সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনা করতে রোজা ‘র ১০টি শিক্ষা

রোজা

রোজা ইসলামের গুরুত্বপুর্ণ একটি মৌলিক ইবাদাত। ইসলামের প্রতিটি ইবাদাতের ন্যায় রোজার মধ্যেও অনেক হিকমাত নিহিত রয়েছে৷ আমাদের জীবনে রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। রোজার মধ্যে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় অনেক বিষয় রয়েছে। আমাদের জীবনকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য এসব শিক্ষা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরী৷ পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে রোজার গুরুত্বপুর্ণ দশটি শিক্ষা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো৷

তাকওয়া

রোজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা৷ তাকওয়া অর্জনই রোজার মূল উদ্দেশ্য৷ এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরয করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরয করা হয়েছিল যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” (সূরা বাকারা-১৮৩) কেউ যদি রোজা রেখেও তাকওয়া অর্জন করতে না পারে অর্থাৎ রোজা রেখেও গোনাহের কাজ ছাড়তে না পারে তাহলে তার রোজার উদ্দেশ্য পূরণ হবে না৷ এরূপ রোজা আল্লাহ তায়ালার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়৷ এ সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘ যে ব্যক্তি পাপ, মিথ্যা বা অন্যায় কথা, অন্যায় কর্ম এবং মূর্খতাসুলভ কর্ম ত্যাগ করতে না পারবে তার পানাহার ত্যাগ করাতে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।’ (বুখারি)

সবর বা ধৈর্য   

রোজার মাধ্যমে মু’মিনগণ দুঃখ কষ্টে সবর করার শিক্ষা পায়৷ রমজানে দীর্ঘ একমাস রোজা রেখে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য ক্ষুধা-পিপাসা ও নফসের খাহেশাত দমন করার কষ্ট তারা অম্লান বদনে সহ্য করে নেয়৷ তাই রমজানকে সবর বা ধৈর্যের মাস বলা হয়৷ এ সম্পর্কে হযরত সালমান রা. হতে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসের একাংশে রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘ইহা সবরের মাস৷ আর সবরের প্রতিদান জান্নাত।’ (ইবনে খুজাইমা,বায়হাকি,ইবনে হিব্বান)

সহানুভূতি

রমজানের রোজার মাধ্যমে বিত্তশালীগণ অসহায় গরীব ক্ষুধার্ত মানুষদের ক্ষুধার কষ্ট বুঝতে পারে৷ ফলে তাদের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি হয়৷ এ ছাড়া এ মাসে শ্রমিক ও কর্মচারীদের কাজের বোঝা হালকা করে দিয়ে তাদের প্রতি সহানুভুতি প্রকাশের অনেক ফজিলত রয়েছে৷ তাই রোজার মাসকে সহানুভূতির মাসও বলা হয়৷ এ সম্পর্কে হযরত সালমান রা. হতে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসের একাংশে রাসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, ‘ইহা মানুষের প্রতি সহানুভুতি প্রদর্শনের মাস৷ যে ব্যক্তি এই মাসে আপন গোলাম (কর্মচারী ও খাদেম) এর কাজের বোঝা হালকা করে দেয়, আল্লাহ তায়ালা তাকে মাফ করে দেন এবং জাহান্নামের আগুন হতে মুক্তি দান করেন।’ -(ইবনে খুজাইমা,বায়হাকি,ইবনে হিব্বান)

আল্লাহর মহব্বত

যে ব্যক্তির অন্তরে আল্লাহর মহব্বত আছে একমাত্র সে ব্যক্তিই আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য যেকোন ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দুঃখ-কষ্ট স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকে৷ রোজাদার ব্যক্তি ক্ষুধা ও কুপ্রবৃত্তি দমনের কষ্ট স্বীকার করে আল্লাহর প্রতি মহব্বতের প্রমাণ দেয়৷ আর তাই রোজাদার আল্লাহ তায়ালার কাছে অত্যন্ত প্রিয়৷ রোজার মাধ্যমে আল্লাহর মহব্বত লাভ করা

যায়৷  তাই তো রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধও আল্লাহর কাছে প্রিয়৷ এ সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন- আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যার হাতে মুহাম্মাদ সা. এর জীবন তার শপথ, রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের  ঘ্রাণের চেয়েও অধিক প্রিয়৷ রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে৷

ক. তার ইফতারের সময় একটি আনন্দ৷

খ. তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময় হবে আরেকটি আনন্দ।” (বুখারি-মুসলিম)

ইখলাস

অন্যান্য ইবাদাতে রিয়া বা লোক দেখানো মনোভাবের সম্ভাবনা প্রবল থাকে৷ কিন্তু রোজার মধ্যে রিয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে কেননা৷ মানুষ স্বাভাবিকভাবে লোক দেখানোর জন্য দীর্ঘ এক মাস যাবত রোজার কষ্ট স্বীকার করতে পারে না৷ রোজা সাধারণত একমাত্র আল্লাহ তায়ালার উদ্দেশ্যেই করা হয়৷ এজন্য রোজার প্রতিদান আল্লাহ তায়ালা নিজ হাতে দিতে চেয়েছেন৷ এ ব্যাপারে হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ(সা) ইরশাদ করেন, “আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আদম সন্তানের প্রত্যেক আমলের সওয়াব দশগুণ থেকে সাতশক গুণ বৃদ্ধি করা হয়৷ একমাত্র ব্যতিক্রম হলে রোজা৷ রোজা আমার জন্য৷ আর রোজার প্রতিদান আমি নিজেই দেব। কেননা রোজাদার একমাত্র আমার সন্তুষ্টির জন্যই তার কামনাবাসনা ও পানাহার থেকে বিরত থাকে৷” (বুখারি-মুসলিম)

কুপ্রবৃত্তি দমন

রোজা কুপ্রবৃত্তি দমনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার৷ রোজার দ্বারা কুপ্রবৃত্তি অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে৷ ফলে পাপের কাজে তেমন আগ্রহ থাকে না৷ বরং নেক কাজে উৎসাহ বাড়ে৷ তাই রোজাকে পাপ থেকে বাঁচার ঢাল বলা হয়েছে৷ হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রোযা ঢালস্বরূপ।’ -(বুখারি-মুসলিম)

ভ্রাতৃত্ব

রোজার মাধ্যমে মু’মিনদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন মজবুত হয়৷ রোজার মাসে মু’মিনগণ সওয়াবের আশায় একে অপরকে ইফতার করায়৷ এছাড়া রমজানে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে পাঁচওয়াক্ত নামায ও তারাবীহ নামায পরস্পর পরস্পরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জামাতে নামায আদায় করে৷ তখন সব মুসলমান একে অপরের ভাইয়ের মত হয়ে যায়৷ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিশ্চয় মু’মিনগণ ভাই ভাই৷” (সূরা হুজুরাত-১৹)

ঐক্য

সকল মুসলমান একই সময়ে অর্থাৎ রমজান মাসে একই নিয়মে অর্থাৎ সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও কামাচার হতে বিরত থেকে সম্মিলিতভাবে অর্থাৎ রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব, ফর্সা-কালো, নারী-পুরুষ সকলেই একসঙ্গে আল্লাহর হুকুম পালন করে৷ এতে বিরাট ঐক্যের চিত্র ফুটে ওঠে৷ আর আল্লাহর হুকুম সম্মিলিতভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে পালনের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন, “তোমরা ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে আকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সূরা আল ইমরান- ১০৩)

সাম্য

ইসলাম সাম্যের ধর্ম৷ রোজার ক্ষেত্রেও ইসলাম সাম্যের আদর্শ দেখিয়েছে৷ রাজা-প্রজা, ধনী-গরীব, সাদা-কালো, উঁচু-নিচু সব ধরণের প্রাপ্ত বয়স্ক সুস্থ মুসলিমের ওপর রোজা ফরয করা হয়েছে৷ এক্ষেত্রে কোন ভেদাভেদ নেই৷ এতে বিরাট সাম্যের চিত্র ফুটে উঠে৷ ইসলামে কারো ওপর কারো কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই তাকওয়া ছাড়া৷ এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্ট করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যেন তোমরা পরস্পরে পরিচিতি লাভ করতে পারো৷ নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি আল্লাহর কাছে অধিক সম্মানিত যে অধিক তাকওয়াবান৷”-(সূরা হুজুরাত ১৩)

আরো দেখুনঃ রোজা রাখছেন কিন্তু সব নিয়ম মানছেন তো?

সম্প্রীতি

রোজা মানুষের মাঝে বিদ্যমান ঝগড়া বিবাদ ও মারামারি-হানাহানি থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়৷ এভাবে পরস্পরের মাঝে সম্প্রীতি ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠার প্রতি উৎসাহ যোগায়৷ এ ব্যাপারে হযরত আবু হুরাইরা রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সা.  ইরশাদ করেন, “তোমাদের কেউ যে দিনে সিয়াম পালন করবে সে দিনে অশ্লীল কাজ করবে না এবং চিল্লাচিল্লি, হৈ চৈ বা ঝগড়া বিবাদ করবে না৷ যদি কেউ তাকে গালি দেয় অথবা তার সাথে মারামারি করতে চায় সে যেন বলে আমি রোজাদার৷”-(বুখারি-মুসলিম)

পরিশেষে বলা যায়, রোজা একটি মৌলিক ফরজ ইবাদাত হলেও এর মধ্যে আদর্শ ইসলামী জীবন গঠনের মত অনেক শিক্ষা নিহিত রয়েছে৷ আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে রমজানের সকল রোজা সঠিকভাবে পালনের পাশাপাশি এর শিক্ষাসমুহ গ্রহণ করে সুন্দরভাবে ইসলামের আলোকে জীবন যাপনের তাওফিক দান করুন৷ আল্লাহুম্মা আমিন৷

রমজান ও আত্মশুদ্ধি বিষয়ক ইসলামী বই গুলো দেখুন 

* লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আবু আখতার

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

1 thought on “সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনা করতে রোজা ‘র ১০টি শিক্ষা”

  1. Pingback: নবীজির (স.) মতো রমজান এর সকল প্রস্তুতি নিয়েছেন তো? - রকমারি ব্লগ

Leave a Comment

You May Also Like This Article


Notice: Undefined offset: 2 in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-includes/class-wp-query.php on line 3300

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 30

Notice: Trying to get property 'ID' of non-object in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 31

Notice: Trying to access array offset on value of type bool in /var/www/html/blog.rokomari.com/wp-content/plugins/new-pc-functionality/views/relatable-posts-views.php on line 33
Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading