অমুসলিম থেকে মুসলমান হওয়ার গল্প : ১ম পর্ব

অমুসলিম থেকে মুসলমান

নামাজের দৃশ্য দেখে মুসলমান হন থমাস ক্লেয়টন

এক দুপুর বেলায় সূর্য যখন মধ্য গগণে শোভা পাচ্ছিল তখন বাগানের করিডোর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কানে ভেসে এলো একই তাল ও ছন্দের এক মধুর ধ্বনি। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম এক অপূর্ব ও মনোহর দৃশ্য। সদ্যস্থাপিত একটি কাঠের টাওয়ারের ওপর দাঁড়ানো এক মুসলমান উপহার দিচ্ছিলেন এই মধুর সুর। কানে আসছিল কতগুলো আরবি শব্দ। যেমন, আল্লাহু আকবার বা আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ… লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বা আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ইত্যাদি। কী ঘটতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না।

ধীরে ধীরে আমার চারদিকে জড়ো হচ্ছিলেন নানা অঞ্চলের ও নানা বয়সের মানুষ। তারা অত্যন্ত প্রশান্ত চিত্তে ও সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে পরস্পরের পাশে দাঁড়ালেন। প্রত্যেকের হাতেই রয়েছে মাদুরের তৈরি একটি জায়নামাজ। তারা সেগুলোকে সবুজ ঘাসের ওপর বিছিয়ে দিচ্ছিলেন। ক্রমেই তাদের সংখ্যা বাড়ছিল। ঠিক কতজন শেষ পর্যন্ত এভাবে একসঙ্গে জড়ো হলেন তা বুঝতে পারিনি। তারা পায়ের জুতোগুলো খুলে কয়েকটি লম্বা ও সুশৃঙ্খল সারিতে দাঁড়িয়ে গেলেন। নীরবে দেখছিলাম এই দৃশ্য। বিস্মিত হচ্ছিলাম এটা দেখে যে, সেখানে কারো ওপর অন্য কারো কোনো ধরণের অগ্রাধিকার ছিল না। তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন শ্বেতাঙ্গ, কেউ কৃষ্ণাঙ্গ ও কেউবা হলুদ বা বাদামি বর্ণের। -বলছিলেন মার্কিন নওমুসলিম ‘থমাস ক্লেয়টন’।

মার্কিন নওমুসলিম ক্লেয়টন আরো বলেন- ‘এই সমাবেশে ভ্রাতৃত্বের যে চিত্র ও পরিবেশ দেখেছিলাম তার প্রভাব কখনও বিলুপ্ত হবে না। সেই থেকে অনেক বছর কেটে গেছে। আমি সেই বছরই ইসলামের ছায়াতালে আশ্রয় নিই এবং নিজের জন্য মুহাম্মাদ নাম বেছে নিই।’

মানবীয় প্রকৃতির ধর্ম ইসলাম মানুষকে প্রকৃত সৌভাগ্যের পথ দেখায়| অমুসলিম বিশ্বেও দিনকে দিন এ ধর্মের প্রতি বাড়ছে মানুষের আকর্ষণ। আধ্যাত্মিক শূন্যতার কারণে মানুষ এখন ধর্মের দিকে ফিরে যেতে চাইছে। আর ইসলামের মধ্যেই তারা পাচ্ছেন অবিকৃত ধর্ম ও প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার স্বাদ এবং পরিপূর্ণ জীবনবিধান।

মুসলমানদের নামাজের জামাতে ফুটে উঠে এক আদর্শসমাজ তথা ইসলামী সমাজের চিত্র| যেখানে কোনো ভেদাভেদ নেই এবং সবাই একই দেহ ও একই হৃদয় নিয়ে একই লক্ষ্যে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করেন। আর তাই এ ধরনের ইবাদতের দৃশ্য সত্য-সন্ধানী মানুষকে আকৃষ্ট করে ইসলামের দিকে। থমাস ক্লেয়টনের মতো মার্কিন নাগরিক হচ্ছেন এমনই সৌভাগ্যবানদের একজন। প্রকৃত নামাজির মতো কোনো সমাজের সদস্যরা যদি সব অবস্থায় আল্লাহকে হাজির-নাজির জানেন তাহলে সেখানে অনৈতিক আচরণ, পাপাচার, দুর্নীতি ও অন্যায়ের কোনো সুযোগ থাকে না।

মার্কিন নওমুসলিম ‘থমাস ক্লেয়টন’ আরো বলেছেন- ‘ইসলাম মানুষকে দায়িত্বশীলতা, কল্যাণকামিতা ও সততার মতো পছন্দনীয় গুণের অধিকারী হতে বলে। এ ধর্ম অন্যের সম্পদ ও জীবনের ওপর জুলুম করতে নিষেধ করে এবং নিজের অধিকার রক্ষার কথা বলে। যেসব কাজ সমাজ ও নিজের জন্য কল্যাণকর তা করার এবং যেসব কাজ সমাজের জন্য ক্ষতি ও দুর্নীতি ডেকে আনে তা থেকে দূরে থাকার কথা বলে ইসলাম। নামাজের মত যেসব ইবাদত আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের প্রতীক, সেইসব ইবাদতে শামিল হতে বলে এই মহান ধর্ম।’

মার্কিন নওমুসলিম ‘থমাস ক্লেয়টন’  সবশেষে আরো বলেছেন- ‘আমি এখন আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ বা উপাস্য নেই’- এই বাক্যে আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী এবং এই সত্যকে আমার সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করছি। আমি এই ধর্মকে আমার প্রকৃতির ইচ্ছাগুলোর সঙ্গে মানানসই হিসেবে দেখতে পাচ্ছি। আর তাই মুসলমান হয়েছি। সেই থেকে এ পর্যন্ত আমার স্রষ্টার প্রতি এক বিশেষ ভালবাসা অনুভব করছি। যখন মুসলমান ছিলাম না তখন কেন এই অনুভূতি ছিল না তা জানি না। আল্লাহর ওপর আমার রয়েছে গভীর বিশ্বাস।

আশা করছি এই ঈমানকে সবসময় রক্ষা করতে পারব। যখন কেউ আল্লাহর ওপর ঈমান আনেন আল্লাহ তাকে নিরাশ করেন না; তিনি সবসময়ই বান্দার ডাকে সাড়া দেন। কখনও কখনও বান্দা হতাশ হয়ে পড়েন ও ভাবেন যে আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে পরিত্যাগ করেছেন। আমি তাদেরকে বলতে চাই, কখনও দয়ালু আল্লাহ সম্পর্কে আশা ছাড়বেন না। আল্লাহ সব অবস্থায় আমাদের দেখছেন। সঠিক পথ নির্বাচনে ও ভালো কাজ করার ক্ষেত্রে সাফল্য দানে তিনিই আমাদের সহায়তা করবেন। একমাত্র ঈমানই জীবনের সব ক্ষেত্রে মানুষকে সফল করে। নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতি আমাদের ভালোবাসা একতরফা নয়। আমরা যেমন আল্লাহকে ভালবাসি, তেমনি আল্লাহও তাঁর বান্দাদের ভালবাসেন।

মাসায়ো ইয়ামাগুচিমুসলমান হওয়ার গল্প

জাপানী নও-মুসলিম ‘মাসায়ো ইয়ামাগুচি’ পড়াশুনা করেছেন টোকিও’র বহির্বিশ্ব স্টাডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফার্সি সাহিত্যের ওপর পড়াশুনা বদলে দিয়েছে তার জীবন। জাপানের মতো একটি দেশে আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ঝোঁক-প্রবণতাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কিন্তু এমন একটি দেশেও কেউ কেউ আছেন যারা নিজ অন্তরে মানবীয় মূল্যবোধের প্রতি দরদ অনুভব করেন এবং ব্যাপক গবেষণার পর ইসলামকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ‘মাসায়ো ইয়ামাগুচি’র বর্তমান নাম ফাতিমা। তার মতে, ইসলাম মানুষকে অর্থহীনতা ও বিভ্রান্তি থেকে রক্ষার একমাত্র পথ।

ফার্সি ভাষা ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির বাহন হিসেবে আরবী ভাষার পরই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী ভাষা। অত্যন্ত মিষ্টি এই ভাষা শেখা অন্য অনেক ভাষা শেখার চেয়ে অনেক সহজ। এই ফার্সি ভাষা শিখতে গিয়ে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে পরিচিত হন নওমুসলিম মাসায়ো ইয়ামাগুচি। ফার্সি ভাষাভাষী দেশগুলো, বিশেষ করে ইরানের প্রতি ছোটবেলা থেকেই তার ছিল বিশেষ আকর্ষণ।

নওমুসলিম ‘মাসায়ো ইয়ামাগুচি’ বলেছেন, ‘যখন হাইস্কুলে পড়তাম তখন মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ অনুভব করতাম।  বইয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব ছবি দেখতাম সেগুলো আমার এই আগ্রহকে দ্বিগুণ করত। বিশেষ করে টাইলসের অপূর্ব কারুকাজ করা ও মনোহর স্থাপত্য রীতির মসজিদগুলোর ছবি আমাকে আকৃষ্ট করতো দারুণভাবে। এভাবে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা করার ও জানার আগ্রহ সৃষ্টির পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। মুসলমানদের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকে কাছ থেকে দেখতে পারাটা ছিল আমার কাছে সুন্দর স্বপ্নের মতো একটা বিষয়। কখনও কল্পনাও করতে পারিনি যে একদিন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। হাইস্কুল-জীবনের শেষের দিকে আমার একজন শিক্ষকের পরামর্শে ফার্সি সাহিত্যকে বেছে নিই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভের বিষয় হিসেবে। ফলে বিষয় নির্বাচনের ঝামেলা থেকে বেঁচে যাওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কেও জানার আগ্রহ বেড়ে যায় আমার মধ্যে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ফার্সি ভাষা ও ইরানোলজি বিভাগে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে আমার বহু দিনের পুরনো স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার সুযোগ ঘটে। সেই থেকে মহান আল্লাহ আমার জন্য হেদায়াতের পথ বা ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পথ খুলে দিয়েছেন। আর এ জন্য আমি মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ।’

নওমুসলিম ‘মাসায়ো ইয়ামাগুচি’ যতই ফার্সি শিখছিলেন ততই এ ভাষা শেখার প্রতি তার আগ্রহ বাড়তেই থাকে। ইরানের ভিজিটিং প্রফেসররা তাকে এ ব্যাপারে বেশ সহায়তা করেন। মাসায়ো চাইতেন ইরান সম্পর্কে যা তিনি পড়ছেন ও শুনছেন তা যেন সরাসরি কাছ থেকে দেখতে পারেন। একজন ফার্সিভাষী মুসলমানের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটার পর মাসায়ো ধর্ম ও জীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্বের ব্যাপারে সচেতন হন।  বিষয়টি ছিল তার কাছে খুবই নতুন। কারণ- জাপানীরা সাধারণত ধর্ম ও বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। এভাবে মাসায়োর মধ্যে জাগতে থাকে অনেক প্রশ্ন। আর এসবের উত্তর জানার জন্য তাকে ব্যাপক পড়াশোনা করতে হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই নানা বই-পুস্তক পড়তে গিয়ে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্ম সম্পর্কে বাছ-বিচার করার ও সেগুলোর লক্ষ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পান এই জাপানী নারী।

সব ধর্ম সম্পর্কে তুলনামূলক পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাসায়োর কাছে এটা স্পষ্ট হয়েছে যে আদর্শ জীবনের পথ কেবল ইসলামেই স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ফলে তিনি মুক্তির ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই গ্রহণ করেন ইসলাম ধর্ম। তার বাবা এ বিষয়টিকে সুনজরে না দেখলেও জাপানের জনগণ অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে সাধারণত হস্তক্ষেপ করে না বলে মাসায়ো ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তেমন কোনো সমস্যার শিকার হননি।

ইরান সফরে আসার পর নওমুসলিম মাসায়ো বা বর্তমান ফাতিমা দেশটির জনগণ এবং ইসলামী সরকার সম্পর্কে পশ্চিমা প্রচারণার অসারতা বা মিথ্যাচার বুঝতে সক্ষম হন। তিনি ইরানি ও জাপানি জনগণের সংস্কৃতির মধ্যে বিরাজমান কিছু অভিন্নতাও লক্ষ করেন। বিশেষ করে পরিবার ব্যবস্থা রক্ষার ওপর এই উভয় দেশের সংস্কৃতির গুরুত্ব আরোপের অভিন্নতা ফাতিমাকে মুগ্ধ করেছে।

অবশ্য দুঃখজনকভাবে পাশ্চাত্যের ও বিশেষ করে আমেরিকান অপসংস্কৃতির দ্রুততম আগ্রাসন ও অপপ্রচার জাপানেও আঘাত হেনেছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম, বিশেষ করে উপগ্রহ টিভি চ্যানেলগুলোর প্রচারণা এ ক্ষেত্রে বিষময় প্রভাব রেখেছে। জাপানী যুব সমাজের মধ্যে পরিবার-ব্যবস্থা এখন ধ্বংসের মুখে। মাসায়ো আশা করছেন ইসলাম জাপানী যুব সমাজকে রক্ষা করবে এবং তাদের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ আবারও ফিরে আসবে।

বর্তমানে ফাতিমা অন্যদের কাছেও ইসলাম প্রচারের চেষ্টা করছেন। মাসায়ো বলেছেন, আমি এখন মুসলমান হওয়ায় নিজ জীবনে ইসলামের বিধি-বিধান বাস্তবায়ন করা এবং এ কাজে অন্যদের উৎসাহ দেয়াও আমার দায়িত্ব। জাপানিরা জীবনের প্রথম থেকেই ইসলাম ধর্মের প্রকৃত অর্থ কখনও জানত না এবং এখনও জানে না। তাই এই কঠিন মিশনে ও আত্মগঠনে তিনি মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করছেন এবং দয়াময় আল্লাহর  সাহায্য পাবেন বলে আশাবাদী।

অগ্নিউপাসক থেকে মুসলমান হলেন জাহরা সুজা খানি

ইসলামের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো এর বাণীর গ্রহণযোগ্যতা বা জনপ্রিয়তা এবং স্পষ্ট অর্থ। ইসলাম নিজেকে প্রকৃতির ধর্ম ও বিবেকের ধর্ম বলে মনে করে। আর এ জন্যই পবিত্র অন্তরের অধিকারী ব্যক্তি ও চিন্তাশীলদেরকে আকৃষ্ট করে এ মহান ধর্ম। ইসলাম ধর্মের উদ্দেশ্য হলো একত্ববাদী মানুষের মধ্যে ইসলামী ও মানবীয় গুণাবলী বিকশিত করা। এভাবে এ মহান ধর্ম মানুষের ব্যক্তিত্বের নানা দিককে পূর্ণতা দান করে এবং সৃষ্টির রহস্য তুলে ধরে মানুষের কাছে। ইসলাম মানুষের সত্তার প্রত্যেক দিক ও তাদের ইচ্ছা বা ঝোঁকগুলোকে গুরুত্ব দেয়। মানুষের স্বাভাবিক বা বৈধ চাহিদাগুলোকে অন্য কোনো চাহিদার জন্য বিসর্জন দেয় না ইসলাম। পবিত্র কুরআন মানুষের মধ্যে এমন বিশ্বাস বা ঈমানকে বদ্ধমূল করে, যা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক- উভয় জীবনেই কল্যাণ বয়ে আনে। এভাবে ইসলাম সমাজ ও ধর্মকে সমন্বিত করে। আর এ কারণেই ইসলামের বাণী ও বক্তব্যগুলো যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ধর্ম ও মতাদর্শের লোককে আকৃষ্ট করছে। বলছিলেন ভারতীয় নওমুসলিম ‘জাহরা সুজা খানি’

ভারতীয় নও-মুসলিম ‘জাহরা সুজা খানি’ ছোটবেলা থেকেই ছিলেন সত্য-সন্ধানী। আর এই প্রচেষ্টার পুরস্কার হিসেবে তিনি ইসলামের মহাসত্যকে বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘আমার আগের নাম ছিল নিনা। বর্তমান নাম ‘জাহরা সুজা খানি’। আমি জন্ম নিয়েছি এমন এক দেশে যেখানে রয়েছে হাজার হাজার কল্পিত খোদা। আমার পরিবার ছিল জরথুস্ত্র ধর্মের অনুসারী। আমার পরিবারে চিন্তার স্বাধীনতার সুযোগ ছিল। এ পরিবারটি অত্যন্ত সম্পদশালী ও সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও আমি সুখী ছিলাম না। আমি শৈশবেই মাকে প্রশ্ন করেছিলাম- কেন যে কেউ আমাদের জরথুস্ত্র ধর্ম গ্রহণ করতে পারে না? কেন একজন জরথুস্ত্রকে জন্মগতভাবেই জরথুস্ত্র হতে হয়?’ আমাদের খোদাকে বলা হয় আহুরা মাজদা এবং জরথুস্ত্র ছাড়া আমাদের উপাসনালয়ে অন্য কারো প্রবেশ নিষিদ্ধ। অথচ আমাদের আশপাশে মসজিদ-মন্দিরগুলোতে সবাই অবাধে যাতায়াত করতে পারত। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম ২/৩ মাসের জন্য খ্রিস্টান হব, এরপর ২ মাসের জন্য হিন্দু ও এভাবে একের পর এক অন্য ধর্মগুলোর অনুসারী হব। এরপর মুসলমান হওয়ার পালা। এক মুসলমান প্রতিবেশী আমাকে নামাজ শেখার বই উপহার দিলেন। সে সময় আমার বয়স ও জ্ঞান দুইই অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও ইসলামকেই আমি শ্রেষ্ঠ ধর্ম হিসেবে দেখতে পেয়েছিলাম।’

এভাবে নওমুসলিম জাহরা সুজা খানি খুব দ্রুত ইসলামের গভীর অনুরাগী হয়ে পড়েন। তিনি সে সময়ই হিজাব বা পর্দা করতে থাকেন এবং ইসলাম সম্পর্কে আরো ব্যাপক পড়াশুনায় মশগুল হন। তিনি বলেছেন, ‘সে সময় টেলিভিশনে মডেল হওয়ার অনেক প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু অন্য অনেক তরুণীর মতো খ্যাতি ও বিপুল অর্থের মোহ আমাকে আক্রান্ত করেনি দেখে আমার বাবা-মাও বিস্মিত হন। মডেল হওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব এবং আমি আমার হিজাব অব্যাহত রাখব বলে বাবা-মাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলাম। আজ অনেক বছর পরও দেখছি যে, আমার যেসব বান্ধবী মডেল হয়েছিলেন তারা অনেক অর্থ ও খ্যাতির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও এখনও নিজের ভেতরে কী যেন খুঁজে বেড়ান। তারা সত্যের সন্ধান পাননি। কিন্তু আমি হিজাব বেছে নিয়ে সন্তুষ্ট ও আনন্দিত। আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি একবারও এ ব্যাপারে অনুতপ্ত হইনি।’

নওমুসলিম ‘জাহরা সুজা খানি’ মুসলমান হওয়ার ঘোষণা দিলে তার বাবা-মা অসন্তুষ্ট হন। এ সময় পারিবারিক বাধার কারণে নিজের লক্ষ্যগুলোতে উপনীত হওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। সুজা খানি বলেছেন, ‘মূল সমস্যা আর যুদ্ধটা শুরু হলো পরিবারের ভেতরেই। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বোঝানো হচ্ছিল আমাকে। কিন্তু উপদেশে যখন কোনো কাজ হলো না তখন তারা ইসলাম সম্পর্কে নানা অপপ্রচার বা অপবাদ তুলে ধরছিলেন। দেখা গেল পরিবারে যে স্বাধীন পরিবেশ ছিল তা আমার জন্য সীমিত ও শর্তযুক্ত হয়ে গেল।’ তবে শেষ পর্যন্ত সুজা খানির দৃঢ় ঈমান ও বিশ্বাস সুফল বয়ে আনে এবং তার গোটা পরিবার ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়টি মেনে নেয়। ৭ বছর ধরে প্রবল প্রতিরোধ ও ইসলামের ওপর অবিচল থাকার কারণে পরিবারের ওপর বিজয়িনী হন সুজা। মুক্তভাবে বা অবাধে নামাজ ও কুরআন পড়ার এবং পর্দা করার অনুমতি পান তিনি। তাকে তার ইচ্ছেমত পত্র-পত্রিকা পড়ারও সুযোগ দেওয়া হয়।

বেগম সুজা খানি বলেছেন, ‘আমার আত্মা ছিল সত্যের প্রতীক্ষায় শুকনো মরুভূমির মতো তৃষ্ণার্ত। তাই প্রাণভরে তৃষ্ণা মিটিয়ে নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। আর এ জন্য দরকার ছিল সময় ও অনুরাগ। সৌভাগ্যক্রমে এ দুই-ই আমার মধ্যে ছিল ব্যাপক মাত্রায়। ইসলাম সম্পর্কে যত বেশি সম্ভব জানার জন্য বেশি বেশি পড়াশুনা ও গবেষণা করছিলাম। আমার অন্তরাত্মা ও প্রকৃতি যেন এ জন্য প্রস্তুত ছিল। আর এটাও মহান আল্লাহর এক বড় অনুগ্রহ। ব্যাপক পড়াশোনার সুবাদে বুঝতে পারলাম যে ইসলামই সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যময় ও উন্নত ধর্ম।’

একত্ববাদ হলো ইসলামের প্রাণ, যা গভীরভাবে আকৃষ্ট করে সত্য-সন্ধানীদের। নওমুসলিম সুজা খানিও এর ব্যতিক্রম নন। অন্য অনেক ধর্মে একত্ববাদের কথা এসেছে। কিন্তু বেগম সুজার মতে একত্ববাদকে সবচেয়ে ভালোভাবে তুলে ধরছে ইসলাম এবং ইসলামী বিধি-বিধানগুলো হুবহু মানুষের প্রকৃতির অনুরূপ। তিনি মনে করেন, ইসলাম মানুষের ব্যক্তিত্বকে উপলব্ধি করে বলে এ ধর্ম চর্চার মাধ্যমে মানুষ নিজের ব্যক্তিত্বকে ও নিজেকে বুঝতে পারে খুব ভালোভাবে। এইসব উপলব্ধি ইসলামের প্রতি জাহরা সুজা খানির ভালোবাসাকে করেছে অতলান্ত-গভীর। শৈশব থেকেই যেসব প্রশ্নের জবাব তিনি খুঁজতেন, সেসবেরই নির্ভুল জবাব তিনি পেয়েছেন ইসলামের মধ্যে। এভাবে যতই দিন যাচ্ছে ততই বেগম সুজা খানির কাছে মনে হচ্ছে, যে ইসলামকে তিনি জানতেন তার চেয়েও অনেক বেশি বড় ও মহান এই ধর্ম। সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী এক সময়কার অগ্নি উপাসক ও বর্তমান নওমুসলিম বেগম সুজা খানি মনে করেন ইসলামের বিধি-বিধানগুলো অত্যন্ত উন্নত। তিনি বলেছেন, ‘ইসলাম চোখ, কান ও ইন্দ্রিয়গুলোকে খুবই সতর্ক রাখতে বলে। অনেক সময় এমন মনে হতে পারে যে, সামান্য সময়ের হারাম দৃষ্টি ও ছোটখাট হারাম কোনো কাজ তেমন গুরুতর ব্যাপার নয়। কিন্তু বাস্তবে এইসব পাপ মানুষের আত্মার মধ্যে একটি বীজের মতোই বিকশিত হতে থাকে।

এইসব শিক্ষা ও মনস্তত্ত্ব বহু বছর আগে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ণনা করেছেন বিশ্বনবী সা.। অথচ পশ্চিমারা অতি অধুনা এসব বুঝতে শুরু করেছেন। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা মানুষকে প্রফুল্ল করে ও সব ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনে। এ ধর্ম পার্থিব জীবনে মানুষের করণীয় কাজগুলো কিভাবে সঠিকভাবে সম্পন্ন হতে পারে তা জানিয়ে দেয়। অজু করা, নামাজ পড়া, দাঁত মাজা, ইত্যাদির রয়েছে নানা আদব-কায়দা। এসবই বিশ্বজগতের সঙ্গে বন্ধনের সুন্দরতম মুহূর্ত। এসবের মধ্যে রয়েছে জানার অনেক নতুন কিছু দিক । [সূত্র : ইন্টারনেট]

নওমুসলিমদের ইসলামে ফেরার গল্প নিয়ে লেখা বইসমূহ পেতে ক্লিক করুন!

এমদাদুল হক তাসনিম

এমদাদুল হক তাসনিম

নির্বাহী সম্পাদক : মাসিক ইসলামী বার্তা, অর্থ সম্পাদক : বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম ই-মেইল: imdadtasnim@gmail.com

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading