করোনা ভাইরাসের কারণে মসজিদে নামাজ বন্ধ! ইসলাম কি বলে?

করোনায় মসজিদে সালাত বন্ধ

করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতার কারণে অথবা করোনা ভাইরাসের সংক্রমন রোধ করার স্বার্থে মসজিদগুলোতে ৫ ওয়াক্তের সালাত বন্ধ করে রেখে মুসল্লিদেরকে যার যার বাসায় সালাত আদায় করতে বলা যাবে কিনা এবং জুম্মার সালাতকে পর্যন্ত মসজিদে বন্ধ করে দেয়া যাবে কি না? ইসলামী শরীয়াহ বিষয়টিকে কিভাবে দেখে? ইসলামি শরীয়াহর দৃষ্টিকোণে বিষয়টি ব্যখ্যা করেছে শেখ আহমাদুল্লাহ।

আমরা জানি সৌদিআরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে ইতিমধ্যে হারামা ইন সালাহ বাকি সমস্ত মসজিদগুলোতে জামাতে সালাত আদায় বন্ধ রয়েছে এবং মুসল্লিদেরকে বাসায় যার যার মত সালাত আদায় করতে বলা হচ্ছে। এছাড়াও ইউরোপের অনেক দেশে এমনকি পৃথিবীর অনেক দেশে জুম্মার নামযে পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। ইসলাম শরীয়াহ কি বলে??

আমরা প্রথমে জানবো ইসলামে জামাতের সাথে সালাত আদায় করার গুরুত্ব এবং এরপর আমরা জানবো যে এমন কোন পরিস্থিতি আছে কি না ইসলামে যে মসজিদের সালাত আদায়কে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখা যায় এবং সবার শেষে আমরা জানবো যে ভাইরাসের আক্রমণের জন্য সে সব দেশে জামাতে সালাত বন্ধ সে সব দেশে মসজিদকে জামাতে সালাত আদায়ের জন্য বন্ধ রাখার মত পরিস্থিতি হয়েছে কি না যে বা বন্ধ রাখা যায় কি না!!

সূরা বাকারার ৪৩ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেছেন,

“তোমরা রুকুকারীদের সাথে রুকু কর”। অর্থাৎ জামায়াতের সাথে সালাত আদায় কর। এ আয়াত থেকে আমরা শিখলাম আল্লাহ্‌ সুবহানাল্লাহ তাআলা নির্দেশ করেছেন জামায়াতের সাথে সালাত আদায় করতে। নবী কারীম (সাঃ) থেকে বুখারী মুসলিমে একজন বর্নণা করছেন যে, “জামায়াত বদ্ধ সালাত একাকী সালাতের চেয়ে সাতাশ গুণ বেশি সওয়াবের”। নবী কারীম (সাঃ) একবার সালাতের শেষে বলেছিলেন যে, “যারা মসজিদে সালাত আদায় করতে আসেন নি আমার মনে হচ্ছে তাদের ঘরবাড়িগুলো জ্বালিয়ে দেই”।

জ্বালিয়ে দেন নি তিনি কিন্তু এর আশাবাদ ব্যক্ত করে, বা তার আগ্রহ ব্যক্ত করে তিনি মূলত ভয়াবহতা প্রকাশ করেছিলেন। আর ইসলামি শরীয়াতে কোনো সাধারণ সওয়াব বা সুন্নাহ বা সাধারণ ফজিলত পূর্ণ কাজের জন্য এইরকম ভয়াবহ শাস্তির কথা বলা হয় না। কোরআন বা হাদিসে কোথাও যদি শাস্তির কথা বলা হয় তাহলে ধরে নিতে হয় এটা ওয়াজিব বা ফরজ। এখান থেকে বোঝা গেলো জামাতের সাথে সালাত আদায় করা পুরুষদের জন্য ওয়াজিব। এর পরে আসি এমন কোনো পরিস্থিতি আছে কিনা যে পরিস্থিতিতে জামাত ত্যাগ করা যায়।

আমরা জানি, মসজিদে গিয়ে যদি কেউ ভয়ের মুখোমুখি অথবা ক্ষতির মুখোমুখি হবে এমন কোনো আশংকা থাকে তাহলে মসজিদে না গিয়ে অবস্থানস্থলে সালাত আদায় করার অনুমোদন দেয় ইসলামিক শরীয়াহ।  বুখারি এবং মুসলিমে একদল বর্ণনা করেছেন যে আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) প্রচণ্ড ঠাণ্ডার সময় আজান দিয়েছেন এবং আজানের শেষে  বলেছেন তোমরা যার যার বাসায় সালাত আদায় কর। তার মানে এতো বেশি ঠাণ্ডা ছিল যে কেউ যদি মসজিদে সালাত আদায় করতে আসে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তার হয়তো অঙ্গহানী হতে পারে অথবা মৃত্যুর মুখোমুখি হতে পারেন এইরকম ভয়াবহতার কারণে তিনি বলেছেন, “রাসুল (সা:) বলেছেন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা, প্রচণ্ড  বৃষ্টির কারণে এইরকম ভয়াবহতার সম্ভাবনা থাকলে যার যার বাসায় সালাত আদায় করার নির্দেশ জারি করেছেন।”

এর বাইরে আমরা বুখারি, মুসলিমের অন্য বর্ণনায় জানি সাহাবী আব্দুল ইবনে আব্বাসা ( রা: ) তায়েফে একবার তার মুয়াজ্জিনকে নির্দেশ করেছেন আযান এর মধ্যে হাইয়া আলাস সালার জাগায় তিনি যেন মুসল্লিদেরকে আহ্বান করেন যার যার বাসায় সালাত আদায় করবার জন্য।

তাহলে আযানে এবং আযানের বাইরে দুইরকম বর্ণনা পাওয়া যায় দুটোি বিশুদ্ধ বর্ণনা। বর্ণনাগুলার দ্বারা  বোঝা যায় যে বিশেষ পরিস্থিতিতে মসজিদে জামাতের আয়োজনকে বন্ধ রেখে যার যার বাসায় সালাত আদায় করা যেতে বলা যেতে পারে। এটি রাসুলে কারিম (সা:) থেকে প্রমাণিত সাহাবায়ে কেরাম থেকেও প্রমাণিত। এর বাইরে আমরা জানি নবী করিম (সা:) বুখারি মুসলিম হাদিসে বলেছেন অনেকগুলো ছাগলের মধ্যে যে কোনো একটি বা দুইটি ছাগল যদি অসুস্থ হয় তবে সুস্থ ছাগলের সাথে যেন তাদের না রাখে। এর বাইরে তিনি সহী মুসলিম বর্ণনায় আসছে যে এক ব্যক্তি কুষ্ঠ অথবা এই টাইপের কোন এক রোগে আক্রান্ত ছিল আর তখন এই সকল রোগ হয়তো সংক্রমণ হতো এইরকম কোন ছিল। সেই ব্যক্তি বায়াত নিতে আসার পরে দূরে থাকা অবস্থাতে একজন লোক পাঠিয়ে বললেন যাও তাকে বলে দাও সে যেন চলে যায় তার বায়াত নেওয়া হয়ে গেছে। তার মানে সেই লোকটি যেন কারো সাথে না মিশে নবী (সা:) সেই নির্দেশ তাকে জারি করলেন। এর বাইরে আমরা জানি যে কেউ যদি পেঁয়াজ খায়, নবী (সা:) পেঁয়াজ খেয়ে মসজিদে আসার বিষয়ে  বারণ করেছেন যাতে অন্যের কষ্টের কারণ না হয়। এই সব বিষয়গুলো, হ্যাঁ রাসুল (সা:) বিশেষ পরিস্থিতিতে মসজিদে আসা  বন্ধ করা অথবা মসজিদে আসা বন্ধ রেখে যার যার বাসায় সালাত আদায় করার অনুমোদন দিয়েছেন।

এছাড়া কারো ক্ষতি করার অধিকার ইসলাম কাউকে দেয়নি। বর্ণিত হয়েছে কারো ক্ষতি করার কোন সুযোগ নাই। অতএব  মসজিদে আসার মাধ্যমে যদি কারো ক্ষতি হয়, তাহলে তার জন্য মসজিতে আসা বরং গুনাহের কথা এবং নাজায়েজ। সম্পুর্ণভাবে মসজিদ বন্ধ করে রাখা  সাময়িক সময়ের জন্য যার যার বাসায় সালাত আদায় করতে বলা এটাও ইসলামিক শরিয়তে অনুমোদিত যদি ক্ষতিটা এমন হয় যে সবাইকে আক্রান্ত করতে পারে এইরকম যদি হয় তাহলে সে সুযোগ রয়েছে। এখন কথা হল যে রাসুলে কারিম (সা:) অথবা সাহাবায়ে একরাম তো এক ওয়াক্ত নির্দিষ্ট সালাতে বন্ধ রেখেছেন কিন্তু আমরা তো দিন কে দিন বন্ধ রাখছি, এটা জায়েজ আছে কিনা? এর উত্তর হল, ওজর যদি থাকে যেই ওজরের ভিত্তিতে জামাতে সালাতের আয়োজনকে সাহাবীরা বন্ধ রেখেছেন রাসুল (সা:) বন্ধ রেখেছেন সেই ওজর যদি অনেক লম্বা সময় ধরে থাকে তাহলে ওজর যতদিন পর্যন্ত থাকবে ততদিন পর্যন্ত এই সুযোগ ও থাকবে অর্থাৎ মসজিদে সালাত আদায় না করে বাসায় সালাত আদায় করার অনুমোদন  অবশ্যই থাকবে।

এক্ষেত্রে আমাদের মন খারাপ হওয়া বা কষ্ট লাগাটাই স্বাভাবিক যে মসজিদে সালাত আদায় বন্ধ হচ্ছে এটা কেমন কথা? অনেকে বলে থাকেন যে এই সময় তো মসজিদে আল্লাহর দিকে আরও বেশি ধাবিত হওয়ার কথা। আমরা বলব অতি ঠাণ্ডা, অতি বৃষ্টিতে  ও প্লাবনের ভয়ে রাসুলে কারীম (সা:) বা সাহাবায়ে একরাম তো এই যুক্তি দেখাননি যে এই সময় মসজিদে আরও বেশি আসা দরকার । বরং তাঁরা যার যার বাসায় সালাত আদায় করার জন্য নির্দেশনা জারি করেছেন অতএব মনে রাখা উচিত আমরা বাসা বাড়ি থেকেও ইবাদত করতে পারি আল্লাহ সোবাহান তায়ালার কাছে সাহায্য চাইতে পারি যদি সেই রকম পরিস্থির মুখোমুখি আমরা হই। এমন কই বাসাও আমরা জামতের সাথে সালাত আদায় করতে পারি। এর বাইরে বুখারী বর্ণনা দ্বারা স্পষ্ট ভাবে আমাদের ঘোষণা দিয়েছেন কেউ যদি অসুস্থ হয় অথবা মুসাফির থাকেন তাহলে সেই অবস্থায় তিনি যদি ইবাদত করতে না পারেন তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ইবাদত করে যেই সওয়াব পেতেন এই অবস্থায় ইবাদত না করার কারণেও আল্লাহ সোবহান তায়ালা তাকে সেই পরিমাণ সওয়াব দিবেন। অতএব আমাদের মন খারাপ করার কোন কারণ থাকতে পারে না।

এখন কথা হল আমারেদ দেশে এইরকম কোন পরিস্থিতি হয়েছে কিনা যে জামাতে সালাত আদায় বন্ধ করা যেতে পারে এবং পৃথিবীর যেই  সব দেশে বন্ধ করা হয়েছে সেই সব দেশে আদৌ সেই রকম পরিস্থিতি হয়েছে কিনা? এই বিষয়ে আমরা দুটি কথা বলব।

প্রথম কথা হল এই বিষয়ে চিকিৎসকগণ যারা চিকিৎসা বিজ্ঞান আলহাদুলিল্লাহ পাণ্ডিত্য অর্জনের পাশাপাশি ইসলামিক শরিয়াতে সালাতের কি  গুরুত্ব সেটাও তাঁরা ভালো করে বুঝেন, এইরকম ব্যক্তিবর্গের মতামত এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে ওলামায়ে কেরামের প্রতিনিধি দল চিকিৎসকদের সাথে বসে পরামর্শ করে সমন্বিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এককভাবে এখানে কারো সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত হবে না।

দ্বিতীয়ত পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ রূপে ভিন্ন। আমাদের দেশের যে পরিবেশ পরিস্থিতি। মিডেলিস্টের পরিবেশ পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে । ইউরোপের পরিস্থিতি আরও ভিন্ন হতে পারে । অর্থাৎ করোনা ভাইরাসের সক্রমনের ভয়াবহতা এটা প্রত্যেটা দেশের, প্রত্যেকটা সমাজের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে । যার কারণে প্রত্যেকটা দেশের ওলামায়ে একরাম সে দেশের পরিস্থিতিকে পর্যালোচনা করে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিবেন। এটাই হবে সবথেকে যুক্তিসংগত এবং সবচাইতে সঠিক সিদ্ধান্ত। একক ভাবে কারো সিদ্ধান্ত দেওয়া সঠিক হবে না।

মৌলিকভাবে আমরা এইটুক জানলাম যে বিশেষ কারণে মসজিদে সালাত আদায়ের আয়োজন বন্ধ রাখা যেতে পারে তবে সেটা ঠুনকো কোন অজুহাতে করা যাবে না। অবশ্যই সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতগণ বিশেষজ্ঞগণ তাঁরা  এনালাইসিস করে পর্যালোচনা করে  গবেষণা করে স্টাডি করে  তারপরে তাঁরা সিদ্ধান্ত দিবেন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে  সব ক্ষেত্রে  কোরআন এবং সুন্নাহ ফলো করার তওফিক দান করুক।

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png