ঢাকাইয়াদের খাবার প্রীতি, শত বছরের ঐতিহ্যের ইফতারি আইটেম

ঢাকাই ইফতারের রকমফের নিয়ে যত কথা
Dhakaiyader iftar

ঢাকাইয়ারা যেমন ভালো খাবার খেতে পছন্দ করেন, তেমনি খাওয়াতেও। আর খাওয়া-খাওয়ানোর এ নিয়মই যেন ঢাকাবাসীকে এনে দিয়েছে বিশেষ বিশেষ খাবারের ঐতিহ্য। এসব খাবারের মধ্যে কিছু ঢাকার অধিবাসীদের একান্ত নিজস্ব উদ্ভাবন। আবার কিছু এসেছে পাকিস্তান ও ভারতীয় সংস্কৃতি থেকে। ঢাকার খাবারের প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী অনেক খাবারই এখন আর পাওয়া যায় না। ঢাকার খাবারের আইটেমগুলোতে মোগলাই খাবারের প্রাধান্যই বেশি। তারা ভীষণ তেল-চর্বিযুক্ত খাবার পছন্দ করেন। তাদের খাবারের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মসলার প্রাধান্য বেশি।

ঢাকার হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে পোলাও বা বিরিয়ানি যেন বাধ্যতামূলকই বলা যায়। বিরিয়ানির শহর ঢাকা। এ বিরিয়ানির ঐতিহ্য নিয়েই পুরনো ঢাকায় গড়ে উঠেছে বিরিয়ানির একাধিক ঐতিহ্যবাহী দোকান। পোলাও বা বিরিয়ানি মোগলাই খাবার হলেও এটা ঢাকায় প্রচলন করেন নবাব বাড়ির বাসিন্দারা।

ঢাকার পোলাও নিয়ে কিছু কথা বলতে হবে। উপকরণ ভেদে পোলাওয়ের রয়েছে বিভিন্নতা। যেমন বুন্দিয়া পোলাও, মাছ (ইলিশ/রুই) পোলাও, ডিম পোলাও, মাগলু বা পোলাও, সাইয়া পোলাও, হোগলা পোলাও ইত্যাদি। পোলাও বা সাদা ভাতের সঙ্গে তরকারির নানা উপকরণেও ঢাকাইয়াদের রয়েছে স্বতন্ত্র ঐতিহ্য।

বিরিয়ানি মোগলদের মাধ্যমে ঢাকায় আসা এক বিশেষ প্রকারের খাবার; সুগন্ধি চাল, ঘি, গরম মশলা এবং গোশত মিশিয়ে রান্না করা হয়। বিরিয়ানি উর্দু শব্দ যা ফারসি ভাষা থেকে এসেছে। ফারসি ভাষায় বিরিঞ্জ অর্থ চাল বা ভাত। আর বিরিয়ান অর্থ ভেজে নেওয়া। ভাজা গোশত ও সুগন্ধি চালের সহযোগে তৈরি বিশেষ সুুস্বাদু খাবারটিই বিরিয়ানি নামে পরিচিতি পায়। বিভিন্নতায় বিরিয়ানির নানান রকমফের রয়েছে। কাচ্চি বিরিয়ানি, পাঞ্জাবি মোরগ বিরিয়ানি, কোলকাতা বিরিয়ানি, বিফ বিরিয়ানি, হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি, ভাটকালী বিরিয়ানি, লক্ষৌ বিরিয়ানি, মোরাদাবাদী বিরিয়ানি, সিন্ধী বিরিয়ানি উল্লেখযোগ্য।

ঢাকাইয়াদের খাবার প্রীতি, বিরিয়ানি
বিরিয়ানি

বিরিয়ানির ঢাকাই সংস্করণ তেহারি। আর ঢাকাই বিরিয়ানির নাম উঠলে যে নামটি চলে আসে সেটি হলো হাজীর বিরিয়ানি। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে হাজী গোলাম হোসেন সাহেবের হাত ধরে এই বিরিয়ানির শুরু। জনশ্রুতি আছে, একবার সম্রাজ্ঞী মমতাজ মোগল সৈন্যদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে ব্যারাকে গেলেন। কিন্তু সম্রাজ্ঞী দেখলেন সৈনিকদের স্বাস্থ্যের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। তাই তিনি নির্দেশ দিলেন চাল ও গোশত সমৃদ্ধ এমন একটা পুষ্টিকর খাবার তৈরি করতে যা; সৈনিকদের ভগ্নস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করতে পারে। মমতাজের আদেশে বাবুর্চি যে খাবারটি তৈরি করলেন; সেটাই আজকের ‘বিরিয়ানি’। সৈনিকদের ভোজনালয় থেকে ভোজনরসিক মোগলদের খাবার টেবিলে আসতে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি।

পোলাও শব্দটি তুর্কি-আর্মেনিয়া শব্দ পিলাও থেকে এসেছে। কাঁচা পানিতে পোলাওয়ের চাল সিদ্ধ করার পর ভাত থেকে ফেন বা মাড় গালানো অর্থাৎ পাশানো হয়। তারপর কন্বি পরীক্ষা করার পর প্রয়োজনীয় উপকরণ ঢেলে দম দিলেই পাশানো পোলাও তৈরি হয়। চালের দানার আধা-কাঁচা আধা-পাকা অবস্থাকে হিন্দিতে কন্বি বলে। পাশানো পোলাও ঢাকাইয়ারা পছন্দ করে না। যে পোলাও পাক করার সময় মাড় গালানো বা পাশানো হয় না হিন্দিতে তাকে লাপেটা পোলাও বলে।

ঢাকার খাস্বা অর্থাৎ ঢাকার বিশিষ্টতম খাবার যা ঢাকার মোরগপোলাও নামে পরিচিত। মোরগপোলাও ঢাকাইয়াদের উদ্ভাবন।
তাহেরি শব্দটি উর্দু যাকে ঢাকাইয়ারা তেহারি বলে। ঢাকাইয়ারা তেহারি খুবই পছন্দ করে। তাহেরি প্রাচীন পোলাও কেননা মশলা মিশ্রিত গোশ্ত ও চাল একইসঙ্গে দম দেয়া হয়। ঢাকার প্রত্যেক অলিগলিতে গরম গরম তেহারি বিক্রি হয়।

বায়দা পোলাও অর্থাৎ ডিম পোলাও। বায়দা আরবি শব্দের অর্থ আন্ডা বা ডিম। মাহী পোলাও মাহী ফার্সি শব্দের অর্থ মাছ। সাধারণত রুই ও ইলিশ মাছ দিয়ে পাকানো হয়। বুন্দিয়া পোলাও মটরের মতো নোনতা বা কোফতা পোলাও বা বুন্দিয়া পোলাও। বুন্দিয়া শব্দটি ফার্সি। যা দেখতে ছোটো ছোটো গোলাকার বুদ বুদ এর মতো।

শাবাত পোলাও। ফার্সি শব্দ শাবাতের অর্থ বীজ। শাবাত পোলাও মানে বীজ পোলাও। সোয়া শাকের পোলাও যা বনেদি ঢাকাইয়া পরিবারে রান্না হতো। শীতকালে ঢাকায় অনেক মহল্লায় সোয়াশাক দেখা যেতো।

হিন্দি শব্দ মালগুবার অর্থ পাঁচমিশালি। বিভিন্ন রকমের সবজির পোলাও-এর সঙ্গে গোশ্ত মেশালে মালগুবা পোলাও তৈরি হয়। এই পোলাওয়ে কয়েক প্রকারের সবজি থাকতে হবে। আর মাগরুবা পোলাও হচ্ছে ডিম-পালং শাক পোলাও।

ডিম-পালং শাক-পোলাও
ডিম-পালং শাক-পোলাও

মোতাঞ্জান রঙিন বা মিষ্টি বিরিয়ানি যা ছাগল, ভেড়া বা দুম্বার গোশ্ত দিয়ে পাক করা হয় তাকে ইরানে মোতাঞ্জান পোলাও বলে। অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের রঙিন বিরিয়ানি।

এবার আসি কাবাবে। শিক কাবাব বা ভারি কাবাব যা ঢাকায় সুতলি কাবাব বলা হয়। মোসাল্লাম মোরগ বা মুরগির সম্পূর্ণ কাবাবকে ঢাকায় মোরগা মোসাল্লাম বলে। মোরগে প্রয়োজনীয় মসলা দেয়ার পর সিদ্ধ ডিম ভিতরে পুরে সুতা পেঁচিয়ে শিকে গেঁথে ঘি মেখে ও ফোটা ফোটা ঘি দিয়ে সরাসরি আগুনের শিকায় স্যাঁকা হয়। এই মোরগা মোসাল্লামের নতুন সংস্করণ এখন চিকেন টিক্কা যা এক মুরগির চার টুকরা করে।

ঢাকার খাবারে আরো আছে কালিয়া, চিকেন রোস্ট, রেজালা, দোপিঁয়াজা, দোলমা, কোফতা, টিকিয়া আলুর দম, নানা প্রকার ভর্তা কিংবা চাটনি। টিকিয়া আকারে কয়েন বা পয়সার আকারে হয়। প্রয়োজনীয় মসলা মিশিয়ে গরুর গোস্তের বাটা কয়েন বা পয়সার আকারে তেলে ভাজা হয়। তাই টিকিয়াকে পয়সা কাবাবও বলে। কাঁচা গোশতের কোফতা, সিদ্ধ গোশতের কোফতা এবং কাঁচা ও সিদ্ধ গোশ্ত মিশিয়ে কোফতা, খাশতা কোফতা, কোফতার কালিয়া ঢাকার খাবার তালিকায় রয়েছে। ইলশার শিককাবাব। যা আদতে স্মোক্ড হিলসা। ঢাকার নিজস্ব খাবার স্মোক্ড হিলসা এখন পৃথিবীজুড়ে পাওয়া যায়।

স্মোকড হিলশা
স্মোকড হিলশা

কোরমা তুর্কি শব্দ। রেজালাহ মূলত মোরগ দিয়েই তৈরি হতো। এখন খাসির গোশ্ত দিয়েও পাক করে। কালিয়া ও দোপেঁয়াজো উভয়ই গোশতের আর মাছের পাকানো হয়। কাশ্মীরি বড়ি কিমা ভর্তি ডালের বড়া অথবা কাশ্মীরি পাকোড়া বা ফুলুরি। ভর্তা ঢাকার লোকজ খাবার। যে কোনো মাছের ভর্তা বানানো সম্ভব। সাধারণত টাবি, শৈল, চিংড়ি, বাইলা, রুই, বোয়াল ও ইলিশ প্রভৃতি মাছের ভর্তা খাওয়া হয়। মাছের ডিমের ভর্তার মধ্যে শিং, বাইলা, রুই, বোয়াল ও ইলিশ। পুঁটি আর রেওয়া মাছের শুটকি ভর্তা। গরুর তিল্লির ভর্তা। সবজি ভর্তার মধ্যে বেগুন, টমেটো, গোল আলু, ডাল, বড় শিমের ভর্তা। শাকপাতার মধ্যে ধনেপাতা, রসুন, পিয়াজ, বথুয়া, লাউ ও শিম পাতার ভর্তা।

ঢাকার আরেকটি খাবার বেগুনের রায়তা। রায়তা হিন্দি শব্দ। বেগুন, লাউ ও দই দিয়ে তৈরি খাদ্য। টমোটোর দিনে খাট্টা বানানো ঢাকায় একটি শখের খাবার। ডাল ভাত ঢাকার বিখ্যাত খাদ্য। গোশ্ত, ডিম ও কোফতার সাথে ডাল পাকানো হতো।
তন্দুর বা কাশ্মীরি নান ঢাকাবাসীর কাছে অধিক প্রিয়। আর চালের রুটি দিয়ে ছোলার ডাল বা মাংসের তো তুলনাই হয় না। তন্দুর বা পরোটার সঙ্গে মুরগির গিলা-কলিজির ভুনা এখনো বেশ তৃপ্তি দিচ্ছে সকালের নাশতায়। কেউ বা নাশতা সারেন তন্দুর বা পরোটার সঙ্গে খাসির পায়া কিংবা গরুর পায়া দিয়ে তৈরি নেহারি দিয়ে।

নাশতার জন্য কাবাব পরোটার পাশাপাশি সকাল কিংবা বিকালের নাশতাটা ঢাকাইয়ারা ডালপুরি, আলুপুরি, বাকরখানি, ফুলুড়ি, বেগুনি, ছোলাবুট, চটপটি, ফুচকা ইত্যাদি দিয়ে সারেন। তবে গরমে শরবত হিসেবে বরফকুচিসহ দইয়ের শরবত যা লাচ্ছি শরবত নামে পরিচিত, তা ঢাকাইয়াদের কাঠফাটা রোদে তৃষ্ণা মেটায়। রসগোল্লা, দইবড়া, শকরপারা, হালুয়া, বুন্দিয়া, বাদামের মিষ্টি, আমৃতি, নকুল দানা, চালকুমড়ার মুরব্বা, ছানা, সন্দেশ, বরফি, সনপাপড়ি, ফালুদা, ফিরনি, জরদা ইত্যাদি ঢাকার মিষ্টান্নের শত বছরের ঐতিহ্য।

পুরান ঢাকার ফালুদা
ফালুদা

ঢাকায় শত বছরের ইফতারি আইটেমের মধ্যে গতানুগতিক আইটেমগুলো হচ্ছে পিয়াজু, ছোলা, বেগুনি, আলুর চপ। আর এর সঙ্গে রয়েছে জালি কাবাব, শিক কাবাব, গুর্দা কাবাব, সুতি কাবাব, নার্গিস কাবাব, মাছ কাবাব, বড়ো মুরগি ভাজা, ডিমের দোপিঁয়াজা, টানা, বিফ-কিমা, কাশ্মীরি পরোটা, নান খাতাই, নান রুটি, বাকরখানি, মোগলাই পরোটা, বিফ কোপতা, ঝাল কাচুরি, শিঙাড়া, নেমকপাড়া, ফালুদা, দইবড়া, মাখনা, ক্ষীর, জরদা, শাহী হালিম, পনিরের সমুচা, দই, বম্বে জিলাপি, শাহী ফিরনি, বিভিন্ন পদের মুড়ি, মিষ্টি আর হালুয়া। এছাড়া মোরগ পোলাও, শাহী পোলাও, বুন্দিয়া পোলাও, সঙ্গে পাওয়া যায় কোরমা, রেজালা, কালিয়াসহ অর্ধ-শতাধিক পদের ইফতার আইটেম। চকবাজারের ইফতারির বিশেষ একটি আইটেমের নাম ‘বড়ো বাপের পোলায় খায়’।

চকবাজারের বিশেষ ইফতারি- বড় বাপের পোলায় খায়
চকবাজারের বিশেষ ইফতারি- বড় বাপের পোলায় খায়

মোগলাই শরবত: পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী খাবারে মোগল মোগল ভাব আছে এখনও। মূলত মোগলদের হাত ধরেই ঢাকাই খাবারে যুক্ত হয়েছে এসব আইটেম। রমজানে রোজাদারদের তৃষ্ণা মেটাতে তাই ইফতারের আইটেম হিসেবে কদর রয়েছে পুরান ঢাকার কিছু মোগলাই শরবতের। রয়েলের পেস্তাবাদামের শরবত, বিউটির লাচ্ছি, নূরানির লাচ্ছি, শাহির জুস ও আল রাজ্জাকের মাঠা অন্যতম।

লালবাগ কেল্লার পাশেই প্রায় ১৭ বছর ধরে মুগলিয় কায়দায় ‘পেস্তাবাদামের শরবত’ তৈরি করে আসছে রয়েল হোটেল। বিখ্যাত এই পেস্তাবাদামের শরবতের জন্য ভিড় লেগেই থাকে। বিশেষ করে রমজানের দিন হলে তো কথাই নেই। ঢাকার মানুষকে ভিন্ন রকম লেবুর শরবত, লাচ্ছি আর ফালুদা খাইয়ে আসছে ‘বিউটি লাচ্ছি ফালুদা’। এখানে শরবত-লাচ্ছি-ফালুদা সব হাতে বানানো হয়। রায়সাহেব বাজার মোড় থেকে একটু সামনে হাঁটলেই ছোটো একটি দোকান এটি। লালবাগ শাহি মসজিদের সামনে অবস্থিত শাহি জুস কর্নারে মিলবে জলপাই, জাম, লেবু, গাজর, কাঁচা-পাকা আম, কলা, বেদানা, গাজর, আনারস, পেঁপে, আপেল, তরমুজসহ ২২ পদের ফলের শরবত। আরেকটি ঐতিহ্যবাহী হোটেল আল রাজ্জাক তাদের মাঠা ও ফলের জুসের জন্য অনেকের পছন্দের। মাঠা, বোরহানির পাশাপাশি ফলের জুসও তাদের ক্রেতাদের চাহিদায় থাকে।

বাকরখানি: মোগল আমলের খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় বাকরখানি। ঢাকাইয়ারা ‘ছুকা রুটি’ও বলে। ঘুম থেকে উঠে গরম গরম চায়ের সঙ্গে বাকরখানিতেই নাশতা হয়ে যায় ঢাকাবাসীর। নানা আচার-ঐতিহ্যে মিলেমিশে আছে বাকরখানি। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও রাশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় বাকরখানি নামের পেছনে বাকের-খনির প্রেমের ইতিহাস নিয়ে জনশ্রুতি আছে, নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁর ছেলে আগা বাকের আর নর্তকী খনি বেগমের বিয়োগান্তক প্রেম কাহিনী। সুস্বাদু এই খাবারের কথা বলতে গিয়ে এখনো পুরান ঢাকার মানুষ আগা বাকের ও খনি বেগমের প্রেমকাহিনীর কথা স্মরণ করেন। নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর দত্তক ছেলে আগা বাকের ও রাজধানী মুর্শিদাবাদের নর্তকী খনি বেগম মধ্যে প্রেম ছিল। কিন্ত উজিরপুত্র নগর কোতোয়াল জয়নাল খান ছিল পথের কাঁটা, সে খনি বেগমকে প্রেম নিবেদন করলে তিনি জয়নাল খানকে প্রত্যাখান করেন। প্রত্যাখ্যাত হয়ে জয়নাল খনি বেগমের ক্ষতির চেষ্টা করে এবং খবর পেয়ে বাকের সেখানে যান ও তলোয়ারবাজিতে জয়নালকে হারিয়ে দেন।

বাকরখানি
বাকরখানি

অন্যদিকে জয়নালের দুই বন্ধু উজিরকে মিথ্যা খবর দেয় যে, বাকের জয়নালকে হত্যা করে লাশ গুম করেছে। উজির ছেলের হত্যার বিচার চায়। নবাব মুর্শিদ কুলী খাঁ পুত্র বাকেরকে বাঘের খাঁচায় নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। অবশেষে বাকেরের হাতে মারা যায় বাঘ। ইতিমধ্যে জয়নালের মৃত্যুর মিথ্যা খবর ফাঁস হয়ে গেছে ও সে জোর করে খনি বেগমকে ধরে নিয়ে গেছে দক্ষিণ বঙ্গে। উদ্ধার করতে যান বাকের। পিছু নেন উজির জাহান্দার খান। ছেলে জয়নাল খান বাকেরকে হত্যার চেষ্টা করলে উজির নিজের ছেলেকে হত্যা করেন তলোয়ারের আঘাতে। এই অবস্থাতে জয়নাল খনি বেগমকে তলোয়ারের আঘাতে হত্যা করে। বাকেরগঞ্জে সমাধিস্থ করা হয় খনি বেগমকে। আর বাকের সবকিছু ত্যাগ করে রয়ে গেলেন প্রিয়তমার সমাধির কাছে দক্ষিণ বঙ্গে। বাকের খাঁর নামানুসারেই বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ (পটুয়াখালী-বরিশাল) অঞ্চলের নাম হয় বাকেরগঞ্জ।

আরও পড়ুন- যেভাবে ট্রেন এলো বাংলায়

তবে প্রচলিত এই কাহিনীর সঙ্গে ইতিহাসের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায় না। লোক কাহিনীতে যেই মির্জা আগা বাকের খানের কথা বলা হয়, তিনি ঢাকার নবাব প্রথম মুর্শিদ কলি খানের নাতনি জামাই ও দ্বিতীয় মুর্শিদ কুলি খানের মেয়ে জামাই। আগা বাকেরের পুত্র আগা সাদেক ষড়যন্ত্র করে নবাব সিরাজ উদ দৌলার চাচা ঢাকার ডেপুটি গর্ভনর হোসেনউদ্দিন খানকে হত্যা করে। ঢাকার কোতয়াল মির্জা আলী নকীর নেতৃত্বে ঢাকার সকল সুন্নী জনগণ হত্যাকারী আগা সাদেকে না পেয়ে তার পিতা আগা বাকেরকে হত্যা করে। আগা বাকের এর কবর আগা সাদেক ময়দানের পূর্বদিকের একটি গলিতে অবস্থিত। ঘটনাটি ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দের। এই ঘটনায় বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলার পারিবারিক

শত বছর ধরে সগৌরবে টিকে আছে ঐতিহ্যবাহী খাবার বাকরখানি। লালবাগ কেল্লার কাছেই প্রথম বাকরখানির দোকান গড়ে উঠেছিল। তা থেকেই পুরান ঢাকার সব এলাকায় বিভিন্ন আকৃতি ও স্বাদের বাকরখানি দোকান। কাবাব বাকরখানি, চিনি বাকরখানি, ছানা বাকরখানি, খাস্তা বাকরখানি, নোনতা বাকরখানি, পনির বাকরখানি, নারকেল বাকরখানি, ঘিয়ের বাকরখানি, মাংসের বাকরখানিসহ অসংখ্য পদ। বাকরখানি ময়দা দিয়ে তৈরি রুটি জাতীয় খাবার বিশেষ। ঢাকাবাসীদের সকালের নাস্তা হিসাবে একটি অতি প্রিয় খাবার। ময়দার খামির থেকে রুটি বানিয়ে তা মচমচে বা খাস্তা করে ভেজে বাকরখানি তৈরি করা হয়। ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের বাকরখানি পাওয়া যায়। বাকরখানি সাধারণত গম, দুধ, লবণ, চিনি, ডালডা, ঘি, পনির এবং খামির দিয়ে তৈরি করা হয়। রুটিটি তাওয়া দেয়ার পূর্বে বেলন দিয়ে কিছুটা চ্যপ্টা ও প্রসারিত করা হয়। তারপর ঘি, গুড়, জাফরান, পোস্ত বা নিগেল্লার বীজ ইত্যাদি দিয়ে তাওয়া বা তন্দুরে সেঁকে নেয়া হয়।

এম মামুন হোসেন, সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

ঢাকার ইতিহাস নির্ভর উল্লেখযোগ্য বইগুলো দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading