে হয়রান হয়ে মা তখন এক টানে সকেট থেকে খুলে আনেন টেলিভিশনের প্লাগ। শাট ডাউন করে দেন কম্পিউটার।

খেতে আসে না, পড়তে বসে না, কেবল হা করে গেলে ওসব ভিডিও। নয়তো মোবাইল ফোনে খেলে গেমস। বন্ধ করতে বললে চিৎকার করে, কাঁদে কিংবা অভিমান করে গাল ফুলিয়ে থাকে। খাবার টেবিলেও চুপচাপ হয়ে থাকে। খেতে চায় না। স্ক্রিনের মোহ থেকে তাদের কোনো রকম মন কষাকষি ছাড়াই কিভাবে বের করে আনবেন?

মোহভঙ্গের উপায়? এই বিষয়ে মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ 

জনির মায়ের সঙ্গে এই বিষয়েই আলাপ হচ্ছিল। সন্তানকে নিয়ে বেশ দুঃশ্চিন্তায় আছেন তিনি। জানালেন, রোজ রোজ এমন কান্নাকাটি ভালো লাগে না আর। হতাশ দেখাল তাঁকে। আমার তখন কিছুদিন আগে পড়া Isabelle Filliozat এর লেখা একটা চমৎকার নিবন্ধের কথা মনে পড়ল। ইসাবেল একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট, বিশেষ করে প্যারেন্টিং নিয়েই কাজ করেন। ফরাসী ভাষাভাষী লোকদের কাছে তিনি বেশ গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ। বাচ্চাদের শিক্ষা এবং প্যারেন্টিং বিষয়ে অনেক লেখালেখি করেছেন তিনি। ঐ নিবন্ধে ইসাবেল ১ টি কৌশল বাতলে দিয়েছিলেন। আমি জনির মাকে সেই নিবন্ধ পড়তে দিয়েছিলাম। আর তারও কয়েক মাস পর দেখা হতেই তিনি জানালেন, ট্রিক ভালোই কাজে দিয়েছে। তাঁকে দেখাচ্ছিল হাসি-খুশি এবং প্রাণবন্ত।

হুট করে টেলিভিশন বন্ধ করা বা মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া খুবই ক্ষতিকর

ইসাবেল-এর বাতলে দেয়া সেই কৌশল কী ছিল, চলুন জেনে নেয়া যাক-এভাবে বলব না। বিষয়টা একটু জটিল। টেলিভিশন, ভিডিও গেইম কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় এমন মোহগ্রস্ত হয়ে থাকার কারণ এবং এর প্রতিক্রিয়া কী সেটাও জানা জরুরি বলে মনে করেন ইসাবেল। হুট করে টেলিভিশন আনপ্লাগ করা কিংবা কম্পিউটার শাট ডাউন করা বা মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া, কোনটাই সঠিক নয়। বরং এতে ক্ষতি হয় অনেক বেশি। শিশুদের স্ক্রিনের মোহ ভাঙানো জরুরি, তার চেয়ে জরুরি হলো হঠাৎই সেটা ভাঙাতে গেলে কী প্রতিক্রিয়া হয় তাদের মস্তিষ্কে, সেটা জানা থাকা।

হুট করে টেলিভিশন বন্ধ করা বা মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়া কেন ক্ষতিকর? 

আচ্ছা, একটা প্রিয় অনুষ্ঠানের টান টান উত্তেজনার মূহূর্তে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে কেমন লাগে আপনার? কিংবা ধরুন, জিততে হলে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের লাগবে চার বলে আরও চার রান। বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে তেমন সময়েও। কেমন লাগে এমন ক্ষেত্রে? খুব খারাপ, তাই না? অনেক ক্ষোভ আর অতৃপ্তি কাজ করে তখন। প্রশ্ন হলো, আপনি তো এখন আর জনি না। বেশ বয়স হয়েছে আপনার। বুঝতে শিখেছেন। কিন্তু খারাপ লাগাটা আপনারও ঘটছে কেন? উত্তরটা হলো-

ডিজিটাল বিনোদন মাধ্যমে সময় কাটানোর সময় এক ধরনের সুখের অনুভূতি তৈরি হয়

টেলিভিশন, কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে সময় কাটানোর সময় আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরনের সুখের অনুভূতি তৈরি হয়। ভিজ্যুয়াল এ্যাক্টিভিটিগুলো সমস্ত রঙ-রূপ-শব্দ-ছবি দিয়ে আটকে রাখে আমাদের। কোনো খেলা খেলার সময় বা দেখার সময়, কোনো মুভি দেখার সময় আমরা অন্য এক জগতে থাকি। আমরা হিপনোটাইজড থাকি অনেকটা। ঠিক করে বলতে গেলে, আমরা সেই নকল জগতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই।

সুখের অনুভূতি হঠাৎ নষ্ট হয়ে গেলে মস্তিষ্কে চাপ পড়ে 

মস্তিষ্ক এসময় ‘ডোপামিন’ নামক হরমোন নিঃসরণ করে, যা ব্যথা-বেদনা এবং দুঃশ্চিন্তা মোচন করে। স্ক্রিন-টাইম অফ হওয়া মাত্র ডোপামিনের ক্ষরণ কমে যায়, যা এক রকম ফিজিক্যাল শক হিসেবে আসে। এরকম সুখের অনুভূতি থেকে বয়স্কদেরই হুট করে বের হয়ে আসা কষ্টকর, ছোটদের জন্য তো তা রীতিমত ভয়াবহ ব্যাপার।

জনির মা তাই জনিকে যতই টেলিভিশন বন্ধ করতে বলুক, জনির জন্য সেটা মোটেই ভাবনার বিষয় হয় না। সে তখন চিন্তা করার মতো অবস্থাতেই থাকে না। খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই, হুট করে টেলিভিশন বা গেইম অফ করে দেয়া মাত্র জনির সীমাহীন খারাপ লাগতে থাকে। জনির মা হয়তো তাকে চড়-থাপ্পড় মারেন না, কিন্তু নিউরোলজিক্যালি, জনির এই খারাপ লাগা তার মায়ের চড়-থাপ্পড়ের চেয়েও খারাপ।

সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে শিশুর জগতে প্রবেশ করুন

একটি প্রশ্ন করুন- ‘কী দেখছ তুমি?’  

এরকম ক্ষেত্রেই সাইকোলজিস্ট ইসাবেল একটাই কৌশল অবলম্বনের কথা বলেছেন। সেটা হলো- তার জগতে আপনিও প্রবেশ করুন। তার জগতের সঙ্গে সেতুবন্ধন তৈরি করুন। বসুন তার পাশে গিয়ে। কোমল স্বরে আগ্রহ প্রকাশ করুন, ‘কী দেখছ তুমি?’

বাস্তব জগতে পুরোপুরি ফিরে না আসা পর্যন্ত কথা চালাতে হবে 

এই একটা প্রশ্নই আপনার কাজ অর্ধেক সহজ করে দেবে। কারণ- শিশুরা তাদের কাজকর্মে তাদের মতো করেই বড়দের পেতে পছন্দ করে। প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পর আরও কিছু কথা চালাচালি করুন। নাটকের বা কার্টুনের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করুন। গেইম খেলতে থাকলে জিজ্ঞেস করুন সে কত নম্বর লেভেলে আছে। প্রয়োজনে আপনাকেও শেখাতে বলুন।

যখন দেখবেন আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর সে ঠিকঠাক মতো দিচ্ছে, বুঝবেন মোহগ্রস্ত অবস্থা থেকে সে বেরিয়ে এসেছে। আর না দিলে তার সঙ্গে আরও কথা চালাতে হবে, তাকে বাস্তব জগতে পুরোপুরিভাবে ফিরিয়ে আনতে হবে।

তাকে আদর করুন এবং ছোট কোনো কাজ করে দেয়ার অনুরোধ করুন 

বাস্তব জগতে ফিরে আসার মানে হলো এখন সে আপনার নির্দেশ বা অনুরোধ মান্য করতে প্রস্তুত। অতএব, তাকে ছোট্ট একটা অনুরোধ করুন। কিছু এগিয়ে দিতে বলুন বা আদর করুন বা আপনার গালে চুমু খেতে বলুন। তারপর তাকে মনে করিয়ে দিন ‘এখন কিন্তু পড়তে বসার সময় হয়েছে। টিভি দেখার সময় শেষ’, অথবা, ‘চলো, গোসল করতে যাই’ কিংবা ‘এখন খাবার সময়, খেতে যাবে চলো’… যা কিছু প্রয়োজন। শিশুদের টেলিভিশনের মোহ থেকে মুক্ত করতে এই কৌশল সবচে’ কার্যকরী বলে মনে করেন অন্যান্য গবেষকরাও।

নিজের সম্পূর্ণ মনোযোগ তাকে দিন 

আপনার পুরোপুরি মনোযোগ পেলে সেও আপনার প্রতি মনোযোগী হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই কথাটা অনেক বেশি সত্য। তারা সব সময় প্রিয় মানুষদের এ্যাটেনশন চায়। তাই, শিশুদের স্ক্রিনের মোহ থেকে মুক্ত করার জন্য সেটা সুশৃঙ্খলভাবেই করার পরামর্শ দিয়েছেন ইসাবেল।

এই সহজ কৌশলটুকু প্রয়োগ করে দেখুন, কত সহজেই শিশুদের ডিজিটাল স্ক্রিনের মোহ থেকে মুক্ত করতে পারেন আপনি। না মেরে, চোখ না রাঙিয়ে খুব কোমলভাবে তাকে তার কাজে যুক্ত করুন। সেটার ফল হবে অনন্য। খুশি থাকুন আপনি, খুশি থাকুক আপনার সোনামণি।

বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র সায়েন্স কিট অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্স আপনার সন্তানের অবসর সময় সুন্দর করবে, এবং তার মেধা বিকাশে সাহায্য করবে। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।

প্যারেন্টিং বিষয়ক বইগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading