পোস্টম্যানের পোস্টমর্টেম: গল্পগুলো বাড়ি গেছে

Postman er Postmortem
  • প্রিয় কেক শেক আপু ওরফে মাহরীন,
    আচ্ছা, আমরা যে একে অপরকে কেক-শেক আপু-ভাইয়া বলি এর শানে নজুলটা কি অন্যরা জানে? আজ যেহেতু তোমার সাম্প্রতিক গল্পের বই নিয়ে লিখবো বলে বসেছি, সেই সুন্দর গল্পটাও বলে ফেলা যাক কী বলো? জানো তো, গল্পরাই শুধু বেঁচে থাকে এই পৃথিবীতে, আমরা চলে যাই যদিও দূরে।
    সেটা ২০০৯/১০ সাল। চতুর্মাত্রিকে আমার জন্মদিনে ভেবু পোস্ট দিয়েছিলো। সেসময় ছোট্ট তুমি খুব চাঞ্চল্যে কিছু ইমোখচিত শুভেচ্ছা জানিয়ে দিলে। চতুর্মাত্রিকের সেই বিখ্যাত ইমোগুলো! মজার ছিলো না? সেসময় আমি অত্যন্ত দুর্বল গতির সিটিসেল জুম মডেম ব্যবহার করতাম। তোমার অজস্র ইমোসমৃদ্ধ কমেন্টটা লোড হতে সময় নিচ্ছিলো। তখন আমি ইমোগুলো না দেখে শুধু কোডগুলো দেখতে পাচ্ছিলাম। তোমার কেক এবং কোকময় শুভেচ্ছা বার্তাটি টেক্সটরূপে এভাবে দেখতে পেয়েছিলাম- বাড্ডে বাড্ডে কেকশেক কেকশেক, বাড্ডেবাড্ডে কেকশেক কেকশেক, বাড্ডেবাড্ডে কেকশেক কেকশেক! আজ তোমার গল্পের বই নিয়ে এই লেখাটি লিখতে গিয়ে চতুরে ঢু মারতে ইচ্ছে হলো। গিয়ে কি দেখি জানো? চতুর্মাত্রিকের বাতি নিভে যাচ্ছে। হ্যাঁ প্রিয় কেক-শেক আপু, আমাদের চতুর্মাত্রিক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই দীর্ঘ জার্নি নিয়ে একদিন তুমি আর আমি বড় করে কিছু লিখবো নিশ্চয়ই? আমরা জানি তো গল্পরাই কেবল বেঁচে থাকে।
    তোমার এবারের বইয়ের সূচিপত্রটা বেশ মজার হয়েছে! ১০টা গল্পকে ৩ ভাগে ভাগ করেছো প্রথম প্রহর, দ্বিতীয় প্রহর এবং তৃতীয় প্রহর নামে। প্রতিটিতে আছে যথাক্রমে ৩, ৪ এবং ৩টি গল্প। আমি জানি না ঠিক কোন ভাবনা থেকে এ ধরণের শ্রেণীকরণ করেছো। আমি ভেবেছিলাম প্রতিটি প্রহরের আলাদা চরিত্র থাকবে বুঝি। তা অবশ্য ঠিক মেলাতে পারি নি। মনে হয়েছে টাইমলাইন অনুযায়ী ভাগ করা। তাই কি? বলে দাও তো!
    মাহরীন ফেরদৌস এর লেখা বই ‘গল্পগুলো বাড়ি গেছে’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে বইমেলা ২০১৮ সালে
    প্রথম প্রহর আমার কাছে মনে হয়েছে বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। কেন জানো? কারণ এই গল্পগুলোর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ‘গল্প’ আছে। আমি অনেকবারই একটি কথা বলে এসেছি (যা মূলত আহমেদ মোস্তফা কামাল স্যারের উপদেশ হতে প্রাপ্ত) আমাদের গল্পের ধারা দুরকম। অনুভূতিনির্ভর আর আখ্যান নির্ভর। আখ্যান নির্ভর গল্প লেখা আমার কাছে খুব কঠিন মনে হয়। কারণ এত এত গল্প লেখা হয়েছে, যে একদম নতুন গল্প তৈরি করা মুশকিল। তাই আমি এবং আমরা মূলত যা করি, তা হলো পুরোনো গল্পকে নানারকম মেটাফর, আর বিমূর্ত অনুভূতি দিয়ে তৈরি করি। আখ্যান নির্ভর গল্পগুলোই সাধারণত ক্লাসিকের মর্যাদা পায়, পাঠক মনে রাখে। তোমার প্রথম প্রহরের দুটি গল্প- বোকামানুষি আর ত্রিভূজের চতুষ্কোণ আমার মনে থাকবে। এই দুটি খুবই শক্তিশালী গল্প, আছে শক্তিশালী টুইস্ট আর শক। তবে সেজন্যেই হয়তো গলতির দিকটাও বেশি করে চোখে পড়ছে!
    যেমন ধরো ত্রিভূজের চতুষ্কোণ গল্পটি, এখানে মূল চরিত্রের সাথে এরিকা এবং তার বাবা হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো এবং শ্বেতাঙ্গ নারী এরিকা অলমোস্ট লস্ট বাঙালি তরুণটির সাথে কী মনে করে প্রেম করা শুরু করলো বিষয়টি আমার কাছে মোটেও স্পষ্ট নয়। কিন্তু এটি বাদে বাদবাকি গল্পটা খুবই জম্পেশ। সম্ভবত তোমার সবচেয়ে বড় গল্প, তাই না? জানো, আগে রহস্যপত্রিকায় এমন গল্প পড়ে রোমাঞ্চিত হতাম প্রায়ই। এই গল্পের ট্রাজেডিটা একদম আমার বুক বিদীর্ণ করে দিয়েছে। করেছোটা কি তুমি বলো তো! আর এত ভায়োলেন্স! বেশ চমকে গেছিলাম কিন্তু।
    প্রথম গল্প বোকামানুষিতে আমার পছন্দের বিষয় নিয়ে কাজ করেছো। মনস্তাত্বিক টানাপোড়েন। আমাদের অন্তর এমন কত বোঝা টেনে ক্লান্ত তাই না? সে পরিশুদ্ধ হবে কীভাবে বলো তো? এই গল্পটা প্রথমদিকে খুবই প্লেইন আর প্রেডিক্টেবল মনে হচ্ছিলো। আচমকা মোচড়ে হতভম্ব হয়েছি তো বটেই! তবে তুমি যে অতিপ্রাকৃত একটা আবহ নির্মাণের মাধ্যমে একটা ট্রাঞ্জিশন আনতে চেয়েছিলে, সেটা আরেকটু দীর্ঘ হলে ভালো হতো। আরেকটু গা ছমছমে করা যেতো। আর গল্পের শেষে কেন মূল চরিত্রটির ভুনা মাংসের জন্যেই কেবল আক্ষেপ হবে বলো! অন্য কোনো এলিমেন্ট বা মেটাফর এলে বিপন্নবোধ আরো প্রবল হতে পারতো।
    দ্বিতীয় প্রহরের “তাহের ফিরে এসেছিল” গল্পটায় বেশ চমৎকার এক্সপেরিমেন্ট করেছো! মাঝখানে তোমার একটি স্ট্যাটাসে দেখেছিলাম লেখালেখি থেকে বিরতির সময়টাতে তোমার প্রচুর পড়াশোনায় নিজেকে ঋদ্ধ করার/হওয়ার ছাপ।

এই গল্পটাতে তার প্রতিফলন দেখতে পেলাম। বর্ণনায়, আঙ্গিকে সবদিক দিয়েই অন্যরকম। কেউ যদি মনে করে এটা স্রেফ একটা ভুতুড়ে গপ্প, ভুল করবে। এই গল্পের ফিলোসফিটা কিন্তু দারুণ! বারে বারে হারিয়ে যায়, মরে যায়, থেতলে যায় আবার ফিরে আসে, বিয়ে করে এমন একটা চরিত্র কি আমাদের অন্তর্গত বিপন্নতা আর ভাঙনের কায়া রূপ? আরেকটু ভাংলেই পারতে! না থাক, এই ঠিক আছে! তবে এই বইয়ের যে গল্পটা আমাকে একদমই টানে নি, সেটা হলো “শেষ প্রিয়মুখ”। নামটাও যেমন সেকেলে, গল্পটাও মেলোড্রামাটিক। পুরোনো দিনের প্যাকেজ নাটকের মত। এই বইয়ের সাথে একদমই বেমানান!
তবে এই বইয়ের সবচেয়ে ভালো গল্প আমার কাছে কোনটা মনে হয়েছে জানলে হয়তো অবাক হবে। “পালট” গল্পটা আমার কাছে বুননের দিক দিয়ে সবচেয়ে আঁটোসাঁটো মনে হয়েছে।
“ফিরে যাওয়ার চেয়ে চলে যাওয়া বুঝি সহজ”, তাই না? ছোট্ট কিন্তু শক্তিশালী একটি গল্প। তৃতীয় প্রহরের “হিজলবনে জোনাকি” আগেই পড়া ছিলো। এই গল্প নিয়ে ভালোলাগার অনুভূতি আগেই জানিয়েছি।
তবে তোমার সবচেয়ে সফল গল্প বলবো “মুনিয়া ও একজন ভালোমানুষ”কে। কেন জানো? তোমাকে এর আগে কখনও এত বিস্তারিত ভাবে অসুন্দর প্রকাশ করতে দেখি নি। রীতিমত অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে আমার ভেতর। বিশেষ করে মুনিয়া যখন ফোনে শরীর হাতড়াতে প্রমত্ত এবং প্রকান্ড হয়ে ওঠা হবু স্বামীর নির্দেশনা অনুযায়ী কলের পুতুলের মত দেহমন্ত্র উচ্চারণ ভুলে থাকতে দশ থেকে এক গুণতে থাকে, এবং সেই সময় প্রতিটি গণনার সাথে অতীতের ফ্ল্যাশব্যাক- আমার অনেকদিন মনে থাকবে। আমি অনেককেই পড়তে বলবো।
তবে একটু অনুযোগ আছে। তুমি দেহক্ষুধায় মত্ত লোকটির ভালোমানুষীকে তার তরফ থেকে বারবার প্রকাশিত করতে দিয়ে ব্যাপারটা কিছুটা ক্লিশে করে ফেলেছো, কিংবা যেভাবে তাকে বলিয়েছো তা খুব একটু বাস্তবসম্মত লাগে নি।
তোমার লেখা একটি উপন্যাস আগে পড়েছিলাম। “কিছু বিষাদ হোক পাখি”। সেটা পড়ে তোমাকে ছোট্ট করে মন্তব্য জানিয়েছিলাম। আর এই গল্পগ্রন্থটি পড়ে একটু বড় করে লিখতে ইচ্ছে করলো। আমি জানি সামনের দিনগুলোতে আরো অনেক বড় করে লিখতে ইচ্ছে করবে।
ভালো থেকো আকাশের সব থেকে উচ্ছল পাখিটির মত
ইতি
পোষ্টম্যান


পোস্টম্যানের পোষ্টমর্টেম- লিখেছেন হাসান মাহবুব, একজন লেট ব্লুমার! জন্ম ১৯৮১ সালে হলেও লিখতে শুরু করেন ১৯৯৮ সাল থেকে। প্রথমে পদ্য লিখতেন, পরে ঝুঁকলেন গদ্যের দিকে। মাঝখানে দু বছর লেখেন নি। তবে ব্লগে আসার পর থেকে লিখেই চলেছেন। প্রকাশিত বই- প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত (২০১২), আনন্দভ্রম (২০১৬), নরকের রাজপুত্র (২০১৭) এবং মন্মথের মেলানকোলিয়া (২০১৮)। প্রথম তিনটি গল্পগ্রন্থ, শেষেরটি উপন্যাস। তাঁর সবগুলো বই দেখুন রকমারি ডট কম-এ

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading