মহানবীর স. জীবনী রচনার হাজার বছর

মহানবীর স. জীবনী

একক ব্যক্তি হিসেবে সবচে’ বেশি জীবনীগ্রন্থ লেখা হয়েছে কার, এ বিষয়ক কোনও জরিপ কখনও হয়েছে কি? হলে মহানবী হজরত মুহাম্মাদের স. নাম উপরেই থাকবে। গত দেড় হাজার বছরে দেশ, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষ অজস্র সাহিত্যিক, সমাজনেতা, শিক্ষাবিদ, সমরবিদ, গবেষক, রাষ্ট্রনায়ক এমনকি তার বিরুদ্ধবাদীরাও তাকে নিয়ে বিপুল প্রশস্তি বর্ণনা করেছেন। তাঁর প্রচারিত ধর্ম গ্রহণ না-করেও তাঁকে মহামানবের স্বীকৃতি দিয়েছেন। বিশ্বের ঘোর দুর্দিনে তাঁর মতো নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার বলেছেন। একেবারে আটপৌড়ে জীবনীগ্রন্থ থেকে বিশেষায়িত গবেষণাগ্রন্থ লিখেছেন তারা অসংখ্য। একটিই মানুষ, একটাই তাঁর জীবন, একটাই কাহিনী—সেই মক্কার কুরাইশ পরিবারে জন্ম, আল-আমিন উপাধি, সিরিয়ায় বাণিজ্য, হেরাপর্বতের ধ্যানমগ্নতা, মক্কার দাওয়াত, তায়েফের ক্ষত, মদিনায় হিজরত, বদরের যুদ্ধ, বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে ঊর্ধ্বগমন, আবার মক্কায় ফেরা, বিদায় হজ্জ। একই কথা বহুমুখে বহুজনে বহুশতাব্দি ধরে বাতাসে বাতাসে ফিরছে, তবু যেন অফুরান, যেন কিছু লেখা হলো আর অলিখিত রয়ে গেল ঢের, কিছু বলা হলো আর অনেক কিছুই হয় নি বলা।

জীবনী রচনার সূচনাপূর্ব

মহানবীকে জানার সর্বপ্রথম উৎস হলো কুরআন। যেমন তাঁর সম্পর্কে তাঁর জীবনসঙ্গী আয়েশার কাছে জানতে চাওয়ার পর তিনি বলেছেন, কোরআনই তাঁর চরিত্র। (আদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারি, হাদিস ৩০৮)। কুরআনজুড়ে প্রসঙ্গক্রমে নবীজীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতির ছায়া পড়েছে। মক্কার কুরাইশদের সঙ্গে তার কথোপকথন, যুদ্ধের নানান অনুষঙ্গ, অথবা নবীর স্ত্রীর নির্দোষিতা ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে তখনকার ঘটনার আলোকে। কুরআনের প্রাচীন তাফসির ও কুরআন নাজিলের প্রেক্ষাপট সংক্রান্ত বিভিন্ন হাদিস এবং হাদিসের বিচ্ছিন্ন সঙ্কলনগুলোতে তাঁর জীবনের টুকরো টুকরো ঘটনা বিধৃত হয়েছে। সেকালে রচিত ইতিহাসের আধার ও উপাদানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নবীজীবনের খণ্ড খণ্ড চিত্র। কিন্তু তাঁকে নিয়ে ধারাবহিক জীবনী রচনার উন্মেষ ঘটেছে তাঁর ইন্তেকালের অন্তত ৫০ বছর বছর পরে। কেননা, নবীজি তখন নিজেই তাদের সামনে ছিলেন।এমনকি দূরে বা কাছের যারা তখনও দেখেন নি তাঁকে, তাদেরও সবার যেন একবার অন্তত দেখার সুযোগ হয়ে যায়, তাই তিনি বহু আগেই বিদায় হজের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর তিরোধানের পর পরবর্তী প্রজন্মও সাহাবিদের এমন একটি বিরাট দলের সান্নিধ্য পেয়েছেন, যাঁদের প্রাত্যহিক জীবনের সকল ইবাদত ও কাজকর্ম মহানবীর স. আদর্শ মেনে বাস্তবায়িত হতো। তারপর সময়ের দূরত্ব যত বাড়তে থাকে, নবীজি সম্পর্কে জানার কৌতূহল বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি কেমন ছিলেন—এই প্রশ্নের আধিক্য মহানবীর জীবনকাহিনি রচনার পথ উন্মুক্ত করে দেয়। প্রজন্মান্তরে মহানবী দেখা ও তাঁকে জানার প্রবল ইচ্ছার কথা কি তিনিও জানতেন? যেমন তিনি বলেছেন— তোমাদের পরে উম্মতের মধ্যে আমার প্রতি এতোটা ভালবাসাসম্পন্ন লোক আসবে, যারা তাদের সম্পদ-পরিজনের বিনিময়ে হলেও আমাকে দেখতে চাইবে। (মুসলিম, হাদিস ২৮৩২)। তো জীবিত সাহাবিগণ কেরাম নবীজির বিবরণ তুলে ধরা শুরু করলেন, কখনো সংক্ষেপে, কখনো সবিস্তারে, আবার কখনো-বা আংশিক। এভাবেই একসময় ধারাবাহিক জীবনী সামনে চলে এলো।

মহানবীর জীবনী আলোচনার প্রধানতম দুটি বাহু রয়েছে। একটি হলো ‘সিরাত’; যাকে ‘সিয়ার’ ও ‘মাগাজি’ও বলা হয়। সিরাত মানে জীবনী। আমরা মহানবীর জীবনীর যে সাধারণ ধরণটি দেখি, অর্থাৎ, জন্ম থেকে তাঁর জীবনের ধারাবাহিক ঘটনাবলির বিবরণ সেটিই ‘সিরাত’ নামে পরিচিত, এবং এ-জাতীয় গ্রন্থকে সাধারণত সিরাতগ্রন্থ বলা হয়। তবে আরেকটা দিক আছে—নবীজির দৈহিক গঠন, আচরণ ও কার্যক্রমের বর্ণনা। একে বলে ‘শামায়েল’।

জীবনীগ্রন্থের দুটি বাহু

মহানবীর জীবনী আলোচনার প্রধানতম দুটি বাহু রয়েছে। একটি হলো ‘সিরাত’; যাকে ‘সিয়ার’ ও ‘মাগাজি’ও বলা হয়। সিরাত মানে জীবনী। আমরা মহানবীর জীবনীর যে সাধারণ ধরণটি দেখি, অর্থাৎ, জন্ম থেকে তাঁর জীবনের ধারাবাহিক ঘটনাবলির বিবরণ সেটিই ‘সিরাত’ নামে পরিচিত, এবং এ-জাতীয় গ্রন্থকে সাধারণত সিরাতগ্রন্থ বলা হয়। তবে আরেকটা দিক আছে—নবীজির দৈহিক গঠন, আচরণ ও কার্যক্রমের বর্ণনা। একে বলে ‘শামায়েল’। শামায়েল রচনার ধারাটা শুরু হয় একটু পরে। শামায়েল গ্রন্থকারকগণ প্রথম দিকে কেবল নবীজির দৈহিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করার মধ্য দিয়ে তার অবয়ব-প্রকৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করতেন। পরবর্তী সময়ে আরও বিস্তৃতি আকারে নবীজির আচার-আচরণ, ইবাদত-বন্দেগি, বিনয়-কোমলতা—এভাবে তাঁর ব্যক্তিজীবনের সমস্ত দিক উল্লেখ করা হতে থাকে। শামায়েল বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থগুলি হলো, ইমাম তিরমিজি’র (মৃ. ২৭৯ হি.) ‘শামায়েল তিরিমিজি’, ইমাম বাগাবি’র (মৃ. ৫১৬ হি.) ‘আল আনওয়ার ফিশ শামায়েল’ ইবনে কাসির’র (মৃ. ৭৭৪ হি.) ‘আল-ফুসুল ফি সিরাতির রসুল’ ও জালালুদ্দিন সুয়ুতি’র (মৃ. ৭৭৪ হি.) ‘শামায়িলুশ শারীফা’ এবং বর্তমান সময়ে সিরিয়ান লেখক সালেহ আহমাদ শামী’র (জন্ম ১৯৩৪) ‘মিন মায়িনিশ শামায়েল’, যা ইতিমধ্যে আকিক পাবলিকেশন্স, ঢাকা থেকে ‘মুহাম্মাদ স. : ব্যক্তি ও নবী’ নামে অনুবাদিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

সীরাত বিশ্বকোষ
সীরাত বিশ্বকোষ ( উন্নত সংস্করণ ১-১১ খণ্ড)

প্রথম যুগের রচনাবলি

সর্বপ্রথম মহানবীর জীবনী রচনা করেন কে, এই সময়ে এসে তাঁর নিশ্চিত সন্ধান পাওয়া দুরূহ। ১০৯২ সালে সৌদি আরবের কিং সাউদ ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকাশিত ‘আসসিরাতুন নাবাবিয়াহ ফি যাওইল মাসাদিরিল আসলিয়া’ এ-বিষয়ক একটি প্রামাণ্যগ্রন্থ। ড. মাহদি রিজকুল্লাহ আহমাদ তাতে চৌদ্দ শতকের মিশরি স্কলার ইবনে হাজার আসকালানির অভিমতকে প্রাধান্য দিয়ে প্রথম তিনজন রচয়িতার নাম ও রচনার উল্লেখ করেছেন। এক. সাহল ইবনে হাসমা রা.। তাঁর জন্ম তৃতীয় হিজরিতে। কৈশরে তিনি মহানবীকে দেখেছেন এবং উমাইয়া খলিফা মুয়াবিয়া’র আমলে (৪১-৬০ হি.) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সেই জীবনীর বিভিন্ন অংশ মৌলিক সূত্র আকারে নবম শতকের ঐতিহাসিক বালাজুরি রচিত ‘আনসাব’, ইবনে সাদ রচিত ‘তাবাকাত’, তাবারি রচিত ‘তারিখে তাবারি’ এবং ওয়াকিদির বিভিন্ন রচনায় পাওয়া যায়। দুই. সাইদ ইবনে সাদ ইবনে উবাদা খাজরাজি। তাঁর রচনা ইবনে হাম্বল ও আবি-ইওয়ানার ‘মুসনাদ’ এবং তাবারির ‘তারিখে তাবারি’তে রয়েছে। তিন. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (মৃ. ৭৮ হিজরি)। খ্যাতিমান তাফসিরবিশারদ সাহাবি। হাদিস ও সিরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে তার রচনা পাওয়া যায়। তাদের তিনজনের রচিত নবীজীবনী পুস্তকাকারে পাওয়া যায় না এবং পরবর্তী সময়েও সে-রচনাবলি কোথাও একত্রে সঙ্কলিত হয় নি।

তাদের পরে রচনাকর্মে হাত দেন উরওয়া ইবনে জুবাইর রা. (মৃ. ৯২ হি.), সাদ ইবনে মুসাইয়িব মাখজুমি (মৃ. ৯৪ হি.), আবদুল্লাহ ইবনে কাব ইবনে মালেক (মৃ. ৯৭ হি.) ও খলিফা উসমানের রা. ছেলে আবান ইবনে উসমান (মৃ.১০৫ হি.), ওয়াহাব ইবনে মুনাববিহ (মৃ. ১১০ হি.), ইবনে শিহাব জুহরি (মৃ. ১২০ হি.) শুরাহবিল ইবনে সাদ (মৃ. ১২৩ হি.) ও আবদুল্লাহ ইবনে আবু বাকর ইবনে হাজাম (মৃ. ১৩৫ হি.)। কিন্তু উরওয়া, ওহাব ও জুহরির রচনা ছাড়া সবকটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, কিছু কিছু অংশমাত্র বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থে টিকে আছে।

উরওয়া ইবনে জুবাইর রা. ছিলেন সাহাবি আবু বকরের রা. বড় মেয়ে আসমা’র ছেলে। তিনি উমাইয়া খলিফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান ও আল ওয়ালিদের সময়ে নবীযুগে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে জানতে চাওয়া চিঠির জবাব লিখতেন। তাকে বহু ঐতিহাসিক গ্রন্থে মুহাম্মাদের স. ‘প্রথম জীবনীকার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের খ্যাতিমান স্কলার ড. মুহাম্মাদ মুস্তফা আজমি (মৃ. ২০১৭ খ্রি.) তাঁর রচিত পুস্তিকাটির কেবল শেষভাগটি উদ্ধার করতে সক্ষম হন—যা আবুল আসওয়াদ মিশরির বর্ণনায় পাওয়া যায়—এবং ‘মাগাজি রসূলিল্লাহ স. লি-উরওয়াহ ইবনি যুবাইর বি-রিওয়াতি আবিল আসওয়াদ’ শিরোনামে রিয়াদ (সৌদি আরব) থেকে ১৯৮১ সালে প্রকাশ করেন। ওয়াহাব ইবনে মুনাববিহ’র রচনার একটি অংশ বর্তমানে জার্মানির হাইডেলবার্গে সংরক্ষিত আছে বলে জানা যায়। আর ইবনে শিহাব জুহরির রচনা বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থ থেকে কুড়িয়ে এনে ২ হাজার পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ আওয়াজি এবং তা দুই খণ্ডে ‘মারাউইয়্যাত আল ইমাম জুহরি ফিল মাগাজি’ শিরোনামে ২০০৪ সালে মদিনা থেকে প্রকাশিত হয়।

একটি বর্ণনা অনুযায়ী ‘মুআম্মার ইবনে রাশেদ’র (মৃ. ১৫১ হি.) সিরাতগ্রন্থ ‘আল-মাগাজি’ও সিরাতে ইবনে ইসহাকের পূর্বে রচিত এবং তার কপিও দুর্লভ নয়। লেখকদের জীবনকালের তারতম্য থেকেও প্রাচীনত্বের বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ইবনে ইসহাকের জন্ম ৮৫ হিজরি এবং মৃত্যু ১৫১ হিজরি। আর মুসা ইবনে উকবার জন্ম ৬৮ হিজরি এবং মৃত্যু ১৪১ হিজরি। সুতরাং অস্তিত্বের বিচারে ইবনে ইসহাক রচিত ‘সিরাত’ নয়—মুসা ইবনে উকবার ‘আল-মাগাজি’ সর্বপ্রাচীন পূর্ণাঙ্গ সিরাতগ্রন্থ।

সর্বপ্রাচীন পূর্ণাঙ্গ জীবনী গ্রন্থ

প্রাচীন সিরাত গ্রন্থের কথা উঠলেই সকলে একনামে ইবনে ইসহাক (মৃ. ১৫১ হি.) রচিত ‘সিরাতে ইবনে ইসহাক’কে চেনেন; যার ভিত্তিতে আব্দুল মালিক ইবনে হিশাম (মৃ. ২১৮ হি.) জনপ্রিয় সিরাতগ্রন্থ ‘সিরাতে ইবনে হিশাম’ রচনা করেছেন। অথচ এর অন্তত এক যুগ আগে রচিত হয়েছে মুসা ইবনে উকবা (মৃ. ১৪১ হি.) সুবিশাল সিরাতগ্রন্থ ‘আল-মাগাজি’ এবং তা এখনও অক্ষত আছে। একটি বর্ণনা অনুযায়ী ‘মুআম্মার ইবনে রাশেদ’র (মৃ. ১৫১ হি.) সিরাতগ্রন্থ ‘আল-মাগাজি’ও সিরাতে ইবনে ইসহাকের পূর্বে রচিত এবং তার কপিও দুর্লভ নয়। লেখকদের জীবনকালের তারতম্য থেকেও প্রাচীনত্বের বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ইবনে ইসহাকের জন্ম ৮৫ হিজরি এবং মৃত্যু ১৫১ হিজরি। আর মুসা ইবনে উকবার জন্ম ৬৮ হিজরি এবং মৃত্যু ১৪১ হিজরি। সুতরাং অস্তিত্বের বিচারে ইবনে ইসহাক রচিত ‘সিরাত’ নয়—মুসা ইবনে উকবার ‘আল-মাগাজি’ সর্বপ্রাচীন পূর্ণাঙ্গ সিরাতগ্রন্থ।

গতশতকের প্রথম দিকে জার্মান প্রাচ্যবিদ এডওয়ার্ড সাচাউ (মৃ. ১৯৩০ খ্রি.) বার্লিনে সরকারি প্রত্নতাত্বিক সংগ্রহশালা থেকে চতুর্দশ শতাব্দির শেষের দিকের হাদিসবেত্তা ইউসুফ ইবনে কাজি শাহবাহ (মৃ. ১৩৮৭ খ্রি.) সংকলিত মুসা ইবনে উকবা বর্ণিত হাদিসসমূহ ও ‘মাগাজি’র ২০টি অধ্যায় সম্বলিত একটি পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন এবং কিছু নির্বাচিত অংশ ইংরেজিতে প্রকাশ করেন। এর মধ্য দিয়ে আধুনিক সময়ে প্রথমবারের মতো গ্রন্থটি আলোর মুখ দেখে। এরপর মরক্কোর ইবনে জুহর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আবু মালিক মুহাম্মাদ ইবনুল হুসাইন বাকিশিশ দীর্ঘদিন পরিশ্রম করে বিভিন্ন প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ঘেঁটে আরবি মূলপাঠ উদ্ধারে সক্ষম হন, তারপর প্রয়োজনীয় টিকা-ভাষ্য যুক্ত করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক অনুষদ থেকে ১৯৯৪ সালে মুদ্রণের ব্যবস্থা করেন।

মুহাম্মাদ সা. ব্যক্তি ও নবী
মুহাম্মাদ সা. ব্যক্তি ও নবী (হার্ডকভার)

পরবর্তী যুগের শ্রেষ্ঠ রচনা

হিজরি প্রথম ও দ্বিতীয় শতক ছিল নবীজীবনী রচনার প্রথম যুগ। তৃতীয় শতক থেকে দ্বিতীয় যুগের সূচনা হয়। এ-যুগই হলো নবীজীবনী রচনার স্বর্ণযুগ এবং ইতিহাসের ধূলোর আস্তর কঠিন হওয়ার আগেই ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতগণ বিরাট বিরাট কলেবরের জীবনী ও ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেছেন। তৃতীয় শতকের শ্রেষ্ঠ রচনা হলো, সিরাতে ইবনে হিশাম, যার কথা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ আলফ্রেড গিলিয়াম অনুবাদিত ইংরেজি সংস্করণ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হলে তা আধুনিক সময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষায়ও তার বেশ কয়েকটি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তারপরই রয়েছে প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইবনে ওমর আল-ওয়াকিদি’র (মৃ. ৩৪৬ হি.) ‘আত-তারিখ ওয়াল মাগাজি’ গ্রন্থটি। লেখক ‘ওয়াকিদি’ নামেই সমধিক পরিচিত, তিনি মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তবে তিনি তাঁর এই গ্রন্থটির বিভিন্ন বর্ণনার ব্যাপারে ইসলামবেত্তা পণ্ডিতগণ বেশ ‘আপত্তি’ তুলেছেন। চতুর্থ হিজরি শতকে রচিত হয় ঐতিহাসিক জারির ইবনে তাবারি’র ( মৃ. ৩১০ হি.) ‘আত-তারিখ ওয়াল উমাম’ এবং আলী ইবনে হুসাইন মাসউদি’র (মৃ. ৩৪৬ হি.) ‘মুরুজু আয-যাহাব’, পঞ্চম হিজরি শতকে ইবনে হাজম’র (মৃ. ৪৫৬ হি.) ‘জাওয়ামিউস সিরাহ’, ষষ্ঠ শতকে আব্দুর রহমান সুহাইলি আন্দালুসি’র (মৃ. ৫৮১ হি.) ‘রওজুল উনফ’, সপ্তম শতকে প্রকাশিত হয় ইমাম নববি’র (মৃ. ৬৭৬ হি.) ‘তাহজিবুস সিরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ’, অষ্টম শতকে তিনটি গ্রন্থ বিখ্যাত হয়— ইমাম যাহাবি’র (মৃ. ৭৪৮ হি.) ‘আল-মাগাজি’, ইবনুল কাইয়্যিম জাওজি’র (মৃ. ৭৫১ হি.) ‘যাদুল মাআদ’ ও ইবনে কাসির’র (মৃ. ৭৭৪ হি.) ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’। এর মধ্যে ‘যাদুল মাআদ’ গ্রন্থটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ থেকে ৬ খণ্ডে বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। নবম হিজরি শতকের দু’টি বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থ হলো, ঐতিহাসিক আহমদ ইবনে আলী মাকরিজি’র (মৃ. ৮৪৫ হি.) ‘ইমতাউল আসমা বিমা লিররসূলি মিনার আবনা’ ও প্রখ্যাত হাদিসবেত্তা ইবনে হাজার আসকালানি’র (মৃ. ৮৫২ হি.) ‘মুখতাসারুরস সিয়ার’; দশম শতকে শিহাবুদ্দিন কাসতালানি (মৃ. ৯২৩ হি.) লেখেন ‘আল-মাওয়াহিবুল লাদুনিয়্যা’, এগার শতকে রচিত হয় আল্লামা বুরহানুদ্দিন হালাবি (মৃ. ১০৪৪ হি.) বিখ্যাত সিরাতগ্রন্থ ‘ইনসানুল উয়ূন ফি সিরাতিল আমিনিল মামুন’, যা ‘সিরাতে হালাবিয়া’ নামে সমধিক পরিচিত।

এ-যুগের রচনার সিংহভাগ রচিত হয়েছে আরবি ভাষায়, যদিও লেখকদের সবাই আরব ছিলেন, তা নয়। কিন্তু মুসলিমবিশ্বের লেখা ও শেখার মাধ্যম আরবি হওয়ায় রচয়িতাগণ আরবি ভাষাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

আধুনিক যুগের বিচিত্র রচনা

ইসলামের ইতিহাসের এমন কোনও পণ্ডিত খুঁজে পাওয়া ভার, যিনি নবীজীবনের উপরে কলম ধরেন নি। কারও কারও রচনা কলেবরে এতটাই বিরাট আকার ধারণ করেছে যে, তা কয়েক হাজার পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশে ‘সিরাত বিশ্বকোষ’ রচিত হয়েছে। আবার কেউ কেউ নবীজীবনের উপর আরবি ভাষায় বিরাট কাব্যগ্রন্থ রচনা করেছেন। মহানবীর জীবদ্দশাতেও তাকে নিয়ে অনেক প্রশস্তিমূলক কাব্য রচিত হয়েছে বটে, তবে তা জীবনী আকারে ছিল না। বারো হিজরি শতকে মাসউদ ইবনে মুহাম্মাহ আল-ফাসি (মৃ. ১১১৯ হি.) প্রথম কাব্যজীবনী রচনা করেন। গ্রন্থের নাম দেন ‘নাফাইসুদ দুরার ফি আখবারি সাইয়িদিল বাশার’। এরপর একইভাবে আহমদ বুখারি দিময়াতি (মৃ. ১৮৯২ ইং) রচিত ‘সাআদাতুত দারাইন’ এবং ইউসুফ ইসমাইল নাবহানি (মৃ. ১৯৩২ ইং) লেখেন ‘আন-নাজমুল বাদী ফি মাওলিদিশি শাফি’। বাংলাভাষাও কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘মরু ভাস্কর’ লিখেছেন।গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে। মহানবীর জীবনী নিয়ে চারটি সর্গে ১৮ টি খণ্ড-কবিতা নিয়ে রচিত হয়েছে এই কাব্যগ্রন্থ।

আধুনিক যুগে আরবি ভাষার অন্যতম সিরাতগ্রন্থ হলো, নাসিরুদ্দিন আলবানি (মৃ. ১৯৯৯ ইং) রচিত ‘সহিহ আস –সিরাতুন নাবাবিয়্যা’, ভারতের বিখ্যাত দায়ি আবুল হাসান আলী নদভি (মৃ. ২০০০ ইং) রচিত ‘আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা’; যা বহু ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে, বাংলাভাষায় এর অনুবাদ ‘নবীয়ে রহমত’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে। সফিউর রহমান মোবারকপুরির (মৃ. ২০০৬ ইং) ‘আর রাহীকুল মাখতুম’। আরবি বইটি ১৯৭৯ সালে রাবেতায়ে আলাম আল ইসলামি আঢোজিত প্রথম উন্মুক্ত সিরাত গ্রন্থ প্রতিযোগিতায় ১১৮৭ টি পান্ডুলিপির মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে। এটিকে সিরাত সংক্রান্ত বিশাল সংগ্রহশালার একটি নির্যাস গ্রন্থ বলা যায়। মিশরীয় চিন্তাবিদ মুহাম্মাদ আল গাজালি (মৃ. ১৯৯৬ ইং) রচনা করেন সিরাতবিষক একটি বিশ্লেষগ্রন্থ ‘ফিকহুস সিরাহ’ একই নামে সিরিয়ান শায়খ রামাদান আল-বুতি’রও (মৃ. ১৯৯৬ ইং) একটি রচনা রয়েছে’। এ-ছাড়া আরবি ভাষায় লিখিত সিরাতের মধ্যে সাইয়েদ সোলাইমান নদভির আস-সিরাতুন নাবাবিয়া, শায়খ সালেহ আল মুনাজ্জিদ ‘খুলুকুন আজিম’ ও আলী সাল্লাবি’র ‘আসসিরাতুন নাবাবিয়া আরজু ওয়াকায়ি ওয়া তাহলিলিল আহদাস’ উল্লেখযোগ্য।

উর্দু ভাষায় রয়েছে ভারতের শিক্ষাবিদ মওলানা আবুল কালাম আজাদ ‘রসুলে রহমত’ এবং সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদির ‘সিরাতে সরকারে দোআলম’ ও শিবলী নুমানির ‘সিরাতুন নাবী’। ইংরেজি ভাষার আলোচিত সিরাতগ্রন্থগুলি মধ্যে মার্টিন লিংগসের Muhammad: His Life Based on the Earliest Sources, জামাল বাদাবি’র Muhammad A Blessing For Mankind. ওয়াহিদুদ্দিন খানের Prophet of Revolution, হোসাইন হায়কল’র Muhammad Rasulallah, মোহাম্মদ হামিদুল্লাহ’র Muhammad Rasulullah: A concise survey of the life and work of the founder of Islam, সাইয়েদ হোসাইন নাসের’র Muhammad, Man of God, আদিল সালাহি’র Muhammad : man and prophet, a complete study of the life of the Prophet of Islam, ফেতুল্লাহ গুলেন’র The Messenger of God: Muhammad ও তারিক রামাদান’র The Messenger: the Meanings of the Life of Muhammad উল্লেখযোগ্য।

অমুসলিমদের রচনাবলি

উনবিংশ শতকের শুরুতে প্রাচ্যবিদদের রচনায় বেশ কিছু জীবনীগ্রন্থের উঠে আসে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাতে মহানবীকে উপস্থাপন করার চেয়ে তাকে আক্রমণ করা হয়েছে বেশি। ফিলিপ কে হিট্টি আরবি ভাষা ও সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত। তিনি তার রচিত ‘ইসলাম অ্যান্ড দ্য’ ওয়েস্ট’ গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়েছেন ‘ইসলাম ইন ওয়স্টার্ন লিটারেচার’। তিনি দেখিয়েছেন ১৬৪৯ সালে সিউর ডিউ রায়ার কুরআনে ফার্সি তর্জমা প্রকাশ করেন। তার সঙ্গে মহানবী’র সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য যুক্ত করে Alcoran of Mahomet নামে প্রকাশ করেন। এই Mahomet হলো মুহম্মাদের বিকৃত রূপ। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে একই নামের ৪১টি রূপের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর ১৭৩৬ সালে ভলতেয়ার ‘মাহোমেত’ নামে একটি পাঁচ অঙ্কের প্রহসন রচনা করেন; যার পুরো শিরোনাম : Le fanatisme, ou Mahomet le Prophete (ধর্মান্ধতা বা মাহোমেত নবী)। নাটকের মাহোমেত (মুহাম্মদ স.) চরিত্রটি ধর্মান্ধ, যে তার সমালোচকদের হত্যার আদেশ দেয় এবং ‘পালমিরা’ নামে এক মেয়ের প্রেমে মত্ত হয়। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সেন্ট হেলেনাতে বন্দি থাকাকালে এই নাটকে এর কঠোর সমালোচনা করেন। ভলতেয়ার তার বক্তব্য পরিবর্তন করেন এবং বলেন : “তিনি (মুহাম্মাদ) অবশ্যই খুব মহান ব্যক্তি ছিলেন এবং তিনি মহান মানুষদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। ছিলেন বিজয়ী বিধানদাতা, প্রজ্ঞাবান ও নেতা। সাধারণ মানুষের চোখে, তিনি পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন।”

১৮৩০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের একজন পূর্বপুরুষ রেভারেন্ড জর্জ বুশ এ.এম (১৭৯৬-১৮৫৯) লেখেন ‘The Life of Mohammed : Founder of the Religion of Islam and of the Empire of the Saracens। কিসিঞ্জার লিগেছি রিপ্রিন্ট ১৮৩৩ সালে তা পুনর্প্রকাশ করে এবং নতুন করে ২০০২ সালে লন্ডনে আবার ছাপা হয়। ১৮৪৩ সালে জার্মান প্রাচ্যবিদ গুস্তাফ ওয়েইল লেখেন : Mohammed der Prophet, sein Leben und seine Lehre, ১৮৫১ সালে অস্ট্রিয়ান প্রাচ্যবিদ স্প্রেঙ্গার লেখেন Aloys Sprenger, The Life of Mohammad, from Original Sources, ১৮৫৮ সালে স্কটিশ লেখক উইলিয়াম মুর ৪ খণ্ডে লিখেছেন : The Life of Muhammad and History of Islam to the Era of the Hegira। তবে ১৯৪৭ সালে আর.ভি.সি বোদলে লিখিত বিখ্যাত The Messenger: the Life of Mohammed গ্রন্থটি বেশ প্রশংসা অর্জন করে, খ্যাতিমান স্কলার আলী নদভিসহ পরবর্তীকালের সিরাতগ্রন্থকারগণ এই গ্রন্থের রেফারেন্স ব্যবহার করেন। এমন আরেকটি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হলো উইলিয়াম মন্টোগোমেরি ওয়াট রচিত Muhammd at Mecca ও Muhammae at Medina।

উর্দু ভাষায় অমুসলিমদের রচনাবলির মধ্যে বিখ্যাত দুটি গ্রন্থ হলো, ইন্ডিয়া পত্রিকার সম্পাদক গুরু দত্ত সিং দারা (G.S. Dara) লিখিত ‘রসুলে আরাবি’, যা আবু তাহের মেছবাহ কর্তৃক ‘তোমাকে ভালোবাসি হে নবী’ শিরোনামে বাংলাভাষায় অনুবাদিত হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আরেকটি হলো স্বামী লক্ষ্মণ প্রসাদ লিখিত ‘আরব কা চান্দ’।

উর্দু ভাষায় অমুসলিমদের রচনাবলির মধ্যে বিখ্যাত দুটি গ্রন্থ হলো, ইন্ডিয়া পত্রিকার সম্পাদক গুরু দত্ত সিং দারা (G.S. Dara) লিখিত ‘রসুলে আরাবি’, যা আবু তাহের মেছবাহ কর্তৃক ‘তোমাকে ভালোবাসি হে নবী’ শিরোনামে বাংলাভাষায় অনুবাদিত হয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আরেকটি হলো স্বামী লক্ষ্মণ প্রসাদ লিখিত ‘আরব কা চান্দ’। গ্রন্থটির ভূমিকায় লেখকের পরিচয়ে বলা হয়েছে—লেখক একজন হিন্দু সাহিত্যানুরাগী যুবক; সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদের বাইরে এসে সত্যপ্রিয়তার প্রাণিত হয়ে শেষনবীর জীবনী লিখেছেন। ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের ফতেহাবাদ জেলার তোহানায় থাকতেন তিনি। ১৯৩৯ সালে ২৬ বছর বয়সে মারা যান। গ্রন্থটি পরে পকিস্তানের লাহোর থেকে প্রকাশিত হয়।

আর রাহীকুল মাখতুম
আর রাহীকুল মাখতুম (হার্ডকভার)

বাংলাভাষায় লেখা নবীজীবনী

বাংলাভাষায় যারা মহানবীর জীবনীগ্রন্থ লেখেন, তাদের বেশ কয়েকজনই ইসলামের অনুসারী নন, তবু ভক্তি ও ভালোবাসার অর্ঘ্য নিবেদনে তারা মুসলিমদের পিছিয়ে ছিলেন না। যদিও ১৮০২ সালে শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে জনৈক লেখকের ‘মহম্মদের বিবরণ’ শিরোনামের একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়, কিন্তু তা ছিল কুৎসায় ভরপুর। তবে বাংলায় প্রথম যার গ্রন্থ পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সামনে আসে, তিনি হলেন রেভারেন্ড জেমস লং। তিনি প্রথম জীবনে ছিলেন একজন খ্রিষ্টান, পরে মুসলিম হন। ১৮৮৫ সালে তা কলকাতার সত্যার্ণব প্রকাশনী থেকে ‘মুহাম্মদের জীবনচরিত্র’ নামে প্রকাশিত হয়। একই বছর অতুল কৃষ্ণমিত্র লেখেন ‘ধর্মবীর মুহাম্মদ’ নামে একটি নাট্যজীবনী।১৮৮৬ সালে কৃষ্ণ কুমার মিত্রের ‘মুহাম্মদ চরিত্র ও মুসলমান ধর্মের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ প্রকাশিত হয় শ্যামা প্রেস, কলকাতা থেকে এবং গিরিশ চন্দ্র সেন লেখেন ৩ খণ্ডে ‘মহাপুরুষ মুহাম্মদের জীবন চরিত’। এরপর ১৯০৪ সালে রামপ্রাণ গুপ্ত লিখেছেন ‘হযরত মুহাম্মদ ও হযরত আবু বকর’।

বাংলা সাহিত্যে নবীজিকে নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন শেখ আব্দুর রহীম (জ. ১৮৫৯ খ্রি-মৃ.১৯৩১খ্রি.)। গ্রন্থটির নাম ‘হযরত মুহম্মদের স. জীবন চরিত ও ধর্মনীতি’, ১৮৮৭ সালে ৪০৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে শ্রেষ্ঠ সিরাতগ্রন্থ হলো, কলকাতা থেকে ১৯০৮ সালে ডা. সৈয়দ আবুল হোসেন রচিত ‘মোসলেম পতাকা’, ১৯১৫ সালে কলকাতা থেকে শেখ মোহাম্মদ জমীর উদ্দীন রচিত ‘মাসুম মোস্তফা (সা.)’, ১৯২২ সালে কলকাতা থেকে এয়াকুব আলী চৌধুরী রচিত ‘মানব মুকুট’, ‘১৯২৫ সালে মোবিনুদ্দীন আহমদ জাহাগীর নগরী রচিত ‘নবীশ্রেষ্ঠ’, ১৯২৫ সালে কলকাতা থেকে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী রচিত ‘মরু ভাস্কর’, ১৯৪২ সালে চুঁচুড়া থেকে কবি গোলাম মোস্তফা রচিত ‘বিশ্বনবী’, ১৯৪৯ সালে ঢাকা থেকে খান বাহাদুর আবদুর রহমান খাঁ রচিত ‘শেষ নবী’, ১৯৫১ সালে ঢাকা থেকে মাওলানা আবদুল খালেক রচিত দুই খণ্ডের ‘ছাইয়েদুল মুরছালীন’, ঢাকা থেকে ১৯৬০ সালে মুহাম্মদ বরকতুল্লাহ রচিত ‘নবী গৃহ সংবাদ, ১৯৬৮ সালে শায়খুল হাদীস মাওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোসাইন রচিত ‘হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) সমকালীন পরিবেশ ও জীবন। এ ছাড়া কবি আল মাহমুদ রচিত ‘মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)’, কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদা রচিত ‘মহানবী’ ও ২০০২ সালে প্রকাশিত কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ রচিত ‘বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-ও অনন্য জীবনীগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষক নাসির হেলাল তাঁর গবেষণায় মধ্যযুগ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলায় রচিত মোট ১০২৮টি গ্রন্থ নাম উল্লেখ করেছেন।

নারীদের সিরাত রচনা

মহানবীর জীবনীগ্রন্থ রচনার কাজটি ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকে পুরুষদের হাতেই পরিপুষ্ট হয়েছে। তবে আধুনিক সময়ে বেশ কয়েকজন নারীর লিখিত গ্রন্থ বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এক্ষেত্রে সবার উপরে থাকবেন ক্যারেন আর্মস্ট্রং।তিনি ইংল্যান্ডের ওয়ারসেস্টারশায়ারের উইল্ডমুরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৬২ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ছিলেন গির্জার নান। ১৯৯১ সালে তাঁর Muhammad: A Biography of the Prophet গ্রন্থটি প্রকাশিত হলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বাংলাভাষাসহ বিশ্বের বহু ভাষায় অনুবাদিত হয়। এই গ্রন্থে তিনি মুহাম্মদের স. জীবনের যেসব ঘটনাবলি নিয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনা ছিল, সেগুলোর যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে তাদের সমাজের উপমা উল্লেখ করেন। ২০০৬ সালে Muhammad: A Prophet For Our Time নামে আরও একটি ননফিকশন গ্রন্থ প্রকাশ করেন।
তবে এর আগে ১৯৪২ সালে দি শিকাগো ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় Aishah : the beloved of Mohammed। এই গ্রন্থের লেখক নাবিয়া অ্যাবট ছিলেন আমেরিকার আমেরিকান একজন প্যাপিওরোলজিস্ট ও পুস্তিকাবিদ। তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউটে প্রথম মহিলা অধ্যাপক নির্বাচিত হন। আরবি লিপি ও ইসলামের প্রাচীনতম লিখিত দলিলগুলির উত্থানের বিষয়ে তার গবেষণার জন্য বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন। মুহাম্মদের স. সহধর্মীনি আয়েশাকে রা. কেন্দ্র করে লেখা হলেও এটি মূলত একটি সিরাতগ্রন্থ, যাতে হিজরতের পূর্ব থেকে আয়েশা’র রা. মৃত্য পর্যন্ত ইসলামের ইতিহাসও সুনিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে। ১৯৮৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলিনা প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় প্রভাবশালী জার্মান প্রাচ্যবিদ অ্যানেমারি শিমেল’র ৩৬৭ পৃষ্ঠা একটি গ্রন্থ। শিারানম : And Muhammad Is His Messenger: The Veneration of the Prophet in Islamic Piety। লেখক দীর্ঘদিন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। ২০১৩ সালে ব্রিটিশ লেখক লেসলি হাজলেটন (জন্ম ১৯৪৫) রচিত The First Muslim : The Story of Muhammad নিউইয়র্ক টাইম এডিটর্স বাছাইয়ে নির্বাচিত হয় এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।২০১৬ সালে ফরাসি লেখক হেলা ওয়ার্দি মহানবীর জীবনের শেষের দিনগুলি নিয়ে রচনা করেন Les Derniers Jours De Muhammad গ্রন্থটি, যা ইতোমধ্যে ‘মুহাম্মাদ ফি আইয়্যামিল আখিরাহ’ শিরোনামে আরবি ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে।

বাংলাভাষায় নারী সিরাতগ্রন্থকারদের মধ্যে সর্বপ্রথমে জায়গা করে নিয়েছেন সারা তাইফুর (জ. ১৮৯৩)। তাঁর লিখিত ‘স্বর্গের জ্যোতি’ গ্রন্থটি ১৯১৬ সালে প্রকাশিত হয়। অবশ্য ১৩৭১ বাংলা সনে বাংলা একাডেমি, ঢাকা এর একটি সংস্করণ প্রকাশ করে।তার পুরো নাম হুরায়ূন্নিসা সারা খাতুন। কাব্যিক গদ্যে রচিত এ গ্রন্থের ভাষা সাবলীল। লেখিকা অত্যন্ত দরদ দিয়ে গ্রন্থটি রচনা করেছেন। উল্লেখ্য যে, এ গ্রন্থ প্রকাশের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিঠি দিয়ে লেখিকাকে অভিনন্দিত করেছিলেন। এরপর খাদিজা আক্তার রেজায়ি লেখেন ‘তিনি চাঁদের চেয়েও সুন্দর’। তিনি ‘আর-রাহিকুল মাখতুম’র মতো কয়েকটি প্রাচীন ও মৌলিক সিরাতগ্রন্থ অনুবাদের জন্য তিতি খ্যাত হয়েছেন। ২০০৯ সালে মাসুদা সুলতানা রুমি’র সিরাতগ্রন্থ ‘আমি বারোমাস তোমায় ভালোবাসি’ প্রকাশিত হয় রিমঝিম প্রকাশনী ঢাকা থেকে। সর্বশেষ ২০১৯ সালে প্রবাসী লেখিকা মাজিদা রিফা’র ‘মহানবী’ প্রকাশিত হয় রাহবার প্রকাশনী, ঢাকা থেকে। অসাধারণ গদ্যে রচিত তাঁর গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

সীরাতে রাসুল ﷺ জানতে যে বইগুলো আপনার সংগ্রহে রাখতে পারেন !

সবিশেষ—হাজার বছর ধরে মহানবীর জীবনী রচনার যে অবিরল ধারা চলেছে, তা নিশ্চয় মহাকাল পর্যন্ত রুদ্ধ হবার নয়। কবি যথার্থ বলেছেন : শব্দশিল্পী সকলকালের সকল দেশের সব ভাষার, আহরণ করে সকল মুক্তা মনের মাধুরি করে উজাড়, অনন্তকাল রচে যায় যদি বাণীর হার, তোমার স্তুতি তবুও হে নবী হবে না শেষ।

মনযূরুল হক

মনযূরুল হক

মনযূরুল হক। লেখক ও গবেষক। কওমি মাদরাসা থেকে তাকমিল এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন মাহির’স প্রডাকশন ও মুহাম্মাদ স. রিসার্চ সেন্টারে। গবেষণা করছেন ‘ইসলামি আইনের আলোকে বাংলাদেশের আইন : বৈপরীত্য ও সামঞ্জস্য’ বিষয়ে। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে আশিক মিন ফিলিস্তিন (২০১৬), মুহাম্মাদ স.: ব্যক্তি নবী (২০১৮), রমজানে জীবন যাপন (২০১৯) উল্লেখযোগ্য।

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading