আধুনিক বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান

image-105812-1557254275-1905071847

 

‘নবজাতক’ কাব্যের ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন — ‘আমার কাব্যের ঋতু পরিবর্তন ঘটেছে বারে বারে। প্রায়ই সেটা ঘটে নিজের অলক্ষ্যে। কালে কালে ফুলের ফসল বদল হয়ে থাকে, তখন মৌমাছির মধু জোগান নতুন পথ নেয়।…..কাব্যে এই যে হাওয়া বদল থেকে সৃষ্টি বদল এ তো স্বাভাবিক, এমনি স্বাভাবিক যে এর কাজ হতে থাকে অন্যমনে। কবির এ সম্বন্ধে খেয়াল থাকে না’। কাব্যের এই ঋতু-বদলের কথা স্মরণ রেখে রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুলিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, গদ্যকাব্য এবং ছন্দোবদ্ধ কাব্য—উভয় ক্ষেত্রেই স্বচ্ছন্দ বিচরণ করেছেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর সাহিত্যসৃষ্টির প্রথম পর্বের রচনার মধ্যে রয়েছে ‘বনফুল‘(১২৮২-৮৩ সালে ‘জ্ঞানাঙ্কুর’ ও ‘প্রতিবিম্ব’ পত্রিকায় প্রকাশিত), ‘কবি কাহিনী’, ‘ভগ্নহৃদয়’, ‘ভানুসিংহের পদাবলী'(১২৮৪-১২৯০), ‘বাল্মীকি প্রতিভা'(গীতিনাট্য) প্রভৃতি।

তাঁর স্বকীয়তার বিচ্ছুরণ, প্রতিভার বিকাশ ক্রমশ লক্ষ করা গেছে ‘সন্ধ্যাসঙ্গীত‘(১২৮৮), ‘প্রভাতসংগীত'(১২৯০), ‘ছবি ও গান'(১২৯০), ‘কড়ি ও কোমল'(১২৯৩) ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে। প্রভাত সংগীত রচনার সময়পর্বে প্রকৃতির প্রসারতা ও মানব জীবনের বৈচিত্র্যের সঙ্গে কবির যোগসূত্র স্থাপিত হওয়ায় তাঁর হৃদয়াবেগের অস্পষ্টতা কেটে গেছে এবং তাঁর কাব্যের ভাব, ভাষা ও ছন্দ ক্রমশ সুন্দর হয়ে উঠেছে। এই কাব্যের অনেক ভাব তাঁর অনেক প্রেমের গল্পের বই গুলোতেও লক্ষ্য করা যায়। প্রভাত সংগীতের পরবর্তী কাব্য ‘ছবি ও গানে’র পর রবীন্দ্রনাথের বধূ সনেট বা চতুর্দশপদী কবিতাসমৃদ্ধ ‘কড়ি কোমল'(১২৯৩) প্রকাশিত হলে, তাতে তাঁর মর্ত্যমমতা, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বমানবতা ও বিশ্বপ্রকৃতির প্রভাব ও প্রকাশ লক্ষ করা গেল। ‘মানসী'(১২৯৭) ও ‘সোনার তরী'(১৩০০) কাব্যগ্রন্থে বিশ্বাত্মবোধে, ছন্দ ও ভাষার আড়ষ্টতা থেকে মুক্তিতে, সৌন্দর্যব্যাকুলতা ও নিসর্গচেতনাময় রোমান্টিক কল্পনার বিস্তারে তাঁর কবি প্রতিভার যথার্থ উন্মেষ ঘটেছে। ‘চিত্রা’ (১৩০২) কাব্যগ্রন্থে মানবপ্রেম তথা মানবতাবোধ, সৌন্দর্যকে সীমা ও অসীমে পরিব্যাপ্ত করে দেখার মনোভাব, কর্মচঞ্চল জীবনের আহ্বানে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতির চেতনা, দুঃখবরণ ও আত্মবিসর্জনে ঔৎসুক্য লক্ষ করা গেছে।

সমসাময়িক ‘মালিনী’ নাটকেও এই আদর্শেরই সম্প্রসারণ। ‘চিত্রা’র পরবর্তীকালে ‘চৈতালি'(১৩০২) কাব্যগ্রন্থে প্রাচীন ভারতের ধ্যানগম্ভীর, শান্ত আদর্শে কবি উদ্বুদ্ধ। এছাড়া এই কাব্যে সুখ-দুঃখ, মহত্ত্ব, কর্তব্য নিষ্ঠার পরিচয় পাওয়া যায়। ‘কল্পনা‘(১৩০৭) কাব্যেও লক্ষণীয় সেই অতীত স্মৃতিরই অনুধ্যান। এখানে অতীতমুখী কবিমন প্রাচীন ভারতের সৌন্দর্য স্মৃতিতে বিভোর। প্রায় একই সময়ে রচিত তাঁর অন্য কাব্যগ্রন্থগুলি হলো ‘কথা ও কাহিনী’ ও ‘ক্ষণিকা’। পৌরাণিক, ঐতিহাসিক, লৌকিক আখ্যায়িকা থেকে গৃহীত বিষয় নিয়ে লেখা কবিতা ও নাট্যকবিতা স্থান পেয়েছে ‘কথা ও কাহিনী’ ও ‘ক্ষণিকা’য়। সমাজ ও স্বভাবধর্মের ওপর মানুষ্যধর্মের জয়ঘোষণার পাশাপাশি ত্যাগ যে কত মহনীয় হতে পারে, তা কবিতাগুলিতে প্রকাশিত হয়েছে। ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থে আবেগ উচ্ছলতা সংযত হয়ে সাধারণ জীবনের চারপাশের ভাব থেকে রূপক বেছে নিয়ে নীতিনির্ভর, দার্শনিকতা প্রধান অজস্র কবিতা রচিত হয়েছে। ‘ক্ষণিকা’র কবিতাগুলি গীতকবিতার অসামান্য নিদর্শন। ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থে ঈশ্বরের প্রতি শান্ত, সমাহিত, ঐকান্তিক অনুরাগের ছবি যেমন ধরা পড়েছে, তেমনই সবরকম সংস্কারমুক্ত সত্যধর্ম উপলব্ধিরও প্রকাশ ঘটেছে।

স্বদেশকেও সেই সত্যসাধনার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে চেয়েছেন কবি। এই কাব্যে ভগবানের কাছে তাঁর ও দেশবাসীর জন্য কবির পূর্ণ মনুষ্যত্বের প্রার্থনা তাঁর ‘ব্রহ্মচর্য্যাশ্রম’ তৈরির মধ্য দিয়ে রূপায়িত হয়েছে। স্ত্রী বিয়োগের পটভূমিতে রচিত ‘স্মরণ'(১৩০৯) কাব্যে মৃত্যুরহস্য সম্বন্ধীয় বেশ কিছু কবিতা স্থান পেয়েছে। শিশুমনের খেয়ালি কল্পনা ও রহস্য উপলব্ধির প্রকাশ ঘটেছে ‘শিশু'(১৩১০) কাব্যগ্রন্থে। অসীমের সঙ্গে মিলিত হওয়ার ব্যাকুলতার প্রকাশ ঘটেছে ‘উৎসর্গ’–এর কবিতায়। ‘খেয়া‘ কাব্যগ্রন্থে ব্যক্তিগত জীবনের সুখদুঃখের মধ্য থেকে জীবনের পূর্ণতার অনুধ্যান ভগবদভক্তির অনুভূমিতমণ্ডিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে। এই কাব্যে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি যে বিচিত্র বর্ণসুষমায় উদ্ভাসিত, তারই পরিণতি পরবর্তী গানের সংকলনগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’, ‘গীতিমাল্য’ ও ‘গীতালি’তে, যেখানে তাঁর ভগবৎপ্রেম আরো স্নিগ্ধ, গভীর, তত্ত্বপ্রধান ও অপরূপ সৌন্দর্যে প্রকাশিত হয়েছে। কবির ভগবৎবিশ্বাস এখানে বৈষ্ণব-বাউল-সহজিয়া-সুফি মরমিয়াদের অনুরৃপ।

তা যেন মানবপ্রেমেরই বিস্তৃত প্রকাশ, যে প্রেমে ঈশ্বরও তাঁর বন্ধুর রূপ পরিগ্রহ করেন। ‘গীতাঞ্জলি’র মাধ্যমে আধুনিক পাশ্চাত্য দেশগুলি ভারতীয় অধ্যাত্মবাদ, ঈশ্বর উপলব্ধির সঙ্গে পরিচিত হলো। সংস্কারমুক্তি ও গতির বাণী নিয়ে এসে ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থ রবীন্দ্রকাব্যের দিক পরিবর্তনকে সূচিত করেছে। ‘বলাকা’, ‘পূরবী’, ‘মহুয়া’র কবিতাগুলিতে রবীন্দ্রনাথ গদ্য ও পদ্যছন্দের নতুন পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। ‘বলাকা’ পরবর্তী ‘পলাতকা’ কাব্যগ্রন্থে সাধারণ মানুষের সুখদুঃখের কাহিনি নির্ভর বাস্তবধর্মী কবিতা যেমন স্থান পেয়েছে তেমনি অজানা জগতের প্রতি আকর্ষণ ও অলক্ষ্য থাকেনি। ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যে ধ্বনিত হয়েছে গতিবাদের সুর। ‘পূরবী’তে যেখানে কবি আত্মসমীক্ষায় নিমগ্ন, ‘বনবানী’ কাব্যে বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে কবির পরিচিতির বিস্ময়বোধ ও বিশ্বসৌন্দর্য দর্শনজনিত আনন্দের প্রকাশে তন্ময়, ‘মহুয়া’য় সেই তিনিই আবার প্রেমের বিচিত্র প্রকাশে ও নারীবন্দনায় মুখর। ‘পরিশেষ’-এর কবিতাগুলি বিবাহ, নামকরণ প্রভৃতি জীবনঘনিষ্ঠ ঘটনা নিয়ে রচিত। গদ্যছন্দের সৃষ্টি ও পরীক্ষার পর্বে তাঁর ‘পুনশ্চ’, ‘শেষ সপ্তক’, ‘পত্রপুট’, ‘শ্যামলী’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থগুলিও উল্লেখযোগ্য। জীবনের প্রান্তসীমায় এসে ‘শেষসপ্তক’, ‘প্রান্তিক’, ‘সেঁজুতি’, ‘নবজাতক’, ‘সানাই’, ‘রোগশয্যায়’, ‘আরোগ্য’, ‘জন্মদিনে’ তাঁর প্রধানতম সৃষ্টি। অষ্টাদশ অক্ষর অমিত্রছন্দে বিন্যস্ত ক্ষুদ্র কাব্য ‘প্রান্তিক’ এ অপার রহস্যময়তার প্রতি কবির অভিযাত্রা এবং যুদ্ধবিরোধী কবির অপরূপ বৈরাগ্যের ছবি ধরা পড়েছে। ‘সেঁজুতি’ কাব্যগ্রন্থে সংস্কারমুক্তির কথায়, ‘আকাশ প্রদীপে’ কৈশোর স্মৃতির রোমন্থনে, ‘নবজাতক’-এ আত্মঘাতী সভ্যতার বীভৎসতার প্রতি ধিক্কারে কবি মুখর। তাঁর জীবিতকালে প্রকাশিত শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘জন্মদিনে’, কবি জীবনের সার্থকতাকে কৃতজ্ঞচিত্তে পরমশ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন।

জীবনকালের শেষ দশ/বারো বছরের সময়কালে বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে নতুন পর্যায়ের রেখাপাত হতে শুরু করে। এই রেখাপাত অবশ্য অবিমিশ্র ছিল না। এর কারণ রবীন্দ্রনাথের উজ্জ্বল উপস্থিতির ফলে এবং ‘….গুরুদেবের কাব্যকলা মারাত্মক রূপে প্রতারক, সেই মোহিনী মায়ার প্রকৃতি না-বুঝে শুধু বাঁশি শুনে ঘর ছাড়লে ডুবতে হবে চোরাবালিতে’ —কিছুটা এর ফলেও ‘অনিবার্য ছিল রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ এবং অসম্ভব ছিল রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ’। ফলত করুণানিধান, কিরণধন, যতীন্দ্রমোহনের মতো অনেক কবি বহু সুপাঠ্য ও উপভোগ্য কবিতা লিখেও বিস্মৃত হয়ে গেলেন, ঢাকা পড়ে গেলেন রবীন্দ্র বলয়ে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ থেকে ভিন্নতর হওয়ার একটা চেষ্টা শুরু হলো। নিজের কথাটা নিজের মতো ক’রে বলবো—এই ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে উঠেছিল সেদিন, আর তার জন্যই তখনকার মতো রবীন্দ্রনাথকে দূরে রাখতে হলো'(বুদ্ধদেব বসু)। নতুন কবিদের সমস্যাটাই ছিল সাবালকত্ব অর্জনের সমস্যা, নিজের নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি করে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ। ফলে রবীন্দ্রনাথ থেকে সরে আসার লড়াইটা শুরু হয়েছিল হয়তো এভাবেই, পাশাপাশি সমিধ জুগিয়েছিল তখনকার সামাজিক অবস্থা আর অন্যভাষার সাহিত্যিক দর্শন ও নিদর্শন।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত ও নজরুল ইসলামের হাতে শুরু হয়েছিল এই রবীন্দ্রবলয় অতিক্রমের প্রয়াস। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রথম দিকের তিনটি কাব্যগ্রন্থ ‘সবিতা’, ‘সন্ধিক্ষণ’, ‘হোমশিখা’র পর ‘ফুলের ফসল’, ‘কুহু ও কেকা’ আর ‘তুলির লিখন’ —এ এসে সত্যেন্দ্রনাথকে স্বকীয় ও বিশিষ্ট রীতিতে পাওয়া যায়; ধ্বনিচিত্রের একাত্মতা, স্নিগ্ধ মাধুর্যের স্বাদ, রূপরঙের সঙ্গে ছন্দের নিপুণ ব্যবহার আর বিচিত্র শব্দপ্রয়োগে যে কাব্যিক জগৎ তিনি নির্মাণ করলেন, তা একেবারেই অ-রাবীন্দ্রিক। যতীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে নিজস্ব ভাষায় রচনা করেছিলেন তাঁর কাব্যিক ভুবন। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার এই কবি জীবনকে মূলত নিরাশাবাদী বস্তুমূলক নিরাসক্ত বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখেছেন। তাঁর এই দেখাকেই বাকসংযমের মধ্যে, আত্মসচেতনতার আতিশয্যে, তীব্র কৌতুকে এমনভাবে রূপায়িত করেন, মনে হয় তিনি সদর্থেই পরবর্তী প্রেমেন্দ্র মিত্র-সমর সেন-সুভাষ মুখোপাধ্যায়-বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পূর্বসূরি।

প্রিয়ব্রত পাত্র
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png