গল্পে গল্পে সীরাত পড়ি, আলোকিত জীবন গড়ি

সীরাত

মাক্কার মানুষ পালাচ্ছে। দলে দলে। আবালবৃদ্ধবণিতা—সবাই। ভীতসন্ত্রস্ত। মুহাম্মাদের দ্বীনকে তারা মেনে নেয় নি। আজ তিনি মাক্কায় আসছেন দলবল নিয়ে। আমজনতা তাই হোবল দেবতার আশ্রয় চায়। সরে পড়ছে পাহাড়ের পেছন দিকে। এক বুড়ি তাদের সাথে ছিল। একা। সন্তানহীনা। পেছনে পড়েছে দল থেকে। বয়সের ভারে ন্যুজ্ব। পথ চলায় ক্লান্ত, শ্রান্ত। ‘মা’ বলে এগিয়ে এলেন এক অচেনা মানুষ। দিলেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। বুড়ির পুটলিটা নিলেন কাঁধে। শীর্ণ হাত ধরে বুড়িকে পার করে দিলেন বাকি পথটুকু। পাহাড়ের আড়ালে, নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে গেলেন। আগন্তুক যাবার সময় নিজেকে মুহাম্মাদ বলে পরিচয় দিলেন। বুড়ির চোখে-মুখে তখন রাজ্যের বিস্ময়…। “যার ভয় দিলে, যার ভয়ে ঘরছাড়া, পালিয়ে আসা- তুমি সেই মুহাম্মাদ!” বুড়ির চোখের পাতা ভিজে আসে।

একটি শব্দে সব কথা বলা হয়ে যায়। আর কিছু জানান দিতে চান না তিনি; কিন্তু পাঠকের মনের পর্দায় সে বর্ণনার ব্যঞ্জনা ও স্নিগ্ধ লালিত্য যেন ঢেউ খেলে যায় নিরন্তর। মাক্কা-মদীনার প্রকৃতি মরুময়, রুক্ষ। তবে শিল্পীর কলমের কালিতে তা সিক্ত হয়। শক্ত শিলার ওপর যেন হাসনাহেনার কোমল হাসি। শুষ্ক নিসর্গও মানুষের মতো কথা কয়। তার নিসাড় শরীর প্রাণময় হয়ে ওঠে। কয়েক মুঠো শব্দ দিয়ে এরকম। তার নিসাড় শরীর প্রাণময় হয়ে ওঠে।

তিনি রাজা নন। বাদশাহ নন। হেজাযের সম্রাটও নন। প্রভু-প্রেরিত মহান পুরুষ। রাসূল। রাহমাতাল্লিল আলামিন। মানুষের নাবী। নাবীদের নাবী। কুলকানিয়াতের সেরা সৃষ্টি। সৎগুণের সর্বোচ্চ উৎকৃষ্টায় ভরপুর নিষ্কলুষ চরিত্র। মানবিক। জ্যোতির্ময়। সর্ব কালের সেরা মানুষ। তাঁকে নিয়েই আবদুল আযীয আল আমানের মহান তোহফা। নাবীচরিত সীরাতসিরিজের ছ’টি গ্রন্থ—১. সেই ফুলেরই রৌশনিতে, ২. মানুষের নাবী, ৩. আলোর রাসূল আল-আমীন, ৪. আলোর আবাবিল, ৫. রৌদ্রময় নিখিল ও ৬. অনন্তের দিকে প্রতিটিতে রয়েছে সাধারণ কিছু বিশেষত্ব, যা সজাগ পড়ুয়া আয়ত্ত করে নেবে অনায়াসেই।

একগুচ্ছ সীরাত-সাহিত্য
একগুচ্ছ সীরাত-সাহিত্য (নবী-জীবনের নিউক্লিয়াস)

BUY NOW

এই ছ’টি গ্রন্থের মোট ৮৪ টি ছোটগল্পের মূল অবলম্বন হাদীস। নবুওয়াতের ঈশিতা ও আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ রাসূল নয়, মানবিক রাসূলুল্লাহ সা.-এর ছবি আঁকাই গল্পগুলির নিহিত অভিপ্রায়। অভিপ্রায় হলো সমকালীন হিংসা, দ্বেষ, কলহ, অসহিষ্ণুতার বাতাবরণের সমান্তরালে কিংবা ওপরে উঠে একটি সাদা-শুদ্ধ স্বরের বার্তা দেওয়া। সহৃদয় পাঠকমহল একে শুধু পাঠ্যতালিকায় না রেখে ব্যবহারিকতায় নিয়ে আসবেন, আশা এটুকুই।

হাদীস এখানে সূত্র বা অনুসঙ্গ। সেই অর্থে এগুলি ধৰ্মীয়। তবে স্বীকার্য যে, হাদীস-কুরআনের anecdotes-কে ‘সূত্র’ রেখে গল্প রচনার ধারা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে থাকলেও তা বড় ক্ষীণ। ঈশপের ‘নীতিকথা’র ধরনে ধারাবাহিকভাবে প্রায় শতাধিক ইসলামী আখ্যান লেখার নযীর নেই বললেই চলে। আর সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হাদীসকে ‘মূল সূত্রে’ রাখাটাই কার্যত অভিনব একটি প্রয়াস।

লেখক আবদুল আযীয আল আমান (১৯৩২-১৯৯৪)। আজকের তরুণ পাঠকের কাছে তিনি প্রায় অচেনা, অপরিচিত। তবে যারা পুরোনো দিনের মানুষ, পড়ুয়া, লেখালেখির জগতের খোঁজ-খবর রাখেন, তারা হয়তো চিনতে পারবেন অনায়াসে। পশ্চিম বাংলায় জন্ম ও বেড়ে ওঠা, পড়াশোনার পাঠ চুকিয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। দাপটের সাথে লিখেছেন সাড়ে তিন দশক ধরে। সময়ের স্রোতে। সব রকম লেখাই এসেছে তার কলম ছুঁয়ে। নিজস্ব প্রকাশনা, সাংবাদিকতা ও অধ্যাপনার পাশে পাঁচ ডজনের বেশি স্বর্ণালি বই দিয়ে উৎকীর্ণ তার জীবনসরণি। যা অজস্র কলকথায় মুখরিত, দীপ্ত, সুরভিত। আমানের সৃষ্টির উজ্জ্বলতম দিক হলো রাসূলচরিত, সীরাত-অনুষঙ্গ। শিশুদের জন্য এই সীরাতের সুরভি-মাখানো গল্প বর্ণনায় তিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন। উন্মোচন করেছেন এক-একটি নতুন ভুবন। যা মমতা-রসে সিক্ত।

১৯৬৯-এ প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর এ সিরিজের প্রথম বইটি। শিশু-কিশোরদের জীবন গড়ার জন্য যা উপাদেয়, তা তো রাসূলের উত্তম আদর্শে উচ্চকিত। গল্পপাঠে তাদের মনোরাজ্যে এসে হাযির হয় নৈতিকতা, পরমত সহিষ্ণুতা, মানবতাবোধ, ধৈর্য, সেবা, সাহস ও প্রভু-নির্ভরতা। আজকের বিক্ষুব্ধ বিশ্বের বেড়ে-ওঠা উচ্ছল শিশু-কিশোরদের জন্য এসব বই নিতান্ত জরুরী। এই বইয়ে রাসূল সা.-কে নিয়ে গল্প এসেছে বারোটি। শুরুর গল্পটি ‘সেই ফুলেরেই রৌশনিতে’দিয়েই বইয়ের নামকরণ। এর পরের গল্পটি ‘একটি মহান হৃদয়’। পর পর এ দুটো গল্পের কেন্দ্রভূমিতে দুজন বুড়ি। দুই বুড়ির কাহিনিও আলাদা সময়ের, পরিবেশের।

পাখি নীড় ছেড়ে নীল আকাশে পাখা মেলে। সে চায় বিদূর নীল, ঠিকানাবিহীন আকাশে মিলিয়ে যেতে। পারে না শেষ অবধি। ফিরে আসে আপন কুলায়। তার অশু, অতৃপ্তি, প্রশ্ন, অজ্ঞতা, মগ্নতা, মুখরতা—সবকিছুই তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। অনন্ত পিপাসার প্রদীপ আর নেভে না। মানুষ এক অবুঝ পাখি। তাকে ফিরতে হয় আপন আবর্তে। যেখান থেকে শুরু হয় তার জীবনের চিহ্ন, সেখানে ফিরতে হয়। সেই রুদুর জগৎ, সেই প্রিয়তম প্রভুর কাছে। তার ভালোবাসা, সংরাগ,আকুতি, প্রাপ্তি—সবই সমর্পণ করে পরম পালিয়তাকে, সৃজয়িতার উদ্দেশ্যে। তবু কী যেন সে পায় নি । সে তো তৃষিত তিথির অতিথি।…

পথিমধ্যে এক পান্থজনের সাথে সাক্ষাৎ। যিনি বার্তাবাহক। আকাশজ বাণী-বৈভব তাঁর কলবে গাঁথা। তিনি তো রাসূল সা.। সঠিক পথ বাতলে দিতে পারেন। কালান্তরে এসেও এই পথিকের কোনো কিছু হারিয়ে যায় না। প্রতি পদবিক্ষেপের শব্দও যেন মানুষ শুনতে পায়। লাওহে মাহফুযের বার্তা ও তাঁর কোমল-পেলব সান্নিধ্য তাকে বার বার আকুল করে তোলে। যারা তাকে দেখে নি তৃষিত চোখ দিয়ে তারাও উন্মন-উন্মুখ হয় তার জন্য। এমনকি তার কথাও অক্ষরে অক্ষরে পালন করে—তার নৈতিকতা, শিক্ষা, উদারতা—সবকিছুই তার ভেতরের জগতে আবেগ ও উত্তাপ ছড়ায়।

এ নিয়েই যুগে যুগে রচিত হয়েছে সীরাত-গ্রন্থ। রাসূলচরিত। সেই ধারাবাহিকতায় আবদুল আযীয আল আমানের সীরাত-সিরিজের শেষ নিবেদন—‘অনন্তের দিকে। মূল দশটি গল্প, তার সাথে যুক্ত হয়েছে। আরও দশটি গল্প। সব সাকুল্যে বিশটি। প্রতি গল্পের কেন্দ্রভূমিস্পর্শ করে আছেন রাসূল সা.। সফেদ তরঙ্গের মতো মানুষের হৃদয়-তন্ত্রীতে বেজে ওঠে, ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়, একান্ত অন্তরঙ্গ মূৰ্ছনায়।

আমরা রাসূল সা.-কে দেখি নি। তার সান্নিধ্যেও আসতে পারি নি। তবুও তাঁকে নিয়ে এই গল্পগুলোর অশরীরী অনুভবে হৃদয় তো জেগে উঠতে পারে। শিশুর সাথে আমরাও শরিক হই এই গ্রন্থপাঠে। স্বপ্নকল্পনায় ও আধো-জাগরণে সেই নাবীর পুণ্যময়-স্নিগ্ধ মুহাব্বাতে। ১৯৬৯ থেকে ২০২০, হরফ থেকে বইকেন্দ্র—এক দীর্ঘ বন্ধুর পথ পেরিয়ে এই সীরাত-সিরিজ আবারও আলোর মুখ দেখল। মহান আল্লাহর দরবারে তাই অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই।

-সিরিজের ভূমিকা থেকে পরিমার্জিত

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading