তাওহিদ ও শিরক তথা একত্ববাদ ও অংশীদারিত্ব

2

কেউ তার গর্ভধারীণী মা সম্পর্কে সংশয় পোষণ করল যে, তিনি তার মা নন। বরং তার ধারণা হল, তার মা বুঝি অন্য কেউ। তাহলে এখানে বিশ্বাসগত ভাবে সে অন্য কাউকে তার মায়ের অংশীদার বানালো। আর যদি সে কাগজে-পত্রে এবং লোকসমাজে ঐ ‘অন্য মহিলা’কে তার মা বলে লিখতে ও প্রচার করতে আরম্ভ করে, তাহলে সে এবার কার্যত ও বাস্তবিক পর্যায়ে তার মায়ের অংশীদার তৈরি করলো।

শরয়ী পরিভাষার শিরক ব্যাপারটা ঠিক এমনই। স্রষ্টার সাথে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে অংশীদার বানানোর নামই এখানে শিরক। নানারূপেই হতে পারে এটা। বিশ্বাসের জায়গা থেকে বা কার্যকরভাবে অথবা উভয়রূপেই।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক একাধিক স্থানে বলেছেন যে, সমস্ত কিছুর ওপর তিনি একক ক্ষমতাবান। কিন্তু কেউ যদি জীবনের কোনো পর্যায়ে গিয়ে ধারণা করে বসে যে, এ কাজটি হয়তো আল্লাহর সাধ্যাতীত বা আল্লাহকে দিয়ে এটি হবে না (নাউজুবিল্লাহ)। তবে সে স্পষ্টতই বিশ্বাসের জায়গা থেকে শিরকের আশ্রয় নিলো।

আর যদি এ বিশ্বাসটাকে কেউ বাস্তবে রূপদান করে- যেমন মাজারে শায়িত কোনো মৃত ব্যক্তিকে সে তার কার্যসিদ্ধির রূপকার ভাবলো বা কোনো ডাক্তার-কবিরাজ, পীর-ফকিরকে কোনো অসাধ্য সাধনের একক ক্ষমতাধিকারী ভেবে তার দ্বারস্থ হলো, তাহলে সে কার্যতই শিরক করলো।

আর এর বিপরীত বিশ্বাস তথা মহান আল্লাহ পাককে সব কিছুর ব্যাপারে একক ক্ষমতাধিকারী বলে মনেপ্রাণে বিশ্বাস লালন করা এবং কাজেকর্মে ও আমলে-আখলাকে তার প্রমাণ রাখার নামই তাওহিদ বা একত্ববাদ।

বলা বাহুল্য, ইসলামের দৃষ্টিতে শিরক অত্যন্ত ভয়ানক অপরাধ ও জঘন্যতম গুনাহ বলে স্বীকৃত। কুরআনে পাকের সূরা নিসা’য় ৪৮ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

إِنَّ اللّهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللّهِ فَقَدِ افْتَرَى إِثْمًا عَظِيمًا

অর্থাৎ নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য পাপ তিনি ক্ষমা করেন, যাকে তিনি চান। আর যে আল্লাহর সাথে শরিক করে, সে যেন তাঁর ওপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করল।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বরাত দিয়ে তাফসিরে ইবনে কাসিরে একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত আবু যার রা. বলেন, আমি এক রাতে বের হয়ে দেখতে পেলাম যে, রাসূলুল্লাহ সা. একাকি হাঁটছেন। আমি ধারণা করলাম, তিনি হয়তো কাউকে সঙ্গে নিতে চাইছেন না। আমি তাই চাঁদের আলোয় রাসূলুল্লাহ সা. এর পেছনে চলতে থাকি।

ইত্যবসরে তিনি ঘুরে আমাকে দেখতে পেয়ে বললেন, কে তুমি? আমি বলি- আবু যার, আল্লাহ আমাকে আপনার প্রতি উৎসর্গ করুন। তিনি তখন আমাকে বললেন, ‘এসো, আমার সঙ্গে চলো।’ কিছুক্ষণ আমরা চলতে থাকি। অতঃপর তিনি বলেন, ‘আধিক্যের অধিকারীরাই কিয়ামতের দিন অল্পের অধিকারী হবে। তারা ছাড়া যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ধনসম্পদ দিয়েছেন এবং সেই সম্পদ তারা ডানে-বামে ও সামনে-পেছনে ভালো কাজে খরচ করে থাকে।’

আবার কিছুক্ষণ চলার পর তিনি আমাকে বললেন, ‘এখানে বসো।’ আমাকে তিনি এমন জায়গায় বসিয়ে দেন যার চতুর্দিকে ছিল পাথর এবং আমাকে বললেন, ‘আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত এখানে বসে থাকো।’ অতঃপর তিনি চলে যান এবং দৃষ্টির আড়াল হয়ে যান। তাঁর বেশ বিলম্ব হতে থাকে। অবশেষে আমি দেখি যে, তিনি বলতে বলতে আসছেন- ‘যদিও ব্যভিচার করে এবং যদিও চুরি করে।’

যখন তিনি আমার নিকট পৌছেন, তখন আমি অধৈর্য হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করি, আল্লাহ তা’আলা আমাকে আপনার উপর উৎসর্গ করুন, আপনি মাঠের প্রান্তে কার সাথে কথা বলছিলেন? আমি শুনেছি, তিনি আপনাকে উত্তরও দিচ্ছিলেন! তিনি বলেন, “তিনি ছিলেন জিবরাঈল আ.। এখানে এসে তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনার উম্মতকে সুসংবাদ শুনিয়ে দিন যে, তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক না করা অবস্থায় মারা যাবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ আমি বলি, হে জিবরাঈল, যদিও সে চুরি এবং ব্যভিচার করে? তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ।’ আমি (আবারও) বলি, যদিও সে চুরি এবং ব্যভিচার করে? তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, এমনকি যদি সে মদ্যপানও করে।’

শিরক
অন্য হাদীসেও এর অনুরূপ বক্তব্য পাওয়া যায়। নবীজী সা. ইরশাদ করেন,

كُلُّ ذَنْبٍ عَسَى اللَّهُ أَنْ يَغْفِرَهُ إِلَّا مَنْ مَاتَ مُشْرِكًا أَوْ مَنْ يَّقْتُلُ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا

অর্থাৎ আশা করা যায়, আল্লাহ তা‘আলা সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। কিন্তু ঐ ব্যক্তিকে ক্ষমা করবেন না, যে মুশরিক তথা শিরকরত অবস্থায় মারা যায় অথবা স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করে। আবু দাউদ : ৪২৭০।

শিরকের অনেক ধরণ ও প্রকার রয়েছে। নীতিহীন পথভ্রষ্ঠ এবং ধর্মের নামে অধর্মের কাজে সিদ্ধহস্ত লোকেদের কর্তৃক নানা কিসিমের শিরক পৃথিবীর আদি কাল থেকেই প্রচলিত। ফলে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আমাদের অজান্তেই এমন বহু শিরক ঢুকে গেছে, যেগুলো পরিষ্কার শিরকের পর্যায়ে পড়ে, অথচ আমরা মোটেও তার ব্যাপারে সতর্ক নই; এমনকি অবগতও নই।

যেমন, হযরত ইবনু উমার রা. থেকে বর্ণিত হাদিস-

سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ:  مَنْ حَلَفَ بِغَيْرِ اللَّهِ فَقَدْ أَشْرَكَ

রাসূলুল্লাহ সা. কে আমি বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলার নাম ব্যতীত অন্য কিছুর নামে যে শপথ করলো, সে যেন কুফরী করলো অথবা শিরক করলো। তিরমিজী : ১৫৩৫।

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় কতিপয় আলেম সূরা কাহাফের সর্বশেষ আয়াত- ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে, সে যেন সৎকাজ করে এবং তার প্রভুর ইবাদাতের মধ্যে অন্য কাউকে শরীক না করে’ এর বরাত দিয়ে বলেন, শিরক একটি অন্যতম অপরাধ ও গুনাহ, যা আল্লাহ পাকের সাক্ষাত লাভে ধন্য হওয়াকে অনিশ্চিত করে দেয়।

প্রসঙ্গত এখানে আমাদের খ্রীষ্টান ভাইদের মতবিশ্বাসের কথাও চলে আসে। যারা তাদের প্রভুরূপে আল্লাহ ব্যতীত আরও দুই সত্তাকে দাবি করে। তারা হলেন, হযরত ঈসা ও তাঁর মা হযরত মারইয়াম আ.। অথচ কুরআনে হযরত ঈসার বান্দা হবার ব্যাপারে স্পষ্ট বক্তব্য উচ্চারিত হয়েছে। ঈসা আ. নিজেই বলেছেন,

আমি (কেবলই) আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে নবী বানিয়েছেন। সূরা মারইয়াম : ৩০।

এজন্যই সূরা লোকমানে আল্লাহ পাক হযরত লোকমান আ. কর্তৃক তার পুত্রকে দেয়া উপদেশ উদ্ধৃত করেছেন। সেখানে তিনি শিরককে একটি ‘মহা অন্যায়’রূপে সাব্যস্ত করেছেন। তিনি বলেন,

নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরিক করা মহা অন্যায়। সূরা লোকমান : ১৩।

এজন্য ইসলামের প্রথম আহ্বানই ছিল আল্লাহ পাকের একত্ববাদের প্রতি বিশ্বাস তৈরি এবং তার স্বীকারোক্তি। নবী আ. বলেছেন,

যে ব্যক্তি বলবে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। মুসনাদে আবু ইয়া‘লা : ৬/১০।

উপরন্তু কুরআনেও আল্লাহ পাকের পরিষ্কার বাণী-

তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি মহা করুণাময়, দয়ালু। সূরা বাক্বারা : ১৬৩।

এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে বই দুটি পড়া যেতে পারে:
১. তাওহীদ ও শিরক প্রকার ও প্রকৃতি।
২. তাবিজ কি শিরক?

নূরুল্লাহ মারূফ

নূরুল্লাহ মারূফ

Published 13 Jan 2020
আলেম, প্রাবন্ধিক
  1      1
 

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png