হাদিস নিয়ে জানা অজানা

হাদিস

“রাসুল তোমাদের যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা তোমাদের নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক।” ( সূরা হাশর: আয়াত ৭)

কুরআন মাজীদ ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ, যা আল্লাহর বাণী বলে মুসলমানরা বিশ্বাস করে থাকেন। মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের জন্য এটি সংবিধানতুল্য এবং পুর্নাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত। কুরআন শরীফে থাকা ইসলামের বিভিন্ন মূলনীতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ এবং তা বাস্তবায়নের কার্যকর পন্থার নির্দেশনা আছে হাদিস নামে অন্য কিছু গ্রন্থে।

হাদিস কি?

আল্লাহ তা’আলা জীবরাঈল (আঃ) এর মাধ্যমে ইসলামের শেষ বাণীবাহক হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর কাছে যে ওহী (গোপনে কথা বলা বা ইশারা করা) নাযিল করেন সেগুলোই হাদিসের মূল উৎস।  ওহী প্রধানত দুই প্রকার। একটি হচ্ছে প্রত্যক্ষ ওহী। এই ওহী রাসূল (সঃ) এর উপর সরাসরি নাযিল হতো।  কুরআন শরীফ এই প্রত্যক্ষ ওহী থেকেই রচিত।  অন্যটি হচ্ছে পরোক্ষ ওহী। এই ওহী রাসূল (সঃ) এর উপর প্রচ্ছন্নভাবে নাযিল হতো।   মহানবী (সঃ) নিজের ভাষায়, নিজের কথা, কাজ এবং সম্মতির মাধ্যমে এই ওহী প্রকাশ করেছেন। এগুলোই হাদিস নামে পরিচিত। তবে মুহাদ্দিসগণ (হাদিস চর্চা করেন এবং বহুসংখ্যক হাদিসের সনদ ও মতন সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান রাখেন এমন ব্যক্তি) রাসুল (সঃ) সম্পর্কিত বর্ণনা ও তাঁর গুণাবলি সম্পর্কিত বিবরণকেও হাদিসের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। হাদিস যে ওহীর সূত্রে প্রাপ্ত এবং শরী’আতের অন্যতম উৎস সে সম্পর্কে পবিত্র কুরআন শরীফেই প্রমাণ পাওয়া যায়।

আল্লাহ বলেন,
“তোমাদের সঙ্গী বিভ্রান্ত নয়,  বিপথগামীও নয়। এবং সে নিজ ইচ্ছামতে কোন কথাও বলে না। এ তো ওহী যা তাঁর কাছে প্রত্যাদেশ হয়। ” (সূরা নাজ্মঃ আয়াত ২-৪)

হাদিস সংকলনের ইতিহাস

হাদিস সংকলনের ইতিহাস

সাহাবায়ে কিরাম (রঃ) মহানবী (সঃ)-এর প্রতিটি কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং তাঁর প্রতিটি কাজ ও আচরণ সুক্ষ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করতেন। রাসুলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে ইসলামের আদর্শ ও এর যাবতীয় নির্দেশ যেমন মেনে চলার হুকুম দিতেন, তেমনি তা স্মরণ রাখতে এবং অনাগত মানব জাতির কাছে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি সাহাবীগণকে সম্বোধন করে বলেছেনঃ
“আমার পরে লোকেরা তোমাদের নিকট হাদিস শুনতে চাইবে। তাঁরা এই উদ্দেশ্যে তোমাদের নিকট এলে তাঁদের প্রতি সদয় হয়ো এবং তাঁদের নিকট হাদিস বর্ণনা করো।” (মুসনাদ আহমদ)।

রাসুল (সঃ)-এর বাণীর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তাঁর সাহাবীগণ হাদিস সংরক্ষনে উদ্যোগী হন।

প্রধানত তিনটি শক্তিশালী উপায়ে মহানবী (সঃ)- এর হাদিস সংরক্ষিত হয়ঃ (১) উম্মতের নিয়মিত আমল, (২) রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর লিখিত ফরমান, সাহাবীদের নিকট লিখিত আকারে সংরক্ষিত  হাদিস ও পুস্তিকা এবং (৩) হাদিস মুখস্থ করে স্মৃতির ভাণ্ডারে সঞ্চিত রাখা, তারঃপর বর্ণনা ও শিক্ষাদানের মাধ্যমে লোক পরম্পরায় তাঁর প্রচার।

সেকালে আরবদের স্মরণশক্তি অসাধারণভাবে প্রখর ছিল। কোন কিছু স্মৃতিতে ধরে রাখবার জন্য একবার শ্রবণই তাঁদের জন্য যথেষ্ট ছিল। স্মরণশক্তির সাহায্যে আরববাসীরা হাজার বছর ধরে তাঁদের জাতীয় ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করে আসছিল। হাদিস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক উপায় হিসেবে এই মাধ্যমটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মহানবী (সঃ) যখনই কোন কথা বলতেন, উপস্থিত সাহাবীগণ পূর্ণ আগ্রহ ও আন্তরিকতা সহকারে তা শুনতেন, অতঃপর মুখস্থ করে নিতেন। তদানীন্তন মুসলিম সমাজে প্রায় এক লক্ষ লোক রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর বানী ও কাজের বিবরণ সংরক্ষণ করেছেন এবং স্মৃতিপটে ধরে রেখেছেন। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রঃ) বলেন,   “আমরা রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর হাদিস মুখস্থ করতাম।” (সহীহ মুসলিম, ভূমিকা)

উম্মতের নিরবচ্ছিন্ন আমল, পারম্পারিক পর্যালোচনা, শিক্ষাদানের মাধ্যমেও হাদিস সংরক্ষিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সঃ) যে নির্দেশই দিতেন, সাহাবীগণ সাথে সাথে তা কার্যে পরিণত করতেন। তাঁরা মসজিদ অথবা কোন নির্দিষ্ট স্থানে একত্র হতেন এবং হাদিস আলোচনা  করতেন। আনাস ইবনু মালিক (রঃ) বলেন, “আমার মহানবী (সঃ)-এর নিকট হাদিস শুনতাম। তিনি যখন মজলিশ থেকে উঠে চলে যেতেন, আমরা শ্রুত হাদিসগুলো পরস্পর পুনরাবৃত্তি ও পর্যালোচনা করতাম। আমাদের এক একজন করে সবাই হাদিসগুলো মুখস্থ শুনিয়ে দিতেন। এ ধরনের প্রায় বৈঠকেই অন্তত ষাট-সত্তরজন লোক উপস্থিত থাকতেন। বৈঠক থেকে আমরা যখন উঠে যেতাম তখন আমাদের প্রত্যেকেরই সবকিছু মুখস্থ হয়ে যেত”- (আল-মাজমাউয-যাওয়াইদ, ১ম খন্ড, পৃ ১৬১)

প্রাথমিক পর্যায়ে কুরআন মজীদ ব্যাতিত সাধারণতঃ অন্য কিছু লিখে রাখা হত না। পরবর্তীকালে হাদিসের বিরাট সম্পদ লিপিবদ্ধ হতে থাকে। ‘হাদিস নবী করীম (সঃ)-এর জীবদ্দশায় লিপিবিদ্ধ হয়নি, বরং তাঁর ইন্তেকালের শতাব্দী কাল পর লিপিবদ্ধ হয়েছে’ বলে যে ভুল ধারনা প্রচলিত আছে তাঁর আদৌ কোন ভিত্তি নেই। অবশ্য একথা ঠিক যে, কুরআনের সঙ্গে হাদিস মিশ্রিত হয়ে জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে- কেবল এই আশংকায় ইসলামী দাওয়াতের প্রাথমিক পর্যায় রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছিলেনঃ “আমরা কোন কথাই লিখো না। কুরআন ব্যাতিত আমার নিকট থেকে কেউ অন্য কিছু লিখে থাকলে তা যেন মুছে ফেলে।”(মুসলিম) কিন্তু যেখানে এরূপ বিভ্রান্তির আশংকা ছিল না মহানবী (সঃ) সে সকল ক্ষেত্রে হাদিস লিপিবদ্ধ করে রাখতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করতেন।

আবদুল্লাহ ইবন আমর (রঃ) রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন, “হে আল্লাহ্‌র রাসূল ! আমি হাদিস বর্ণনা করতে চাই। তাই যদি আপনি অনুমতি দেন, তাহলে আমি স্মরণশক্তির ব্যাবহারের সাথে সাথে লেখনীরও সাহায্য গ্রহণ করতে ইচ্ছুক।” তিনি বললেনঃ “আমার হাদিস কণ্ঠস্থ করার সাথে সাথে লিখেও রাখতে পার”(দারামী)। আবদুল্লাহ ইবন আমর (রঃ) আরও বলেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট যা কিছু শুনতাম, মনে রাখার জন্য তা লিখে নিতাম। কতিপয় সাহাবী আমাকে তা লিখে রাখতে নিষেধ করলেন এবং বললেন, রাসুলুল্লাহ (সঃ) একজন মানুষ, কখনও স্বাভাবিক অবস্থায় আবার কখনও রাগান্বিত অবস্থায় কথা বলেন।” এ কথা বলার পর আমি হাদিস লেখা থেকে বিরত থাকলাম, অতঃপর তা রাসুলুল্লাহ (সঃ)-কে জানালাম। তিনি নিজ হাতের আঙ্গুলের সাহায্যে স্বীয় মুখের দিকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ “ তুমি লিখে রাখ। যেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রান, এই মুখ দিয়ে সত্য ছাড়া অন্য কিছু বের হয় না” (আবূ দাঊদ, মুসনাদ আহমেদ, দারমী, হাকিম, বায়হাকী)। তাঁর সংকলনের নাম ছিল ‘সাহীফায়ে সাদিকা’ ।

আবু হুরায়রা (রঃ) বলেন, এক আনসারী সাহাবী রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর কাছে আরয করলেন, হে আল্লাহ্‌র রাসুল ! আপনি যা কিছু বলেন, আমার কাছে খুবই ভালো লাগে, কিন্তু মনে রাখতে পারি না। নবী করীম (সঃ) বললেনঃ “ তুমি ডান হাতের সাহায্য নাও।” তারপর তিনি হাত এর ইশারায় লিখে রাখার প্রতি ইঙ্গিত করলেন- (তিরমিযী, হাদিসটি যঈফ )

আলী ইবন আবূ তালিব (রঃ)-ও হাদিস লিখে রাখতেন। চামড়ার থলের মধ্যে রক্ষিত সংকলনটি তাঁর সঙ্গেই থাকত। তিনি বলতেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট থেকে এ সহীফা ও কুরআন মজীদ ব্যাতিত আর কিছু লিখিনি। সংকলনটি স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সঃ) লিখিয়ে ছিলেন। এতে যাকাত, রক্তপাত(দিয়াত), বন্দীমুক্তি, মদীনার হেরেম এবং আরও অনেক বিষয় সম্পর্কিত বিধান উল্লেখ ছিল (বুখারী, ফাতহুল বারী)।

এসব ঘটনা থেকে পরিষ্কারভাবে প্রমানিত হয় যে, নবী (সঃ)-এর সময় থেকেই হাদিস লেখার কাজ শুরু হয়।

সাহাবীগণ যেভাবে রাসুলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট থেকে হাদিসের জ্ঞান লাভ করেন, তেমনিভাবে হাজার হাজার তাবিঈ সাহাবীগণের কাছে হাদিসের শিক্ষা লাভ করেন। হিজরী দ্বিতীয় শতকের শুরু থকে কনিষ্ঠ তাবিঈ ও তাবিঈ-তাবিঈনের এক বিরাট দল সাহাবা ও প্রবীণ তাবিঈনের বর্ণিত ও লিখিত হাদিসগুলো ব্যাপকভাবে একত্র করতে থাকেন। এ সময় ইসলাম বিশ্বের খলীফা উমর ইবন আবদুল্লাহ আযীয (রঃ) দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রশাসকদের নিকট হাদিস সংগ্রহ করার জন্য রাজকীয় ফরমান প্রেরন করেন। ফলে সরকারী উদ্যোগ সংগৃহীত হাদিসের বিভিন্ন সংকলন সিরিয়ার রাজধানী দামেশক পৌঁছতে থাকে। খলীফা সেগুলোর একাধিক পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দেশের সর্বত্র পাঠিয়ে দেন।  ইমাম আবূ হানীফা (রঃ)-এর নেতৃত্বে কূফায় এবং ইমাম মালিক (রঃ) তাঁর মুত্তয়াত্তা গ্রন্থ এবং ইমাম আবূ হানীফার দুই সহচর ইমাম মুহাম্মদ ও আবূ ইউসুফ (রঃ) ইমাম হানীফার রিওয়ায়াতগুলো একত্র করে ‘কিতাবুল আসার’ সংকলন করেন। এ যুগের আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হাদিস সংকলন হচ্ছেঃ জামি’ সুফইয়ান সাওরী, জামি’ইবনুল মুবারক, জামি’ইমাম আওযাঈ, জামি’ ইবন জুরাইজ ইত্যাদি।

হিজরী দ্বিতীয় শতকের শেষার্ধ থেকে চতুর্থ শতকের শেষ পর্যন্ত হাদিসের চর্চা আরও ব্যাপকতর হয়। এ সময়কালে হাদিসের প্রসিদ্ধ ইমাম-বুখারী, মুসলিম, আবূ ঈসা তিরমিযী, আবূ দাঊদ সিজিস্তানী, নাসাঈ ও ইবন মাজা (রঃ)-এর আবির্ভাব হয় এবং তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দীর্ঘ অধ্যবসায়ের ফলশ্রুতিতে সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ছয়খানি হাদিস গ্রন্থ (সিহাহ সিত্তাহ) সংকলিত হয়। এ যুগেই ইমাম শাফিঈ (রঃ) তাঁর কিতাবুল উম্ম ও ইমাম আহমেদ (রঃ) তাঁর আল-মুসনাদ গ্রন্থ সংকলন করেন। হিজরীর চতুর্থ শতকে মুসতাদরাক হাকিম, সুনান দারি কুনতী, সহীহ ইবন হিব্বান, সহীহ ইবন খুযায়মা, তাবারানীর আল-মু’জাম, মুসান্নাফুত-তাহাবী এবং আরও কতিপয় হাদিস গ্রন্থ সংকলিত হয়। ইমাম বায়হাকীর সুনানু কুবরা ৫ম হিজরী শতকে সংকলিত হয়।চতুর্থ শতকের পর থেকে এ পর্যন্ত সংকলিত হাদিসের মৌলিক গ্রন্থগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের সংকলন ও হাদিসের ভাষ্য গ্রন্থ এবং এই শাস্ত্রের সাখা-প্রশাখার উপর ব্যাপক গবেষণা ও বিভিন্ন গ্রন্থ রচিত হয়। বর্তমান কাল পর্যন্ত এ কাজ অব্যাহত রয়েছে।

হাদিসের প্রকারভেদ
ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া তথ্যমতে, হাদিসকে প্রাথমিক পর্যায়ে তিন ভাগে ভাগ করা যায়।
প্রথমটি কাওলী হাদিস। কোনো বিষয়ে মহানবী (সঃ) যা বলেছেন, সেসব যে হাদিসে বিবৃত করা হয়েছে, তাকে বলা হয় কাওলী হাদিস।  উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে,  হযরত রাসূলে করীম (স.) বলেছেন- ফাসেক (যে ব্যক্তি নিয়মিত কবীরাহ গুনাহতে লিপ্ত থাকে অথবা প্রকাশ্যে মহান আল্লাহ পাক উনার নিষিদ্ধ ঘোষিত হারাম কাজ করতে অভ্যস্ত এবং তোওবা করে পাপ কাজ থেকে ফিরে আসেনা, তাকে ফাসেক বলা হয়।)  ব্যক্তির প্রশংসা ও স্তুতি করা হলে আল্লাহ তায়ালা অসন্তুষ্ট ও ক্রুদ্ধ হন এবং এ কারণে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে। (বায়হাকী)
এই হাদীসটি রাসূল (স.)-র একটি বিশেষ কথার উল্লেখ থাকার কারণে এটা কাওলী হাদিস।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে ফে’লী হাদিস৷ মহানবী (সঃ) এর কাজ, চরিত্র এবং আচার আচরণের মধ্য দিয়ে ইসলামি জীবন বিধানের স্পষ্ট চিত্র ফুটে উঠেছে। এসব কাজের বর্ণনা যে হাদিসে উল্লেখ আছে সেগুলোকে বলা হচ্ছে ফে’লী হাদিস।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আনাস ইবনু মালিক হতে বর্ণিত আছে, রাসূল (সঃ) সূর্য ঢলে পড়লে যুহরের নামাজ আদায় করেছেন। (সহীহ আত্-তিরমীযীঃ ১ম খন্ড, হাদিস নং ১৫৬)
এই হাদীসটিতে রাসূলের (স.)-র একটি কাজের বর্ণনা দেয়া হয়েছে এই জন্য এটি ‘হাদিসে ফে’লী’।

তৃতীয় এবং সর্বশেষটি হচ্ছে তাকরীরী হাদিস। সাহাবীগণের যেসব কথা ও কাজে মহানবী (সঃ) এর সম্মতি ছিল সেসব কথা ও কাজের বিবরণ যেসব হাদিসে উল্লেখ আছে,  সেগুলোকে তাকরীরী হাদিস বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়,  “আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন : আমরা রাসূল (সাঃ) এর সাথে সালাত আদায় করতাম । আমাদের কেউ কেউ গরমের কারণে কাপড়ের প্রান্ত সিজদার স্হানে রাখতো ।” ( বুখারী , ১ম খন্ড, হাদীস নং: ৩৭৮)

এছাড়াও হাদিসের আরও নানান প্রকারভেদ থাকার কথা জানা যায়।
হাদিসের মূল কথাটুকু যে সূত্র পরম্পরায় গ্রন্থ সংকলনকারী পর্যন্ত পৌছেছে তাকে ‘সনদ’ বলে। এতে হাদিস বর্ণনাকারীর নাম একের পর এক সজ্জিত থাকে।  বর্ণনাকারীদের (রাবী) সিলসিলা অনুযায়ী হাদিসকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়ঃ
ক. মারফু খ. মওকুফ গ. মাকতু

রাবীদের বাদ পড়ার দিক থেকে হাদিস দু’প্রকার যথা : ১. মোত্তাছিল ২. গায়ের মোত্তাছিল।
হাদিস গায়ের মোত্তাছিল আবার কয়েক প্রকারঃ ক. মু’আল্লাক খ. মুরসাল গ. মুনকাতা ঘ. মুদাল্লাস ঙ. মো’দাল।

বর্ণনার দুর্বলতার জন্য হাদিসের প্রকারভেদ-
১. মুজতারাব ২. মুদরাজ ৩. মাকলুব ৪. শাহ’জ ৫. মুনকার ৬. মুআল্লাল।

রাবীদের যোগ্যতা অনুসারে হাদিস তিন প্রকার-
১. সহীহ ২. হাসান ৩. জয়ীফ

হাদিস বর্ণনা করার ব্যাপারে সকল ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীদের সংখ্যা এক রকম হয়নি। কখনো কম কখনো বা বেশী হয়েছে। এ জন্য এর ভিত্তিতে হাদিসকে বেশ কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। যেমমঃ মুতাওয়াতির হাদিস। এটির আবার বেশকিছু ভাগ আছে।

খবরে ওয়াহিদ নামে আরেক ধরনের হাদিস শ্রেণীবিন্যাস রয়েছে। প্রত্যেক যুগে এক, দুই বা তিন জন রাবী কতৃক বর্ণিত হাদিসকে খবরে ওয়াহিদ বা আখবারুল আহাদ বলে। এই হাদিস তিন প্রকার- মাশহূর, আযীয এবং গরীব।

হাদিসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  হলো হাদিসে কুদসী। এ হাদিসের মুল বক্তব্য সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে  প্রাপ্ত। আল্লাহ তার নবীকে ‘ইলহাম’ কিংবা স্বপ্নযোগে অথবা জিবরাইল (আঃ) এর মাধ্যমে যা জানাতেন নবীজী নিজ ভাষায় তা বর্ণনা করতেন। একে বলা হয় হাদিসে কুদসী।

হাদিস গ্রন্থ প্রনয়নের বিভিন্ন ধরন ও পদ্ধতি রয়েছে। এসব গ্রন্থের নামও বিভিন্ন ধরনের। নিম্নে এর কতিপয় প্রসিদ্ধ পদ্ধতির নাম উল্লেখ করা হলঃ
১। আল-জামিঃ
যে সব হাদিসগ্রন্থে (১) আকীদা-বিশ্বাস (২) আহকাম ( শরিয়াতের আদেশ-নিষেধ) ৩) আখলাক ও আদব (৪) কুরআনের তাফসীর (৫) সীরাত ও ইতিহাস (৬) ফিতনা ও আশরাত অর্থাৎ বিশৃঙ্খলা ও আলামতে কিয়ামত (৭) রিকাক অর্থাৎ আত্নশুদ্ধি (৮) মানাকিব অর্থাৎ ফযিলত ইত্যাদি সকল প্রকারের হাদিস বিভিন্ন অধ্যায়ে সন্নিবেশিত হয়, তাঁকে আল-জামি বলা হয়। সাহীহ বুখারী ও জামি তিরমিযী এর অন্তর্ভুক্ত।

২। আস-সুনানঃ
যেসব হাদিসগ্রন্থে কেবল মাত্র শরী’আতের হুকুম-আহকাম ও ব্যাবহারিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ম-নীতি ও আদেশ-নিষেধমূলক হাদিস একত্রিত করা হয় এবং ফিকহ গ্রন্থের ন্যায় বিভিন্ন অধ্যায় ও অনুচ্ছেদ সজ্জিত হয় তাঁকে সুনান বলে।
যেমন- সুনান আবূ দাঊদ, সুনান নাসাঈ, সুনান ইবন মাজা ইত্যাদি। তিরমিযী শরীফও এই হিসেব সুনান গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত।

৩। আল-মুসনাদঃ
যে সব হাদিসগ্রন্থে সাহাবীগণের বর্ণিত হাদিসসমূহ তাঁদের নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী অথবা তাঁদের মর্যাদা অনুযায়ী পরপর সংকলিত হয়, ফিকাহের পদ্ধতিতে সংকলিত হয় না তাঁকে আল-মুসনাদ বা আল-মাসানীদ বলা হয়। যেমন- হযরত আয়িশা (রঃ)কর্তৃক বর্ণিত সমস্ত হাদিস তাঁর নামের শিরোনামের অধীনে একত্রিত করা হলে। ইমাম আহমদ (রঃ)-এর আল-মুসনাদ গ্রন্থ, মুসনাদ আবূ দাঊদ তা’য়ালিসী (রঃ) ইত্যাদি এই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।

৪। আল-মু’জামঃ
যে হাদিসগ্রন্থে মুসনাদ গ্রন্থের পদ্ধতিতে এক একজন উস্তাদের নিকট থেকে প্রাপ্ত হাদিসসমুহের পর্যায়ক্রমে একত্রে সন্নিবেশ করা হয় তাঁকে আল-মু’জাম বলে। যেমন- ইমাম তাবারানী (রঃ) সংকলিত আল- মু’জামুল কবীর।

৫। আল-মুসতাদরাকঃ
যেসব হাদিস বিশেষ কোন হাদীসগ্রন্থে শামিল করা হয়নি অথচ তা সংশ্লিষ্ট গ্রন্থকারের অনুসৃত শর্তে পূর্ণমাত্রায় উত্তীর্ণ হয়, সে সব হাদিস যে গ্রন্থে সন্নিবেশ করা হয় তাঁকে আল-মুসতাদরাক বলা হয়। যেমন- ইমাম হাকিম নিশাপুরী (রঃ)-এর আল-মুসতাদরাক গ্রন্থ।

৬। রিসালাঃ
যে ক্ষুদ্র কিতাবে মাত্র এক বিষয়ের অথবা এক রাবীর হাদিসসমূহ একত্র করা হয়েছে তাঁকে রিসালা বা জুয বলা হয়।

৭। সিহাহ সিত্তাহঃ
বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, আবূ দাঊদ, নাসাঈ ও ইবন মাজা- এই ছয়টি গ্রন্থকে একত্রে সিহাহ সিত্তাহ বলা হয়।

৮। সাহীহায়নঃ
সাহীহ বুখারী ও সাহীহ মুসলিমকে একত্রে সাহীহায়ন বলা হয়।

৯। সুনানে আরবা’আঃ
সিহাহ সিত্তার অপর চারটি গ্রন্থ আবূ দাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ এবং ইবন মাজাকে একত্রে সুনানে আরবা’আ বলা হয়।

হাদিসের কিতাবসমূহকে মোটামুটিভাবে পাঁচটি স্তরে বা তাবাকায় ভাগ করা হয়েছে। শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী (রঃ) তাঁর ‘হুজ্জাতুল্লাহহিল বালিগা’ নামক কিতাবে পাঁচ স্তরে ভাগ করার কথা উল্লেখ আছে।

বোখারী শরীফ
বোখারী শরীফ, ১-১০ খন্ড এখানে দেখুন

হাদিসের সংখ্যা

হাদিসের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। মোট হাদিসের সংখ্যা সাহাবা ও তাবেয়ীনের (তাবেয়ী বলতে যাঁরা মহানবী (সঃ)কে দেখেননি কিন্তু মহানবী (সঃ) এর সান্নিধ্যে থাকা সাহাবীদের সঙ্গ পেয়েছেন তাদের বুঝানো হয়) আছারসহ এক লক্ষের অধিক নয় বলে মনে করা হয়।

এর মধ্যে প্রথম শ্রেণীর সহীহ হাদিসের সংখ্যাটা দশ হাজারেরও কম।  বুখারী ও মুসলিম শরীফ সহীহ হাদিসের কিতাব। কিন্তু সমস্ত সহীহ হাদিসই যে বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে তা নয়। ইমাম বুখারী (রঃ) বলেছেনঃ ‘আমি আমার এ কিতাবে সহীহ ব্যাতীত কোন হাদিসকে স্থান দেই নাই এবং বহু সহীহ হাদিসকে আমি বাদও দিয়েছি।’ এইরূপে ইমাম মুসলিম (রঃ) বলেনঃ ‘আমি এ কথা বলি না যে, এর বাইরে যে সকল হাদিস রয়েছে সেগুলি সমস্ত যইফ।’

সিহাহ্ সিত্তাহ অর্থাৎ প্রসিদ্ধ ছয় হাদিসগ্রন্হে থাকা হাদিসের সংখ্যা টা নিম্নরূপঃ
১. সহীহ বুখারী, সংগ্রাহকঃ ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল বুখারী (র), অন্তর্ভুক্তি সংখ্যাঃ ৭২৭৫ টি হাদিস। পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে এই সংখ্যাটা ২৫১৩টি।

২. সহীহ মুসলিম, সংগ্রাহকঃ ইমাম আবু হোসাইন মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ (র) , অন্তর্ভুক্তি সংখ্যাঃ ৭২৮২ টি হাদিস। পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে এই সংখ্যাটা ৪০০০টি।

৩.  সুনানে নাসাই, সংগ্রাহকঃ ইমাম আবূ আবদির রাহমান আহমদ ইবনে শু’আয়ব    ল আন-নাসাঈ (র), অন্তর্ভুক্তি সংখ্যাঃ ৫৭৫৮ টি হাদিস। পুনরাবৃত্তি নেই তেমন।

৪.  সুনান আবু দাউদ, সংগ্রাহকঃ ইমাম আবু দাউদ সুলায়মান ইবনুল আশ’আস আস্-সিজিস্তানী (র)  , অন্তর্ভুক্তি সংখ্যাঃ ৫১৮৫ টি হাদিস। মুরসাল (যে হাদীসের সাহাবীর নাম বাদ পড়েছে এবং তাবিঈ সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর উল্লেখ করে হাদিস বর্ণনা করেছে) হাদিস আছে প্রায় ৬০০ টি।

৫.  সহীহ্ আত্-তিরমিযী,  সংগ্রাহকঃ ইমাম হাফিয মুহাম্মাদ বিন ঈসা সাওরাহ  আত্-তিরমিযী, অন্তর্ভুক্তি সংখ্যাঃ ৩৬০৮ টি হাদিস।

৬.  সুনান ইবনে মাজাহ, সংগ্রাহকঃ আল-হাফিয আবূ আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন ইয়াযীদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু মাজাহ আল-কাযবীনী  , অন্তর্ভুক্তি সংখ্যাঃ ৪৩৪১ টি হাদিস।

“তারা আল্লাহর বাণী শুনত, তারপর তা পরিবর্তন করে দিত ” (আল-বাক্বারাহ ৭৫-৭৬)

জাল হাদিস

জাল হাদিস বলতে এমন সব হাদিস বা কর্ম বোঝায় যা রাসূল(সঃ) বলেননি বা করেননি অথচ তার নামে তা কথিত বা প্রচারিত হয়েছে।সিহাহ সিত্তাহ্(ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ) সহ অন্যান্য নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থসমূহে এই হাদিসগুলো পাওয়া যায় না। পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে কথাগুলো রাসূল(সঃ) এর নামে সমাজে প্রচলিত হয়েছে এবং প্রসিদ্ধি পেয়েছে।

জাল হাদিস বর্ণনার ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে রাসূলুল্লাহ(সঃ) বলেন, “যে ব্যাক্তি আমার নামে মনগড়া কথা রচনা করলো, যা আমি বলি নি, সে যেন তার বাসস্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করলো “( ইবনু মাজাহঃ ৫/৩৪)

জাল হাদিসের একটি উদাহরণ ঃ
“জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীনে যেতে হলেও যাও”

ইবন জাওযি এবং ইবন হিব্বান এটি জাল বলে প্রমাণ করেছেন। আলবানির সংকলিত ৫০০০ টি দুর্বল হাদিসের সংগ্রহে এটিকে জাল বলে চিহ্নিত করা হয়েছে (সিলসিলাতুল আহাদিথ আল যায়িফা, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৪১৩)। এই জাল হাদিসটি মানুষকে জ্ঞান অর্জনের জন্য উদ্বুদ্ধ করতে ব্যবহার করা হয়—যা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ উদ্দেশ্য। কিন্তু সে জন্য নবী (সঃ) এর  নাম ব্যবহার করে ধর্মের নামে মিথ্যা কথা প্রচার করাকে ইসলামে একটি বিরাট গুনাহ হিসেবে দেখা হয়।

হাদিস হচ্ছে কুরআনের ব্যাখ্যা। মহানবী (সঃ) কুরআনের আয়াত দ্বারা কী বুঝেছেন, সাহাবীদের কীভাবে কুরআনের আয়াত ব্যাখ্যা করেছেন, সেইসব না জানা থাকলে এক একজন কুরআনের আয়াতের এক এক অর্থ বের করতে পারে। শুধুমাত্র নবীজী এবং তার সাহাবীগণই সঠিকভাবে বলতে পারবেন, কোন প্রেক্ষাপটে কী কারণে একটি আয়াত নাজিল হয়েছিল। সেগুলো শুধুমাত্র হাদিসেই পাওয়া সম্ভব। কুরআন সম্পর্কিত ব্যাখ্যা এবং পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বিধি-বিধান সম্পর্কে জানতে তাই হাদিস জানাটা একান্তই জরুরি।

হাদিসের বই সমূহ কিনতে ক্লিক করুন ! 

 

*তথ্য সূত্র: 
১. https://www.britannica.com/topic/Hadith
২. সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২২-৩৬)
৩. http://imam.gov.bd/singlepost/4089
৪. হাদীস সংকলনের ইতিহাস —- মওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম
৫. সহীহ মুসলিম (বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার,  ১ম খন্ড)
৬. হাদিসের নামে জালিয়াতি, ড. খোন্দকার আব্দুলাহ জাহাঙ্গীর (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স)
৭. http://blog.omaralzabir.com/2012/12/03/fabricated-hadeet/

Leave a Comment

You May Also Like This Article


Notice: Undefined offset: 2 in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-includes/class-wp-query.php on line 3300

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 30

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 31

Notice: Trying to access array offset on value of type bool in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 33
Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading