বাবাকে নিয়ে লেখা- সাদাত হোসাইন

Baba K Niye_Shadat

…………………………………

সেহরির সময় বাড়িতে ফোন দিলাম। আম্মা ফোন ধরে বললেন, ‘হ্যালো’।

আমি বললাম, ‘আব্বাকে দেন’।

আম্মা খানিক অবাক হলেন। সাধারণত বাড়িতে ফোন দিলে আম্মার সাথেই বেশি কথা হয়। আব্বা ফোনে কথা বলতে তেমন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। আম্মা আব্বাকে ফোন দিলেন। আব্বা ফোন ধরতেই আমি বললাম, ‘আব্বা, আব্বা, ও আব্বা, আব্বা, আব্বা…’

আব্বা অবাক গলায় বললেন, ‘কি হইছে আব্বা?’

আমি বললাম, ‘আব্বা, ও আব্বা, আব্বা, আব্বা, আব্বা, ও আব্বা… আব্বা’।

আব্বা এবার রীতিমত চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি বিভ্রান্ত গলায় বললেন, ‘কি হইছে আব্বা? কিছু হইছে?’

আমি আবারও বললাম, ‘ও আব্বা, আব্বা, আব্বা, আব্বা, আব্বা… ও আব্বা।’

আব্বা বললেন, ‘আব্বা, কি হইছে, কি হইছে?’

আমি ফিক করে হেসে দিয়ে বললাম, ‘কিছু হয় নাই। এমনিই। অনেকদিন ধরে আপনারে ফোন দেই না। কতদিন আব্বা আব্বা বলে ডাকি না। মনে হচ্ছিল আব্বা আব্বা ডাকার জন্য বুকের ভেতরটা শুকাই গেছে, পানি না খাইতে পারলে যেমন তৃষ্ণা লাগে, সেইরকম। গলা শুকাই গেছে, কেমন খা খা লাগতেছিল বুকের মধ্যে। এইজন্য তৃষ্ণা মিটাইলাম। আব্বা, আব্বা, ও আব্বা, আব্বা, আব্বা…।

আমি ফোন রেখে দিলাম। খানিক বাদে আম্মা ফোন দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তুই তোর আব্বারে কি বলছস?’

আমি বললাম, ‘কেন? কি হইছে?’

আম্মা বললেন, ‘কি হইছে মানে? সেইটা তুইই জানস। সে ফোন রাখনের পর থেইকা কানতেছে আর কানতেছে। নামাজে দাঁড়াইয়া মোনাজাত ধইরাও হাউমাউ কইরা কানতেছে। কি কইছস তোর আব্বারে…;

কী বলেছি আমি?

আমি হঠাৎ চুপ করে যাই। একদম চুপ। আম্মার প্রশ্নের কোন জবাব দেই না। চুপ করে বসে থাকি। নিঃশব্দ। আম্মা আমাকে জিজ্ঞেস করতেই থাকেন। আমি জবাব দেই না। আমার চোখ ক্রমশই ঝাপসা হতে থাকে, গাল ভিজে যেতে থাকে। বাইরে সুবহে সাদিকের আলো ফুটছে। সেই আবছা আলোর দিকে তাকিয়ে আমার হঠাৎ মনে হতে থাকল, আব্বা কাঁদুক, কাঁদুক। কাঁদুক তার পুত্রও। জগতে এই কান্নার খুব দরকার, খুব, খুব।

এই অস্থির সময়ে অজস্র কষ্ট, বেদনা, হাহাকার, ঘৃণা, মৃত্যু, জিঘাংসার কান্নায় ক্রমশই ডুবে যেতে থাকা জগতে এমন গভীরতম অনুভূতির তীব্র কান্না, এমন অপার ভালোবাসায় ডুবে থাকা বিশুদ্ধতম কান্না খুব দরকার। খুব দরকার।

~ সাদাত হোসাইন

…………………………………………………………

দুটো ইচ্ছে নিয়ে স্বপ্নযাত্রার শুরু। এক- খেয়ানৌকার মাঝি হওয়া, দুই- নিজের নামটি ছাপার অক্ষরে দেখতে পাওয়া। মাদারীপুরের কালকিনি থানার কয়ারিয়া নামের যে গ্রামে জন্ম, তার পাশ দিয়েই তিরতির করে বয়ে গেছে ছোট্ট এক নদী। খেয়ানৌকার মাঝি হওয়ার স্বপ্নটা তাই সত্যি হওয়াই ছিল সহজ। কিন্তু হলো উল্টোটা। পূরণ হলো দ্বিতীয় স্বপ্নটি! সাদাত হোসাইন হয়ে গেলেন লেখক। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছয়। লিখেছেন, কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস। যা প্রশংসা কুঁড়িয়েছে পাঠক মহলে। ‘আরশিনগর’ এবং ‘অন্দরমহল’ নামের দীর্ঘ কলেবরের উপন্যাস দুটি রীতিমত চমকে দিয়েছে পাঠকদের। শুধু লেখালেখিই নয়, দুর্দান্ত আলোকচিত্রী সাদাত হোসাইন নিজের স্বপ্নের সীমানাটাকে বাড়িয়ে নিয়ে গেলেন স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণেও। তার নির্মিত ‘বোধ’ ও ‘দ্যা শ্যুজ’ নামের নির্বাক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দুটি প্রশংসার ঝড় তুলেছে বিশ্বব্যাপী। কাজ করছেন একাধিক নতুন ফিল্ম নিয়ে। সাদাত হোসাইনের জগত জুড়ে অমিত স্বপ্নের বসবাস।

সেই স্বপ্নের সবটা ছুঁয়ে ছুটে যেতে চান অবিরাম। সম্প্রতি আলোকচিত্র, লেখালেখি এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য জিতেছেন ‘জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যশনাল অ্যাওয়ার্ড’।

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png