একটি ছোট ব্যাকটেরিয়া ও কিছু মশাকে ধন্যবাদ: বিল গেটস

0001-8398896025_20210922_135259_0000

বিল গেটস: যখন মানুষ হত্যার প্রসঙ্গ আসে- হাঙর, সাপ, কুমির কিংবা অন্য যে কোনো প্রাণী হয়তো এখনো এতটা মরণঘাতী হয়ে ওঠেনি যতটা না মরণঘাতী হয়ে উঠেছে একটি ক্ষুদ্রাকার প্রানী, মশা। তবে বর্তমানে ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে সেই মশাকেই আবার একধরণের উপকারী সহযোগী হিসেবে রুপান্তর করা গেছে যা জীবন বাঁচাতে এবং পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে সহায়ক।

ডেঙ্গু একধরণের ভাইরাস জ্বর যা এডিস এইজেপটাই  মশার কামড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। তীব্র যন্ত্রণার কারণে ডেঙ্গুকে “হাড়ভাঙ্গা জ্বর-ও বলা হয়ে থাকে। প্রতি বছর সারা বিশ্বে ৪০ কোটি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় ২০ কোটিরও বেশী মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে, তার ফলে মশার ভৌগলিক বিস্তারও বেড়ে চলেছে দিন দিন, যা বিগত বছরগুলোতে ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

ওয়ার্ল্ড মসকিউটো প্রোগ্রাম- এর বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই একটি যুগান্তকারী বিষয় নিয়ে গবেষণা করে আসছেন যা বিস্ময়করভাবে ডেঙ্গুকে পরাজিত করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই যুগান্তকারী গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে “ওলবাকিয়া” নামক একটি ছোট ব্যাকটেরিয়া ও এডিস এইজেপটাই  মশাকে সামনে রেখে ।

BUY NOW

ওলবাকিয়া খুব পরিচিত একটি অক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া যা প্রায় ৬০ ভাগ পোকামাকড়ের মধ্যেই পাওয়া যায় যেমন, ফলের মাছি, পশম পোকা, প্রজাপতি, মোমাছি ইত্যাদি। কিন্তু এই নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াটি এডিস এইজেপটাই  মশাতে থাকেনা।

এক দশকেরও বেশি সময় আগে গবেষকরা ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া সম্মন্ধে একটি আশ্চর্যজনক তথ্য উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। তারা জানতে পারেন এই ব্যাকটেরিয়াটি যদি কোনোভাবে এডিস এইজেপটাই  মশার মধ্যে অনুপ্রবেশ করানো যায় তাহলে এটি মশার মধ্যে ডেঙ্গু ভাইরাস উৎপাদনে বিঘ্ন তৈরি করতে আশ্চর্যজনকভাবে সক্ষম হয়। গবেষকরা আরও উদ্ভাবন করেন যে, ওলবাকিয়া  ব্যাকটেরিয়াটি  মশাদের সংস্পর্শে আসলে খুব দ্রুত মশাদের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে এবং এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্ম এভাবে বংশানুক্রমে ডেঙ্গু ভাইরাস  উৎপাদনের ধারা বন্ধ করে দিতে পারে ।

এসব ধারণার প্রাথমিক গবেষণা ইতোমধ্যেই ল্যাবে সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিলো। এর পরে পরবর্তী ধাপে শুধু জানা বাকি ছিলো এই ধারণাটি বাস্তব পরিবেশে আসলেই কার্যকরী হবে কী না। যদি ওলবাকিয়া  সমৃদ্ধ মশাদের কোনো মশা কমিউনিটিতে অবমুক্ত করা যায় তাহলে কি তা আদৌ ডেঙ্গু ভাইরাস নির্মুলে কাজ করবে?

এটিই ছিল ওয়ার্ল্ড মসকিউটো প্রোগ্রাম- এর ডেঙ্গু এবং মশাবাহিত অন্যান্য রোগ নির্মুলে একটি অলাভজনক গবেষণা যা ইন্দোনেশিয়ার ইয়োগ্যাকার্তায় চলে আসছে। (আমাদের প্রতিষ্ঠান এই গবেষণাকর্মের একটি গর্বিত অংশীদার। ২০১৪ সালে আমি ইয়োগ্যাকার্তায় গিয়ছিলাম এবং কিছু ওলবাকিয়া  মশাকে খাওয়াতে সাহায্য করেছিলাম)

পরবর্তীতে এই গবেষণার একটি র‍্যান্ডম ট্রায়ালের অংশ হিসেবে ইয়োগ্যাকার্তা শহরের বেশ কিছু অংশে ওলবাকিয়া  মশাদের অবমুক্ত করা হয়। বলে রাখা ভালো ইয়োগ্যাকার্তা তখন ডেঙ্গু ঝুঁকিতে দেশটির শীর্ষ শহরগুলোর একটি।

যাই হোক, মানুষের বসতবাড়ির আশেপাশে এভাবে কর্মসূচী চালিয়ে মশা ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারটি অবশ্যই অপ্রচলিত এবং একরকম রীতিবিরুদ্ধ ঘটনা ছিলো। তাই, এক্ষেত্রে নাগরিকদের বিশ্বাস অর্জনের জন্য গবেষকরাও মাঠপর্যায়ে কর্মীদের সাথে কাজ করেছে, শহরের হাজার মানুষের সাথে দেখা করে কথা বলেছে এবং তাদের প্রশ্ন ও উৎকণ্ঠাগুলো চিহ্নিত করেছে।

এই গণপ্রচার সফলভাবে সম্পন্ন করতে বছরখানেক সময় লেগে গিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত গিয়ে ট্রায়ালটি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছিলো।

পরবর্তীতে জুন মাসে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন  তাদের সংখ্যায় এই গবেষণার ট্রায়ালের ফলাফল প্রকাশ করে, যেখানে দেখানো হয় ওলবাকিয়া  ব্যাকটেরিয়া বহনকারী মশাগুলো ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭ ভাগ পর্যন্ত এবং ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগির সংখ্যা ৮৬ ভাগ পর্যন্ত নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।

বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে যেসব স্থানে ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ, সেসব জায়গায় ওয়ার্ল্ড মসকিউটো প্রোগ্রাম- এখন এই প্রচেষ্টাকে ছড়িয়ে দেবার জন্য কাজ করে যাচ্ছে যেমনঃ শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, কলোম্বিয়া, মেক্সিকো, অস্ট্রেলিয়া ও ফিজি। ধারণা করা হচ্ছে এই পদ্ধতিটি শুধু ডেঙ্গু প্রকোপ কমাতেই কার্যকরী হবেনা বরং অন্যান্য এডিস মশাবাহিত ভাইরাস রোগ যেমনঃ জিকা, ইয়োলো ফেভার ইত্যাদি রোগ প্রতিরোধ করতেও কার্যকর হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে ওয়ার্ল্ড মসকিউটো প্রোগ্রাম – এর এই কর্মসূচী বাস্তবায়ন হলে এর সম্ভাব্য ইতিবাচক ফলাফল কী হতে যাচ্ছে তা এখনই খুব বাড়িয়ে বলা কষ্টসাধ্য। তবে প্রত্যাশা করা হচ্ছে প্রতিটি ডলার যা এই প্রচেষ্টার পেছনে খরচ হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে তার প্রায় ৪ গুণ প্রতিদান আকারেই আবার ফেরত আসবে। বেঁচে যাবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতিবছরের বিলিয়ন ডলারের খরচ, আর অনেকাংশেই  কমে আসবে মানুষের অসুস্থতার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন কর্মঘণ্টার অপচয় ।

আমি আশা করছি, সামনের বছরগুলোতে এই অসাধারণ প্রজেক্টটির ব্যাপারে আমি আপনাদের আরো অগ্রগতির খবর প্রদান করতে পারবো।

বিল গেটসের লেখা বইগুলো সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading