কেমন ছিলেন খলিফা ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ?

ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ

জন্ম:
৬৩ হিজরীতে মদীনায় জন্ম। পিতা আবদুল আজিজ ও মাতা লায়লা বিনতে আসেমের কোল আলোকিত করে ধরিত্রীর বুকে পদার্পণ করেন। পালিত হন রাজ পরিবারের আয়েশী সুখে। দাদা মারওয়ান ছিলেন প্রভাবশালী শাসক। পিতা আবদুল আজিজ বিন হাকাম ছিলেন বনি উমাইয়ার শ্রেষ্ঠ গভর্নরদের একজন। ২০ বছরেরও অধিককাল মিসর শাসন করেছেন তিনি।

ইতিহাসের সোনালী যুগে সাহাবা ও তাবেয়ী। পূণ্যত্মাদের পূণ্যভূমির সুশোভিত কাফেলার মাঝে বেড়ে উঠেছেন তিনি।

শিক্ষা-দীক্ষা:
সালেহ ইবনে কাইসান ও আব্দুল্লাহ বিন উতবার মত বিশ্বখ্যাত তুখোড় মুহাদ্দিসগণ তাঁর হাদিসের শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক। তাছাড়া আনাস ইবনে মালেক, আব্দুল্লাহ বিন ওমর, উরওয়া ইবনে যুবায়ের, আবু সালামা বিন আব্দুর রহমান, ওবায়দুল্লাহ বিন উতবা,সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব ও ইউসুফ বিন আব্দুল্লাহ সহ বিখ্যাত সাহাবী ও জগদ্বিখ্যাত তাবেয়ীনগন ছিলেন তাঁর সরাসরি শিক্ষক।

দাম্পত্য:
বিয়ে করেন চাচাতো বোন ফাতিমা বিনতে আব্দুল মালিককে।

খলীফারূপে শাসন ও অবদান : 
ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ মদিনাকে ভালোবাসতেন। কারণ মুকুটহীন সম্রাট রাসুলে আরাবী যে এখানে আরাম করছেন চিরনিদ্রায়। তাছাড়া হযরত উরওয়া, ইকরামা, আবু সালামা, আবু বকর ইবনে আব্দুর রহমান, সালেহ ইবনে কাইসান ও আব্দুল্লাহ বিন উতবার মত বড় বড় ফকীহ-মুহাদ্দিস সাহাবা ও তাবেয়ীদের বিচরণক্ষেত্র এটি। তাই এই ভূমির প্রতি ভালবাসা থাকাটাও স্বাভাবিক। মদিনা শাসকের পদটাও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। খলীফা ওয়ালীদ যখন ওমর ইবনে আব্দুল আজীজকে মদীনার শাসক নিযুক্ত করার প্রস্তাব দিলেন তখন তিনি ওয়ালীদকে শর্ত জুড়ে দিলেন——

“আমার আগের শাসকরা প্রজাবর্গের উপর অত্যাচার করেছে এবং অন্যায় ও অসৎ উপায়ে কালো টাকা উপার্জন করেছে। আমি তাদের মত অত্যাচার কিংবা কালো টাকা আয় কোনোটাই করতে পারব না। আপনি কি তাতে রাজি?”

[তাবাকাত, ইবনে সাদ, খ:৫, পৃ:২৪৪]

খলীফা ওয়ালীদ জানালেন—-
‘‘আপনি সদা সত্যের উপর অবিচল থাকেন, আমি আছি আপনার সাথে। আপনি একটা পয়সাও যদি কেন্দ্রে পাঠাতে না পারেন, তবুও আপনার অত্যাচার করার দরকার নেই।’’

[তাবাকাত, ইবনে সাদ, খ:৫, পৃ:১৪১‘]

শর্ত মেনে ওয়ালীদ তাঁকে শাসক নিয়োগ দেন এবং পাশাপাশি শাসকের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা প্রদান করেন। মদীনা ছাড়া মক্কা ও তায়েফও তার শাসনাধীন ছিল।

ক্ষমতায় আরোহনের পর প্রথমেই তিনি ন্যায় ও ইনসাফ কায়েমের প্রতি মনোযোগ দেন। প্রথমেই রাজ পরিবারে সংশোধনী আনেন এবং অত্যাচারী গভর্নরদের বরখাস্ত করেন। সৎ ও বিশ্বস্ত লোকেদের অনুসন্ধান করে গভর্নরের দায়িত্ব দেন। জাকাত আদায়ের যে ব্যবস্থা আগের শাসকদের সময়ে প্রচলিত ছিল, তা নতুন ভাবে সংশোধন করেন।

বায়তুল মালের অর্থ সাধারণ মুসলিমদের কল্যাণে ওয়াক্ফ করে দেন। অন্যায়ভাবে দখল করা অমুসলিমদের উপাসনালয়গুলো তাদের ফিরিয়ে দেন। অমুসলিমদের যে সব জমি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তাও তাদের ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। স্বাধীনভাবে কার্য সম্পাদনের জন্য বিচার বিভাগকে সরকার ব্যবস্থা থেকে আলাদা করে দেন এবং বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেন।

কর আদায়ের ক্ষেত্রে সব ধরণের কঠোরতা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন:
মক্কা-মদীনা ও তায়েফের ফকীহদের বলে রেখেছিলেন, কোথাও অন্যায় হতে দেখলে দ্রুত ও তাৎক্ষণিক তাদের জানাতে। এজন্য বিখ্যাত তাবেয়ী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ফকীহ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব তাকে ‘‘যুগের মাহদী’’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

মদীনার ছয় বছরের শাসনামলে ন্যায়-বিচার, আইনের সুশাসন ও প্রজা-সাধারণের কল্যাণের প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন। মদীনার আশেপাশে কূপ খনন করে মদীনাবাসীর পানির অভাব দূর করেন। মসজিদে নববী সংলগ্ন বাগানে ঝরনা ও হাউজ নির্মাণ করে আগত অতিথিদের পানির অভাব দূর করেন। হেজাজের রাস্তা-ঘাট সংস্কার, পর্যটকদের জন্য মক্কা-মদীনা ও তায়েফের সংযোগ সড়ক সংস্কারে করেন।

খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরের মাথায় মসজিদে নববীর পুননির্মাণ ও সৌন্দর্য ‍বৃদ্ধির কাজে হাত দেন। এ কাজের জন্য মিশর, সিরিয়া ও আফ্রিকার বিখ্যাত সব আর্কিটেকচার ও ইঞ্জিনিয়ারদের হায়ার করেছিলেন। যেখানে ভাল মানের পাথর পাওয়া যেত সেখান থেকে মূসা, রুখাম ও মর্মর পাথরের উত্তম অংশ সংগ্রহ করতেন।

[মুজামুল বুলদান, ইয়াকূত আল-হামূভী, খ:৪, পৃ:৬৬], [ফুতূহুল বুলদান, আহমাদ আল-বালাযূরী (মৃত্যু ২৭৮ হি.), পৃ:৭৬]

“বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল থেকে ৮০ জনেরও বেশি আর্কিটেকচার স্পেশালিস্ট ও হাই-কোয়ালিফাইড ইঞ্জিনিয়ার হায়ার করা হয়। প্রায় ৩ বছর যাবত নির্মাণ কাজ চলতে থাকে।” [মুজামুল বুলদান, ইয়াকূত আল-হামূভী, খ:৪, পৃঃ৪৬৬]

অবশেষে এই খলীফা ৯৩ হিজরীতে স্বেচ্ছায় খিলাফতের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন।

ধ্বংসের আগে ওমর বিন আব্দুল আজিজের কবর ও রওজার সামনের মসজিদ 5

ধ্বংসের আগে ওমর বিন আব্দুল আজিজের কবর ও রওজার সামনের মসজিদ

সাধাসিধে ও অনারম্বর জীবন-
খলীফা হওয়ার আগে পোশাক-পরিচ্ছদে ছিল রাজকীয় ভাব। বিত্ত-বৈভব, ঐশ্বর্য ও সুগন্ধির প্রকাশ যেন তার সমার্থক হয়ে উঠেছিল। এত মূল্যবান পারফিউম ব্যবহার করতেন, যে পথে হেঁটে যেতেন এক সপ্তাহ পরে সেখান দিয়ে কেউ অতিক্রম করলেও ধারণা করা যেত যে, এখান দিয়ে ওমর বিন আব্দুল আজীজ হেঁটে গিয়েছেন। পায়জামার আঁচল পায়ে এসে জড়িয়ে থাকত। কুঞ্চিত কেশ ললাটে এসে পড়ত। রাজকীয় এই অনুভব ও ঐশ্বর্যের মধ্যেও অবশ্য কখনও হারাম ভক্ষণ করেননি। রমনীদের প্রতি দৃষ্টি দিতেন না। শরীয়ত বিরোধী কোন কাজও পছন্দ করতেন না।

ইনসাফ প্রতিষ্ঠা ও অনাচার প্রতিরোধ-
খিলাফাতের দায়িত্ব গ্রহণের পর কেবল নগদ অর্থ ও স্থাবর সম্পত্তি বায়তুল মালে জমা দিয়েছেন এমন নয়, বরং স্ত্রীর পোশাকাদি ও গহনা-অলঙ্কার পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোষাগার-বায়তুল মালে জমা দিয়েছেন। খিলাফাত গ্রহণের আগে তাঁর বার্ষিক আয় ছিল ৪০ হাজার দিনার (স্বর্ণমুদ্রা)। এভাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব-কিতাবের পর নিজ ও নিজ বংশের সকল দখল করা সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগার-বায়তুল মালে জমা দিয়ে দেন। হযরত মুআবিয়া (রা.) এর পর তাঁর বংশের লোকেরা অন্যায়ভাবে লোকেদের যে সব সম্পদ দখলে নিয়েছিল, উমর বিন আব্দুল আজিজ সেসব সম্পদ ও অর্থ প্রাপকদের নিকট ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। পরবর্ততীতে মক্কা, ইয়ামেন, তায়েফ, ইরাক ও মিশরে একই আদেশ জারি করেন।

হজরত উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. এর ক্ষমতাকালে অবস্থা এতটাই উন্নত হয় যে, ৪ জন লোক একত্রিত হলেই সেখানে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কিত আলোচনা শুরু হয়ে যেত।

ধর্মবিরোধী আইন সংস্কার: 
খলীফা হওয়ার পর অন্যান্য শাসকবর্গের উদ্দেশ্যে ফরমান জারি করেন—“ইসলামে কতগুলো নীতিমালা আছে, যারা এগুলো পুরোদস্তুর মানে তারা পূর্ণ ঈমানের অধিকারী। যারা মানে না তাদের ঈমান অপূর্ণ। আমি বেঁচে থাকলে এগুলোই তোমাদের শেখাতে থাকব। সে অনুযায়ী কাজ করতে তোমাদের বাধ্য করব। আর যদি চলে যাই তাহলে তোমাদের মাঝে আমার জিইয়ে থাকার লোভ নেই।”

উমাইয়ারা নিজেদের স্বার্থে খিলাফাত যুগের যেসব আইনে পরিবর্তন এনেছিল তিনি সেসব আইন পরিবর্তন করে হযরত ওমরের যুগের আইন কার্যকরের নির্দেশ দেন। আইনে পরিবর্তন এনে নিজ গোত্র উমাইয়াদের অন্যায়ভাবে দখল করা সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে সেগুলো জব্দ করেন। শরীয়ত বিরোধী সকল আইনকে অকার্যকর ঘোষণা করেন। ক্রম অনুযায়ী কর্মচারীদের বার্ষিক বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ৩০০ দিনার নির্ধারণ করেন।

ওমর বিন আব্দুল আজীজের শাসনামলে মুসলিম বিশ্বের কিছু মানচিত্র 3.1

 

ওমর বিন আব্দুল আজীজের শাসনামলে মুসলিম বিশ্বের কিছু মানচিত্র:

রাষ্ট্রীয় আমলাদের জবাবদিহিতা: 
তাঁর শাসনামলে কোন কর্মচারী শরীয়ত বিমুখ হলে কিংবা দায়িত্বে অবহেলা করলে তিনি তার কঠোর হিসেব নিতেন। শাসক বা কর্মচারী কেউ ন্যায় ও শরীয়ত পরিপন্থি কোন কাজ করলে তিনি সহজে তা মেনে নিতেন না। হয় শাস্তি দিতেন বা ক্ষমতাচ্যুত করতেন। সেই প্রক্রিয়াতেও তিনি শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ নিয়ম-নীতি রক্ষা করতেন।

এক কর্মচারী ওমর ইবনে আব্দুল আজীজকে লেখেন—আপনার খিলাফত লাভের কথা শুনে লোকেরা দ্রুত জাকাত আদায় করতে শুরু করেছে। এখন আমার কাছে প্রচুর অর্থ জমা আছে। আপনার মতামত ছাড়া কোনকিছু করতে আমি পছন্দ করি না। উত্তরে ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ লিখলেন—আমার সত্তার কসম, প্রজারা আমাকে ও তোমাকে তাদের আশানুরূপ পায়নি। তুমি তাদের সম্পদ কেন আটকে রেখেছো ? আমার চিঠি পাওয়া মাত্র মুসলমানদের মধ্যে তা বণ্টন শুরু করবে।’’

সমাজ সংস্কার:
যত অকার্যকর প্রথা ছিল সব রহিত করেন। জিজিয়া ও খারাজ অবশিষ্ট সকল কর মওকুফ করে দিয়েছিলেন। জিজিয়া আদায়েও ছিলেন ইনসাফের প্রতি সম্পূর্ণ নিষ্ঠাবান। কেবল তাদের থেকেই কর নেওয়া হত যাদের জিজিয়া আদায়ের সামর্থ্য ছিল। দরিদ্র, সামর্থ্যহীন, অন্ধ, প্রতিবন্ধী ও গীর্জার পাদ্রিরা ছিলেন কর ব্যবস্থার একদম বাইরে। নৈতিক চরিত্র স্খলনকারী অপরাধীকে তিনি শাস্তি দিতেন তার সামনে।

একবার মদ্যপানে অভিযুক্ত এক অপরাধীকে তার সামনে আনা হল, তিনি তার গায়ের কাপড় খুলে ৮০ টি বেত্রাঘাত করার পর বলেন, এ কাজ পুনরায় যদি কর, এভাবে আবারও পেটাব এবং কারাগারে বন্দি করে যতক্ষণ না সংশোধন হও। লোকটি সাথে সাথে বলে উঠল, আমি তওবা করছি, এমন কাজ আর কোনোদিন করব না।

মানুষের চরিত্র সংশোধনের জন্য যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের বেতনভুক্ত কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে গণচরিত্র সংশোধনের জন্য প্রেরণ করতেন। সেসব মনীষীরা লোকেদের ইসলাম শিক্ষার পাশাপাশি আত্মশুদ্ধির দীক্ষা দিতেন। তারা প্রাদেশিক গভর্নরদের সমান ভাতা পেতেন।

দাস মুক্তি:
খলীফা আব্দুল মালেক, ওয়ালিদ ও সুলাইমানের যুগে মুক্তদাসদের বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহার করা হত। সর্বত্র আক্রমণের সময় তাদের অগ্রভাগে রাখা হত। কিন্তু এর জন্য তাদের কোন ভাতা বরাদ্দ থাকত না। তিনি এসে সেই অন্যায় দূর করেন।

ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের পূর্বের উমাইয়া খলীফারা লক্ষ লক্ষ দাস-দাসীদের নির্যাতন করে আসছিল। তিনি এসব নির্যাতিত দাস-দাসীদের পক্ষে ফরমান জারী করেন— ‘‘তোমরা যেসব দাসদের মুক্তি দিয়ে থাক যদি তারা ঈমান আনে তবে তাদের মনিবদের মত তাদের ভাতা প্রদান করবে।”

সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণ:
একবার তিনি জানতে পারেন, হেরার এক মুসলিম একজন অমুসলিম জিম্মিকে অকারণে হত্যা করেছে। তিনি সেখানকার শাসককে নির্দেষ দিলেন, হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির পরিবারের কাছে হস্তান্তর কর এবং তাদের এই অধিকার দাও—‘‘এই মুসলিম লোকটিরর সাথে তারা যা ইচ্ছে করতে পারে।’’

ইসলামের দণ্ডাদেশ হচ্ছে, প্রত্যেক হত্যাকারীকে নিহত ব্যক্তির পরিবারে হস্তান্তর করা হবে, ইচ্ছে করলে নিহতের পরিবার খুনীটিকে হত্যা করতে পারে। আবার চাইলে নগদ রক্তপণ নিয়ে ক্ষমা করে দিতে পারে। এই ঘটনায় পরিবার খুনীকে হত্যা করেছিল।

একবার এক অমুসলিম কৃষক এসে তাঁর নিকট অভিযোগ দায়ের করে যে, খলীফার এক সেনাদল তার শষ্য ক্ষেতের উপর দিয়ে অতিক্রম করায় তার সকল ফসল বিনষ্ট হয়ে গেছে। তখন তিনি ১০ হাজার দিরহাম ক্ষতিপূরণ করতে আদেশ দেন এবং নির্দেশ দেন এমন জুলুম যেন ভবিষ্যতে আর না হয়।

কারাবন্দীদের জীবন মান উন্নয়ন:
অপরাধীদের তিনি অপরাধের মাত্রার চেয়ে যেন শাস্তি বেশি না হয়ে যায় সেদিকে কঠোর ও সজাগ দৃষ্টি রাখতেন। লঘু পাপে গুরু দণ্ড কিংবা অপরাধের তুলনায় অধিক শাস্তিদানে কঠোর হুঁশিয়ারী ছিল গভর্নরদের প্রতি। সংকীর্ণ ও নোংরা সেলের পরিবর্তে প্রশস্ত ও পরিচ্ছন্ন সেল নির্মাণ করেন।

প্রত্যেক প্রাদেশিক গভর্নরদের আদেশ দেন, প্রতি সপ্তায় স্থানীয় জেলখানায় নিজে গিয়ে কয়েদীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে এবং তাদের অভিযোগগুলো শুনবে। যারা অসুস্থ তাদের সু-চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।

সবার জন্য শিক্ষার অধিকার সুনিশ্চিত ও শিক্ষাখাত উন্নয়ন:
পীড়িত ও বঞ্চিত মানবতার সংস্কার ও অগ্রগতি যদিও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজ এর জন্য দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন। হেজাজ থেকে সিরিয়া, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, কাশগর, কিরমান, সিন্ধু (পাকিস্তান), বলখ, বুখারা, আফগানিস্তান, মিশর, আফ্রিকা, স্পেন সহ বিশাল এই সাম্রাজ্য—যা বৃটিশ সাম্রাজ্যের চেয়ে অধিক বিস্তৃত ছিল—শিক্ষাকে মানুষের মাঝে এমনভাবে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, যখনই একে অপরের সাথে সাক্ষাত হত পরস্পরকে জিজ্ঞেস করত, রাতে কতবার দুরূদ পাঠ করেছ? কতবার দুআ পাঠ করেছ? কতটুকু কুরআন শিখেছো? কবে খতম করবে? এ মাসে ক’টা রোযা রাখবে ইত্যাদি।

মৃত্যু ‍ও দাফন:
উমাইয়ারা খলীফার কারণে বেশ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ছিল। তিনি তাদের থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে তার উপযুক্ত পাওনাদারদের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। উমাইয়ারা এটা কোনভাবে মেনে নিতে পারছিল না। খলীফা ওমর বিন আব্দুল আজিজ এভাবে খিলাফাতের মসনদে বেশিদিন টিকে গেলে তারা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা করছিল। অবশেষে ইয়াজিদ খলীফার খাবারে বিষ প্রয়োগে হত্যার পরিকল্পনা করে। তিনি বিষ পান করার পর তার গোত্রের ষড়যন্ত্রের নীল-নকশা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কিন্তু লজ্জায় তিনি বিষয়টি গোপন করতে চেয়েছিলেন। তারপরও বিষয়টি জানা-জানি হয়ে গেলে তিনি সেই বিষপ্রয়োগকারী সেবককে ডেকে তার কাছ থেকে ঘুষের ১ হাজার দিনার নিয়ে নেন এবং বায়তুল মালে তা জমা করে দেন। সেইসাথে সেবককে বলেন, ‘‘তুমি এখান থেকে পালাও, নতুবা আমার পরিবার জানা মাত্রই তোমাকে বধ করে দিবে।’’ মৃত্যুর সময়েও তিনি ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা থেকে এক চুল বিচ্যুত হতে চাননি।

তার ইন্তিকালের সংবাদ শুনে হাসান বসরী বললেন, “পৃথিবীর সর্বোত্তম লোকটির ইন্তিকাল হলো।”

১০১ হিজরীর রজব মাসে ঊনচল্লিশ বছর ছয় মাস বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। সিরিয়ার হালব শহরে মাআররতুন নোমানের কাছাকাছি দিয়ারে সামআন পল্লীতে তাঁকে দাফন করা হয়। এখনও তাঁর মাজার ওখানে বিদ্যমান আছে।

খলীফার বর্তমান কবর ও মাজারে শিয়া মিলিশিয়াদের হামলা:
শিয়ারা বরাবর এই মহান খলীফার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে থাকে। বাশার আল-আসাদের শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী ২০২০ সালের মে মাসের ২৮ তারিখে খলীফা হযরত ওমর ইবনে আব্দুল আজীজের মাজারে  আক্রমণ চালায়। মাজারে আগুন ধরিয়ে দেয়।তাঁর পাশের কবরটি হল স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আব্দুল মালিকের। হামলায় দুটি কবর বেশ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এর আগেও সিরিয়ার যাদুঘর ও পুরাকীর্তি মন্ত্রনালয় এটির সংস্কার করে। কিন্তু শিয়া মিলিটারীরা এটাকে তছনছ করে দেয়।

ওমর বিন আব্দুল আজিজের ও স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আব্দুল মালিকের মাজার ধ্বংসের চিত্র
শিয়া মিলিশিয়াদের ধ্বংসের পর ওমর বিন আব্দুল আজিজের ও স্ত্রী ফাতিমা বিনতে আব্দুল মালিকের মাজার ধ্বংসের চিত্র:

শিয়াদেরে ঘৃণা:
একদল শিয়া ইমাম জাফর আস-সাদিকের প্রতি সম্পর্কিত এক সনদের ভিত্তিতে বলে, সকল উমাইয়া খলীফা জাহান্নামী। বিশেষ করে মারওয়ানের পরিবার। ওই হাদিসে নাকি আছে—এটি এমন একটি দরজা যা দিয়ে বনূ উমাইয়ারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।

শিয়ারা মনে করে, বনূ উমাইয়াদের মধ্যে ওমর বিন আব্দুল আজিজ তাদের থেকে একটু ভিন্নপথ করেছেন কেবলমাত্র পলিটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স বা রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা জানান দেওয়ার জন্য। তিনি তার প্রখর মেধা দিয়ে কেবল লোকেদের উমাইয়াদের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্যই নাকি এমন করেছেন, যাতে তাঁর পরে লোকেরা উমাইয়াদের প্রতি আস্থাশীল হয়।

মৌলিকভাবে ২ কারণে শিয়ারা তাকে ঘৃণা করেঃ-
১. দাদা মারওয়ান বিন হাকাম ও চাচা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান পাপাচারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাদের সঙ্গ ত্যাগ করেননি; বরং উল্টো তাদের ভালবাসতেন এবং চাচা আব্দুল মালিকের কন্যাকে বিয়ে করেছেন।

২. অধার্মিক চাচাতো ভাই ইয়াজিদ বিন আব্দুল মালিকের সাথে চরম বিরোধ থাকা সত্ত্বেও তিনি তাকে খিলাফাতের পদ থেকে পদচ্যুত করার চেষ্টা করেননি।

এই রকম অপবাদ দিয়ে শিয়ারা এই মহান খলীফার বিরুদ্ধে যুগযুগ ধরে বিষোদগার করে আসছে।

“ইতিহাসের মহানায়ক ওমর ইবনে আবদুল আযীয” বইটি সংগ্রহ করুন।

 

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Loading