ড. জুন আলমেইডাঃ মানবদেহে যিনি প্রথম পেয়েছিলেন করোনার অস্তিত্ব

Coronavirus 2019-nCoV spreading

ড. জুন আলমেইডা। নামটা খুব পরিচিত না হলেও স্কটিশ এই নারী বিজ্ঞানীই সর্বপ্রথম মানবদেহে ‘করোনা ভাইরাস’ এর অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন, যেটি কোভিড-১৯ নামে বিশ্বব্যাপী এখন মহামারী আকারে ছড়িয়ে গেছে। ১৯৬৪ সালে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালের গবেষণাগারে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত করেছিলেন ড. আলমেইডা।

কে এই আলমেইডা?

ড. জুন আলমেইডার জন্ম স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে, ১৯৩০ সালের ৫ই অক্টোবর। তাঁর বাবা হ্যারি লিওনার্দো হার্ট পেশায় ছিলেন একজন বাস চালক। গ্লাসগো’র উত্তর-পূর্বের আলেকজান্দ্রা পার্কের নিকটে এক ছোট্ট বাড়িতে আলমেইডার বেড়ে ওঠা। ১৯৪৭ সালে স্কুল ছাড়ার পর তিনি সাপ্তাহিক ২৫ শিলিং বেতনে গ্লাসগো রয়েল ইনফার্মারি’তে হিস্টোপ্যাথলজি’র টেকনিশিয়ান হিসেবে যোগ দেন। তখনই আলমেইডা বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। এরপর তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডনের সেন্ট বার্থলোমিউ’র হাসপাতালে একই কাজের জন্য চাকরি পান। ১৯৫৪ সালে ভেনেজুয়েলার শিল্পী এনরিক রোজালিও’কে বিয়ে করার পর কানাডায় পাড়ি জমান আলমেইডা এবং সৌভাগ্যক্রমে টরেন্টোর অন্টারিও ক্যান্সার ইন্সটিটিউটে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ টেকনিশিয়ান হিসেবে চাকরি পেয়ে যান। তখন থেকেই ভাইরাস নিয়ে তাঁর আগ্রহ বেড়ে যায়। গ্লাসগো এবং লন্ডনের পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে তাঁর কাজে তিনি বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এর ফলস্বরূপ আনুষ্ঠানিক কোনো যোগ্যতা ছাড়াই বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন প্রকাশনায় সহলেখক হিসেবে নাম লেখানোর সুযোগ পেয়ে যান আলমেইডা, যেগুলরো বেশিরভাগই ছিল ভাইরাসের কাঠামো সম্পর্কিত। তিনি এমন একটি পদ্ধতির সূচনা করেছিলেন যা অ্যান্টিবডি সংহত করার মাধ্যমে ভাইরাসগুলি আরও পরিষ্কারভাবে দেখা সম্ভব হয়। চিকিৎসা বিষয়ক লেখক মি. জর্জ উইন্টারের বরাত দিয়ে বিবিসি রেডিও স্কটল্যান্ড বলছে, তার এই প্রতিভার বিষয়টি যুক্তরাজ্যের মনোযোগ কাড়ে। টরেন্টো থাকাকালীন আলমেইডার লন্ডনের সেন্ট থমাস ‘হাসপাতাল মেডিকেল স্কুলের প্রফেসর এ পি ওয়াটারসন সাথে সাক্ষাত হয়। ওয়াটারসন তাঁকে সেন্ট থমাসে যোগ দিতে বলেন। এর তিনবছর পর সেখানে যোগ দেন ততদিনে তাঁর কাজে বেশ অভিজ্ঞ হয়ে উঠা আলমেইডা। এরপরই তাঁর ক্যারিয়ারের দিন বদল হতে শুরু করে।

প্রথমবারের মত মানবদেহে করোনার অস্তিত্ব

বিবিসির তথ্যমতে, লন্ডনে ফিরে এসে জুন আলমেইডা কমন কোল্ড রিসার্চ সেন্টারের ডিরেক্টর ডক্টর ডেভিড টাইরেলের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন, যিনি উল্টশ্যায়ারের সালসবিউরিতে সাধারণ ঠাণ্ডা নিয়ে গবেষণা করছিলেন।
মি. উইন্টার বলছেন, ডক্টর টাইরেল স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে অনুনাসিক ধোয়ার ওপর গবেষণা করছিলেন। তাদের দল দেখতে পায় যে, তারা বেশ কয়েকটি সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাস বৃদ্ধি করতে পারছিলেন, কিন্তু সবগুলো নয়। তার মধ্যে একটি বিশেষভাবে নজরে আসে। সেটির নাম দেয়া হয়েছিল বি-৮১৪, যা এসেছিল ১৯৬০ সালে সারের একটি বোর্ডিং স্কুলের একজন ছাত্রের কাজ থেকে। তারা দেখতে পান, তারা সাধারণ সর্দি-কাশির কয়েকটি লক্ষণ স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে তৈরি করতে পারলেও, সেগুলো তাদের নিয়মিত কোষের ভেতরে আর বেড়ে উঠতে পারে না।

তবে স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে প্রত্যঙ্গের মধ্যে কিছু বৃদ্ধি দেখিয়েছিল। সেটা দেখে অবাক হয়ে ড. টাইরেল ভাবলেন, এটা কোন বৈদ্যুতিক মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা উচিত। তারা সেসব নমুনা জুন আলমেইডাকে পাঠান, যিনি নমুনার মধ্যে ভাইরাস কণা দেখতে পান। সেগুলো সম্পর্কে তিনি বলেন, এগুলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মতো দেখতে হলেও পুরোপুরি তা নয়। মি. উইন্টারের তথ্য অনুসারে, ড. টাইরেল ও ড. আলমেইডার পাশাপাশি অধ্যাপক টনি ওয়াটারসন, যিনি সেন্ট থমাসের দায়িত্বে ছিলেন, তারা ওই ভাইরাসের নামকরণ করেন করোনাভাইরাস, কারণ ভাইরাসের চারপাশ জুড়ে অনেকটা মুকুটের মতো সাদৃশ্য ছিল।

মি. উইন্টার বলছেন, ড. আলমেইডা ইঁদুরের মধ্যে হেপাটাইটিস এবং মুরগির সংক্রামক ব্রঙ্কাইটিস তদন্ত করার সময় এর আগে এ ধরণের কণাগুলি দেখেছিলেন। তা সত্ত্বেও, পিয়ার-রিভিউড জার্নালে পাঠানো তার নথিটি বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, “তিনি যেসব ছবি দিয়েছেন, সেগুলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস কণার বাজে ধরণের চিত্র। ”
বি-৮১৪ আবিষ্কারের বিষয়ে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয়। তিনি করোনাভাইরাসের প্রথম যে চিত্র দেখেছিলেন, সেটি প্রকাশিত হয় দুই বছর পরে ১৯৬৭ সালের পহেলা এপ্রিল জেনারেল ভাইরোলজি জার্নালে। ২০১৩ সালে ভাইরাল জনিত বিভিন্ন রোগ ও তার ইতিহাস নিয়ে জন বুস ও মেরিলিন জে.আগস্টের লেখা ‘ To Catch a Virus’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে,” ড. টাইরেল এবং আলমেইডা যে নতুন ধরনের করোনা ভাইরাস নিয়ে কাজ করছিলেন সেটি সার্স (Severe Acute Respiratory Syndrome) ভাইরাস পরিবারেরই সদস্য। আর এই সার্সের সদস্য সার্স কোভ২ ই বর্তমান কোভিড-১৯ এর কারণ। “স্কটল্যান্ডের আবেরডিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাকটেরিওলজির ইমেরিটাস অধ্যাপক হিউ পেনিংটন স্কটিস সংবাদমাধ্যম হেরাল্ড স্কটল্যান্ডকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, ” চীন প্রশাসন আলমেইডার কৌশলগুলি কোভিড-১৯ সনাক্ত করতে ব্যবহার করেছিল এবং তাঁর কাজটি প্রাথমিক সনাক্তকরণে সহায়তা করেছিল।”

আলমেইডার শেষ জীবন

ড. আলমেইডা পরবর্তীতে লন্ডনের পোস্টগ্রাজুয়েট মেডিকেল স্কুলে কাজ করেন, যেখানে তিনি ডক্টরেট সম্মানে ভূষিত হন।
দক্ষিণ-পূর্ব লন্ডনের ওয়েলকাম রিসার্চ ল্যাবরেটরীতে তিনি তার পেশাজীবন শেষ করেন যেখানে ভাইরাস ইমেজিংয়ের এর ক্ষেত্রে তার নামে বেশ কয়েকটি স্বত্বাধিকার হয়।
ওয়েলকাম ছেড়ে দেয়ার পর ড. আলমেইডা একজন ইয়োগা প্রশিক্ষক হন। তবে পরবর্তীতে আশির দশকে তিনি এইচআইভি ভাইরাসের ইমেজিং এর ক্ষেত্রে একজন পরামর্শক হিসাবে সেন্ট থমাস হাসপাতালে ফিরে আসেন। তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জন্য ১৯৭৯ সালে দ্রুত পরীক্ষাগার ভাইরাল নির্ণয়ের জন্য ম্যানুয়াল প্রকাশ করেছিলেন।
২০০৭ সালে পহেলা ডিসেম্বর, ৭৭ বছর বয়সে জুন আলমেইডা মৃত্যুবরণ করেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিযুক্ত এই ভাইরোলজিস্টকে ভাইরাল ইমেজিং এবং ডায়াগনোসিসের জন্য নতুন পদ্ধতিগুলির পথিকৃত হিসেবে দেখা হয়।

ছবিসূত্র
১. ১৯৬৩ সালের অন্টারিও ইনস্টিটিউটের ল্যাবে আলমেইডা। Courtesy: Getty Images
২. মাইক্রোস্কোপে করোনা ভাইরাস। Courtesy: Getty Images

তথ্য সূত্র
১. https://www.bbc.com/news/uk-scotland-52278716
২. https://www.thescottishsun.co.uk/news/scottish-news/5499444/coronavirus-discovery-june-almeida-glasgow/
৩. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC2440895/
৪. https://www.microbiologyresearch.org/content/journal/jgv/10.1099/0022-1317-1-2-175
৫. Booss, J. and August, M., 2013. To Catch A Virus. [Erscheinungsort nicht ermittelbar]: American Society for Microbiology.
৬. https://www.oxforddnb.com/view/10.1093/ref:odnb/9780198614128.001.0001/odnb-9780198614128-e-99332;jsessionid=C58EE2B2F709D14655174353AE1B93D4
৭. https://www.heraldscotland.com/news/18289806.june-almeida-tribute-scotlands-forgotten-hero-coronavirus/
৮. https://apps.who.int/iris/handle/10665/37199

* *লেখক: তানভীর মাহতাব, তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দূর্যোগ ব্যবস্হাপনা বিভাগে অধ্যয়নরত।

Tanvir Mahatab

Tanvir Mahatab

Published 24 Apr 2020
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png