কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহঃ এক সাহিত্যিকের অজানা জীবন !

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ । তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প ও নাটকের জন্য সমাদৃত। ইউরোপীয় আধুনিকতার পরিশ্রুত রূপ দেখা যায় তার লেখায়। বিষয় কাঠামো ও ভাষা-ভঙ্গিতে নতুন এক ঘরানার জন্ম দেন ওয়ালীউল্লাহ, যা বাংলা সাহিত্যের আচানক আবির্ভাবের মতোই ছিল। তাঁর লেখায় ব্যক্তির অস্তিত্ব সঙ্কট, সমাজের কুসংস্কার, মানসিক ও চারিত্রিক স্খলন ফুটে উঠেছে। মহান এই সাহিত্যিক সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।

জন্ম পড়াশোনা

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ব্রিটিশ ভারতের চট্টগ্রাম শহরের ষোলশহরে ১৯২২ সালের ১৫ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সৈয়দ আহমাদুল্লাহ ও মা নাসিম আরা খাতুন। তার পরিবার ছিল উচ্চশিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক। বাবার বদলির চাকরির সুবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল দেখার সুযোগ পান। শিক্ষাজীবন কেটেছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ১৯৩৯ সালে কুড়িগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪১ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৪৩ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে ডিসটিংশনসহ বিএ পাস করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হলেও শেষ করেননি।

পরিবার

১৯৫৫ সালে ফরাসী নারী আন্-মারি লুই রোজিতা মার্সেল তিবো বা আজিজা মোসাম্মত নাসরিনকে বিয়ে করেন। তিনি আন মারী নামেই বেশি পরিচিত। তাদের দুই সন্তান- মেয়ে সিমিন ওয়ালীউল্লাহ ও ছেলে ইরাজ ওয়ালীউল্লাহ।

যেভাবে সাহিত্যে ঝুঁকেছেন

নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রের অনুপস্থিতিতে নিশ্চিত করে বলা আর সম্ভব নয়, কী করে সাহিত্যচর্চার দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন ওয়ালীউল্লাহ। এটুকু জানা যাচ্ছে, তার মামি রাহাত আরা বেগম উর্দু সাহিত্যের লেখক ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ডাকঘরসহ বেশ কয়েকটি গল্প-উপন্যাস তিনি অনুবাদ করেছিলেন উর্দু ভাষায়। অনেকগুলো গল্প-উপন্যাসের বইও রয়েছে তাঁর। বালক ওয়ালীউল্লাহর অবচেতনে মামির সাহিত্যচর্চা হয়তো আগ্রহ সৃষ্টি করেছিল।

লেখালেখির শুরু

ফেনী হাই স্কুলে ছাত্র থাকাকালেই ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যচর্চার সূত্রপাত। এ সময় হাতে লেখা ‘ভোরের আলো’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তার প্রথম গল্প ‘হঠাৎ আলোর ঝলকানি’ ঢাকা কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। ইংরেজি-বাংলা উভয় ভাষায় তার দক্ষতা ছিল। কনটেম্পোরারি নামে একটি ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশ করেন। সওগাত, মোহাম্মদী, বুলবুল, পরিচয়, অরণি, পূর্বাশা প্রভৃতি পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হতো।

আঁকার প্রতি ঝোঁক

১৯৩৫-৩৬ সালে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ফেনী হাইস্কুলে পড়াশোনা করেছেন সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীতে। হাউজ সিস্টেম ছিল সে বিদ্যালয়ে। ওয়ালীউল্লাহ যে হাউজে ছিলেন, তাঁকে সেটির ম্যাগাজিন সম্পাদক করা হয়েছিল। বোধকরি সেই থেকেই সাহিত্যের সংশ্রবে আসেন তিনি। ম্যাগাজিনের নাম কী রাখা যায়, তা নিয়ে সবাই যখন চিন্তাভাবনা করছে, ওয়ালীউল্লাহই তখন প্রস্তাব করেছিলেন, দেয়াল পত্রিকার নাম রাখা হোক ‘ভোরের আলো।’ পত্রিকাটিতে তিনি শুধু লিখতেন না, ছবিও আঁকতেন। তাঁর সৎ মা নাসিম আরা খাতুনের ভাষ্যানুযায়ী, ওই সময় ছবি আঁকার দিকেই তাঁর বেশি ঝোঁক ছিল।

বন্ধুত্ব

শওকত ওসমান ও জয়নুল আবেদীন ছিলেন ওয়ালীউল্লাহর বড় ভাই নসরুল্লাহর বন্ধু। কিন্তু সাহিত্যচর্চার সূত্রে তিনি শওকত ওসমানের এবং পেইন্টিংয়ে আগ্রহ থাকার কারণে জয়নুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন। গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ের পর ওয়ালীউল্লাহদের দুই ভাইকে পার্ক সার্কাস এলাকার বালুহাক্কাক লেন থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন শওকত ওসমান ও বুলবুল চৌধুরী। এরপর তাদের হূদ্যতা আরো গভীরতা পায়।

কাজকর্ম লেখালেখি

১৯৪৮ সালে কলকাতায় ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যানে সাব-এডিটরের চাকরি নেন। কর্মজীবন শুরুর তিন মাস আগে প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নয়নচারা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর দ্য স্টেটসম্যানের চাকরি ছেড়ে ঢাকা চলে আসেন। সেপ্টেম্বরে রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের সহকারী বার্তা সম্পাদকের চাকরি নেন। ওই সময় বিখ্যাত উপন্যাস ‘লালসালু’ লেখায় হাত দেন। পরের বছরই এটি প্রকাশ করে কমরেড পাবলিসার্স। ১৯৪৮ সালে করাচি কেন্দ্রের বার্তা সম্পাদক হন। সেখান থেকে ১৯৫১ সালে নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান দূতাবাসে তৃতীয় সেক্রেটারির পদমর্যাদা পান। এর পর ১৯৫৮-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত সিডনি, জাকার্তা, করাচি, লন্ডন ও বনে বিভিন্ন পদে ও মেয়াদে কাজ করেন।

১৯৬১ সালের এপ্রিলে ফার্স্ট সেক্রেটারির পদমর্যাদায় যোগ দেন প্যারিসের দূতাবাসে। ৬ বছর ছিলেন ওই শহরে। এরই মধ্যে প্রকাশিত হয় লালসালুর ফরাসী অনুবাদ লারব্র্ সা রাসিন (শিকড়হীন গাছ)। ১৯৬৭ সালে দূতাবাসের চাকরি ছেড়ে ওয়ালীউল্লাহ চুক্তিভিত্তিক প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট পদে যোগ দেন প্যারিসের ইউনেস্কো সদর দফতরে। ১৯৭০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইউনেস্কোতে তার চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছিল। অবসর গ্রহণের নিয়ম হিসেবে পাকিস্তান সরকার তাকে ইসলামাবাদে বদলি করে। কিন্তু তিনি প্যারিসেই থেকে যান।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে প্রচার চালান এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে ফরাসী একাডেমির সদস্য পিয়ের এমানুয়েল, আদ্রে মারলো প্রমুখ বুদ্ধিজীবীর সহযোগিতায় বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে সাধ্যমতো অনুদান পাঠিয়েছিলেন।

লালসালুর প্রকাশকথা

দেশভাগের পর পরই প্রকাশ পায় ওয়ালীউল্লাহর প্রথম উপন্যাস ‘লালসালু’— যাতে দুই দেশেরই নাম রয়েছে। মনোটাইপে ঢাকার সবচেয়ে আধুনিক প্রেস নবাবপুরের নারায়ণ মেশিন প্রেস থেকে ছাপা হয় বইটি। কিন্তু কলকাতার সুভাষ এভিনিউ ছিল প্রকাশকের ঠিকানা। প্রকাশক কমরেড পাবলিশার্স ছিল তাঁর বড় মামা খান বাহাদুর সিরাজুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান। দেশভাগের আগে কলকাতায় থাকার সময়ে ওই প্রকাশনার কাজ শুরু করেন তারা।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এ প্রকাশনার কর্মাধ্যক্ষ ছিলেন বেশ কিছুদিন। বইটির প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ করেছিলেন জয়নুল আবেদিন। তবে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ পায় আহসান হাবীবের কথা বিতান থেকে, প্রচ্ছদ করেন আবদুর রউফ। ১৯৬১ সালের জুনে এটির উর্দু অনুবাদ প্রকাশ পায় ‘লাল চাদর’ নামে। অনুবাদ করেছিলেন বিখ্যাত উর্দু লেখক ইউনুস আহমার। এরপর তিনি ‘লালসালু’ যথেষ্ট বিক্রি না হওয়ার গ্লানি থেকে মুক্ত হয়েছিলেন।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সকল বই

আরও পড়ুনঃ

বাংলা সাহিত্যের যেসব বই থেকে সিনেমা বানানো হয়েছে

আবু ইসহাক এর এই গল্পগুলো হয়তো আপনি জানেনই না !

একজন সেলিনা হোসেন, কতটুকু জানা আছে তার বিষয়ে ???

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png