আর্নেস্ট হেমিংওয়ে : উত্তাল সমুদ্রের নিঃসঙ্গ যাত্রী

ernest hemingway

ঘুম থেকে উঠেই আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মেজাজটা বেশ খিঁচড়ে গেল। খবরের পাতায় বড় করে লেখা তাঁর হাতের জাদু নাকি শেষ হয়ে গেছে৷ আসলেই কি তাই? 

চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলেন তিনি। চিন্তা করে দেখলেন, তাঁর শেষ বেস্টসেলিং বই ‘ফর হুম দ্যা বেল টোলস’ বেড়িয়েছিল বছর দশেক আগে। আর শেষ দুটো বই তো সমালোচকদের কাছে এক্কেবারে যাচ্ছেতাই ঠেকেছে। মাথায় নতুন কোনো গল্পও আসছে না, যা নিয়ে লেখা যাবে। ঘরের ভেতর পায়চারি করতে করতেই ঠিক করলেন, “নাহ, এবার দারুণ কিছু একটা লিখে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে হবে!” 

প্রায় ১৬ বছর আগে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে একটা লেখা লিখেছিলেন। সেই লেখাটা ছিল একজন বৃদ্ধ জেলেকে নিয়ে যে মাছ ধরার জন্য হাঙরের সাথে লড়াই করেছিল।

হেমিংওয়ে

মাছের রক্তের গন্ধে মত্ত হয়ে গিয়েছিল হাঙরেরা। যদিও ডাঙায় আসার পরে মাছের দেহাবশেষ খুব একটা ছিল না। এই কাহিনির উপর ভিত্তি করেই তিনি ‘দ্যা ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্যা সি’ লিখতে চেয়েছিলেন। তবে মাঝে ‘ফর হুম দ্যা বেল টোলস’ এর লেখা শুরু করার জন্য মনোযোগ অন্যদিকে সরে যায়। তাই ঠিক করলেন সেই পুরোনো প্লট নিয়েই লেখা আগাবেন। 

যেভাবে লিখলেন ‘দ্যা ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’

হেমিংওয়ে তাঁর ‘দ্যা ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্যা সি’ বইয়ের মূল চরিত্র, সান্তিয়াগোকে তৈরি করেছিলেন তাঁর মাছধরার বন্ধু জর্জিও ফুয়েন্তেসের কথা মাথায় রেখে৷ তার মতই সাহসী জেলে, কৃশবর্ণের ও চিকন, নীল চোখের অধিকারী। তিনি ছিলেন হেমিংওয়ের নৌকার ক্যাপ্টেন। এমনকি উপন্যাসিকাটা লেখার সময়েও তারা একে-অপরের সাথে এটা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন৷ 

হেমিংওয়ে ছোট থেকেই ছিলেন বেশ দস্যি প্রকৃতির। প্রকৃতির বাধাগুলোর মুখোমুখি হয়ে তা থেকে তাঁর বেড়িয়ে আসার কলা-কৌশল দেখিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে তাঁর ভালো লাগতো। 

হেমিংওয়ে 

তাঁর অধিকাংশ গল্পই নিজ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে  আক্ষরিক বা রূপকার্থে লেখা। সাহিত্য সমালোচক ফিলিপ ইয়ং বলেছেন, “হেমিংওয়ের অনেকগুলো গল্পই নিজের জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার আক্ষরিক অনুবাদ। আর ‘দ্যা ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি’ উপন্যাসিকাটিও এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। যখন আপনি সেই কাহিনী জীবনীগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করবেন, তখন বুঝতে পারবেন যে এটি তিনি তাঁর ক্যারিয়ারের রূপক হিসেবে ব্যাখা করেছেন।”

কিন্তু এই দস্যিপনাও তাঁকে তাঁর একাকীত্বের বেদনা থেকে মুক্তি দেয়নি। তাঁর এবং সান্তিয়াগোর মধ্যেও একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতার স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। 

এক একাকী যোদ্ধার গল্প

বলা যায়, একজন লেখক হিসাবে হেমিংওয়ের সংগ্রাম মৎস্যজীবীদের মতোই। হেমিংওয়ে যেমন দীর্ঘ দশ বছর পাঠকদের ভালো কিছু উপহার দিতে পারেননি, তেমনি সান্তিয়াগোও ৮৪ দিন ধরে কোনো মাছ ধরতে পারছে না। সমালোচকদের ছুরির ফলার মতন কলম যেমন হেমিংওয়েকে বিদ্ধ করতো, অন্যান্য জেলেরাও সান্তিয়াগোর পরাজয় নিয়ে ঠাট্টা করতো। 

সমুদ্রের হাঙরগুলোকে তিনি তাঁর সমালোচকদের প্রতীক হিসেবে ধরেছেন, যারা তাঁকে কুড়ে কুড়ে খেতে চায়। হেমিংওয়ে যেমন টের পেয়েছিলেন যে তাঁকে ভালো কিছু লিখে সবাইকে প্রমাণ করে দিতে হবে যে তিনি এখনো লিখতে পারেন, তেমনি সান্তিয়াগোও অনুভব করেছিল নিজেকে আবার প্রমাণ করতে হবে। তাদের দুজনের কাছেই প্রতিটি সময় নতুন এবং আগের কথা চিন্তা করে সময় নষ্ট করার আগ্রহ নেই। নিজের খ্যাতি বাঁচাতে সান্তিয়াগোকে দুর্দান্ত একটা মাছ ধরতে হয়েছিল, আর হেমিংওয়েকে লিখতে হয়েছিল একটি দুর্দান্ত উপন্যাস।

তবে হেমিংওয়ে ভেবেছিলেন এই বইয়ের জন্য হয়তোবা তাঁকে সমালোচিত হতে হবে। তবুও তিনি তাঁর লেখা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর কাছে লেখালিখি ছিল গণিতের মতন। তিনি যেন পাটিগণিত, জ্যামিতি আর বীজগণিত শেষে ক্যালকুলাসে এসে পৌঁঁছেছেন। এখন সমালোচকরা যদি তাঁর লেখা বুঝতে না পারেন, এতে তাঁর কোনো দোষ নেই।

সান্তিয়াগোর বৈশিষ্ট্য এবং বাহ্যিক সংঘাতের মধ্যে হেমিংওয়ের একাকীত্ব স্পষ্ট। সেই সাথে, তিনি এই উপন্যাসিকায় নারীদের একটি নেতিবাচক উপায়ে চিত্রিত হয়েছেন, যা তাঁর মা-সহ সব নারীদের সাথে ব্যর্থ সম্পর্কের ফল।

হেমিংওয়ের জীবনে নারীর প্রভাব

সান্তিয়াগো যখন উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে নৌকা চালানোর চেষ্টা করে, তখন ঢেউ তাকে অন্যদিকে সরিয়ে দেয়। তখন তার মনে হয় সমুদ্র যেন একজন নারীই, যে তাকে তার উদ্দেশ্য সফল করতে দেয় না। আবার চাঁদও তাকে সহায়তা না করলে সে মনে করছে চাঁদ কোনো নারীরই প্রতিচ্ছবি, যে তার ক্ষতি করতে চায়।  

হেমিংওয়ের একাকীত্বের কারণ ছিল বারবার বৈবাহিক জীবনে ব্যর্থ হওয়া এবং আদ্রিয়ানা ইভানিচ নামের এক নারীর থেকে প্রেমে প্রত্যাখিত হওয়া। ফলে তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ এবং বিষণ্ণ। আদ্রিয়ানার সাথে সম্পর্ক গড়ার আগ্রহ প্রকাশের আগে তাঁর সহধর্মিণীর সংখ্যা ছিল চারটি, এবং কারো সাথেই তিনি সুখী হতে পারেননি৷ এই নেতিবাচক অভিজ্ঞতাগুলোই তাঁকে নেতিবাচক উপায়ে নারীদের চিত্রিত করতে প্রভাবিত করেছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মহিলাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অভাব রয়েছে এবং তারা প্রতারণাকারী। তিনি এটাও অনুভব করেছিলেন যে আদ্রিয়ানা, তাঁর স্ত্রী বা অন্য নারীরাই কখনো তাঁর মহত্বকে স্বীকৃতি দেয়নি। ‘দ্যা ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্যা সি’ এই কারণেই হেমিংওয়ের জীবনের অভিজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

১৯৪৮ সালে হেমিংওয়ে আদ্রিয়ানা ইভানসিচ নামের এক উনিশ বছর বয়সী ইতালিয়ান মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬ বছর চিঠি আদান-প্রদান চলে এবং সেই সময়ে হেমিংওয়ে তাঁর প্রতি নিজের ভালবাসা এবং একাকীত্ব প্রকাশ করেছিলেন। আদ্রিয়ানা অবশ্য হেমিংওয়ের প্রেমে পড়েননি, তিনি কেবল তাঁকে বন্ধু হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন।

হেমিংওয়ের মহিলাদের ঘৃণা এই গল্পে স্পষ্ট। এটি কেবল তাঁর ব্যর্থ বিবাহ এবং আদ্রিয়ানার প্রত্যাখ্যানের ফল নয়, এটি তাঁর মা গ্রেসের সাথে তাঁর সম্পর্কের ফলাফলও। এর কারণ হলো বাল্যকালে বেশ কয়েক বছর আর্নেস্ট হেমিংওয়ে ও তাঁর বড় বোন মার্সেলিন হেমিংওয়ে স্যানফোর্ডকে যমজ সন্তান হিসেবে বড় করে তোলা হয়। তাঁদের ছোট থেকেই একই জামা পরিয়ে জমজ মেয়েশিশুদের মতন থাকতে বাধ্য করেন তাঁদের মা। হেমিংওয়ে তাঁর বাবা ক্লারেন্স এডমন্ডস হেমিংওয়ের আত্মহত্যার জন্যও তাঁর মাকে দোষারোপ করতেন। 

সান্তিয়াগো বিশ্বাস করতো পুরুষদের আত্ম-নিয়ন্ত্রণের প্রাচুর্য রয়েছে, যা মহিলাদের নেই। হেমিংওয়ের মতে একজন পুরুষ মানুষই কেবল সম্মান ও মর্যাদার যোগ্য, যা নারীদের চুড়ান্ত অবমাননা। 

হেমিংওয়ে

অবশ্য এই দাম্ভিকতাও তাঁকে খুব বেশিদিন স্বস্তি দেয়নি। নোবেল ও পুলিৎজার পুরষ্কার বিজয়ী আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, যিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও স্প্যানিশ সিভিল ওয়ারে অংশ নিলেও জীবন যুদ্ধে আর জয়ী হতে পারলেন না। ১৯৬১ সালের দোসরা জুলাই নিজের দোনলা বন্দুকটা মাথায় ঠেকিয়ে তাঁর বাবা ক্লারেন্স হেমিংওয়ে, ভাই লিস্টার হেমিংওয়ে আর বোন উরসালা হেমিংওয়ের মতন আত্মহনন করলেন।

হেমিংওয়ের বইসমূহ দেখতে ক্লিক করুন 

 

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading