পরিবেশ রক্ষায় মহানবী (স.) এর পাঁচটি পদক্ষেপ

islam in environment

প্রতিদিনকার খবর, অনুসন্ধান ও গবেষণা থেকে পৃথিবীর ভূ-পৃষ্ঠের অবস্থা, আবহাওয়া, জলবায়ূর পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। লোভী মানুষের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম ও এর প্রাসঙ্গিক অনুষঙ্গগুলো আমাদের পরিবেশ ও পৃথিবীকে বিপর্যস্ত করে তুলে চলেছে প্রতিনিয়ত। তাই সময় থাকতেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মানবজাতির জন্য যা কল্যাণকর তাতে মনোনিবেশ করলেই সকলের মঙ্গল। 

যদিও এমন আহবান আজকাল প্রায়শই শোনা যায়। কিন্তু পরিবেশকে সুন্দর রাখার পরামর্শ সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়ে গেছেন। কেবল পরামর্শ দিয়েই ক্ষান্ত হননি বরং তার বাস্তবায়নও নিজ হাতে করে গেছেন। 

পরিবেশের প্রতি তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য কেমন ছিল সেটা আমরা আবু সাঈদ খুদরী রা. এর হাদিস থেকে জানতে পারি,

‘‘নিশ্চই এই পৃথিবী মিঠেময় চির সবুজ,আল্লাহ তা তোমাদের কেবল ব্যবহার করতে দিয়েছেন। এটা দেখার জন্য যে,(পৃথিবীতে) তোমরা কেমন আচরণ কর।’’

[সহীহ মুসলিম, হাদিস:২৭৪২]

এই হাদিস থেকে কয়েকটা বিষয় জানা যায়,

১. পরিবেশের প্রতি সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি আন্তরিকভাবে এর সুরক্ষা ও যত্ন সুনিশ্চিত করা প্রত্যেকের কর্তব্য। 

২. মহানবী এই হাদিসের মাধ্যমে আমাদের এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, আসলে আমরা আল্লাহ তাআলার আজ্ঞাবহ বান্দা হিসেবে এই সৃষ্টির প্রতি অনেকটা দায়িত্বশীল ও দায়বদ্ধ। 

পরিবেশ রক্ষা ও সচেতনতার বিষয়ে কথা বলার আগে যিনি মানবজাতির এক আইডল। পরিবেশ রক্ষায় সেই আদর্শ মানবের যে পদক্ষেপ সমূহ আছে সেগুলো নিয়ে কথা বলার চেয়ে উত্তম আর ভালো বিষয় কি-ই-বা হতে পারে? 

পরিবেশ বিষয়ে মহানবীর কিছু দিক নির্দেশনা তুলে ধরা হল: 

. নিজেদের সম্বল সংস্থানের সর্বোচ্চ সংরক্ষণ

সম্পদের সুরক্ষা আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যপার। এখনও আমাদের কাছে পৃথিবীতে যে পরিমাণ সম্পদ বিদ্যমান আছে সেগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ এবং এর সুষ্ঠ ব্যবহার করতে পারলে দীর্ঘদীন পর্যন্ত আমরা এগুলোর ব্যবহার করতে পারব। 

দিনদিন যেভাবে জনসংখ্যা বাড়ছে সে তুলনায় আমাদের প্রাকৃতিক রিসোর্স ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। পরিবেশ সংরক্ষণ বলতে কেবল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা বোঝায় না, বরং অন্যান্য সকল প্রাণীদের বাস্তুসংস্থান ও ইকোসিস্টেম সংরক্ষণও এর গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। 

বাস্তুসংস্থান সংরক্ষণের ক্ষেত্রে মহানবীর কর্মপদ্ধতি একটি হাদিসের মাধ্যমে দেখা যায়। হযরত আনাস বিন মালিক রা. বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে,

 আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযু করতেন এক ‘‘মুদ’’ (আধা কেজি) পানি দিয়ে এবং গোসল করতেন এক ‘‘সা’’ (দুই কেজি) থেকে পাঁচ ‘‘মুদ’’ (আড়াই কেজি) দিয়ে। 

[সহীহ বুখারী,হাদিস:২০১, সহীহ মুসলিম,হাদিস:৩২৫]

উল্লিখিত হাদিসে আমরা দেখতে পাই, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পানির মত প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারেও কতটা সতর্ক ছিলেন। যেখানে সম্ভব সেখানে ন্যূনতম পরিমাণে পানি ব্যবহারের প্রতি উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে এবং এটি আমাদের রিসোর্স বা উৎসের ব্যাপারে একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। অথচ এগুলো ওযু ও ফরয গোসলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতেও লক্ষ্য রাখা হয়েছে। মহানবী আমাদের সংযম ও মিতব্যয়ীতার উপর আমল করতে শিখিয়েছেন। কেবল সেটুকুই ব্যবহার করার তাগিদ দিয়েছেন যেটুকু প্রয়োজন। পাশাপাশি অপচয়ও এড়িয়ে চলতে বলেছেন।  

এই অপচয় আমাদের পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে চলেছে। বিশ্ববাসীর সামনে এক বিরাট সমস্যা দাঁড় করিয়ে দিতে পারে। তাই এই সমস্যা সমাধানেও বিজ্ঞানীরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, বর্জ্যের পূনঃব্যবহার। পশুসম্পদ বর্জ্য থেকে পশুপাখির খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে। একটি সুনির্দিষ্ট মাত্রার পর পশুসম্পদ বর্জ্য থেকে উৎপাদিত পশুখাদ্যে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। যেমনগবাদিপশুর ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পোল্ট্রি লিটার খাবার সহজেই গ্রহণ করতে পারে। পোল্ট্রি বর্জ্য থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত আমিষ গ্রহণ গাভীর দুধ উৎপাদনে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না এবং তা একইসঙ্গে নতুন খাদ্যে আমিষের চাহিদা কমায়, ফলে খরচ হ্রাস পায়। পশুসম্পদ বর্জ্যে সঠিক ব্যবস্থাপনার আরও একটি পদ্ধতি হচ্ছে কম্পোস্টিং। উৎপাদিত কম্পোস্ট কৃষিজমিতে প্রয়োগ করলে একদিকে যেমন ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে রাসায়নিক সারের খরচও কমে। উর্বরতা বৃদ্ধিতেও এটি বেশ বড়সড় ভূমিকা রাখে।  

২. সম্ভাব্য স্থায়ী ও টেকসই পদক্ষেপের চর্চা 

আমরা অনেকেই 3R এর কথা শুনেছি। Reduce (হ্রাস), Reuse (পুনর্ব্যবহার), Recycle (ব্যবহার উপযোগী করে তোলা)। এই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে আমাদের জন্য যা প্রয়োজন তা ব্যবহার করি, প্রয়োজনে একই উদ্দেশ্যে কিংবা নতুন করে ব্যবহারের জন্য পুনর্ব্যবহার করি এবং বর্জ্য পদার্থকে উপকারী বস্তুতে রূপান্তর করে ফেলি। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশাতেই এই টেকসই পদ্ধতির অনুশীলন করে গেছেন। 

বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জুতা ছিঁড়ে গেলে পরিবর্তন করার বদলে বরং তিনি তা মেরামত করে পড়েছেন। কাপড় সেলাই করে পড়তেন। সাহাবাগণকে তাদের পোশাকগুলি সুন্দরভাবে সেলাই করার পরামর্শ দিতেন। যেমনটা উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.বর্ণিত এক হাদিসে এসেছে যেখানে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছিল, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়িতে কি করতেন? উত্তরে আয়েশা রা.বলেন, 

‘‘তোমরা বাড়িতে যা কর তিনিও তাই করতেন। তিনি জুতা মেরামত করতেন। ছেঁড়াফাটা কাপড় ঠিক করতেন, সেলাই করতেন।’’

[আলআদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং: ৪১৯]

এই হাদিস থেকে যেমনটি আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা মানুষটি তার নিজের ও আশপাশের মানুষদের ব্যাপারে কতটা সচেতন ছিলেন। দৈনন্দিন ব্যবহৃত জিনিসগুলো মেরামত করতেন। সবকিছুকে ভাল ও সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখতে নিজে নিজেই চেষ্টা করতেন। 

এর মানে এই নয় যে, যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা কাজ না করবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের সেটা ব্যবহার করে যেতে হবে, বরং দেখতে হবে যে, কিভাবে আমরা সেটাকে দীর্ঘমেয়াদী উপায়ে ব্যবহার করতে পারি। 

আমরা যেসব জিনিস ব্যবহার, ক্রয়-বিক্রয়, তৈরি ও ভোগ করি সেসব জিনিস সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। একজন ভোক্তা হিসেবে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে মানুষ এই বাসযোগ্য গ্রহ ও তার রিসোর্সের উপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে চলেছে প্রতিনিয়ত।

এখন আমাদের সম্মিলিত উদ্দ্যোগ এবং সেসব পদ্ধতির প্রতি মনোনিবেশ করতে হবে যাতে আমরা নিয়ন্ত্রিত টেকসই পন্য ও তার আবিষ্কার লাভ করতে পারি, যেগুলো নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশি সময় পর্যন্ত ক্ষয় রোধ করতে সক্ষম হবে। যাকগে, এটি আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বহু শতাব্দী আগেকার আমলও বটে। 

৩. বৃক্ষরোপনের মাধ্যমে সৎকর্ম

বৃক্ষ ও গাছ-পালা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কমবেশি দেখা যায়। মানবসভ্যতায় বৃক্ষরাজির ভূমিকা অপরিসীম। বৃক্ষরাজি অক্সিজেন প্রদানের পাশাপাশি ওজন স্তর কমানোর মাধ্যমে পানি ও বাতাসকে দূষণমুক্ত রাখতে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। এটি মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য ছায়া সরবরাহ ও পরিবহণ করে বায়ূমন্ডলের তাপমাত্রা কমাতেও সাহায্য করে থাকে।

বৃক্ষরোপন একটি কল্যাণমূলক কাজ। যা আমাদের পরিবেশের ইকোসিস্টেম লেভেলকে প্রতিনিয়ত উপকৃত করে চলেছে। পরিবেশের যত্ন ও সংরক্ষণে বড়সড় ভূমিকা পালন করে চলেছে। হাদিস শরীফে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃক্ষরোপন ও চাষাবাদের প্রতি আমাদের অনুপ্রাণিত করেছেন। হযরত আনাস রা. বর্ণিত এক হাদিসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, 

‘‘কোন মুসলিম যদি বৃক্ষ রোপন কিংবা ফসল উৎপাদন করে আর তা থেকে পাখী কিংবা মানুষ অথবা চতুষ্পদ জন্তু কিছু খায় তবে তা তার পক্ষ থেকে সাদাকাহ স্বরূপ হবে।’’

[সহীহ বুখারী, হাদীস নং: ২৩২০;  সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৫৫৩] 

অন্য এক হাদিসে আরেকটু স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, 

‘‘যে ব্যক্তি কোনো বৃক্ষরোপণ করে, আল্লাহ তায়ালা এর বিনিময়ে তাকে ওই বৃক্ষের ফলের সমপরিমাণ প্রতিদান দান করবেন।’’

[মুসনাদে আহমাদ,হাদিস : ২৩৫৬৭]

উল্লিখিত হাদিসদ্বয়ের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত যে, কোন ব্যক্তি দ্বারা সম্পাদিত প্রতিটি ভাল কাজ ও কল্যাণমূলক কাজের নির্ধারিত পারিশ্রমিক ও পুরষ্কার একদিন দেওয়া হবে। এটা তো গেল কার্যকরী পদক্ষেপের এক উদাহরণ। যদিও এটি  খালি চোখে কেবল একটি পরিকল্পনা মনে হতে পারে অনেকের কাছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি সমূহ কল্যাণ বয়ে আনে গোটা মানব সভ্যতার জন্য। 

বৃক্ষের পত্ররাজি, ডাল-পালা, ছাল-বাকল ও কাঠ ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষ ও প্রাণীকূল প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হতে পারে। পরোক্ষভাবেও এই বৃক্ষ আমাদের পরিবেশের যত্ন নিয়ে থাকে। ভূমির সুরক্ষা প্রদান করে। আমরা যে গ্রহে বাস করি তা সকলের জন্য বসবাসের উপযুক্ত রাখতে প্রতিনিয়ত এই বৃক্ষই আমাদের সাহায্য করে থাকে। তাই হাদিস শরীফে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃক্ষরোপনকে সাদাকাহর অন্যতম মাধ্যম বলেছেন। 

৪. পশু-পাখি ও অন্যান্য সৃষ্টির যত্ন নেওয়া   

মানব সভ্যতা ছাড়াও এই ভূ-পৃষ্ঠের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও বাসিন্দাদের মধ্যে প্রাণী ও জীবকূল অন্যতম।  প্রকৃতির সকল প্রানীর ইকোসিস্টেম তথা বাস্তুতন্ত্রে প্রত্যেকের নিজস্ব ও আলাদা আলাদা ভূমিকা আছে। পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব কমানো এবং অজানা দূষণ চিহ্নিতকরণ, গ্লোবাল ওয়ার্মিং এবং ইকোসিস্টেমে ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে যে সমস্যাগুলো প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয় তা সমাধান করতে তারা একে অপরকে সহাবস্থানের পাশাপাশি ভারসাম্যতা বজায় রাখে।

এই যে প্রাণী ও জীবকূল ভূ-পৃষ্ঠকে সুরক্ষা ও যত্ন গ্রহনের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করে যাচ্ছে, বিষয়টি মাথায় রাখলে এই ভূ-পৃষ্ঠের সুরক্ষায় বাসিন্দা হিসেবে আমাদেরও কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। পরিবেশের যত্নে আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে অন্যতম উপায় হতে পারে পশু-পাখি, প্রাণী ও মহান আল্লাহর সৃষ্টিকূলের প্রতি যত্ন নেওয়ার মধ্য দিয়ে। এই বিষয়েও মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলোকপাত করেছেন। হযরত আবূ হুরায়রা রা. বলেন, লোকেরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করে, পশু-পাখি ও জীব-জন্তু লালন-পালনের সাওয়াব কি?আল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দেন, 

‘‘যে কোন প্রাণীর সেবা করার মধ্যে প্রতিদান রয়েছে।’’

[সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৩৬৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ২২৪৪ ]

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, পৃথিবীতে যেসকল প্রাণী রয়েছে তাদের সেবা করা ও লালন-পালন করা কতটা জরুরী। যে কোন ভালো কাজে যেমনটা পুরষ্কারের ঘোষণা এসেছে হাদিসে তেমনি ‍সৃষ্টির সেবা করার মাঝেও উত্তম বিনিময় ও প্রতিদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। 

প্রাণিবিজ্ঞানী ও উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বিগত প্রায় ২৫০ বছর ধরে জীব প্রজাতির সংখ্যা গণনা করে আসছেন। কিন্তু তারা মাত্র ১২ লাখ প্রজাতি পর্যন্ত গণনা করতে পেরেছেন। প্রতি বছর নতুন প্রজাতি আবিষ্কার হয়েছে ৬ হাজার। এই হিসেবে আরও ১২শ বছর লাগবে সবগুলো প্রজাতি খুঁজে বরে করতে। হাল আমলে পৃথিবীতে বর্তমানে ৮৭ লাখ প্রজাতির জীব রয়েছে বলে দাবি করেছেন কানাডীয় একদল বিজ্ঞানী। সমগ্র মানবজাতি ও আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সৃষ্টিকুলের পাশাপাশি এই পৃথিবীর পরিবেশ ও এর বিচিত্র ভূ-পৃষ্ঠের প্রতি যত্নবান হওয়া আমাদের অন্যতম কর্তব্য।

৫. পরিবেশ পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ রাখুন

এই পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার একজন প্রতিনিধি হিসেবে পরিবেশ সংরক্ষণ করতে আমরা বাধ্য। পরিবেশের সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। পরিবেশের স্বাস্থ্যবিধি হিসেবেও এটি পরিচিত। এটি সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, ভূ-পৃষ্ঠবাসীদের মানসিক স্থিতিশীলতা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আমাদের সামগ্রিক সুস্থ্যতা এবং ইকোসিস্টেমের প্রোডাক্টিভিটি বৃদ্ধিতে অনেকাংশে সাহায্য করে থাকে। 

প্রকৃতপক্ষে পরিবেশকে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন রাখার দুটি দিক রয়েছে। একদিকে এটি ক্ষতিকারক ও জঞ্জাল দূরকরণের সাথে সংশ্লিষ্ট । অন্যদিকে একইসাথে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখে এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করে থাকে। মজার বিষয় হল, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের দুটো অংশই শিখিয়েছেন। আবু হুরায়রা রা. সূত্রে এক হাদিসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

‘‘এক ব্যাক্তি রাস্তা দিয়ে চলার সময় কাঁটাযুক্ত বৃক্ষের একটি ডাল রাস্তায় পায়, তখন সেটাকে রাস্তা থেকে অপসারণ করে, আল্লাহ তার এ কাজকে কবূল করে নেন এবং তাকে মাফ করে দেন।‘’

[সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৪৭২; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং: ৫৩৬]

হাদিসের মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাস্তা থেকে ক্ষতিকর বস্তু সরিয়ে ফেলার গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। এভাবে সৎকর্মশীলদের জন্য ক্ষমা ও পুরষ্কারের ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিষয়বস্তুর গভীরতা অনুধাবনে ‍গুরুত্ব দিয়েছেন বারবার। 

মোটকথা, প্রতিটি সৎ চেষ্টা ও উদ্দ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ

গ্রেট প্রশান্ত মহাসাগরীয় আবর্জনা প্যাচ উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের সামুদ্রিক ধ্বংসাবশেষের এক বিশাল সংগ্রহ। নেচারে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় জাহাজ বিমান সমীক্ষার তথ্য ব্যবহার করে দেখা গেছে যে . মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এলাকায় ৭৯৯,০০০ টন প্লাস্টিক ভেসে বেড়াচ্ছে। পূর্বে, গবেষকরা বিশ্বাস করেছিলেন যে অঞ্চলটি চার থেকে ১৬ গুণ কম ছিল।

আমাদের ক্ষুদ্রতম প্রচেষ্টাও পরিবেশে অনেক প্রভাব ফেলতে পারে, বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে পারে এবং আশেপাশের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। আমরা যে গ্রহে বাস করছি কেবলমাত্র এই

দায়বদ্ধতা থেকেও তার যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

‘‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, প্রত্যেকের দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।’’

[সহীহ বুখারী, হাদিস নং: ২৫৫৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮২৯]

এটি ‍গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, সমস্যাটি কত বড়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, আমরা সে সমস্যাটি নিজ দায়িত্বে কতটুকু সমাধান করতে পারি। আর এর চেয়ে আর সহজ পদ্ধতি আর  কি হতে পারে যা আমরা সুন্নাতে নববীর মাধ্যমে পাই। আমরা যখনই সে সুন্নাত যথাযথ পালন করব তাতে প্রতিদান পাব। মানবীয় যে দায়িত্ব আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন তা পালন করতে পারলে আমরা দুনিয়া ও আখিরাতে উভয় জাহানে শান্তিতে থাকতে পারবো।

– আব্দুল্লাহ বিন রফিক

 

ইসলামিক বই সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading