নন্দিত-নিন্দিত ঢাকার নবাব পরিবার

Nawab family of dhaka

প্রাচীন স্থাপনাসমূহ সভ্যতার অন্যতম সাক্ষী। এ সমস্ত স্থাপনাসমূহ জনপদ এবং জনমানুষের স্মৃতির ধারক-বাহক হয়ে নিরবে ইতিহাসের উপাদান হয়ে রয়। রোম নিয়ে কথা বলতে গেলে যেমন কলোসিয়ামের কথা চলে আসে, মিশর নিয়ে কথা বললে পিরামিড। ঠিক তেমনি ঢাকা নিয়ে কথা বললে লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিলের কথা বলতেই হয়। তুলনাটা একটু বেখাপ্পা মনে হলেও চারশত বছর বয়সের এই নগরের জন্য এগুলোই প্রাচীন নিদর্শন। ছোট কাটরা, বড়কাটরা, তারা মসজিদসহ অন্য প্রাচীন স্থাপনা নিয়ে এত চর্চা হয় না যতটা হয় লালবাগ কেল্লা আর আহসান মঞ্জিল নিয়ে হয়। আর এ সমস্ত কিছু নিয়ে কথা এগুতে চাইলে ঢাকার নবাব পরিবার এর কথা উঠে আসবেই।

কিন্তু আহসান মঞ্জিলের নবাবেরা কতটুকু ঢাকার বা সবার নবাব ছিল সেটাই প্রশ্ন। আগে রাষ্ট্র পরিচালনা হত রাজপ্রাসাদ থেকে। বৃটিশ ভারতে রাজা আর রাজপ্রাসাদে ক্ষমতা না থাকলেও অনেক জমিদার, ভূস্বামীরা ইংরেজদের তাবেদারি করে বিপুল ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিলেন। আহসান মঞ্জিলও ছিল তেমনি একটি রাজ্যহীন রাজপ্রাসাদ। তাই চাইলেও ঢাকার ইতিহাস কোনোভাবেই আহসান মঞ্জিল ও ঢাকার নবাবদের বাদ দিয়ে লেখা সম্ভব না।

উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে এ শতকের দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত ঢাকায় তো বটেই পূর্ববঙ্গেও প্রভাব বিস্তার করেছিল আহসান মঞ্জিল। ড.মুনতাসীর মামুন তার “ঢাকা : স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী” গ্রন্থে লিখেছেন, “ঢাকা শহরে, পূর্ববঙ্গের জমিদার ও ইংরেজ সৃষ্ট এই নবাব পরিবারের আভিজাত্য, বৈভব ও প্রভাবের প্রতীক ছিল এই অট্টালিকা।

অলি মিয়ার রংমহল

১৮৪২ সালের আগ পর্যন্তও আহসান মঞ্জিল “অলি মিয়ার রংমহল” নামে পরিচিত ছিল।

আহসান মঞ্জিল নবাবদের হাতে গড়া কোনো প্রাসাদ ছিল না। নবাবদের আদি পিতা আলিমুল্লাহ ১৮৩৫ মতান্তরে ১৮৩৮ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে ফরাসি কুঠিয়ালদের কাছ থেকে বাড়িটি কিনেছিলেন। ফরাসিরাও এই বাড়ির মূল মালিক ছিল না। এই বাড়ি তারা কিনেছিলেন ফরিদপুরের জালালদির জমিদার শেখ এনায়েতুল্লার ছেলে মুতিউল্লার কাছ থেকে।

পুরান ঢাকা'র বিখ্যাত আহসান মঞ্জিল
ঢাকা’র বিখ্যাত আহসান মঞ্জিল।

আলিমুল্লাহ বা অলি মিয়া ঢাকায় এই পরিবারের গোড়াপত্তন করেছিলেন। তবে ‘নবাব’ উপাধি তিনি পাননি। পেয়েছিলেন তার পুত্র খাজা আবদুল গনি, বৃটিশ সরকারের কাছ থেকে। এই খেতাব বংশানুক্রমিকভাবে ব্যবহারের অধিকারও দেয় সরকার। ঐ সময় থেকেই এই পরিবার ঢাকায় নবাব পরিবার নামে পরিচিত।

১৮৪২ সালে বাড়িটিকে প্রায় পুননির্মাণ করেন নবাব আবদুল গনি। পুননির্মাণের পর নিজের ছেলে নামে নামকরণ করেন “আহসান মঞ্জিল”।

ঢাকার কাগুজে নবাব

ড.মুনতাসীর মামুনহৃদয়নাথের ঢাকা শহর’ গ্রন্থে ঢাকার নবাবদের প্রসঙ্গে  লিখেছেন, “ আখতারুজ্জান ইলিয়াস তাঁর এক প্রবন্ধে, ঢাকার নবাবদের উল্লেখ করেছেন কাগুজে নবাব হিসেবে। হয়তো একসময় ঢাকার খানদানি পরিবারের লোকজন (মোঘল আমলে বসতি স্থাপনকারী অভিজাতরা) তাচ্ছিল্যভরে এই নামই ব্যবহার করতেন। কারণ, ঢাকার আদি বা খানদানি নবাবপরিবার ছিল নিমতলি কুঠির নায়েবে-নাজিমরা, যে-বংশের শেষ উত্তরাধিকারীর মুত্যু হয়েছিল ১৮৪৩ সালে।”

সিপাহী বিদ্রোহ এবং নবাব পরিবারের বিশ্বাসঘাতকতা

ঢাকার অন্যতম আরেকটি প্রাচীন নিদর্শন লালবাগ কেল্লা। সিপাহী বিদ্রোহের সময় এখানে ব্যারাক ছিল দেশী সিপাহীদের। স্বল্প কয়েক সিপাহীদের ভোরের আলো ফেটার আগে কীভাবে নিধন করা হয়েছিল সে ইতিহাস আমাদের অনেকেরই জানা। কিন্তু আমরা অনেকে এটা জানি না যে, ঢাকার সিপাহীদের নিধন করার পিছনে সবথেকে বড় হাত ছিল নবাব পরিবারের।

১৮৫৭ সনে সিপাহী বিদ্রোহের সময় ঢাকার নবাব পরিবার ইংরেজ সরকারের নজরে সর্বপ্রথম আসে। খাজা আবদুল গনি ইংরেজ সরকারকে সাহায্য করেন। এতটাই প্রত্যক্ষ ভাবে সাহায্য করেন যে, বাংলার শাসক হ্যালিডে তার রিপোর্টে বিশেষভাবে আবদুল গনির নাম উল্লেখ করেছিলেন। ইংরেজ প্রশাসক বাকল্যান্ড লিখেছেন, ওই সময় আবদুল গনি বলেন- “এই সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে আমার উপস্থিতি সরকারকে সাহস যোগাবে।” আবদুল গনি সরকারি কোষাগারে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছিলেন। হাতি, ঘোড়া, নৌকা সবকিছু দিয়ে সাহায্য করেছিলেন সিপাহীদের দমন করার জন্য।

ঢাকা'র বিখ্যাত লালবাগ কেল্লা
সিপাহী বিদ্রোহের সময় লালবাগ কেল্লায় ব্যারাক ছিল দেশী সিপাহীদের।

লালবাগ কেল্লায় ঘুমন্ত সিপাহীদের আক্রমণ করে পরাস্ত করার পেছনেও আবদুল গনি এবং তার স্ত্রী’র ষড়যন্ত্র ছিল বলে জনশ্রুতি আছে। শোনা যায়, সুবাদারের স্ত্রী নবাবের স্ত্রীর কাছে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল হয়তো সিপাহীরা বিদ্রোহ করবে।’ নবাবের স্ত্রী এই তথ্য নবাবকে জানানো মাত্রই নবাব কালবিলম্ব না করে ইংরেজদের অবহিত করে। সেই রাতেই ঘিরে ফেলা হয় লালবাগ কেল্লা।

ঢাকা প্রকাশ  পত্রিকার তখনকার একটি সংবাদ লিপিবদ্ধ আছে ঢাকা সমগ্র-১ –এ খাজে আবদুল গনি, ইংরাজ গভর্ণমেন্টেরও বিশেষ সাহায্যকারী ছিলেন সিপাহী বিদ্রোহের সময় উন্মত্ত সিপাহীগণ আবদুল গনিকে বাঙ্গালার রাজত্ব প্রদানের প্রলোভন দিয়াছিল এবং তাহাদের সাহায্য না করিলে ভয়েরও সম্ভাবনা জানাইয়াছিল কিন্তু আবদুল গনি বাহাদুর তাহাদের প্রলোভনে না ভুলিয়া ভয়েও দৃকপাত না করিয়া তাহাদের দুরভিসন্ধি  গভর্ণমেন্টকে জানাইয়াছিলেন

 

 বৃটিশ সরকারের আস্থাভাজন পরিবার

১৮৬০ সনে তাজিয়া মিছিলকে কেন্দ্র করে ঢাকায় শিয়া-সুন্নিদের দাঙ্গা হয়েছিল।  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক প্রবন্ধে লিখেছেন ‘সরকার পর্যন্ত ঐ দাঙ্গা রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তখন আবদুল গনি নিজ প্রচেষ্টায় মাত্র তিনদিনের মধ্যে শান্ত করে তুলেছিলেন ঢাকা শহরকে। এবং সরকার তখন তাকে সি.এস.আই (কোম্পানিয়ন অফ দি অর্ডার অফ দি স্টার অফ ইন্ডিয়া) উপাধি দিয়েছিল। ১৮৬৭ সালে ভাইসরয় তাকে মনোনীত করেছিলেন আইন পরিষদের সদস্য হিসাবে। ১৮৭৫ সালে তাঁকে বংশানুক্রমিক নবাব উপাধি দেয়া হয়েছিল।”

নবাব পরিবারের নিজস্ব ওয়েবসাইটে নিজেদের পরিচয় এভাবেই দেয়া।

ঢাকার নবাব ছিলো ব্রিটিশ বাংলার সবচেয়ে বড় মুসলিম জমিদার পরিবার। সিপাহী বিপ্লবের সময় ব্রিটিশদের প্রতি বিশ্বস্ততার জন্য ব্রিটিশ রাজ এই পরিবারকে নবাব উপাধিতে ভূষিত করে”

নবাব আবদুল গনির পুত্র ছিলেন নবাব আহসান উল্লাহ। ১৮৭৭ সালে নবাব আবদুল গনি খাজা পরিবারের কর্তৃত্বভার নবাব আহসান উল্লাহর কাধেঁ অর্পন করেন। ঢাকার রাস্তায় সর্বপ্রথম বিজলি বাতি জ্বলে নবাব আহসান উল্লাহর অনুদানে। ঢাকার নাগরিক উন্নয়নে নবাবদের ভূমিকা অনেক। নবাব আহসান উল্লাহর পুত্র ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ।

নবাব স্যার সলিমুল্লাহ
নবাব আহসান উল্লাহর পুত্র ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহ।

নবাব সলিমুল্লাহর পিতা এবং পিতামহ কতটুকু জনগণের নবাব হয়ে উঠতে পেরেছিলেন সেটা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তিনি যে জনমানুষের নেতা হয়ে উঠেছিলেন সেটা নিয়ে কারো কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়। নবাব সলিমুল্লাহ ও তাঁর সময় নিয়ে অনেকেই লিখেছেন।

১৯০৩ সালে বড় লাট লর্ড কার্জন ঢাকা সফরে এলে নবাব সলিমুল্লাহ পূর্ব বাংলার সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। লর্ড কার্জন এবং লেডি কার্জন আহসান মঞ্জিলের অতিথেয়তা গ্রহণ করেন।

ঢাকার নাগরিক উন্নয়নে নবাবদের ভূমিকা

নবাব সলিমুল্লাহ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। যদিও তিনি জীবদ্দশায় এই বিশ্ববিদ্যালয় দেখে যেতে পারেননি। ১৯১৫ সালে নবাব সলিসুল্লাহ মৃত্যু বরণ করেন। শোনা যায়, নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের জমিও দান করেছিলেন। তবে, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ: অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা“ গ্রন্থে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আলাপচারিতায় জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নবাব সলিমুল্লাহ নিজের জমি দান করেছেন বলে আমরা যেটা শুনি সেটা প্রকৃতপক্ষে একটি শ্রুতি বা মিথ। তখন দান করার মতো জমি নবাব পরিবারের ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মূলত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সরকারি খাসজমিতে।

তবে, নবাব সলিমুল্লাহর দান করা জমিতে প্রতিষ্ঠিত বুয়েট। ১৯০২ সালে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠায় তিনি তার পিতার দেয়া পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুসারে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা দান করেন। ১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহ আরও অর্থ দান করে পিতার নামে স্কুলটির নামকরণ করেন ‘আহসানউল্লাহ স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিং।’

১৯৪৭ সালের পর স্কুলটি কলেজে উন্নীত হয়। মুসলিম লীগ সরকার ১৯৬২ সালে কলেজটির উন্নয়ন করে প্রতিষ্ঠা করে পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় যা ছিল তদানীন্তন প্রদেশের প্রথম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

স্বাধীনতার পর এটির নামকরণ করা হয়েছে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বুয়েট)।

খাজা নজিমুদ্দিন ও ভাষা আন্দোলন

পরবর্তীতে নবাব পরিবারের সদস্যরা রাজনীতিতে আসতে শুরু করেন। অনেকেই উপমহাদেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। এদের উল্লেখযোগ্য একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন।

১৯২২ সাল থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা মিউনিসিপালটির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।  প্রাদেশিক রাজনীতিতে নাজিমুদ্দিন প্রথমে বাংলার শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন, ১৯৪৩ সালে তিনি প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। পাকিস্তান গঠনের পর নাজিমুদ্দিন সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেন। মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর মৃত্যুর পর তিনি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হন। এসময় পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক ছিল এবং নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত ছিল। পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান ১৯৫১ সালে আততায়ীর হাতে নিহত হন। এরপর খাজা নাজিমুদ্দিন তার স্থলাভিষিক্ত হন।

১৯৫২ সালে ভাষার জন্য যখন আন্দোলন হচ্ছে তখন পাকিস্তানের মসনদে ঢাকার সন্তান খাজা নাজিমুদ্দিন। উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়ে তিনি সমালোচিত ও নিন্দিত হন।

 শিল্পসাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক নবাব পরিবার

কখনও নিন্দিত, কখনও নন্দিত হয়ে নবাব পরিবার দীর্ঘদিন এই জনপদের আলোচনার খোরাক হয়ে ছিল। ঢাকার সংস্কৃতি বিকাশেও অবদান ছিল এই পরিবারের। শিল্পসাহিত্যের পৃষ্ঠপোকতা করেছেন এই পরিবারের অনেকেই।

পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ” গ্রন্থে সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, শ্রেণিগত ও সামাজিক অবস্থানের কারণে ঢাকার নবাব ও কলকাতার জমিদার ঠাকুরদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকার কথা। কলকাতায় নবাবদের কয়েকটি বাড়ি ছিল। হয়তো দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যাতায়াত ছিল।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল প্রাপ্তির পর নবাব সলিমুল্লাহ ঢাকায় একটি অভিনন্দন সভার আয়োজন করেন।  কেবল পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বইয়ে ঘটনাটির উল্লেখ বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়। সৈয়দ মকসুদ লিখেন, ঢাকার জজকোর্ট প্রাঙ্গণে বার লাইব্রেরির সামনে সভাটি হয়। সাহিত্য পরিষদের সভাপতি বিধুভূষণ গোস্বামী মানপত্র পড়েন। মূল প্রবন্ধ ছিল সাহিত্য সমালোচক কামিনীকুমার সেনের। সভাপতিত্ব করেন নবাব সলিমুল্লাহ।

১৯২৬ সনে কবিগুর ঢাকায় এসে রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় এসে ওঠেন বুড়িগঙ্গা নদীর ওয়াইজ ঘাটে বাঁধা নবাব খাজা হাবিবুল্লাহর (নবাব সলিমুল্লাহর ছেলে) রাজকীয় জলযান তুরাগ হাউস বোটে। সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। আত্মজীবনী আমার ছেলেবেলা আমার যৌবন গ্রন্থে লিখছেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে আমি প্রথম দেখেছিলাম বুড়িগঙ্গার উপর নোঙর ফেলা একটি স্টিম লঞ্চে… উপরের ডেকে ইজিচেয়ারে বসে আছেন তিনি, ঠিক তাঁর ফটোগ্রাফগুলোর মতোই জোব্বা-পাজামা পরনে—আর কেউ কেউ উপস্থিত ও সঞ্চারণমান, রেলিঙে হেলান দিয়ে আমি দূরে দাঁড়িয়ে আছি। ’

ঢাকার প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল নবাব পরিবারের কিছু সংস্কৃতিমনা তরুণ। এ তরুণরাই বিশের দশকের শেষদিকে ঢাকায় গড়ে তোলে ‘ঢাকা ইস্ট বেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ সোসাইটি’ নামের একটি সংগঠন। তাদের হাত ধরেই নির্মিত হয় ঢাকার প্রথম চলচ্চিত্র ‘দ্য লাস্ট কিস’।

রাজনীতি থেকে শুরু করে শিল্প-সাহিত্য,সংস্কৃতিতে এত এত অবদান রাখার পরেও নবাব পরিবার কি আদৌ নবাব হয়ে উঠতে পেরেছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর যাইহোক না কেন, নবাব পরিবার ঢাকার ঐতিহ্য ও গৌরবের স্মারক হয়ে যুগ যুগ রয়ে গেছে, সামনেও থাকবে সে বিষয়ে আমরা একমত হতেই পারি।

নবাব মেজর খাজা হাসান আসকারি

নবাব মেজর খাজা হাসান আসকারিকে এই পরিবারের শেষ নবাব বলা হয়ে থাকে। তবে  হাসান আসকারির পিতা খাজা হাবিবুল্লাহ ঢাকার পঞ্চম এবং শেষ নবাব ছিলেন। খাজা হাবিবুল্লার পিতা ছিলেন নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ বাহাদুর। তার শাসনামলেই ঢাকার নবাব পরিবারের সম্পদ ও জৌলুশ কমতে থাকে এবং ১৯৫২ সালে ইস্ট পাকিস্তান এস্টেট অ্যাকিউজিশন অ্যাক্ট দ্বারা যা চূড়ান্তভাবে বর্জন করতে হয়।

খাজা হাসান আসকারি ছিলেন নামমাত্র নবাব।  তিনি ১৯৪০ আলিগড় স্কুল ও কলেজ থেকে বি.এ. পাস করেন।  সেই সময় কায়েদ-ই-আজম পুরস্কার লাভ করেন হাসান আসকারি।  আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪২ সালে স্নাতক করেন এবং ১৯৪৪ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কমিশনড অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মায় জাপান আর্মির সাথে একটি যুদ্ধে আহত হয়ে চাকরি ছেড়ে দেন। দেশবিভাগের পরে ১৯৪৮ সালে তিনি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন।

তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অংশ ছিলেন। ১৯৪৯ সালে তাকে নৌশেরা আর্মড কর্পসে স্থানান্তরিত করা হয়। ১৯৫০ সালে তার চাচা খাজা নাজিমুদ্দিন পাকিস্তানের গভর্নর থাকাকালীন তাকে তার দেহরক্ষীর দায়িত্ব দেয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান

স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়ার অভিযোগ ওঠে খাজা হাসান আসকারির বিরুদ্ধে।১৯৭৫ সালে পর্যন্ত তিনি বাংলাদশেই ছিলেন। ১৯৭৪ সালের শেষদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো বাংলাদেশ ভ্রমণে আসেন। তিনি হাসান আসকারিকে পাকিস্তানে যেতে অনুরোধ করেন। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার নবাবকে নিজের দেশে নিজের মানুষের কাছে থাকতে বলেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে হাসান আসকারি পাকিস্তান চলে যান।

১৯৮৪ সালে তিনি মারা যান করাচিতে। তাকে করাচি সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

— হাসান ইনাম

                      ঢাকার নবাবদের সম্পর্কে আরও জানতে ক্লিক করুন

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading