করোনায় মৃত্যুবরণকারীর গোসল, কাফন ও জানাযার বিধান কী? শর’য়ী সমাধান

করোনায় মৃত ব্যক্তির গোসল

করোনার ভয়াবহতার সাথে সাথে যে প্রশ্নটা সকলের মনে উঁকি দিচ্ছে তা হলো ‘করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কোন মুসলিম যদি মারা যান আর তাকে গোসল দেওয়া যদি বিপদজনক হয়ে থাকে অর্থাৎ তার রোগটি অন্যদের মাঝে সংক্রমিত হবার সম্ভাবনা থাকে তাহলে গোসল দেওয়া ছাড়া দাফন করা যাবে কিনা?? ইসলামি শরীয়াহর দৃষ্টিকোনে বিষয়টি ব্যখ্যা করেছে শায়খ আহমাদুল্লাহ।

ইসলামি শরীয়াহর  মৌলিক নীতিমালা বা নির্দেশনা হলো যে কোন মুসলিম মারা গেলে সমাজের অন্য সমস্ত মুসলিমদের উপরে ফারজে কিফায়া বা আবশ্যক বা ওয়াজিব হলো ঐ ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া তারপরে তার কাফনের ব্যবস্থা করা এবং তার জানাজার ব্যবস্থা করে তাকে কবরস্থ করা সম্মানজনক ভাবে। এটি সমাজের লোকদের জন্য কর্তব্য তারা যদি কেউই না করেন তাহলে সবাই গুনাহগার হবেন আর যদি কিছু লোক করে ফেলেন তাহলে সবার পক্ষ থেকে সেটি আদায় হয়ে যাবে এটি হলো মৌলিক কথা।

গোসলের বিষয়ে আমরা জানি বুখারি মুসলিমে একজন বর্ণনা করেছেন রাসূলে কারিম (সা:) তাঁর মেয়ে জয়নব (রা:) মৃত্যুর পরে নির্দেষ করেছিলেন তাকে তোমরা ৩ বার ধুয়ে গোসল করাও এবং অন্য বুখারি মুসলিমের আরেক বর্ণনায়  আসছে যে নবী (সা:) অন্য এক ব্যক্তির মৃত্যুর পরে বলেছেন পানি এবং বড়ই পাতা দিয়ে তোমরা গোসল করাও। তাহলে  নির্দেশ টা আমরা জানতে পারলাম নবী (সা:) এর যে গোসল করাতে হয়। এখন কথা হলো করোনা ভাইরাসের সংক্রমনের ভয়ে গোসল করানো ছাড়া কোন মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থ করা যাবে কিনা? এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলব যে মিসরের আলহাজা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাজনাতুল ফতোয়া ও ফতোয়া বোর্ডের রাইস বা প্রধান ড: আব্দুল হাদি জারেয়া তাঁর একটি ফতোয়া এখানে নকল করা হয়েছে। উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে তিনি বলেছেন যে-

“করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ অথবা এই জাতীয় কোন অসুস্থতা বা রোগ বালাই হলে ছড়িয়ে পরতে পারে এইরকম কোন আশংকা যদি থাকে এবং গোসল করানোর কোন ব্যবস্থাই না থাকে অর্থাৎ সতর্কতা মূলক ভাবেও গোসল করানোর যদি কোন স্কোপ না থাকে করতে গেলেই সেটা রিস্কি হয়ে যায় সমাজের অন্য মানুষের জন্য তাহলে সেই ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারে তায়াম্মুম অর্থাৎ একজন ব্যক্তি তিনি মাটিতে হাত দিয়ে তারপর মৃত ব্যক্তির মুখমণ্ডলে মাসাহ করবেন এভাবেই হাত মাসাহ করবেন এতে তায়াম্মুম হয়ে যাবে এর মাধ্যমে তাকে আমরা বিদায় জানবো এবং তার দাফনের ব্যবস্থা করব। আর যদি তায়াম্মুম টাও রিস্কি হয়ে যায় এবং কোন ভাবেই তায়াম্মুম করানো না যায় তাহলে সে ক্ষেত্রে সেই ব্যক্তিকে তায়াম্মুম এবং গোসল ছাড়াও দাফন করাও হয় তাহলে কোন অসুবিধা হবে না।”

আল্লাহ সুবহান তায়ালা কোরআন কারিমে বলেছেন-

“তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যতটুকু সাধ্যে কুলায় এর বাইরে চলে গেলে অন্যদের ক্ষতি প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেলে তখন সেই ক্ষেত্রে এইটা না করলেও কোন গুনাহগার আমরা হব না।”

 শেখ আহমাদ মামদু, যিনি দারুল ইফতাল মাসরিয়ার আমিন। তিনি তার এক ভিডিও বার্তায় বিস্তারিত এ বিষয়ে উল্লেখ করেছেন  অর্থাৎ গোসল করানোর চেষ্টা করতে হবে যে কোন উপায়ে সতর্কতা মূলক পন্থাগুলো অবলম্বন করে যদি কোন ভাবে তাকে গোসল করানো যায়। অন্তত তার গায়ে পানি স্প্রে করে ধুয়ে দেওয়া যায় তাহলে দায় আদায় হয়ে যাবে যদি সেটাও করা না যায় তাহলে তায়াম্মুম করবে। যদি সেটাও করা না যায় তবে তাকে গোসল ছাড়া বিদায় দিলে গুনাহ হবে না। এর বাইরে শেখ আব্দুল হামিদ আল আত্রাস নামে আরেকজন লাজনাতুল ফতোয়া আল আজহারের তিনি সাবেক খারাইজ ছিলেন। তিনি অবশ্যই কিছুটা ভিন্ন কথা বলেছেন যে-

“ঠুনকো অজুহাতে কোন মুসলিমকে গোসল দেওয়া ছাড়া বিদায় দেওয়া জায়েজ হবে না বরং অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার গোসল দেওয়ার বিষয়টি, জানাজার সালাতের বিষয়টি আমাদেরকে খেয়াল করতে হবে এবং দাফনের বিষয়টি খেয়াল  করতে হবে। যেই লোকটি জীবিত থাকা কালীন সময়ে ডাক্তাররা, চিকিৎসকগণ সতর্কতা মূলক পদ্ধতি অবলম্বন করে তার চিকিৎসা দিয়েছেন ঠিক মৃত্যুর পরে সেই রকম সতর্কতা মূলক পদ্ধতি অবলম্বন করে তার তার গোসল এবং জানাজা ব্যবস্থা করতেই পারেন। যদি সেটা ক্ষতিকর বলে জানা না যায়”।

আমরা এখনো জানি না যে গোসল দিলে কোন ক্ষতি হতে পারে কিনা? সংক্রমণ ভয় কতক্ষণ আছে? এবং এই যুগে অন্তত স্প্রেরের মাধ্যমে গোসল করানো এবং  পানিগুলোকে মাটির নিচে পুতে ফেলা অথবা সেগুলোকে সরিয়ে দেওয়া অথবা যেই কোন ভাবে সংক্রমণ রোধ করবার যত উপায় হতে পারে সেই উপায় গুলো অবলম্বন করে গোসল দেওয়া এইটা অসম্ভব এইটা আমরা অন্তত মনে করি না।

এইটা এই যুগে অন্তত চেষ্টা করে একটু বিষয়টিকে নজরে রাখলে আমার মনে হয় যে গোসল দেওয়া সম্ভব হবে। যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসকগণ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞরা বলেন যে না এটা কোন ভাবেই সম্ভব হবে না করতে গেলেই রিস্ক নিশ্চিত ভাবে থাকবে এবং সেটা ভয়াবহ হবে তাহলে সেই ক্ষেত্রে বিনা গোসলে তায়াম্মুম শুধু মাত্র একজন ব্যক্তি মাসাহ করে তায়াম্মুম করে দিতে পারেন সেই ক্ষেত্রে গ্লাফস পড়েও তিনি তায়াম্মুম করাতে পারেন। আর যদি সেটারও কোন সুযোগ না থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে গোসল ছাড়া যদি দাফন দেওয়া হয় স্বাভাবিক ভাবে গুনাহগার তিনি হবেন না।

এই বিষয়ে আমাদের অনেককে দেখা যায় মন্তব্য করতে যে আল্লাহ এই রকম মৃত্যু আমাদের দিও না যার জানাজাতে অল্প মানুষ আছে এবং পরিবার সামিল হতে পারে না অনেক সময় এবং তার গোসল ও ভালো ভাবে হয় না সুন্দর ভাবে কবরেও রাখা হয় না। এই বিষয়গুলো আমাদের যেন মন খারাপের কারণ না হয়। কারণ মনে রাখতে হবে ব্যক্তির জানাজায় বেশি মানুষ উপস্থিত হওয়া এটা ভালো জিনিস সন্দেহাতীতভাবে কিন্তু একজন ব্যক্তির আখেরাতে মুক্তির বিষয়টি মূলত নির্ভর করে তার আকিদার বিশুদ্ধতা, তার আমলের সোন্দর্য এবং ভালো আমলের উপরে। তার জানাজা যদি নাও কেউ পরে, লাশ দাফন করার যথাযথ সুযোগ নাও থাকে কিন্তু তার আমলটা যদি ভালো থাকে আল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক যদি ভালো থাকে তাহলে সেই ব্যক্তির আখিরাতের পথ সমুজ্জ্বল আর এর বিপরীতে একজন মানুষকে দাফন -কাফন, গোসল সবই হলো জানাজাও হলো লাখো মানুষ উপস্থিত হলো কিন্তু লোকটার যদি আমল ভালো না হয় তাহলে আখিরাতে তার মুক্তি কোন ভাবেই নিশ্চিত করা যায় না বা মুক্তির আশা করা বড় কঠিন।

সেই জন্য আসুন আমরা পেরেশান না হয়ে নিজেদের আমল গুলোর দিকে নজর দেই। আল্লাহর সাথে সম্পর্কের অবস্থা কি সেটার দিকে আমরা নজর দেই এবং আমরা নিজেদের সংশোধন করে আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়ে অজু করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সেই তৌফিক দান করুক।

ইসলামী সওয়াল-জওয়াবের বইগুলো দেখুন

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png