শিশুদের গণিত শেখানোর জন্য ড্যান ফিঙ্কেলের ৫ উপায়!

শিশুদের গণিতের পাঠ হবে আনন্দময়
teaching math to kids- dan finkel rules 1

“‘আমার ছয় বছরের ছেলে সম্প্রতি স্কুল থেকে ফিরে আমাকে বলেছে, সে গণিত ঘৃণা করে।’ কথাটা বলছিল আমার এক বন্ধু। বন্ধুপুত্রের গণিতের প্রতি ঘৃণার কথা শোনাটা আমার জন্য সহজ ছিল না, কেননা- আমি আবার গণিত খুব ভালোবাসি। গণিতের শক্তি এবং সৌন্দর্য আমার জীবনটাই বদলে দিয়েছে।” কথাগুলো বলছিলেন ড্যান ফিঙ্কেল, টেড টক-এর অন্যতম বক্তা। শিশুদের গণিত শেখানো র উপায় সম্পর্কে বলছিলেন তিনি।

গণিত হতে পারে সময়ের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, হতে পারে সবচে’ নিকৃষ্টও। হতে পারে আবিষ্কারের এক রুদ্ধশ্বাস ভ্রমণ, হতে পারে হতাশায় অবনমনের পথও। কিন্তু গণিতের ভ্রান্ত শিক্ষাও চোখে পড়ার মতো। গণিতকে গণিত করে তোলার জন্য তিনি বাতলে দিয়েছেন পাঁচটি উপায়।

প্রথমত তিনি বলছেন, একটি গণিতের ক্লাস শুরু হতে হবে প্রশ্ন দিয়ে। আমরা গণিতের ক্লাস বলতে বুঝি কিছু টেকনিক শেখা, কিছু সূত্র মুখস্থ করে বাঁধা ধরা সমস্যা সমাধান করা, যার পুরোটাই পুনরাবৃত্তি। অতএব, ছাত্র-ছাত্রীরা নিরুৎসাহিত হলে আমরা তাতে বিস্মিত হই না। স্কুল জীবন শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে কারো কারো গণিতের সঙ্গে চির বিচ্ছেদও হয়ে যায়। এর কারণ হিসেবে তিনি গতানুগতিক গণিত ক্লাসগুলোকেই দায়ী করছেন, যেগুলো শুরু হয় মূলত ‘উত্তর’ দিয়ে।

শিশুদের গণিত শেখানো র উপায় - গণিতের ক্লাস শুরু হতে হবে প্রশ্ন দিয়ে
গণিতের ক্লাস শুরু হতে হবে প্রশ্ন দিয়ে

এভাবে গুণ করতে হয়, ওভাবে ভাগ করতে হয়…মূলত কিছু স্টেপ শেখানো হয় ক্লাসে। সেগুলো শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হয়। শ্রেণিকক্ষে সেগুলোর বিরোধীতা করার মতো কেউ থাকে না বলে, সেখানে প্রকৃতপক্ষেই চিন্তার কোনো চর্চা হয় না। অথচ দেকার্তে বলেছেন- “It is the thinking thing that doubts, understands, conceives, that affirms and denies, wills and refuses, that imagines also, and perceives.”  

আমাদের প্রতিদিনের গণিত ক্লাসগুলো হতে হবে এমনই।

যদি প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয়, কেমন হবে একটা গণিত ক্লাসের ধরন? ধরা যাক, একটা ছবিতে ১ থেকে ২০ পর্যন্ত বিভিন্ন রঙের সংখ্যা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বলা হলো, “এই ছবিতে একটা রহস্য লুকিয়ে আছে, যেটা সাধারনভাবে খালি চোখে দৃশ্যমান না। সংখ্যাগুলোর সাথে সেগুলোর রঙের কি কোনো সম্পর্ক আছে?”

এখন, ইনট্যুইটিভলি মনে হচ্ছে, সংখ্যাগুলোর সঙ্গে রঙের কোনো একটা সম্পর্ক আছে। হতে পারে, এটা খুবই সাধারণ। কিন্তু এই রঙের ব্যাপারটা পরিষ্কার না বলে সেটা একই সাথে রহস্যময়ও। তাই শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নটা হয়ে উঠবে অথেন্টিক এবং আকর্ষনীয়। তাদের মধ্যে নানা রকম প্রশ্নের উদয় হবে। কিন্তু যখনই ক্লাসগুলো শুরু হচ্ছে উত্তর দিয়ে, মূলত তখনই ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের শেখার সুযোগ। সেটা করছেন স্বয়ং শিক্ষক। শুধু ক্লাসের শিক্ষক নয়, ক্লাসে বা ক্লাসের বাইরে যে কোনো শিক্ষকের ক্ষেত্রেই তাই।

চিন্তাপ্রক্রিয়া বলা যায় সেটাকেই, যখন একজন মানুষ প্রশ্নের ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে যায়এবং এটা ফিঙ্কেলের দুই নম্বর নীতি। শিক্ষার্থীদের এই সংগ্রামের মধ্যে প্রবেশ করাতে হবে!

ঠিক আছে, সেটা কীরকম?

গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা মনে করে, যে কোনো গাণিতিক সমস্যা একটা নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করা যায়। কেউ যদি উত্তর বের করতে না পারে, তাহলে সে আসলে ম্যাথ-পার্সন না। এটা শিক্ষা ব্যবস্থার একটা ব্যর্থতা। আমাদের অবশ্যই শিক্ষার্থীদের কঠিন সমস্যার মুখে অধ্যবসায়ী হওয়ার মতো উদ্ধত এবং সাহসী হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। এই অধ্যবসায় শেখানোর একমাত্র উপায়, তাদের প্রকৃত সমস্যার সঙ্গে লড়াই করার এবং চিন্তা করার সময় দেয়া।

চিন্তা করার সময় দিতে হবে
চিন্তা করার সময় দিতে হবে

ফিরে যাওয়া যাক বিভিন্ন রঙের সংখ্যার ছবিতে। এই ছবি দেখিয়ে শিক্ষার্থীদের তাদের চিন্তার সঙ্গে লড়াই করতে দিন। কী ঘটবে? তারা পর্যবেক্ষণ করতে থাকবে। কারো মনে হবে, “কেন শেষ কলামের সংখ্যাগুলোয় কমলা এবং নীল রঙ?”, “সবুজ সংখ্যাগুলোই কেন আড়াআড়িভাবে থাকছে?”, “লাল ভাগে শাদা ছোট ছোট সংখ্যাগুলোর মধ্যে কি কোনো ব্যাপার আছে?”, “সেগুলো সব বিজোড় সংখ্যা, এটা কি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার?”। এভাবে শিক্ষার্থীরা আরও গভীর থেকে গভীরে ভাববে, তাদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বাড়বে, কেননা-তারা প্রকৃতপক্ষেই একটা সত্যিকারের সমস্যায় পড়েছে এখন। এভাবে তাদের ঝুঁকি নেয়ার মানসিকতায়ও উন্নতি ঘটছে।

যা বলছিলাম, তাদের মনে হতে পারে, “এখানে কমলা রঙের ঘরে সব জোড় সংখ্যা দেখা যাচ্ছে কেন? তার মানে কমলা রঙ মানে এখানে জোড়?” তারা তখন আপনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতে পারে, “এটা কি ঠিক?”

একজন শিক্ষকের জন্য এই অবস্থাটা সবচে’ ভয়ঙ্কর। একজন শিক্ষার্থী আপনার কাছে আসল একটা জেনুইন চিন্তা নিয়ে, অথচ আপনি উত্তর জানেন না, কী হবে তখন? ফিঙ্কেল-এর তিন নম্বর নীতি এটাই। উত্তর জানা থাকতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। আপনি কোনো answer-key না!

অনেক সময়ই শিক্ষার্থীরা এমন অনেক প্রশ্ন করতে পারে, যেগুলোর উত্তর শিক্ষকের জানা নেই। শিক্ষকদের কাছে এটা একটা থ্রেইটের মতো। কিন্তু ফিঙ্কেল বলছেন, শিক্ষার্থীদের এ্যান্সার-কী তে পরিণত হওয়ার কোনো দরকারই নেই আপনার।

শিশুদের answer-key তে পরিণত হওয়ার প্রয়োজন নেই
শিশুদের answer-key তে পরিণত হওয়ার প্রয়োজন নেই

ক্লাসে অনুসন্ধিৎসু শিক্ষার্থী থাকলে ভালো। উত্তর জানা না থাকলে আপনি রেসপন্স করতে পারেন এভাবে- “আমিও জানি না উত্তর। চলো, উত্তর খুঁজে বের করি।” আর ফিঙ্কেল মনে করেন, জানলেও উত্তর সহসা না বলাই ভালো। এর কারণ দ্বিতীয় নীতিতেই তিনি বলেছেন। গণিত হলো একটি এ্যাডভেঞ্জার। তাকে আবিষ্কার করতে হবে। এবং কোনো কিছুর উত্তর না জানার মানেই ব্যর্থতা নয়, এটা আগে ছেলে-মেয়েদের বোঝাতে হবে। কোনো কিছু বোঝার জন্য এটাই প্রথম ধাপ।

তাই, “কমলা রঙ মানে কি এখানে ‘জোড়’?” এই প্রশ্নের উত্তর সহসা না দিয়ে আপনি তাকে বলবেন ব্যাখ্যা করতে যে, সে কেন এমনটা মনে করছে।

তাদের যুক্তি-তর্কের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়াই শিক্ষকের কাজ।

ছাত্র-ছাত্রীরা সন্দেহ করবে, গ্রহণ করবে, বর্জন করবে, এভাবেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে। শিক্ষক হিসেবে আপনার কাজ শুধু ‘হ্যাঁ’ বলা। হ্যাঁ, তাদের আইডিয়াকে ‘হ্যাঁ’ বলা। এটা ফিঙ্কেলের চতুর্থ নীতি।

এখন আপনার মনে হচ্ছে, “এটা তো খুবই কঠিন কাজ। সব সময় ‘হ্যাঁ’ কিভাবে বলব। কোনো শিক্ষার্থী যদি বলে, ২-এ ২-এ ১২ হয়, সেটাকে হ্যাঁ বলা তো সম্ভব নয়!” আপনি হয়ত তখন তাকে ঠিক করে দেবেন- না বাবু, ওটা ৪ হবে। কিন্তু ফিঙ্কেল ঠিক এটারই বিরোধীতা করছেন।

শিশুদের আইডিয়াকে 'হ্যাঁ' বলুন
শিশুদের আইডিয়াকে ‘হ্যাঁ’ বলুন

কিছু বেসিক ফ্যাক্টস জানা এবং সেগুলো এপ্লাই করাই গণিত নয়। ‘হ্যাঁ’ বলার অর্থ এই নয় যে, সে ঠিক বলছে। আপনি তার আইডিয়া গ্রহণ করবেন। কিন্তু দুয়ে দুয়ে কিভাবে ১২ হয়, সেটা তাকে ব্যাখ্যা করতে হবে। এভাবেই শিক্ষার্থী চিন্তাপ্রক্রিয়ায় প্রবেশ করবে। তারা শিখবে কিভাবে গাণিতিকভাবে চিন্তা করতে হয়।

আর এই সব কিছুই সম্ভব হবে তখন, যখন আপনি গণিত নিয়ে খেলা করতে শিখবেন। এটাই ফিঙ্কেলের পঞ্চম এবং শেষ নীতি।

খেলতে খেলতে গণিত শেখা
খেলতে খেলতে গণিত শেখা

কোনো কিছু নিয়ে খেলা করাই হলো গবেষনার প্রথম ধাপ। ফিঙ্কেল তাই শিশুকে গণিতের খেলায় যুক্ত করার আহ্বান করেছেন শিশুদের অভিভাবক এবং শিক্ষকদের। নিয়ম-কানুন আর সূত্র শেখার প্রাচীনপন্থী বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে গণিতকে একটি নতুন মাত্রায় নিয়ে গেলেই কেবল পূরণ হতে পারে গণিতের উদ্দেশ্য।

আরও পড়ুন- কিভাবে শিশু অংকের ভয় করবে জয়?

গণিত বিষয়ে লেখা মজার বইগুলো 

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading