চুকনগর জেনোসাইড: মুক্তিযুদ্ধের সর্ববৃহৎ গণহত্যা

chuknagar genoside.jpg cover

২০ মে ১৯৭১

সকাল দশটা

সকাল থেকে চুকনগর বাজার বেশ কর্মব্যস্ত। বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষজন অপেক্ষা করছে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার জন্য। কেউ জীবন বাঁচানোর তাগিদে আর কেউবা নিজের জীবন বাজি রেখে দেশমাতৃকাকে পাকিস্তানিদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। মে মাসের শুরু থেকে বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ডুমুরিয়া, ফুলতলা, তেরখাদা, দিঘলিয়া, দৌলতপুর-সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে চুকনগর বাজার ও আশপাশের গ্রামগুলোতে। ১৫ তারিখের পর চুকনগর হাইস্কুল, ডাকবাংলো বাজারের চাঁদনী, বটতলা মন্দির, গরুহাট, ফুটবল মাঠে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। মানুষ আর মানুষ। সবাই সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার জন্য জড়ো হয়েছে।

চুকনগর গণহত্যা
চুকনগর গণহত্যা’র একটি মর্মান্তিক দৃশ্য

চুকনগর বাজার এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ । কেননা, তিন দিকে নদী ঘেরা এই চুকনগর থেকে ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারলেই ভারত। আর চুকনগর একই সাথে যশোর, খুলনা এবং সাতক্ষীরার সংযোগস্থল, তাই অতি সহজেই এই স্থানটি সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে। নৌকা থেকে নেমে অনেকে বিশ্রাম সেরে নিচ্ছে। কেউবা বাজার থেকে সদাই কিনছে। হালকা চিড়া-মুড়ি চিবাচ্ছে কেউ। একটু পরেই নতুন এক যাত্রা। ভিনদেশে পাড়ি জমাতে হবে। দেশ কবে স্বাধীন হবে আর কবে দেশে ফিরে আসা যাবে কেউ জানে না।

আনুমানিক বেলা দশটার দিকে যশোর এবং সাতক্ষীরা সাব-ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর দুই-তিনটি গাড়ি এসে থামলো পোতোখোলা বিলের পাশে। তাদের কাছে আছে হালকা মেশিনগান ও সেমি অটোমেটিক রাইফেল। কর্মব্যস্ত চুকনগর হঠাৎ করে কেমন যে  সুনসান হয়ে গেল। নীরবতার ভিতর চিৎকার করে ওঠে খাকি উর্দি পরা কোন এক পাকিস্তানি অফিসার, উড়া দো, জ্বালা দো, তাবা করদো। মুহুর্মুহু ছুটতে থাকে বুলেট। রচিত হয় বিশ্বের কোনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ একক গণহত্যা।

বিকাল তিনটা

লোকে লোকারণ্য হয়ে থাকা চুকনগর এখন লাশের স্তূপ। স্থানীয় রাজাকার আলবদরের নেতারা চুকনগর বাজার সম্পর্কে জেনে খুব দ্রুত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে অবগত করেছিল। এই নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালানোর সময় রাজাকার ও আলবদর বাহিনী যোগ দেয় পাক হানাদারদের সাথে। চুকনগরে জড়ো হওয়া নিরস্ত্র মানুষরা দিগ্বিদিক ছুটেও নিজেদের রক্ষা করতে পারেননি। তারা রাস্তাঘাট চিনতেন না। মৃত্যুক্ষণ গণনা ছাড়া ভিন্ন কোনও পথ তাদের সামনে ছিল না।

চুকনগরে গণহত্যায় ঠিক কত বাঙালি শহীদ হয়েছিলেন এর সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও  ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। আটলিয়া ইউনিয়নের পাতাখোলার বিল থেকে ভদ্রা নদী এবং সাতক্ষীরা রোড থেকে ঘ্যাংরাইল নদী পর্যন্ত যতদূর দেখা যায় শুধু লাশ আর লাশ ছিল। ২০ তারিখের পর ২৪ তারিখ পর্যন্ত টানা চারদিন লাশ সরানোর কাজে ব্যস্ত ছিল ৪২ জনের একটি দল!

ইতিহাসে সর্ববৃহৎ একক গণহত্যা

 মোহাম্মদ . আরাফাত একটি প্রবন্ধে দাবি করেন চুকনগর গনহত্যা বিশ্বের কোনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ একক গণহত্যা। তিনি লিখেন, “পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর গণহত্যার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যতিক্রমী নাম ‘চুকনগর’। এই গণহত্যা ব্যতিক্রম ভয়াবহতায় এবং নৃশংসতায়। যে নৃশংসতা আজও প্রতিমুহূর্তে তাড়া করে বেড়ায় চুকনগরবাসীকে। গণহত্যাটি ১৯৭১ সালের ২০ মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে ঘটে, যা বিশ্বের কোনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ একক গণহত্যা।”

চুকনগর গণহত্যায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন
এই গণহত্যায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের উদাহরণ টেনে তিনি লিখেন, “ভিয়েতনাম যুদ্ধে একসাথে কয়েকশ’ মানুষ হত্যার বিষয়টি অনেক বড় গণহত্যা হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃত, যা চুকনগরের হত্যাকাণ্ডের তুলনায় নগণ্য!”

সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর স্থানীয়দের শত শত লাশ মাটি চাপা দিতে হয়েছিল সেদিন।

প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য

 ড.মুনতাসীর মামুন,  “চুকনগর গণহত্যা” প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান সংকলিত করেছেন। সেখান থেকে পাঁচজন প্রত্যক্ষদর্শীর নিচে তুুুলে দিচ্ছি।

 . সুরেন্দ্রণাথ বৈরাগী

 “চুকনগর পৌঁছানোর পর যে যার মতো খাবারের আয়োজন করছিল। আমরাও চুলায় ভাত বসিয়ে দিলাম। ভাত একটু হয়ে এসেছে, এমন সময় গুলির শব্দ। ভাত আর খাওয়া হলো না। যে যেদিকে পারে জীবন বাঁচাতে ছুটতে লাগলো। গোলাগুলি থেমে যাওয়ার পর আমার স্ত্রী এসে জানালো যে আমার ছোট ভাই (শিবপদ বৈরাগী) কে হত্যা করেছে পাকবাহিনী। সেদিন আমি অল্পের জন্য বেঁচে গেছি। ”

. আনসার আলী যাকের

 আমার বাড়ী চুকনগর। চুকনগর থেকে ইন্ডিয়া যাওয়া সহজ বলে অনেক মানুষ চুকনগর এসেছিল। আনুমানিক ৮-১০ টার দিক থেকে সাতক্ষীরার দিক থেকে একটি ট্রাক ও একটি জিপে করে পাক বাহিনীর সদস্যরা বাজারে এসে নামে। নেমে সেখান থেকে ফায়ারিং করতে করতে পাতখোলার ভিতর দিয়ে আমাদের বাড়ির কাছাকাছি চলে আসে। আমরা তখন ভয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। সন্ধ্যার দিকে সৈন্যরা চলে যাওয়ার পর আমরা বাড়ি ফিরে আসি। বাড়ি ফিরে বাইরে অনেক মরা মানুষ দেখে সারারাত আর বের হই না। পরদিন ওহাব মাষ্টার মেম্বার আমাদের লাশ ফেলার জন্য ডাকে। আমরা ৪২ জন ২১টি বাঁশ করে লাশ ঠেলে নদীতে ফেললাম। প্রতিবার আমরা ২০০টি লাশ ফেলেছি। প্রথম কিছুক্ষণ ২০০ করে লাশ ফেলেছি, পরে আর গুনতে পারিনি। ভোর ৪টা থেকে বিকাল ৪টা পন্ত লাশ ফেলেছি। তারপর আর শক্তিতে কুলায় নাই”

. শ্রীমতি আনারতি

 “হঠাৎ শুনলাম গুলির শব্দ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গুলি করছে। আমরা কিছুটা দূরে গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। সেখানেও গুলি এসে আঘাত করছিল। আমাদের পাশেই দুজনের গুলি লাগে, তারা ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে। আমার দু মেয়ের গায়ে গুলি লাগে। একজনের পিঠে, অন্যজনের পায়ে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী চলে গেলে আহত মেয়েদের নিয়ে এক বাড়িতে রাতের জন্য আশ্রয় নেই। আমার একটি মেয়ে পঙ্গু হয়ে গেছে। ”

বধ্যভূমি
চুকনগর বধ্যভূমি

.  সরস্বতী মণ্ডল

“বেলা এগেোটার দিকে নৌকা থেকে আমরা চুকরগর নামলাম। আমাদের বলা হলো কলারোয়া, ঝাউডাঙ্গায় পাকবাহিনী গোলাগুলি করছে। আমরা যেন এখানে বেশি দেরি না করি। চিড়া-মুড়ি কিছু একটা মুখে দিয়েই যেন ওপারে চলে যাই।

কিছু মুখে দেবার সুযোগ আর পেলাম না, হঠাৎ শুনলাম পাকবহিনী গুলি করছে। স্বামী-সন্তানসহ কাছের একটি পুকুরে আত্মগোপন করে রইলাম। আমার স্বামীকে শাড়ির আচঁলে লুকিয়ে রাখলাম। পাকবাহিনী বন্দুকের নল দিয়ে মাথার কাপড় সরিয়ে আমার স্বামীকে গুলি করে।”

. ব্রজবাসী গাইন

“আমরা ভারত যাওয়ার উদ্দেশ্যে চুকনগরে এসে উপস্থিত হই নৌকায় করে। বেলা ১০টা কি ১১টার দিকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এসে হাজির হয়। ৪/৫ জন পাক সৈন্য গুলি করতে শুরু করে। গোলাগুলির সময় আমার স্বামী, শ্বশুরসহ দুই দাদা শ্বশুর, দাদা শ্বশুরের এক ছেলে মারা যায়। আমি কোনরকম জীবন নিয়ে ভারত চলে যাই।”

নরকীয় হত্যাযজ্ঞ

চুকনগর গণহত্যা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক ফজলুল বারী জনকণ্ঠের এক নিবন্ধে লিখেছিলেন-

‘লাশের উপর লাশ, মায়ের কোলে শিশুর লাশ, স্বামীকে বাঁচাতে স্ত্রী জড়িয়ে ধরেছিল। বাবা মেয়েকে বাঁচাতে জড়িয়ে ধরেছিল। মুহূর্তে সবাই লাশ হয়ে যায়। ভদ্রা নদীর পানিতে বয় রক্তের বহর, ভদ্রা নদী হয়ে যায় লাশের নদী। কয়েক ঘণ্টা পর যখন পাকিস্তানিদের গুলির মজুত ফুরিয়ে যায় তখন বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছিল মানুষগুলোকে।’

অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী লিখেন, “অনেক শিশু মায়ের বুকের দুধ খাচ্ছিলো, সেই অবস্থায় চলে ঘাতকের কামান। ঘাতকের বুলেট বুকে বিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন মা, কিন্তু অবুঝ শিশু তখনও অবলীলায় মায়ের স্তন মুখে নিয়ে ক্ষুধা মেটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছে।”

চুকনগর জেনোসাইড

যখন ঘোষণা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে চাওয়া হয় তখন সেটি জেনোসাইড বলে বিবেচিত হয়। জেনোসাইডের প্রকৃত সংজ্ঞায় চুকনগর একটি বড় উদাহরণ। চুকনগরের আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করতো। তাই শুরুর দিকেই এই এলাকা রাজাকার আলবদরদের টার্গেটে পরিণত হয়। বাংলাদেশের আর কোথাও যেহেতু এক এলাকায় এত হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস নেই তাই তাদের একক দৃষ্টি পড়ে এই  অঞ্চলে।

এ হত্যাকাণ্ডে সর্বাধিক মৃত্যুবরণ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা, যারা পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশত্যাগের চেষ্টা করেছিল।

একাধিক গবেষক দল, সাংবাদিক, অনুসন্ধান ও গণহত্যা পর্যবেক্ষক পরবর্তীকালে বিস্তারিত বিবরণ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেন চুকনগর গণহত্যার। প্রতিটি অনুসন্ধানে লোমহর্ষক নৃশংসতার বিবরণ মেলে। চুকনগরে মৃত ও আহতের সংখ্যা যদিও অনেক বেশি তবুও সে বিবরণ এতটাই হৃদয়বিদারক যে চুকনগরের গণহত্যাকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হাতে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সহজেই তুলনা করা চলে।

চুকনগর গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভ

 এই ঐতিহাসিক স্থানটি হয়তো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যেত। কিন্তু তা হয়নি, এই অপ্রকাশিত ইতিহাসকে স্মরণ রাখতে ১৯৯৩ সালে গঠিত হয় ‘চুকনগর গণহত্যা ৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ’। সেই সময় থেকে চুকনগর গণহত্যা দিবস ধীরে ধীরে মানুষ জানতে শুরু করে। ২০০৪ সালে গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য সরকার চুকনগর গ্রামের বিলের ৭৮ শতক জমি অধিগ্রহণ করে। এরপর গণপূর্ত বিভাগ ২০০৬ সালে ওই জমির একাংশে ‘চুকনগর গণহত্যা স্মৃতিস্তম্ভ’ নির্মাণ করে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা তরুণ প্রজন্মের অনেকেই বাংলাদেশের ইতিহাসের ভয়াবহ এই গনহত্যা সম্পর্কে এখনও জানি না।

তথ্যসূত্র :

১. চুকনগর গণহত্যা

২.গণহত্যা ও বধ্যভূমি ৭১ (১ম খণ্ড) 

—  হাসান ইনাম

    চুকনগর গণহত্যা সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুন

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading