বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ (পর্ব-১)

বাঙ্গলি সমাজ ও সাহিত্য

বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর চেতনার মূল প্রবণতা অসাম্প্রদায়িকতা। এর পেছনে রয়েছে বহু যুগের ইতিহাসের উত্থান-পতন ও ভাবাদর্শগত বিবর্তন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সুপ্রাচীনকাল থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত নরগোষ্ঠী এই ভূখণ্ডে এসে বসতি স্থাপন করেছে এবং কালক্রমে এই ভূখণ্ডের প্রাচীন অধিবাসীদের সঙ্গে সংমিশ্রিত হয়ে এক অনন্য সমন্বয়ধর্মী সভ্যতার সৃষ্টি করেছে। তারপরই ঘটেছে বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার উন্মেষ।

অর্থাৎ আবহমানকাল থেকে এ অঞ্চলের জনজীবনে যে ধারাটি প্রাধান্য পেয়েছে, সেটি সংঘাতের নয়, উদারতার। এই উদারতা লক্ষ্য করা যায়, এখানকার মানুষের ধর্ম, সমাজচিন্তা এবং সামগ্রিক জীবনবোধের মধ্যে। মূলত বাঙালি জাতি এক সুমহান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী। সে ঐতিহ্য সমন্বয়ের, সে ঐতিহ্য মানবতা ও অকসামপ্রদায়িকতার। এই ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করেই যুগে যুগে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা সামপ্রদায়িক ভাবধারার বিপরীতে গড়ে উঠেছে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি সমাজ ও সাহিত্যে।

বাঙালির শেকড় সন্ধান করলে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক দ্বাদশ শতকে বহিরাগত আর্যরা যখন এই উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল আক্রমণ করে, তখন এই অঞ্চলে এক উন্নত নগরসভ্যতা বিরাজ করছিল। আর্যরা এই সভ্যতার অনেক কিছু ধ্বংস করলেও তারা এখানকার দেশজ সংস্কৃতির অনেক উপাদান আত্মস্থ করে হিন্দু ও বৌদ্ধ সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করে। আর্য জাতি ছাড়াও এদেশে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষ এসে তাদের ধর্ম ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রলেপন ঘটিয়েছে, তবে এখানকার মূল জনগোষ্ঠীর ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতির স্বকীয়তা সম্পূর্ণ বিনষ্ট করতে পারেনি। এর মূলে ছিল সুদূর আধ্যাত্মিক আদর্শ। উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের বিশ্লেষণ থেকে জানা যায় :

পারশীক, গ্রীক, পহলব, শক, কুষাণ, হুন, তুর্কী, আফগান, মোগল, ইংরেজ ক্রমান্বয়ে ভারতের উপর আধিপত্য বিস্তার করিয়াছে বটে, কিন্তু কেহই ইহার বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সভ্যতা ও সংস্কৃতি ধ্বংস করিতে সক্ষম হয় নাই। ইহার প্রধান কারণ ভারতের সুদূর আধ্যাত্মিক আদর্শ। এই আধ্যাত্মিক আদর্শ বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যই ভারতের জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করিয়াছে এবং বহু-বিচিত্র বাহ্য রূপের মধ্যেও ঐক্যের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছে।

sindhu juddho
মুহম্মদ বিন কাশিমের নেতৃত্বে সিন্ধু যুদ্ধের অঙ্কিত চিত্র

আর্যদের পর ভারতবর্ষের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন সাধিত হয় মুসলমানদের আগমনের পর। মুসলমানদের সংস্কৃতির সাথে এ অঞ্চলের মানুষের সম্পর্ক স্থাপিত হয় আরবদের সিন্ধু বিজয়ের পর, আনুমানিক ৭১১ খ্রিস্টাব্দে এবং পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে তুর্কি, আফগান, মোগলদের আগমনের ফলে। এখানকার দেশজ সংস্কৃতি ইসলামি সংস্কৃতির প্রভাবে বহুগুণে সমৃদ্ধ হয়। বস্তুত,

‘বহিরাগত আক্রমণের ফলে যে বিরোধ ও সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল, কালক্রমে তার পরিণতি হয় মিলন, সমঝোতা ও সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে।’

এরপর ইউরোপীয় তথা পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজদের আগমনের ফলে বাঙালিরা এক নতুন আধুনিক সভ্যতার সংস্পর্শে আসে, যার ফলে বাঙালির সংস্কৃতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে। এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধারার সমন্বয় ঘটেছে। মোগল আমলের শিল্পে ও স্থাপত্যে পারসিক শিল্পশৈলী এবং বাঙালির দেশজ ঐতিহ্যর ব্যাপক সংমিশ্রণ লক্ষ করা যায়। এই সমন্বয়ের বিষয়টি বাঙালির সংগীতের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। বাঙালির সংগীত ও নৃত্যকলা সমন্বয়ধর্মী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এসব শিল্পমাধ্যম সুদূর প্রাচীনকাল থেকে প্রচলিত ছিল। প্রাচীনকালে সংগীত ও নৃত্য কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অংশ ছিল। মুসলমানরা এসে এর চরিত্র বদলে দেয়। বেশিরভাগ মুসলিম শাসক সংগীত ও নৃত্যের চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। এই সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতা যে কেবল শাসকরাই করতেন তা নয়, হিন্দু-মুসলিম মরমি সাধকেরাও সংগীতের আশ্রয় গ্রহণ করে আধ্যাত্মিক উচ্ছাসকে প্রকাশের বাহন হিসেবে। তারা মনে করতেন যে, সংগীতের মূর্ছনায় ভাবাবেগ সৃষ্টি হয় এবং তার ফলে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করা যায়। সংস্কৃতির এই বাইরের উপাদান ছাড়াও বাঙালির চিন্তার ক্ষেত্র ও জীবনে পরমত সহিষ্ণুতা, বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থান এবং  সমন্বয়ের ঐতিহ্য বিরাজমান।

আরব ও ইরানের বণিকদের আগমনের বিষয়টিকে সেকালের হিন্দু রাজারা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছিলেন। হিন্দু শাসকেরা মনে করতেন যে, ‘বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের ফলে তাদের রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধি পাবে।’ এজন্য হিন্দু রাজারা সেকালে মুসলমান বণিকদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করতেন। তারা মুসলমানদের বসতিসমূহে মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দিয়েছিলেন, যাতে মুসলমানেরা বিনা বাধায় নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে পারে।

kashem
মুহম্মদ বিন কাশিম

আরবীয় মুসলমান বণিকদের অনেকেই বাঙালি হিন্দু রমণীকে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস আরম্ভ করে। অনেক নিম্নবর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণ্য অনুশাসনে পিষ্ট হয়ে ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধে আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। ধর্মান্তরিত হলেও সেসব নারী নিজস্ব দেশজ সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিতে পারে নি। মুসলিম বণিকরা ছাড়াও অনেক মুসলিম সুফি, দরবেশ, পীর, আউলিয়া বিভিন্ন সময়ে এ অঞ্চলে শান্তিপূর্ণ ও অহিংস উপায়ে ইসলাম প্রচার করেন। জনসাধারণের কাছে ইসলাম ধর্মকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য সুফি-সাধকগণ অনেক সময় স্থানীয় হিন্দুদের আচার-অনুষ্ঠানকে বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করতেন। এভাবে তারা হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির অপূর্ব সমন্বয় সাধন করে উদার ধর্মমত প্রচার করেন :

হিন্দু-মুসলমান-সংস্কৃতির সমন্বয়ের প্রচেষ্টা দৃঢ়ভিত্তি লাভ করে ভারতে সুফীগণের আগমনের দ্বারা। মুসলমান আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই সুফী-সাধকগণ এদেশে আসিতে আরম্ভ করেন এবং ভারতের নানা প্রান্তে তাঁহারা আস্তানা গাড়িয়া তাঁহাদের উদার ধর্মমত প্রচার করিতে থাকেন।

মুহম্মদ বিন কাশিম ৭১১ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধু বিজয়ের পর এক ঘোষণার মাধ্যমে স্থানীয় হিন্দু অধিবাসীদের এই মর্মে আশ্বাস দেন যে, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের গির্জা, ইহুদিদের সিনাগগ এবং ম্যাজিয়ানদের মন্দিরের মতো স্থানীয় হিন্দু মন্দিরগুলোর পবিত্রতা রক্ষার দায়িত্ব আরব সরকার গ্রহণ করবে। আরব অভিযানের সময় যেসব মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল সেগুলো তিনি পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, হিন্দু প্রজারা মন্দিরে পূজা করার ও নিজেদের আচার-অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ পেয়েছিল। মূলত,

এই উপমহাদেশে ইসলাম বিস্তারলাভ করেছে তরবারির দ্বারা হিংসাত্মক পথে নয়; বরং, সুফি-সাধক, দরবেশ-আওলিয়াদের শান্তিপূর্ণ, অহিংস ধর্ম প্রচারের মাধ্যমে। এঁদের মধ্যে আজমিরের খাজা মঈনউদ্দিন চিশতি, দিল্লির নিজামউদ্দিন আওলিয়া এবং সিলেটের শাহ্ জালালের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। এসব মরমি সাধক সব ধর্মাবলম্বী মানুষের অপরিমিত শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

mohavarat
মহাভারত ভগবত্গীতা

প্রায় ৭০০ বছরের মুসলিম শাসনামলে অনেক শাসক হিন্দুবিদ্বেষী হলেও, বেশিরভাগ মুসলিম শাসক ছিলেন উদার ও সহনশীল। মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়মহাভারত’ ও ‘ভগবত্গীতাপ্রথমবারের মতো সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়। হিন্দুদের প্রতি মোগল সম্রাট আকবরের মহানুভবতা ও উদারনীতি সর্বজনবিদিত। সম্রাট বাবর তাঁর পুত্র হুমায়ুনের জন্য যে নির্দেশনামা রেখে গিয়েছিলেন, তা অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূল্যবান দলিল। এই দলিলের বঙ্গানুবাদ নিম্নরূপ :

হে আমার পুত্র :
বিভিন্ন ধর্মবলম্বী মানুষ ভারতবর্ষে বাস করে ; ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে রাজার রাজা এই দেশের শাসনভার তোমার হাতে ন্যস্ত করেছেন।

সুতরাং তোমার কর্তব্য হলো :

১. তোমার মনকে ধর্মীয় সংস্কার দ্বারা প্রভাবিত হতে দেবে না এবং সকল শ্রেণীর মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও ধর্মীয় আচারাদির প্রতি লক্ষ রেখে সকলের প্রতি নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিচার করবে;
২. বিশেষ করে গোহত্যা থেকে বিরত থেকো, এর ফলে ভারতের জনগণের হৃদয়ে তুমি স্থান নিতে পারবে। এর দ্বারা তোমার সঙ্গে এ দেশের মানুষ কৃতজ্ঞতার রজ্জুতে আবদ্ধ হবে;
৩. তুমি কখনো কোনো স¤প্রদায়ের উপাসনালয় ধ্বংস করবে না এবং সব সময় ন্যায়বিচারের প্রতি অনুরক্ত থাকবে, যাতে রাজার সঙ্গে প্রজাদের সুসম্পর্ক বজায় থাকে এবং এই ভূখণ্ড শান্তি ও সন্তুষ্টি বিরাজ করবে;
৪. অত্যাচারের তরবারির চেয়ে ভালোবাসা ও কর্তব্যপরায়ণতার তরবারি দিয়ে ইসলাম প্রচার অধিক সাফল্য অর্জন করবে;
৫. শিয়া ও সুন্নিদের পরস্পরের মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদ সব সময় উপেক্ষা করে চলবে, তা না হলে এগুলো ইসলামকে দুর্বল করে দেবে;
৬. তোমাদের প্রজাদের জাতিগত বৈশিষ্ট্যকে বছরের বিভিন্ন ঋতুর বৈচিত্র্যের সঙ্গে তুলনা করবে, তা হলে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকবে।

দেখুনঃ বাঙ্গালী ইতিহাস এবং ঐতিহ্য বিষয়ক সকল বই

 

*লিখেছেন-  নূহ-উল-আলম লেনিন , দেখুন,নূহ-উল-আলম লেনিনের সকল বই

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  1      1
 

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png