ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য : পথ ও পন্থা

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য

পার্থিব জীবন অর্থ ছাড়া অনর্থ। কারণ অর্থ ছাড়া জীবন অচল। প্রয়োজন পূরণ বা জীবিকা নির্বাহের জন্য মানুষ বিভিন্ন পন্থায় অর্থ উপার্জন করে থাকে। এই অর্থ চাকুরি, ব্যবসা, চাষাবাদ বা আরো নানা উপায়ে অর্জন করা যায়। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য হলো অর্থ উপার্জন বা জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম। ব্যবসার মাধ্যমেই মূলত একজনের পণ্যসামগ্রী অন্যের কাছে পৌঁছে এবং মানুষের প্রয়োজন পুরো হয়। তাছাড়া পৃথিবীতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবদান সবচেয়ে বেশি। শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি নয়, সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশে ব্যবসা-বাণিজ্যের ভূমিকা অনন্য ও অনস্বীকার্য। কেননা ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে হালাল উপার্জনের একটি উৎকৃষ্ট পন্থা। আর হালাল উপার্জন ইবাদত কবুলের আবশ্যিক পূর্বশর্ত। এজন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খুলাফায়ে রাশেদিন, আশরায়ে মুবাশশারাসহ অধিকাংশ সাহাবী ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। আর ইসলামও হালাল ব্যবসা-বাণিজ্যে উৎসাহ প্রদান করেছে। ব্যবসাকে হালাল ঘোষণা করে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- ‘আল্লাহপাক ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ [সুরা বাকারা : আয়াত ২৭৫] রাসুলুল্লাহ সা. ব্যবসায়ীদের অনুপ্রাণিত করে বলেছেন, ‘তোমরা ব্যবসা কর, ব্যবসায় ১০ ভাগের ৯ ভাগ রিজিকের ব্যবস্থা আছে।’ [আল মুগনি : ১/৪১৯]

ব্যবসা করতে হবে হালাল ও সৎভাবে। হালাল ও সৎ ব্যবসায়ীদের জন্যই রয়েছে প্রভূত কল্যাণ ও সওয়াব। রয়েছে পরকালে জান্নাতের সুসংবাদ। তাই প্রথমে জেনে নেওয়া যাক হালালের সংজ্ঞা। হালাল শব্দের আভিধানিক অর্থ বিধিসংগত, বিধিসিদ্ধ, আইনসংগত, বৈধ। সাহাবীরা রাসুলুল্লাহ সা. থেকে হালাল সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে যা কিছু বৈধ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন তাই হালাল।’ [তিরমিজি : ১৭২৬; ইবনে মাজাহ : ৩৩৬৭] আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভি রহ. বলেন, ‘হালাল অর্থ মুবাহ, যা নিষেধের অর্গলমুক্ত এবং শরিয়াহ প্রবর্তক যা করার অনুমতি দিয়েছেন।’ [আল হালাল ওয়াল হারাম ফিল ইসলাম : পৃ. ১০] কুরআন ও হাদিসে যেসব বস্তুকে বৈধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে, সেসব বস্তু ইসলামী শরিয়াহ প্রবর্তিত নিয়মানুযায়ী বাজারজাতকরণের মাধ্যমে পণ্য আদান-প্রদান করে উপার্জনের প্রচেষ্টাকে হালাল ব্যবসা বলে।

ইসলামের ব্যবসার গুরুত্ব

ইসলামের রয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক গুরুত্ব ও ফজিলত। মানুষের কল্যাণচিন্তা ও উপকারের নিয়তে ব্যবসা করলে মানবসেবার সওয়াব পাওয়া যাবে। সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য তো রয়েছে জান্নাতের ঘোষণা। রাসুলুল্লাহ সা. হালাল ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে উপার্জন সন্ধান করাকে ফরজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘হালাল রুজি সন্ধান করা মৌলিক ফরজের পর একটি ফরজ।’ [বায়হাকি : ১১৬৯৫] অপর হাদিসে নিজ হাতে কাজ করা এবং হালাল পথে ব্যবসা-বাণিজ্য করে উপার্জন করাকে সর্বোত্তম উপার্জন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। হযরত রাফে ইবনে খাদিজ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সা.কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে রাসুলুল্লাহ সা. কোন ধরনের উপার্জন সর্বোত্তম? তিনি বললেন, ‘নিজ হাতে কাজ করা এবং হালাল পথে ব্যবসা করা।’ [মুসনাদে আহমদ : ১৭২৬৫] হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যখন ত্যাগ স্বীকার করে সওয়াবের আশায় মুসলিম জনপদে কোনো প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করে এবং ন্যায্য মূল্যে তা বিক্রি করে, আল্লাহর কাছে তিনি শহীদের মর্যাদা লাভ করেন।’ [আল কুরতুবি : ১৯/৫৬] একবার বিশিষ্ট তাবিয়ি ইবরাহিম আন নাখয়ি রহ.কে জিজ্ঞেস করা হয় যে, এক ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে কেবল আল্লাহর ধ্যানেই নিমগ্ন থাকে আর অপর এক ব্যক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য করে, তাদের মধ্যে কে উত্তম? তিনি জবাব দিলেন, ‘বিশ্বস্ত ব্যবসায়ীই।’ [ইবনে মুফলিহ : ৩/৪৩০]

এতক্ষণে আমরা বুঝতে পেরিছ ইসলামে ব্যবসার গুরুত্ব কতটুকু। তবে ইসলামের রয়েছে ব্যবসার কিছু নীতিমালা, পথ ও পন্থা। হালাল পথে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে এবং ব্যবসায়িক পণ্যও হালাল হতে হবে। কারণ হারাম পণ্য দিয়ে ব্যবসা হালাল হবে না। পাশাপাশি ব্যবসায় সততা ও আমানতদারিতা বজায় রাখতে হবে। পণ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা যাবে না। এসব বিষয়ের প্রতি খেয়াল রেখে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করলে আমরা দুনিয়া ও আখেরাতে লাভবান হবো ইনশাআল্লাহ।

সততা ও আমানতদারিতা রক্ষা করা

ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা ও আমানতদারিতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কেননা ব্যবসায়ীদের মধ্যে সততা ও আমানতদারিতা থাকলে বাজার সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালতি হবে। পণ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি হবে না এবং ক্রেতাও প্রতারিত হবে না। সবাই তৃপ্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে কেনাকাটা করতে পারবে। আর সৎ ও আমানতদার ব্যবসায়ী কোনো প্রকার প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে না। তারা সবসময় আল্লাহকে ভয় করে চলে কিংবা সর্বদা আল্লাহর ভয় তাদের অন্তরে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সাথী হয়ে যাও।’ [সুরা তাওবা : আয়াত ১১৯] অন্য জায়গায় তিনি বলেন, ‘তোমরা মিথ্যা কথাবার্তা পরিহার কর’। [সুরা হজ : আয়াত ৩০] আর আমাতদার ও সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য রয়েছে সুসংবাদ। হযরত আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সা. বলেন, ‘সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ [তিরমিজি : হাদিস ১২০৯] অপরদিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রতি ‍উচ্চারিত হয়েছে সাবধান বাণী। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম সা. বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীদেরকে পাপী হিসেবে উঠানো হবে। অবশ্য যারা পরহেজগারি, ন্যায়নিষ্ঠ ও সততার সঙ্গে ব্যবসা করেছে, তাদের কথা ভিন্ন।’ [তিরমিজি : ১২১০]

ইবাদত-বন্দেগিকে অগ্রাধিকার দেওয়া

ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যস্ততা বা অর্থের মোহে পড়ে ইবাদত-বন্দেগি ছেড়ে দিলে হবে না। রিজিকদাতা মহান আল্লাহকে ভুলে গেলে ব্যবসায় বরকত হবে না। বরং সময় মতো নামাজ-কালাম পড়ে নিতে হবে। আর ইসলামের অন্যান্য ফরজ বিধান যেমন : রোজা, হজ, যাকাত যথাসময়ে আদায় করতে হবে। তাদের ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সেসব লোক যাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে এবং নামাজ কায়েম ও যাকাত প্র্রদান থেকে বিরত রাখে না। তারা ভয় করে সেদিনকে, যেদিন বহু অন্তর ও দৃষ্টি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।’ [সুরা নুর : আয়াত ৩৭]

হারাম ও নিষিদ্ধ পণ্যের ব্যবসা বর্জন করা

ব্যবসা করতে হবে হালালভাবে এবং হালাল পণ্য দ্বারা। যেসব পণ্য খাওয়া-পান করা ইসলামে হারাম, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অথবা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ, সেসবের ব্যবসা বর্জন করতে হবে। যেমন : মদের ব্যবসা, দেহ ব্যবসা, ভাগ্য নির্ণয়ের ব্যবসা ইত্যাদি হারাম ও নিষিদ্ধ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণয়ক শর, ঘৃণ্য বস্তু শয়তানেরে কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ [সুরা মায়েদা : আয়াত ৯০] হযরত জাবের রা. বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহকে সা.কে বলতে শুনেছি- ‘মহান আল্লাহ মদ, মৃতদেহ, শূকর ও মূর্তি বেচাকেনা হারাম করেছেন।’ [নায়লুল আওতার, ৫ম খণ্ড] হযরত আবু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা. কুকুরের মূল্য, ব্যভিচারের বিনিময়, গণকের বকশিশ ভোগ করতে নিষেধ করেছেন। [সহিহ বুখারি : হাদিস ২১২২; সহিহ মুসলিম : হাদিস ৪০৯২]

মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রি না করা

মিথ্যা শপথের মাধ্যমে ক্রেতাকে আশ্বস্ত করে পণ্য বিক্রি করা যাবে না। কারণ মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রয় করা কোনোভাবেই সততার মধ্যে পড়ে না। মিথ্যা শপথ করে পণ্য বিক্রয়কারীর পরকালীন পরিণতি ভয়াবহ। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা. ইরশাদ করেন, ‘তিন ধরনের লোক এমন আছে, মহান আল্লাহ যাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, কিয়ামতের দিন তাদের দিকে [রহমতের দৃষ্টিতে] তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না; বরং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। আমি [আবু হুরাইরা] বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, তারা কারা? ওরা তো ক্ষতিগ্রস্ত! তিনি বলেন, টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী, ব্যবসার সামগ্রী মিথ্যা শপথ দিয়ে বিক্রয়কারী এবং কাউকে কিছু দান করার পর তার খোঁটাদাতা।’ [সহিহ মুসলিম : হাদিস ২৯৪] খারাপ পণ্যকে ভালো বোঝানোর জন্য শপথ করা অথবা বেশি পণ্য বিক্রির জন্য ক্রেতার কাছে তার পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য বা উৎকৃষ্ট হওয়ার গুণগান করা ইসলাম অপছন্দ করে। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘ব্যবসায় অধিক শপথ করা থেকে বিরত থাক। এটি সাময়িক সময়ের জন্য ব্যবসার প্রসার ঘটালেও বরকত নষ্ট করে দেয়।’ [সহিহ মুসলিম : হাদিস ১৬০৭]

পণ্যের ত্রুটি থাকলে তা প্রকাশ করে বিক্রি করা

পণ্যে কোনো ত্রুটি বা সমস্যা থাকলে তা প্রকাশ করতে হবে। তাছাড়া বিক্রেতার দায়িত্ব হলো ক্রেতার সামনে খোলামেলাভাবে পণ্য উপস্থাপন করা। পণ্যের ছেঁড়া-নষ্ট বা পচা অংশ না দেখিয়ে অথবা ভালোটি দেখিয়ে তার সঙ্গে খারাপগুলোও সরবরাহ করা নিশ্চিত প্রতারণা। নবী করিম সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি পণ্যের ত্রুটি বর্ণনা না করে [বরং গোপন করে] বিক্রয় করে, সে সর্বদা আল্লাহর গজবের মধ্যে থাকে এবং ফেরেশতারা সবসময় তাকে অভিশাপ করতে থাকে।’ [ইবনে মাজাহ : হাদিস ২২৪৭] অন্য এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘কোনো ব্যবসায়ীর জন্য উচিত নয় কোনো জিনিস বিক্রি করা এবং তার ভেতরের দোষত্রুটির কথা বর্ণনা না করা।’ [মুসনাদে আহমাদ : হাদিস ১৭৪৫১]

ভেজাল মিশিয়ে বা প্রতারণা করে বিক্রি না করা

ইসলামে ব্যবসায় ধোঁকা-প্রতারণা, মজুদদারি, খাদ্যে ভেজাল মেশানো, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এভাবে ব্যবসা করে উপার্জিত অর্থ হারাম বলে গণ্য হয়। কেননা ইসলাম ন্যায়-অন্যায়ের ব্যবধান নির্দেশ করে দিয়েছে এবং অন্যায়ভাবে অর্থ উপার্জনকে নিষিদ্ধ করেছে। আল কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে ঘ্রাস করো না কিন্তু পরস্পর রাজি হয়ে ব্যবসা করা বৈধ।’ [সুরা নিসা : আয়াত ২৯] তাছাড়া ব্যবসায় আমানতদারির একটি অন্যতম দিক হলো কথা-কাজে মিল থাকা। পণ্যের যেমন গুণাবলি ও মান বলা হবে, বাস্তবেও তেমন থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে হেরফের ধোঁকা ও প্রতারণার শামিল। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, ‘একদা রাসুল সা. খাদ্যশস্যের একটি স্তূপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি স্তূপের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিলেন, ফলে হাতের আঙুলগুলো ভিজে গেল। তিনি বলেন, হে স্তূপের মালিক! একি ব্যাপার? লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল! এতে বৃষ্টির পানি পড়েছে। তিনি বলেন, সেগুলো তুমি স্তূপের ওপর রাখলে না কেন? তাহলে লোকেরা দেখে নিতে পারত। যে ধোঁকাবাজি করে সে আমার দলভুক্ত নয়।’ [সহিহ মুসলিম : হাদিস ২৯৫]

সঠিক পরিমাপ নিশ্চিত করা

পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে পরিমাপ সঠিক ও নিখুঁত হতে হবে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা মাপার কাজ যখন করবে তখন পূর্ণ করে মাপবে।’ [সুরা বনি ইসরাঈল : আয়াত ৩৫] কেননা পণ্যের পরিমাপে কমবেশি করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সঠিক ওজন বা পরিমাপ নিশ্চিত করতে হবে। যে সকল সৎ ব্যবসায়ী সঠিকভাবে মেপে দেয়, ব্যবসার ক্ষেত্রে কোন প্রকার মিথ্যার আশ্রয় নেয় না তাদের সুমহান মর্যাদা ও শুভ পরিণাম ঘোষণা করে আল্লাহপাক ইরশাদ করেন- ‘মেপে দিবার সময় পূর্ণভাবে দিবে এবং ওজন করবে সঠিক দাড়িপাল্লায়, ইহাই উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্ট।’ [সূরা বনি ইসরাঈল : আয়াত ৩৫] অথচ একশ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী মানুষকে ওজনে কম দেয়, পণ্যে নানা ধরনের ভেজাল মিশ্রিত করে বাজারকে অস্থির করে তোলে। এরা বাহ্যিক লাভবান হয় বটে; কিন্তু এদের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। এদের করুণ পরিণাম সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- ‘মন্দ পরিণাম তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়। যারা লোকের নিকট হতে মেপে লওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে এবং যখন তাদের জন্য মাপে বা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। তারা কি চিন্তা করেনা যে, তারা পুনরুত্থিত হবে মহাদিবসে।’ [সূরা মুতাফফিফিন : আয়াত ১-৫]

মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি না করা

খাদ্য মজুদদারি করে রাখা বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করা বৈধ নয়। পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে দাম বাড়ানো এবং পরিমাণের চেয়ে অধিক মুনাফায় পণ্য বিক্রি করাও অবৈধ। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং অনেক মানুষ দুর্গতিতে পতিত হয়। এই ধরনের কাজ মানুষের কষ্টকে বাড়িয়ে দেয়। তাই ইসলাম এই ধরনের কাজকে হারাম ঘোষণা করেছে। অথচ অনেক সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর মজুদদারির কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এতে কিছু ব্যবসায়ী সাময়িক লাভবান হলেও মহামারি ও দারিদ্র্যের পথ খুলে যায়। রাসুল সা. বলেন, ‘কেউ যদি মুসলমানদের থেকে নিজেদের খাদ্যশস্য আটকিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আল্লাহ তায়ালা তার ওপর মহামারি ও দারিদ্র্য চাপিয়ে দেন।’ [ইবনে মাজাহ : হাদিস ২১৫৫] অন্যত্র নবী করিম সা. ইরশাদ করেন- ‘যে ব্যবসায়ী পণ্য আবদ্ধ ও স্তূপ করে সে গুনাহগার।’ [মুসলিম : হাদিস ১৬০৫] অন্যদিকে তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আবদ্ধ করে না, বরং সময়মতো বাজারে পণ্য নিয়ে আসে, সে আল্লাহর রহমত পাওয়ার অধিকারী; তাকে আল্লাহ রিজিক দেবেন। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আবদ্ধকারী হচ্ছে অভিশপ্ত।’ [ইবনে মাজাহ : হাদিস ২১৫৩] তাছাড়া কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও হ্রাস করাও শক্ত গুনাহর কাজ। আল্লামা ইবনে হাজর হাইসামি রহ. গুদামজাত করে মূল্য বৃদ্ধি করাকে কবিরা গুনাহ বলে উল্লেখ করেছেন। [নিহায়াতুল মুহতাজ : ৩/৪৫৬]

হস্তগত হওয়ার আগে বিক্রি না করা

কোনো পণ্য নিজে মালিক না হয়ে বা নিজের আয়ত্তে আসার আগে বিক্রি করা যাবে না। কারণ এভাবে বিক্রি করে ক্রেতাকে হস্তান্তর করা সম্ভব নয়। হস্তান্তর করতে না পারলে বিক্রির কোনো অর্থ হয় না। নবী সা. বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি খাদ্যশস্য ক্রয় করলে সে যেন তা হস্তগত করার আগে বিক্রয় না করে।’ [সহিহ বুখারি : হাদিস ২০২৯]

অনিশ্চিত কিছু বিক্রি না করা

অনিশ্চিত কোনো কিছু বিক্রি করা যাবে না। সরল মনে ও সরল পথে ব্যবসা করতে হবে। জটিলতা এড়িয়ে চলতে হবে। সবার স্বার্থ ও সুবিধা দেখতে হবে। এ জন্যই নবী সা. বিশেষ কিছু পদ্ধতির ক্রয়-বিক্রয় থেকে নিষেধ করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘রাসুল সা. গবাদি পশুর গর্ভস্থ বাচ্চা প্রসবের আগে, পশুর স্তনের দুধ পরিমাপ না করে, পলাতক দাস, গনিমতের মাল বণ্টনের আগে, দান-খয়রাত হাতে আসার আগে এবং ডুবুরির বাজির [ডুব দিয়ে যা পাবে] ভিত্তিতে ক্রয়-বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন।’ [ইবনে মাজাহ : হাদিস ২১৯৬] আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সততার সাথে ব্যবসা করে ইহকালে সফলতা অর্জন ও পরকালে মুক্তি লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।

ইসলামি অর্থনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্য বিষয়ক বইসমূহ পেতে ক্লিক করুন!

এমদাদুল হক তাসনিম

এমদাদুল হক তাসনিম

নির্বাহী সম্পাদক : মাসিক ইসলামী বার্তা, অর্থ সম্পাদক : বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম ই-মেইল: imdadtasnim@gmail.com

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading