শিশুকে কীভাবে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন ?

শিশুর ইসলাম শিক্ষা

আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। শিশুকে আগামীর জন্য গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই তার ভবিষ্যৎ সুন্দর ও নিরাপদ করতে হবে। শিশুর ভবিষ্যৎ নিষ্কণ্টক ও প্রোজ্জ্বল হবে তখনই, যখন তাকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা হবে। প্রতিপালন করা হবে ইসলামের আদর্শ ও রূপরেখায়। শিশুকে শিশুকাল থেকেই তার মন-মানসিকতায় ইসলামের প্রতি পরিচ্ছন্ন চিন্তা ও অগাধ ভালোবাসার বীজ রোপণ করতে হবে। তার আকিদা-বিশ্বাস পরিশুদ্ধ করতে হবে। আল্লাহ, নবী-রাসূল, ফেরেশতা, কেয়ামত, কবর, হাশর- এসবের প্রতি তাকে বিশ্বাসী করে তুলতে হবে। আদব-কায়দা, নম্রতা-ভদ্রতা ও সুন্দর শিষ্টাচারে প্রতিপালন করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘কোনো পিতা তার সন্তানকে এর থেকে উত্তম উপঢৌকন প্রদান করতে পারেন না, তিনি তাকে যে উত্তম শিক্ষা প্রদান করেন।’ [তিরমিজি : হাদিস ১৯৫২]

হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ননা করেন রসুলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেন, ‘শিশুর যখন কথা ফুটতে শুরু করবে তখন সর্বপ্রথম তাকে কালেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শিখাবে, আর মৃত্যুকালেও তাদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র তালকিন দিবে। কেননা যার প্রথম বাক্য ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এবং শেষ বাক্য ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হবে সে যদি হাজার বছরও বেঁচে থাকে তাহলে তাকে কোনো গোনাহ ও পাপের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।’ [বায়হাকি : হাদিস ৮২৮২]

ছোটদের ইসলাম শিক্ষা সিরিজ
ছোটদের ইসলাম শিক্ষা সিরিজ- (১ থেকে ৫) (পেপারব্যাক)

BUY NOW

উপর্যুক্ত হাদিস দ্বারা শিশুকে ইসলামের শিক্ষা ও আদের্শে গড়ে তোলার গুরুত্ব প্রকটিত হয়। তাই একজন মুসলমান হিসেবে মা-বাবার নিজ শিশুদের এতটুকু পরিমাণ ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করা গুরু দায়িত্ব, যাতে সে ইসলামের মৌলিক বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা বা জ্ঞান লাভ করতে পারে। যাতে সে আল্লাহর পছন্দ-অপছন্দ, হালাল-হারাম, ও জায়েজ-নাজায়েজ, সত্য-মিথ্যা ও ন্যায়-অন্যায় পার্থক্য করে চলতে পারে। কেননা শিশু বা সন্তানের ভালো কাজের একটা অংশ যেমন মা-বাবা পেয়ে থাকেন, তেমনি শিশু বা সন্তানের পদস্খলনের দায়ভার মা-বাবার কাঁধেই বর্তায়। হাদিসে এসেছে, ‘জান্নাতে কোনো কোনো ব্যক্তির মর্যাদা বৃদ্ধি করা হলে তারা বলবে, কিভাবে আমার মর্যাদা বৃদ্ধি পেল? তখন তাকে বলা হবে, তোমার জন্য তোমার সন্তানের ক্ষমা প্রার্থনার ফলে।’ [ইবনে মাজাহ : হাদিস ৩৬৬০] তাই ‍শিশুকে কিভাবে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা যায় সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।

শিশুর সুন্দর নামকরণ

শিশুকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হলে প্রথমে শিশুর সুন্দর ও ইসলামী নাম রাখতে হবে। ইসলামের মূল ভাষা আরবি। তাই শিশুর নাম রাখার ক্ষেত্রে আরবি শব্দকে প্রাধান্য দেয়াই উত্তম। তাছাড়া শিশুর ভালো নাম চয়নের ক্ষেত্রে অন্য যেকোনো শব্দ ও ভাষা ব্যবহার করা যায়। রাসুলুল্লাহ সা. সন্তান জন্মের সাত দিনের ভেতর তার নাম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। সন্তানের নাম সুন্দর ও অর্থবহ হওয়া আবশ্যক। রাসুলুল্লাহ সা. ইসলাম গ্রহণের পর অনেক সাহাবির নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। কেননা তাঁদের নাম ইসলামী ভাবাদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল অথবা তাঁদের নাম অর্থপূর্ণ ছিল না। জয়নব রা. এর নাম ‘বাররাহ’ পরিবর্তন করে জয়নব রাখেন। [সহিহ বুখারি : হাদিস ৬১৯২] সন্তানের নাম রাখার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ সা. বলেন, ‘কেয়ামতের দিন তোমাদের নামে এবং তোমাদের পিতাদের নামে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা সুন্দর নাম রাখো।’ [সুনানে আবি দাউদ : হাদিস ৪৯৪৮] একইভাবে তিনি অর্থহীন, শ্রুতিকটু ও মন্দ অর্থের নাম রাখতে নিষেধ করেছেন। মহানবী সা. বলেন, ‘তোমরা তোমাদের ছেলেদের নাম ইয়াসার, রাবাহ, নাজাহ ও আফলাহ রেখো না।’ [সহিহ মুসলিম : হাদিস ২১৩৬]

সোনামণিদের সুন্দর নাম এবং মা ও শিশুর পরিচর্যা
সোনামণিদের সুন্দর নাম এবং মা ও শিশুর পরিচর্যা (হার্ডকভার)

BUY NOW

আর শিশুর নাম হাদিসে বর্ণিত পন্থায় রাখলে সহজেই তাকে ইসলামের নানা বিষয় ও ইতিহাস-ঐতিহ্য শেখানো সম্ভব। ইসলামী নামের কারণে ইসলামের ইতিহাসটা তাকে শোনানো যাবে অনায়াসেই। বরং তখন তারা এ বিষয়টা আগ্রহভরে গ্রহণ করবে এবং সর্বদা তা মনে রাখবে। তবে শিশু ছেলেদের ক্ষেত্রে এমনসব নাম রাখা উত্তম যা আল্লাহর নামের সাথে সম্বন্ধীয়। তাছাড়া নবী ও বা সাহাবীদের নাম রাখাও ভালো। আর শিশু মেয়েদের ক্ষেত্রে মহিলা সাহাবীদের নাম উত্তম। সুতরাং শিশুর ইসলামের শিক্ষার প্রথম ধাপ অর্থবোধক ও সুন্দর নাম দিয়ে শুরু হোক।

ছোটদের কুরআনের কাহিনী

BUY NOW 

আদর্শ পরিবার

শিশুকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হলে পরিবারকেও ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলতে হবে। হতে হবে আদর্শ পরিবার। কেননা পরিবার হলো শিশুর প্রথম প্রতিষ্ঠান। আর মায়ের কোল হলো শিশুর সর্বোত্তম শিক্ষালয়। মা-বাবাই শিশুর প্রথম আদর্শ শিক্ষক। পরিবার বা মা-বাবার কাছ থেকেই শিশু ভালো-মন্দ দুটোই শিখে থাকে। তাই পরিবারে ইসলামের চর্চা হলে শিশুও ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে। হয়ে উঠবে আদর্শ নাগরিক। একথা সত্য যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের এ যুগেও যেমন নবজাতকের জন্য মায়ের দুধের বিকল্প খাবার কিংবা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি, তেমনি সুনাগরিক তৈরিতে পরিবারের বিকল্প কোনো প্রতিষ্ঠান আজো গড়ে ওঠেনি। তাই ইসলাম পারিবারিক পরিবেশে ইসলামের বিষয়-আশয় চর্চার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। সুতরাং শিশুকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হলে পরিবারের সদস্য কিংবা মা-বাবাকেই যত্ন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘প্রত্যেক সন্তানই ফিতরাত [ইসলাম] এর ওপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। অতঃপর তার বাবা-মা তাকে ইহুদি বা খ্রিস্টান কিংবা অগ্নিপূজক বানায়।’ [সহিহ বুখারি : হাদিস ১৩৫৯]

একগুচ্ছ কিশোর সীরাত-সাহিত্য (নবী-জীবনের নিউক্লিয়াস)

BUY NOW

প্রাথমিক শিক্ষা

একটি শিশুর বয়স চার থেকে পাঁচ বছর হলেই সাধারনত মা-বাবা তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। আর স্কুলে গিয়ে কোনো শিশু ইসলামের পূর্ণ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে না। তাই শিশুকে চার বছরে স্কুলে না দিয়ে পাঁচ বছরে দেয়া যেতে পারে। আর এই একটি বছর শিশুকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় শেখানো সম্ভব। মাত্র একটি বছর। হিসেবে একবছর খুব বেশি সময় নয়। কারণ মাস্টার্স, অনার্স ডিগ্রি অর্জন করতে হলে ২০/২২ বছর বা ক্ষেত্রবিশেষ আরো বেশি সময় লেগে যায়। সুতরাং একটি বছর যদি মা-বাবা শিশুর কচিমনে ইসলামের বোধ-বিশ্বাস ও নিষ্কলুষ চেতনা রোপন করে দিতে পারেন- তাহলে পরবর্তী সময়ে ইসলামের ওপর চলা তার জন্য অনেক সহজ হবে। সাধারনত দেখা গেছে, যেসব শিশু ছোটকালে কিছুটা হলেও ইসলামকে জেনেছে, মক্তব-মাদরাসায় গিয়েছে কিংবা নবীজির জীবনী পড়েছে, তারা কখনো বিপথগামী হয় না । তাই শিশুকে জেনারেল শিক্ষার পূর্বেই ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে। আর শিশুকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে এ পন্থাটি অবলম্বও বেশ উপকারী হতে পারে।

ছোটদের ঈমান সিরিজ

BUY NOW

নামাজ-রোজা শিক্ষা

নামাজ ইসলামের অকাট্য ফরজ বিধান। তাই শিশুকে নামাজের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। শিশুকে নামাজ শিক্ষা দেওয়া মা-বাবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তাই নামাজ আদায়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে শিশুকে বুঝাতে হবে। তাকে নামাজের ফজিলত, গুণাবলি ও নামাজ না পড়ার শাস্তি সম্বন্ধেও অবগত করতে হবে। আর নামাজ পড়তে হলে সুরা-কেরাত জানতে হবে। এ জন্য তাকে কুরআন মাজিদ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। এ উসিলায় সারাজীবনের জন্য তার কুরআন মাজিদ শেখা হয়ে যাবে। তাছাড়া মা যখন বাসায় নামাজ আদায় করবেন শিশু তা দেখে নামাজে অভ্যস্ত হবে। আর বাবা যখন মসজিদে-ঈদগাহে নামাজে যাবেন তখন তাকেও হাত ধরে নিয়ে যাবেন। কারণ শিশুরা দেখে দেখেই অনেক কিছু শিখে। আর রোজা রাখার প্রতিও তাকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। রোজা রাখতে হয় না খেয়ে। অথচ সারাদিন শিশুর খাবারের কোনো হিসেব থাকে না। তাই না খেয়ে থাকতে হবে বিধায় রোজা রাখতে অনীহা প্রকাশ করবে। তখন তাকে বলতে হবে রোজার কল্যাণ ও উপকারিতার দিকটি। রোজা বছরে মাত্র একমাস। রোজা রাখলে মজার মজার ইফতার করা যায়। রোজা রাখলে ঈদের আনন্দ উপভোগ করা যায় ইত্যাদি। শিশু বয়সে দু’চারটি রোজা রাখাতে পারলে পরবর্তী সময়ে রোজা রাখতে তার আর কষ্ট হবে না। এই পক্রিয়া অবলম্বন করেও শিশুকে ইসলামের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব।

ছোটদের সাহাবি সিরিজ
ছোটদের সাহাবি সিরিজ (পেপারব্যাক)

BUY NOW

চারিত্রিক শিক্ষা

চরিত্র একজন মানুষের মহৎ গুণ। যার চরিত্র সুন্দর না তাকে সুন্দর মানুষ বলা চলে না। তাই শিশুকে শৈশব থেকেই সুন্দর চরিত্র গঠনের শিক্ষা দিতে হবে। শেখাতে হবে বড়কে শ্রদ্ধা ও ছোটকে স্নেহ করার দিকগুলো। বোঝাতে হবে মানুষের সেবা, সময়ানুবর্তিতা, পরিমিতিবোধ ও অল্পতুষ্টির উপকার। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র জীবনে শিশুকে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। কোনো মানুষ ও পশু-পাখিকে কষ্ট দেওয়া, অন্যের ক্ষতি করা, কারো জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করার মতো মন্দ স্বভাবগুলো সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। ঝগড়া-বিবাদ, চুরি থেকেও দূরে রাখতে হবে। শিশুর হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে শিক্ষামূলক গল্পের বই। সিরাত, সাহাবা জীবন, আদর্শ ব্যক্তি ও মনীষীদের বই। টিভি, কার্টুন ও মোবাইল নেশা যেন শিশুকে পেয়ে না বসে। শিশুর ভালো আচরণ ও কাজের জন্য প্রশংসা করা, উৎসাহ প্রদান এবং পুরস্কৃত করা বাঞ্চনীয়। তাহলে শিশু ইসলামের শিক্ষা ও ভালো কাজে আরও আগ্রহী হবে। পরিশেষে ইমাম গাজ্জালি রহ. এর একটি কথা প্রণিধানযোগ্য মনে করছি। তিনি বলেন, শিশু মা-বাবার কাছে আমানত ও তার অন্তর মূল্যবান মণিমুক্তাতুল্য। তা শূন্য ক্যানভাসের মতো পবিত্র ও নির্মল। তা যেকোনো চিত্রের জন্যই উপযোগী এবং তাকে যেদিকে ইচ্ছা ফেরানো যায়। তাকে যদি ভালো কাজের শিক্ষা দেওয়া হয়, তবে সে দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্যবান হবে। আর যদি তাকে মন্দ কাজে অভ্যস্ত করা হয় বা পশুর মতো অবজ্ঞা ও উপেক্ষা করা হয়, তবে সে হতভাগ্য ও ধ্বংস হবে। শিশুর রক্ষণাবেক্ষণ হলো তাকে আদবকায়দা ও শিষ্টাচার এবং উন্নত চারিত্রিক গুণাবলি শিক্ষা দেওয়া। [ইউসুফ আল হাসান, আল ওয়াজিজ ফিত-তারবিয়্যাহ : পৃষ্ঠা ২]

শিশু কিশোরদের যে ইসলামি বইগুলো পড়তে দিতে পারেন !

এমদাদুল হক তাসনিম

এমদাদুল হক তাসনিম

নির্বাহী সম্পাদক : মাসিক ইসলামী বার্তা, অর্থ সম্পাদক : বাংলাদেশ ইসলামী লেখক ফোরাম ই-মেইল: imdadtasnim@gmail.com

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading