বিদআত সমাচার

2

নামাজের পর মুয়াজ্জিন সাহেব বলিষ্ঠ কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, দুআর পর মিলাদ আছে। আমরা সব ভাই বসি। বহুত ফায়দা হবে। জিলাপির ব্যবস্থাও আছে। কী ঘটে- দেখার জন্য পেছনের সারিতে বসে পড়লাম। লোকজন জড়ো হতেই মুয়াজ্জিন সাহেব ভাটিয়ালি সুরে বাংলা-উর্দূর মিশেলে সুললিত কণ্ঠে দুরূদে গলা চড়ালেন। দু’তিনবার এদিক সেদিক সুরের মুর্ছনা ছড়িয়েই তিনি চট করে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং ‘সাল্লাল্লাহ’ এর মুহুর্মুহু সুরে মসজিদ কাঁপিয়ে তুললেন। প্রচলিত ভাষায় একেই বোধহয় বলা হয় ‘মিলাদ-কিয়াম’। খুবই ইন্টারেস্টিং বিষয়।

প্রশ্ন জাগে, ইসলামের দৃষ্টিতে এই ‘মিলাদ-কিয়াম’ এর বৈধতা কতখানি? এটা কি সুন্নাত নাকি বিদআত?

বিদআত কী?

বিদআত (بدعة‎‎) একটি আরবি শব্দ। যার আভিধানিক অর্থ নতুনত্ব ও নবতর উদ্ভাবন। শরীয়তের পরিভাষায় বিদআত বলা হয়, দ্বীন ও ইবাদতের মধ্যে প্রত্যেক নব আবিষ্কৃত কাজকে। অর্থাৎ দ্বীন কিংবা ইবাদত ভেবে করা এমন কাজকে বিদআত বলা হবে, কুরআন ও হাদীসে যার কোনো দলীল নেই।

নবীজীর ভাষায়-

كُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ

‘প্রত্যেক নব আবিষ্কৃত বিষয়ই বিদআত এবং প্রত্যেকটা বিদআতই ভ্রষ্টতা।’ (তিরমিযী: ২৬৭৬ ও আবু দাউদ: ৪৬০৭)।

এর ফলে অবশ্য জাগতিক উন্নতি সাধনের কল্যাণে প্রযুক্তিগত নব আবিষ্কৃত বিষয়গুলোও বিদআতের আওতায় পড়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে যা মনে হয় যেন জনজীবনের জন্য হুমকি স্বরূপ।

তবে মুহাদ্দিসগণ নবীজীর এ কথাকে এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, জগতের সব নব আবিষ্কৃত বিষয় নয়; বরং নবীজী, এমনকি সাহাবায়ে কেরামের যুগেও শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত ছিল না- কিন্তু পরবর্তীতে নতুন করে শরীয়তের মধ্যে অন্তুর্ভুক্ত করা হয়েছে- এমন সব বিষয়ই বিদআত বলে গণ্য হবে। যেমন, নবীজীর জীবদ্দশায় তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়নি। অথচ শতাব্দীখানেক পরই এ দিনটিকে মহা আড়ম্ভরে ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ নাম দিয়ে শরীয়তের একটি আবশ্যকীয় আমল হিসেবে পালনের আবিষ্কার স্পষ্টতই বিদআত।

অপরদিকে জগত ও জগতজীবনের উন্নতির লক্ষ্যে যা কিছু নতুন করে আবিষ্কৃত হবে সেগুলো বিদআত বলে সাব্যস্ত হবে না। এগুলো বরং স্রেফ পার্থিব উন্নয়ন বলে আখ্যায়িত হবে। যেমন নবীযুগে বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা ছিল না। ছিল না বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট, বিমান-উড়োজাহাজ, মোবাইল-ল্যাপটপ কিছুই। আধুনিক বিশ্বের গবেষকগণ উন্নত জীবনের স্বার্থে এসব আবিষ্কার করেন, যা দূষণীয় তো নয়ই; এমনকি বিদআতও নয়।

সুন্নত ও বিদআত নামক বইয়ে মুফতী শফী রহ. বিদআতের পরিচয় উল্লেখ করেছেন-

শরীয়তের পরিভাষায় এমন নতুন আবিস্কৃত ইবাদত পদ্ধতিকে বিদআত বলা হয়, যা অধিক সওয়াব অর্জনের উদ্দেশ্যে রাসূলে পাক সা. এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগের পর হতে অবলম্বন করা হয়েছে এবং প্রিয়নবী সা. ও সাহাবায়ে কিরাম রা.-এর সে মুবারক সময়ে তার প্রয়োজনীয়তা ও কারণ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কথায়, কাজে, স্পষ্ট বা অস্পষ্টভাবে তার পক্ষে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

বিদআতের উল্লিখিত সংজ্ঞাটি আল্লামা বারকুয়ী রহ.-এর ‘আত্তরীকাতুল হামদিয়্যাহ’ এবং আল্লামা শাতিবী (রহঃ)-এর ‘আল ইতিসাম’ নামক গ্রন্থদ্বয় হতে নেয়া হয়েছে।

বিদআতের উপর্যুক্ত এ সংজ্ঞা দ্বারা বোঝা যায় যে, স্বাভাবিকভাবে এবং দুনিয়াবী ব্যবহারিক প্রয়োজনে যে সব নিয়ম-নীতি ও যন্ত্রাদি প্রতিনিয়ত আবিস্কৃত হচ্ছে, শরয়ী বিদআতের সাথে তার কোনো সম্পর্ক নেই। কেননা সেগুলো ইবাদত হিসেবে বা সওয়াবের নিয়তে করা হয় না। সুতরাং সেগুলো মুবাহ এবং জায়েয। তবে শর্ত হলো সেগুলো যাতে শরীয়তের কোনো বিধানের সাথে সংঘর্ষপূর্ণ না হয়।

যেমন দুরূদ ও সালাম পাঠকালে দাঁড়িয়ে পাঠ করার আবশ্যকতা, গরীব-মিসকিনদেরকে খানা খাওয়ানোর মাধ্যমে ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে ধরাবাধা কিছু সূরা পড়ার ‘নিয়ম করে নেয়া’, জামাআতের সাথে নামায আদায়ের পর জামাআতের সাথেই কয়েকবার দু’আ করার ‘বাধ্যবাধকতা’, ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে তৃতীয় দিন বা চল্লিশতম দিন কোনো অনুষ্ঠান করা ইত্যাদির প্রচলন, রজব-শাবান ও অন্যান্য মাসের বরকতপূর্ণ রাত্রে নিজের পক্ষ হতে উদ্ভাবিত বিভিন্ন নিয়মের নামায এবং ঐ সমস্ত রাত্রে বিভিন্ন রকম আলোকসজ্জা ইত্যাদি করা এবং নিজেদের উদ্ভাবিত এসব পদ্ধতিকে ফরয ও ওয়াজিবের ন্যায় আবশ্যকীয় মনে করা এবং যারা তাতে অংশগ্রহণ করে না- তাদেরকে বিভিন্ন অপবাদ দেয়া ও গালমন্দ বা ভর্ৎসনা করা ইত্যাদি- এ সবই বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

বিদআতের সূচনা

নবীজীর তিরোধনের পর সাহাবায়ে কেরাম অত্যন্ত কঠোর হস্তে দমন করেছেন যাবতীয় বিদআত জন্মের সকল সম্ভাবনাকে। ফলে খোলাফায়ে রাশেদীনের সুদীর্ঘ ৩০ বছরে পৃথিবীতে কোনো বিদআতের আবির্ভাব দেখা দেয়নি। এমনকি তাবেয়ীন ও তাবে’ তাবেয়ীন এর যুগেও বন্ধ ছিল ধর্মের নামে অধর্মের এসব অনাকাক্সিক্ষত উদ্ভব।

এজন্যই হয়তো নবীজী বলে গেছেন যে,

‘আমার পরে তোমাদের যে ব্যক্তি বেঁচে থাকবে, সে অনেক মতভেদ দেখবে। এমতাবস্থায় তোমাদের কর্তব্য হবে, আমার সুন্নাতকে ও হিদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা এবং এ পথ ও পন্থার ওপর দাঁত দিয়ে কমড়ে ধরে থাকা।’ (তিরমিযী: ২৬৭৬ ও আবু দাউদ: ৪৬০৭)।

মুহাদ্দিস আল্লামা তুরবিশতী রহ. বলেছেন, এখানে খোলাফায়ে রাশেদীন দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইসলাম যুগীয় প্রথম চার খলীফা। কারণ অপর হাদীসে রাসূল সা. বলেছেন, খেলাফতের সময়কাল হবে ৩০ বছর। আর ৩০ বছর শেষ হয় হযরত আলী রা. এর খেলাফতের মাধ্যমে। তবে এর দ্বারা অবশ্য অন্যদের খেলাফতের নিষেধাজ্ঞা বোঝায় না। (সূত্র: শারহুল মাসাবীহ)।

বলা বাহুল্য যে, দুরূদ ও সালাম, দান-সাদাকা, পরলোকগত ব্যক্তিদের জন্য ইসালে সওয়াব, বরকতময় রাত্রে নামায এবং নামাযের পর দুআ- এ সবই ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। এ সবের প্রয়োজনীয়তা বর্তমানে যেমন আছে তেমনি সাহাবায়ে কিরাম রা.- এর যুগেও তা সমানভাবেই ছিল। এ সবের মাধ্যমে আখিরাতের সওয়াব এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভ করার আগ্রহ-উদ্দীপনা যা বর্তমান যুগের কোনো বুযুর্গের মাঝে সৃষ্টি হতে পারে।

হযরত রাসূলে কারীম সা. ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম রা.- এর আগ্রহ-উদ্দীপনা তার থেকেও অধিক ছিলো। কেউ কি এমন দাবী করতে পারে যে, তার ইবাদতের আগ্রহ এবং আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি লাভের আকাক্সক্ষা প্রিয়নবী সা. এর সাহাবায়ে কেরাম রা. এর চাইতেও অধিক?

হযরত হুযাইফাতুল ইয়ামান রা. ইরশাদ করেন-

كُلُّ عِبَادَةٍ لَمْ يَتَعَبَّدْ أَصْحَابُ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم فَلَا تَعْبُدُوْهَا فَاِنَّ الْأَوَّلَ لَمْ يَدَعْ لِلْآخِرِ مَقَالًا فَاتّقُوْا اللهَ يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِيْنَ وَخُذُوْا بِطَرِيْقٍ مَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ –

অর্থাৎ যে সকল ইবাদত হযরত সাহাবায়ে কেরাম রা. করেননি, সে সমস্ত ইবাদত তোমরা করো না। কেননা পূর্বসূরীগণ উত্তরসূরীদের জন্য এমন কোনো অসম্পূর্ণতা রেখে যাননি, যা পরবর্তীতে পুরা করতে হবে। সুতরাং হে মুসলিমগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং পূর্বসূরীদের আদর্শ অবলম্বন করো। (আল-ই‘তিসাম লিশ-শাতিবী রহ.- পৃ: ২০)।

মিলাদ-কিয়াম কি বিদআত

‘মিলাদ-কিয়াম’ মূলত একটি প্রচলিত বিদআত। কেননা কুরআন তথা আল্লাহর কিতাব, রাসূল সা. এর সুন্নাত, সাহাবাদের আমল এবং সম্মানিত তিন যুগ তথা নবীযুগ, সাহাবী-যুগ ও তাবেয়ী-যুগ-এ এর কোনো অস্তিত্ব ছিলনা। তাই ওলামায়ে কেরাম এটাকে বিদআত বলেন। কারণ যে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা হবে, কুরআন বা সুন্নাহয় অবশ্যই তার পক্ষে দলীল থাকতে হবে। আর মিলাদ-কিয়ামের পক্ষে এরকম কোন দলীল নেই বলেই এটি একটি বিদআতী ইবাদত। মূলত হিজরী ৬ষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত এ ধরনের মিলাদ কোথাও অনুষ্ঠিত হয়নি। হিজরী ৬ষ্ঠ  শতাব্দীর পর বাদশা মুজাফফররুদ্দীন আবু সাঈদ কৌকরী বিন আরবাল তিনি আমোদ-প্রমোদের জন্য এ বিদআতের সর্বপ্রথম উদ্বোধন করেন। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া– ১৩/১৫৯)

প্রচলিত এ মিলাদের সাথে আরেকটি প্রথা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে জুড়ে দেয়া হয়েছে। যার নাম দেয়া হয়েছে কিয়াম তথা দাঁড়িয়ে দরুদ পাঠ। এর  আবিষ্কার মিলাদেরও প্রায় ১০০ বছর পরে। ৭৫১ হিজরির দিকে।

সে যুগে খাজা তকিউদ্দিন নামে একজন ভাব কবি ও মাজযুব (কিছুটা পাগল গোছের) ব্যক্তি ছিলেন। নবীজীর শানে তিনি কিছু কাসিদা (কবিতা) রচনা করেন। বরাবরের ন্যায় একদিন তিনি কাসিদা পাঠ করছিলেন এবং ভাবাবেগে হঠাৎ তিনি দাঁড়িয়ে কাসিদা পাঠ করতে লাগলেন। ভক্তরাও তাঁর দেখাদেখি দাঁড়িয়ে গেল। বলা বাহুল্য, এটি কোনো মিলাদের অনুষ্ঠান ছিল না এবং ঘটনা এখানেই শেষ। জীবদ্দশায় তিনি আর কখনো এমনটি করেন নি।

খাজা তাকিউদ্দিনের এই অনিচ্ছাকৃত দাঁড়িয়ে পড়াটাকে মিলাদ জন্মের প্রায় একশত বছর পর এসে বিদআতপন্থীরা তা মিলাদের সঙ্গে জুড়ে দেয়। ফলে কিয়ামযুক্ত মিলাদ বিদআত হওয়ার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে।

এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পড়া যেতে পারে:
১. সুন্নাত ও বিদআত
২. ইসলামের দৃষ্টিতে বিদআত?
৩. কুরআন ও হাদীসের আলোকে বিদআত ও বিদআত পন্থীদের পরিচয়
৪. হালাল হারাম বিদআত ও ইজতিহাদ

নূরুল্লাহ মারূফ

নূরুল্লাহ মারূফ

Published 13 Jan 2020
আলেম, প্রাবন্ধিক
  1      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png