‘মিলাদ ও কিয়াম’ বিকাশের ইতিহাস ও দালিলিক বিশ্লেষণ।

মিলাদ ও কিয়াম

আহলে হক তথা হকপন্থী ওলামায়ে কেরাম মিলাদ-কিয়ামকে বিদআত বলে ফতওয়া দিয়েছেন। বিদআতের এ ফতওয়াটি যদিও সর্বজন বিদিত কিন্তু কেন তা বিদআত— তা আমাদের অনেকেরই হয়তো অজানা। মিলাদ-কিয়াম কেন বিদআত— এ বিষয়ে তাত্ত্বিক ও দালিলিক আলোচনায় যাওয়ার পূর্বে ‘মিলাদ’ ও ‘কিয়াম’ আসলে কী— তা স্পষ্ট করা যাক।

মিলাদ কী?

মিলাদ শব্দের অর্থ জন্ম বা জন্মকাল। এমনিতে এটি একটি ব্যাপক শব্দ। যে কারো জন্মের দিকে সম্পৃক্ত করেই তা ব্যবহার করা যায়। যেমন, আমার মিলাদ তথা আমার জন্ম বা জন্মকাল। তবে প্রচলিত অর্থে সাধারণত এ শব্দটিকে নবীজী সা. এর জন্মের সাথে সম্পৃক্ত করে ব্যবহার করা হয়। সহজ করে বললে সমাজে নবীজীর জন্ম ও জন্মকালকে বোঝাতেই মিলাদ শব্দটির ব্যবহার বহুল প্রচলিত।

পরবর্তীতে রাসূলের জন্ম ও জন্মকালকে উপলক্ষ করে ঘটা করে কিছু লোকের সম্মিলনে নানান ভাষায় নানান সুরে নবীজীর শানে রচিত কাসিদা বা কবিতা পাঠ, দরুদ পাঠ ইত্যাদি কার্যকলাপকে কেউ কেউ ‘মিলাদ’ হিসেবে নাম দান করেন। যদিও শাব্দিক অর্থে তা মিলাদ নয়; কিন্তু সামাজিক আবহে তা একটি ভুল প্রসিদ্ধি ধারণ করে।

মিলাদ আর দরুদ কি এক?

না, এক নয়। মিলাদের পরিচয় তো উপরে দেয়াই হয়েছে। আর দরুদ বলা হয়, রাসূল সা. এবং তার পরিবার-পরিজন, সন্তান-সন্ততি ও সাহাবায়ে কেরামের প্রতি আল্লাহ্র দয়া ও শান্তি বর্ষণের জন্য দোয়া করা। আবেগ ও ভালোবাসার জায়গা থেকে নবীজীর শানে রচিত কাসিদা বা কবিতা পাঠ ও দরুদ পাঠ একটি প্রশংসাযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ আমল। কুরআন-হাদীসে এর প্রতি গুরুত্বারোপও করা হয়েছে অনেক।

কুরআনে কারীমে আছে, স্বয়ং আল্লাহ পাক ও ফেরেশতাগণ নবীজীর ওপর দরুদ পাঠ করেন এবং মুমীনদেরকেও নবীজীর শানে দরুদ পাঠ করতে নির্দেশ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন-

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا

নিশ্চয় আল্লাহ (উর্ধ্বজগতে ফেরেশতাদের মধ্যে) নবীর (নামে দরুদ পাঠ করেন তথা) প্রশংসা করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর জন্য (দরুদ পাঠ করেন তথা) দুআ করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর ওপর দরুদ পাঠ করো এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও। (সূরা আহযাব: ৫৬)।

এমনকি নবীজী নিজেও উৎসাহিত করেছেন তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করতে। নবীজী বলেছেন-

مَنْ صَلّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا

যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ পাক তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করবেন। মুসলিম : ৪০৮।

অন্য হাদীসে রাসূল সা. সরাসরি দরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি ভর্ৎসনা করেছেন ওই ব্যক্তিকে, যে তাঁর নাম শোনা সত্ত্বেও দরুদ পাঠ করলো না। রাসূল বলেন-

رَغِمَ أَنْفُ رَجُلٍ ذُكِرْتُ عِنْدَه فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيَّ

লাঞ্চিত হোক সেই ব্যক্তি, যার নিকট আমার নাম উচ্চারিত হয়, কিন্তু সে আমার প্রতি দরুদ পাঠ করে না। তিরমিযী : ৩৫৪৫।

সুতরাং বোঝা গেল, দরুদ আর মিলাদ দুটি ভিন্ন জিনিস। একদিকে দরুদ একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হলেও অন্যদিকে মিলাদ বা মিলাদ পালন বলতে কোনো আমলের অস্তিত্বই ইসলামে নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো নবী-রাসূলের মিলাদ তথা জন্মোৎসব পালন বা এ উপলক্ষে কোনো আমেজ-আয়োজনের নজির নেই।

মিলাদের উৎপত্তি

নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা. এর জীবদ্দশায়ও তাঁর জন্মদিন পালন কিংবা জন্ম উপলক্ষে কখনো কোনো আয়োজন করা হয়নি। নবীজীর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরামের সুদীর্ঘ যুগ থেকেও এমন কোনো ঘটনার প্রমাণ বা সাক্ষী পাওয়া যায় না। এমনকি সাহাবায়ে কেরামের পর যে তাবেয়ী ও তাবে’ তাবেয়ীনের যুগ— সেখানেও এ ধরণের কোনো উৎসব-আয়োজন বা আমল ইত্যাদির নজির নেই।

প্রশ্ন জাগে, তাহলে মিলাদ আসলো কোত্থেকে? এর উত্তর হচ্ছে, মিলাদ মূলত হিজরী ৬ষ্ঠ শতাব্দীর পরবর্তী সময়ের উদ্ভাবন। এর আগ পর্যন্ত ‘মিলাদ’ বলতে কোনো উৎসব-আয়োজন বা আমল হতে পারে— এমন কল্পনাও কারো মাথায় আসেনি। সর্বপ্রথম হিজরী ৬ষ্ঠ শতাব্দীর পর সম্পূর্ণ আমোদ-প্রমোদের উদ্দেশ্যে বাদশা মুজাফফররুদ্দীন আবু সাঈদ কৌকরী বিন আরবাল এর উদ্বোধন করেন। (সূত্র: আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া- ১৩/১৫৯)

আমাদের সমাজে এটি আরও ভয়ানক বিভ্রাটে রূপ নিয়েছে, কারণ সুপরিকল্পিতভাবে এর সঙ্গে দরুদ পাঠকেও অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষকে এটি বোঝানো হচ্ছে যে, আমরা তো নিছক দরুদ পড়ছি, তো এতে সমস্যার কী আছে? সমস্যা হচ্ছে, দরুদ পাঠের এ পদ্ধতি আমাদেরকে রাসূল সা. শিক্ষা দেননি।

উপরন্তু দরুদ পাঠের আগে-পরে কখনো কখনো এমন কিছু কথাবার্তা আলোচনা করা হয়ে থাকে বা সুরে সুরে এমন কিছু আপত্তিকর কবিতা আবৃত্তি হয়ে থাকে, যেগুলো বিভ্রান্তির বীজ বপনের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অথচ তা গর্হিত, এমনকি কখনো কখনো তা স্পষ্ট শিরক এর পর্যায়েও চলে যায়।

কিয়াম কী?

কিয়াম শব্দটি আরবি, যার শাব্দিক অর্থ দাঁড়ানো। এটিও একটি ব্যাপক শব্দ। যে কোনো দাঁড়ানো জাতীয় কাজের ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার প্রযোজ্য। যেমন নামাযে দাঁড়িয়ে থাকার রুকনকেও ‘কিয়াম’ বলা হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, দরুদ পাঠের সাথে কিয়ামের সম্পর্ক কী? পরিষ্কার কথা, দরুদ পাঠের সাথে কিয়ামের কোনো সম্পর্ক নেই। দরুদ পাঠের জন্য আদৌ শরীয়ত দাঁড়ানোর কোনো বিধান আরোপ করেনি। এমনকি দরুদ পাঠের জন্য নির্ধারিত কোনো স্থান বা আসনকেও আবশ্যক করা হয়নি। একমাত্র শৌচাগার ব্যতিরেকে যে কোনো স্থানে যে কোনো অবস্থায় দরুদ পাঠের সুযোগ অবারিত।

দরুদের আমল সাহাবায়ে কেরামও করেছেন। তাবেয়ী, তাবে’ তাবেয়ী এমনকি এর পরবর্তী যুগের ওলামায়ে কেরাম ও সর্বস্তরের জনতাও করেছেন এ আমল। কিন্তু ইতিহাসে তাদের কারো কাছ থেকেই এ আমলের সাথে কিয়ামের কোনো সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনকি কোনো দুর্বল হাদীস দ্বারাও নবীজীর কাছ থেকে এর কোনো নির্দেশনা বা ইঙ্গিত পাওয়া যায় না।

কিয়ামের বিকাশ

মিলাদ পালনের বিদআতের সাথে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে জুড়ে দেয়া হয়েছে কিয়ামের প্রথাটিকে। মানে দাঁড়িয়ে দরুদ পাঠ। এর আবিষ্কারও হয়েছে মিলাদেরও প্রায় ১০০ বছর পরে। অর্থাৎ ৭৫১ হিজরির দিকে।

সে যুগে খাজা তকিউদ্দিন নামে একজন ভাব কবি ও মাজযুব (কিছুটা পাগল গোছের) ব্যক্তি ছিলেন। নবীজীর শানে তিনি কিছু কাসিদা (কবিতা) রচনা করেন। বরাবরের ন্যায় একদিন তিনি কাসিদা পাঠ করছিলেন এবং ভাবাবেগে হঠাৎ তিনি দাঁড়িয়ে কাসিদা পাঠ করতে লাগলেন। ভক্তরাও তাঁর দেখাদেখি দাঁড়িয়ে গেল। বলা বাহুল্য, এটি কোনো মিলাদের অনুষ্ঠান ছিল না এবং ঘটনা এখানেই শেষ। জীবদ্দশায় তিনি আর কখনো এমনটি করেন নি।

খাজা তাকিউদ্দিনের এই অনিচ্ছাকৃত দাঁড়িয়ে পড়াটাকেই মিলাদ জন্মের প্রায় একশত বছর পর এসে বিদআতপন্থীরা মিলাদের সঙ্গে জুড়ে দেয়। ফলে কিয়ামযুক্ত মিলাদ বিদআত হওয়ার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে।

মিলাদ-কিয়ামের বিধান

মিলাদ-কিয়াম’কে ওলামায়ে কেরাম পরিষ্কার ‘বিদআত’ বলে আখ্যায়িত করেন। কেননা কুরআন তথা আল্লাহর কিতাব, রাসূল সা. এর সুন্নাত, সাহাবাদের আমল এবং সম্মানিত তিন যুগ তথা নবীযুগ, সাহাবী-যুগ ও তাবেয়ী-যুগ-এ এ জাতীয় কোনো আমলের অস্তিত্ব অনুপস্থিত।

যদি ধরেও নিই, মিলাদ ও কিয়ামের উদ্দেশ্য স্রেফ আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি কামনা, তাহলে এ কথা বলা বাহুল্য যে, যেই ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সন্তুষ্টি কামনা করা হবে, কুরআন বা সুন্নাহ’য় অবশ্যই তার পক্ষে দলীল থাকতে হবে। কুরআন-সুন্নাহ’র সুস্পষ্ট দলীল বিহীন, উপরন্তু সম্মানিত তিন যুগে নজির বিহীন নব উদ্ভাবিত কোনো আমল কোনোভাবেই শরীয়তে গ্রহণযোগ্য নয়।

এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে পড়া যেতে পারে:
১. মিলাদ-কিয়াম ও হাযির-নাযির (বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা)
২. হুব্বে নবী ও মিলাদ-কিয়াম?
৩. এবাদত কী এবং বিদআত কী মিলাদ কোন প্রকার আমল 

নূরুল্লাহ মারূফ

নূরুল্লাহ মারূফ

আলেম, প্রাবন্ধিক

1 thought on “‘মিলাদ ও কিয়াম’ বিকাশের ইতিহাস ও দালিলিক বিশ্লেষণ।”

  1. Pingback: ইসলামের শ্বাসরুদ্ধকর ইতিহাস। (dr. muhammad ibrahim ash-sharqi) - রকমারি ব্লগ

Leave a Comment

You May Also Like This Article


Notice: Undefined offset: 5 in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-includes/class-wp-query.php on line 3300

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 30

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 31

Notice: Trying to access array offset on value of type bool in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 33
Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading