গ্রীক পুরাণ অনুসারে ট্রয় যুদ্ধের চমকপ্রদ ইতিহাস-উপাখ্যান!

troy history

ট্রয় যুদ্ধের কাহিনী Greek mythology’র একটি অতি জনপ্রিয় আখ্যান। Wolfgang Petersen পরিচালিত ২০০৪ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘Troy’ মুভিটি আমরা প্রায় সকলেই দেখেছি, যেখানে ট্রয়বাসী এবং গ্রীকসেনাদের মাঝে সংঘটিত দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী ট্রয় যুদ্ধের খণ্ডচিত্র তুলে ধরা হয়। গ্রিক কবি Homer এর ‘Iliad’ মহাকাব্য অবলম্বনে মুভিটি নির্মিত হয়। কিন্তু হোমারের ‘ইলিয়াড’ এই যুদ্ধের মাত্র কয়েক দিনের ঘটনা নিয়ে রচিত।

ট্রয় যুদ্ধের সূত্রপাত হয় Sparta’র রানী হেলেনের অপহরনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কিন্তু মূল ঘটনার সূত্রপাত আরও পেছনে। আসুন সংক্ষেপে জেনে নিই সেই চমকপ্রদ কাহিনী—

কাহিনীর সূত্রপাত তিন দেবীর বিবাদ থেকে 

ইলিয়াডের মহাকাব্যে তিনি সব কিছু চিত্রিত করেননি ঠিকই, কিন্তু অন্য গ্রীক কবিরা (যেমন- আপোলোডোরাস, ইস্কাইলাস, ইউরিপিডিস) তাঁদের কালজয়ী বিভিন্ন সাহিত্যকর্মে ট্রয় যুদ্ধের আগের ও পরের কাহিনীর বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে লিখেছেন।

 

BUY NOW

সেইসব কাহিনীসূত্র থেকে যতটুকু জানা যায়, দেবতাদের আবাস অলিম্পাসে তিন রূপসী দেবীর মধ্যকার এক বিবাদ থেকেই এই কাহিনীর সূত্রপাত।

সোনার আপেল মূলত কার? 

বিয়ে হবে রাজা পিলিউস এবং জলদেবী থেটিসের। সেই বিয়ের ভোজসভায় কলহের দেবী এরিস বাদে নিমন্ত্রন পেলেন অন্য সকল দেব-দেবী। অপমানিতা দেবী সংকল্প করলেন, যে করেই হোক বিবাহসভায় একটা ভেজাল বাধাবেন। তিনি ভোজসভায় গিয়ে টেবিলের উপর একটি সোনার আপেল রাখলেন, যাতে খোদাই করা ছিল একটি কথা-“কেবলমাত্র সুন্দরীশ্রেষ্ঠার জন্য।” সকল দেবীই এর দাবীদার হলেন, কেননা-প্রত্যেকের মতে তিনিই সবচে সুন্দরী। অবশেষে চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলেন দেবী হেরা, এথিনা এবং আফ্রোদিতি। এখানে বলে রাখা ভালো যে, হেরা সম্পদের দেবী, এথিনা জ্ঞানের দেবী এবং আফ্রোদিতি প্রেমের দেবী।

তাঁরা ফলাফলের জন্য গেলেন দেবরাজ জিউসের কাছে। এদিকে, হেরা আবার তাঁর স্ত্রী। জিউস দেখলেন, হেরাকে সুন্দরীশ্রেষ্ঠা হিসেবে ফলাফল না দিলে তিনি এক গোলযোগ বাঁধাবেন, আবার হেরার পক্ষে রায় দিলে পক্ষপাতিত্ব হয়ে যাবে। তাই তিনি বিচারের ভার দিলেন মনুষ্যকূলের হাতে। ঠিক হলো, পৃথিবীর কোনো মানুষের হাতে আপেলটি তুলে দেয়া হবে। সে যে দেবীর হাতে আপেলটি তুলে দেবে, সে-ই সুন্দরীশ্রেষ্ঠা হিসেবে বিবেচিত হবে।

বিচারের ভার ন্যস্ত হলো প্যারিসের হাতে 

 

 

ট্রয় নগরীর পাশের ‘আইডা’ পর্বতে মেষ চরান প্যারিস। একদিন তিন দেবী নেমে এলেন স্বর্গ থেকে। দেবীরা প্যারিসের হাতে আপেলটি দিয়ে বললেন, “যুবক, আমাদের মধ্যে যে সবচে সুন্দরী, তাঁর হাতেই এই আপেলটি তুলে দাও। আমরা তোমাকে বিচারক নিযুক্ত করলাম।” বললেন বটে, তবে প্যারিসকে লোভের ফাঁদে ফেলে প্রত্যেক দেবীই সফল হতে চাইলেন। হেরা তাকে ইউরোপ এবং এশিয়ার অধীশ্বর বানিয়ে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন, এথিনা তাকে দিতে চাইলেন পৃথিবীর তাবৎ জ্ঞান এবং দেবী আফ্রোদিতি পৃথিবীর সবচে সুন্দরী নারীকে তার প্রণয়িনী বানিয়ে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেন। প্যারিস পৃথিবীর সবচে সুন্দরী নারীকে পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আপেলটি তুলে দিলেন প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির হাতে। [ইংরেজি প্রবাদ- ‘Apple of discord’  (বিবাদের বিষয়) এই কাহিনী থেকেই উদ্ভূত। ]

প্যারিস জাহাজ সাজিয়ে রওনা হলেন স্পারটার দিকে

হেলেন, যে কিনা ভূখণ্ডে রূপে অদ্বিতীয়া, যাকে গ্রীসের এমন কোন রাজপুত্র ছিল না যে বিয়ে করতে চায়নি; স্বয়ম্ভর সভায় সেই হেলেনকে জিতে নিলেন মাইসিনির রাজা আগামেমনন এর ভাই মেনিলাউস। হেলেনের পিতা টিনডারিয়ুস কন্যা সম্প্রদান করলেন মেনিলাউসের হাতে এবং তাকে স্পারটার রাজা ঘোষণা করলেন। এদিকে, দেবী আফ্রোদিতি তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্যারিসকে হেলেনের সন্ধান দিলেন। প্যারিস তাঁর বন্ধুদের নিয়ে জাহাজ সাজিয়ে রওনা হলেন স্পারটার দিকে। ততদিনে তিনিও জেনে গেছেন যে, তিনি সাধারণ কোনো মেষপালক নন; তিনি আসলে ট্রয় এর রাজা প্রায়ামের অন্যতম পুত্র (সেটা অন্য গল্প)।

গোপনে মন দেয়া-নেয়া চলছিল প্যারিস ও হেলেনের

শিল্পীর চোখে হেলেন

যাই হোক, স্পারটায় রাজা মেনেলাউস প্যারিসকে সাদর অভ্যর্থনা জানালেন। গ্রীকদের কাছে অতিথি দেবতাতুল্য। তাই তাঁরা ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিসের কোনো অযত্ন হতে দিলো না। বন্ধুদের নিয়ে ভোজনসভায় খেতে বসলেন প্যারিস। তখন সেখানে প্রবেশ করলেন রানী হেলেন, পৃথিবীতে যার রূপের কোনো তুলনা নেই। হেলেনকে দেখামাত্রই প্রেমে পড়ে যায় প্যারিস। হেলেনও প্রেমে পড়ে যান প্যারিসের। আসলে পুরোটাই ছিল দেবী আফ্রোদিতির কারসাজি। যাই হোক, রাজগৃহে গোপনে মন দেয়া-নেয়া চলছিল প্যারিস ও হেলেনের। ইতোমধ্যে একদিন রাজকার্যে বাইরে যেতে হলো হেলেনের স্বামী মেনেলাউসকে। এই সুযোগেই ঘর ছাড়লেন হেলেন, প্যারিসের হাত ধরে। জাহাজ পাল তুলে দিলো ট্রয়ের দিকে।

অপমানিত, ক্রুদ্ধ মেনিলাউস অন্যান্য রাজাদের সহযোগিতায়, তাঁদের পাঠানো সৈন্যদল নিয়ে বিশাল মিত্রবাহিনী গড়ে তুলে ট্রয় নগরী আক্রমন করলেন। প্রায় নয় বছর স্থায়ী হয়েছিল ট্রয় এর যুদ্ধ, যা সুখী এবং সমৃদ্ধ ট্রয়কে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিল।

শিল্পীর তুলির আঁচড়ে ট্রয় যুদ্ধের করুণ গল্প

ট্রয় যুদ্ধের অধ্যায় কি আদৌ সত্য? 

এ তো গেল গ্রীক পুরাণের উপাখ্যানের কথা। কিন্তু  কবি-সাহিত্যিকরাও কি নিছক কল্পনার চোখ দিয়ে দেখেই রচনা করেছেন এমন দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বর্ণনা, নাকি এতে আছে কিছু সত্যও? অনেক বছর ধরেই সাধারণ মানুষ এগুলোকে নিছক গল্প-গাথা হিসেবে উড়িয়ে দিলেও ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ১০ বছরের একটি যুদ্ধের বর্ণনা শুধু কল্পনার চোখে এঁকে লিখে ফেলা সম্ভব নয়। তাছাড়া, হোমারের বর্ণনায় মানুষের জীবনযাত্রা, যুদ্ধের অস্ত্রাদির যেসব বিবরণ পাওয়া যায়, এগুলোর অনেক কিছুই পরবর্তীতে খুঁজে পাওয়া কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সঙ্গে মিলে যায়।

১৮৭১ সালে আবিষ্কৃত হওয়া একটি ধ্বংসাবশেষ, যা ট্রয়ের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে পরিচিত

১৮৭১ সালে খুঁজে পাওয়া ট্রয়ের ধ্বংসাবশেষ হিসেবে পরিচিত এই ধ্বংসাবশেষটিতে কয়েকটি লেয়ার খুঁজে পাওয়া গেছে, যা ভিন্ন ভিন্ন সময়ের পরিচয় বহন করে। গ্রীকদের আক্রমণে ট্রয়কে বার বার ধ্বংস হতে হয়েছিলো এবং বার বার গড়ে উঠতে হয়েছিলো– এই ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত।

ট্রয় যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস জানতে যে বইগুলো পড়তে পারেন 

হোমারের লেখা অন্যান্য বই দেখতে ক্লিক করুন 

 

2 thoughts on “গ্রীক পুরাণ অনুসারে ট্রয় যুদ্ধের চমকপ্রদ ইতিহাস-উপাখ্যান!”

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading