বাংলার নিজস্ব সেচ ব্যবস্থা

বাংলার নিজস্ব সেচ ব্যবস্থা

পেছনের গল্প
নদীর বন্দনা নতুন কোনো বিষয় না—প্রাচীন আমল থেকে চলে। যে নদী বন্যার কর্দমাক্ত পানিতে ভাসিয়ে দুই পাড়ের ভূমিতে সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি ঢেলে দেয়, সে নদীর বন্দনা করা অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার না। নদীকেন্দ্রিক সেচব্যবস্থা আর এর বন্দনায় মেতেছিলেন উইলিয়াম উইলকক্স। পৃথিবীর আদিমতম ফলিত বিজ্ঞান হচ্ছে সেচ, আর আধুনিক সেচব্যবস্থার জনক উইলিয়াম উইলকক্স। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেচ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি বক্তৃতা দেন। আর সে অভিজ্ঞতা মলাটবন্দী হয়েছে ‘বাংলার নিজস্ব সেচব্যবস্থা’ নামের বইয়ে। সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফের অনুবাদে বইটি প্রকাশ করেছে কুড়িগ্রামের প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান ডাকঘর। চারটি বক্তৃতা হচ্ছে ‘বাংলার প্লাবনসেচ ব্যবস্থা’, ‘তাত্ত্বিক বিচারে বাংলার প্রাচীন সেচব্যবস্থা’, ‘বাস্তবিক বিবেচনায় প্রাচীন বাংলায় সেচব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন’ এবং ‘আজকের দিনে প্রাচীন বাংলার সেচব্যবস্থা পুনরুদ্ধার’।

কী ছিল সেই বক্তৃতায়
প্রথম বক্তৃতায় বলা হয়েছে, ১৮ শতকে মুঘল সাম্রাজ্যের ভাঙনের আগের সময় ছিল বাংলার সেচব্যবস্থার সোনালি দিন। এরপরেই সেচব্যবস্থা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। প্রাচীন রাজাদের প্লাবন-সেচ ব্যবস্থায় জমিতে পানি আনা হতো খালের পাড় কেটে কেটে। এ ধরনের কাটার নাম—‘কানওয়া’। এর অর্থ খনন করা। লেখকের মতে, এটি নেওয়া হয়েছে আরব ও পারস্যের মধ্যবর্তী ব্যাবিলনের সেচব্যবস্থা থেকে। দ্বিতীয় বক্তৃতায় বলা হয়, নদীতে বাঁধ দেওয়া এবং নদী থেকে বন্যার পানি বেরনোর মুখ বন্ধ করে একদম কূল উপচাতে না দেওয়ার অর্থ হলো দেশকে ম্যালেরিয়ার কাছে সঁপে দেওয়া এবং মাটিকে নিঃশেষ করা। শেষ বক্তৃতায় উইলিয়াম বলেছিলেন, বাংলার প্রাচীন সেচ ব্যবস্থাই কেবল পারে সেই সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে। প্রকৌশলীদের ভুল নদীশাসনে গঙ্গা নদী ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত। তারা গঙ্গার কোনো উপকার করেননি বরং গঙ্গা নিজেই নিজেকে রক্ষা করেছে। লেখক বলছেন, ‘একে মনে করুন সেই নৈসর্গিক সংকেত যা আপনাদের আহ্বান করছে উদ্যোগী হতে।’ সে আহ্বানে সাড়া দেওয়ার সময় এসেছে। নদীর প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষায় উদ্যোগী হতে হবে নিজেদেরই।

বাংলার নিজস্ব সেচ ব্যবস্থা
বাংলার নিজস্ব সেচ ব্যবস্থা

BUY NOW

‘বাংলার নিজস্ব সেচব্যবস্থা’ থেকে নেওয়া তিনটি উদ্ধৃতি

১. “যাহোক, কীভাবে প্রায় তিন হাজার বছর আগে প্রাচীন বাংলার শাসকেরা প্লাবন-সেচ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, তা আজ আমি আপনাদের দেখাবার সুযোগ পেয়েছি। আপনারা সুযোগ দিলে এও দেখাব যে, কীভাবে গঙ্গা ও দামোদর নদীর বদ্বীপে সেই পদ্ধতি আবার চালু করলে মধ্য ও পশ্চিমবঙ্গ একসময়ে যে সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য উপভোগ করতো, তা আবার ফিরে আসতে পারে। এতে করে মধ্যাঞ্চলের সমভূমির ওপর দিয়ে পূর্ববঙ্গের সম্পদই কেবল পরিবাহিত হয়ে আসবে না, আবার তারা তাদের রাজধানীতে সম্পদের জোগানও দিতে পারবে।

গাঙ্গেয় বদ্বীপ মিশরের মত অনাবৃষ্টির দেশ নয়, কিংবা নয় ব্যাবিলনের মতো ঊষর ও তৃষিত অঞ্চল। এখানে ৫০ থেকে ৬০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হলেই সবক’টি নদীতে বন্যা আসে। (এ অবস্থায়) গঙ্গা ও দামোদরের বন্যার পলি সমৃদ্ধ পানি ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের বিপুল পানির পূর্ণ ব্যবহারের দরকার ছিল। বাংলার আদিযুগের কতিপয় রাজা তখন প্লাবন-সেচ পদ্ধতির উদ্ভাবন ও প্রচলন ঘটায়। এটাই শত শত বছরের জন্য বাংলার সম্পদ ও সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা এনে দিয়েছিল। অববাহিকা-সেচ যেমন মিশরের জন্য, স্থায়ী-সেচ যেমন ব্যাবিলনের জন্য একদম মোক্ষম ছিল; তেমনি বাংলার জন্য উপযুক্ত ছিল এই প্লাবনসেচ ব্যবস্থা।”

২. “সেচের সময়ে কাজ-কারবার হতো এরকম: খাল কাটার পর প্রকৌশলীরা পানির দায়িত্ব তুলে দিত আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর ওপর। আঞ্চলিক সংস্থাগুলো কাজ করতো কৃষকদের মাধ্যমে, এবং তাদের দায়িত্ব ছিল পানি যাতে সব জমিতে পৌঁছে সেটা নিশ্চিত করা। যে পথে পানি সবচেয়ে কম বাধা পায় সে পথেই গড়ায়। ফলে তা কোনো জমিকে সিক্ত করতো আবার কোনো জমিতে পৌঁছাতোই না। এরকম ধারায় চলে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব ছিল না, কারণ মশককূলও পানির সঙ্গে সঙ্গে বিচরণ করে। এভাবে জমিও সমৃদ্ধ হতো না। কিন্তু সঠিকভাবে চালু প্লাবন-সেচ ব্যবস্থায় দুটো কাজই হতো। তারা এ পদ্ধতিতে চাহিদার থেকে বেশি হারে নদীর পানি পেতো, কিন্তু প্রত্যেকের জমিতে পানি যাবার ব্যবস্থা করার দায়িত্বও তাদের ছিল।

জমি থেকে জমিতে এই পানি যাওয়ার বন্দোবস্ত এমন আন্তরিকতার সঙ্গে করা হতো এবং প্রত্যেকেই তাতে এমনভাবে জড়িয়ে যেত, যেন প্রতিবেশীর জমিটাও নিজেরই জমি (কেননা প্রতিবেশীর স্বার্থ থেকে নিজের স্বার্থ কেউ আলাদা করতে পারতো না)। যেকোনও বিদ্যালয়ের চাইতেও চরিত্র বিকাশের উন্নত এক ক্ষেত্র ছিল এটা। আপনাদের প্রাচীন সেচব্যবস্থার ইতিহাসে আগ্রহী করে তোলার উদ্দেশ্যে আমি এই ঘটনা তুলে ধরছি, যাতে এখনও একে বাস্তবায়িত করা যায়। ঐতিহ্যিকভাবে পরষ্পরের প্রতি ভালবাসার যে প্রবণতা আপনারা আপনারা অর্জন করেছেন, তা আকাশ থেকে পড়েনি; এটা এসেছে আপনাদের উপচানো খালগুলোর ঘোলা পানি বন্টনের ব্যবস্থা থেকে। আবারো যদি এই প্লাবন সেচব্যবস্থা বহাল করা যায়, তাহলে আবারো আপনাদের অবস্থা তেমন উন্নত দশায় পৌঁছবে।”

৩. “এতক্ষণ পর্যন্ত আমরা প্রধানত কৃষির দিক থেকে কর্দমাক্ত বন্যার পানির গুরুত্ব আলোচনা করেছি, এখন আমরা জনস্বাস্থ্যের দিক থেকে এর গুরুত্বের বিষয়ে আলোকপাত করবো। বাংলার জনস্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. বেন্টলি সেরকম একজন মানুষ, যিনি ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়েছেন পয়গম্বরের মতো। আর এটা তিনি করেছেন কর্দমাক্ত বন্যার পানিকে সেচের কাজে লাগিয়ে। বাংলায় যদি কারো কোনো অবদান থেকে থাকে (সেই কালে), তাহলে জীবিত যে কারো চেয়ে তাঁর প্রতিই বেশি ঋণী থাকতে হবে। তিনি তাঁর প্রভাব সৃষ্টিকারী ম্যালেরিয়া ও কৃষি (ম্যালেরিয়া অ্যাণ্ড এগ্রিকালচার, বেঙ্গল সেক্রেটারিয়েট বুক ডিপো, কলকাতা, ১৯২৫) বইয়ে দেখিয়েছেন যে, কর্দমাক্ত বন্য্যার পানি দিয়ে সেচ কাজ বাড়ানো আর ম্যালেরিয়ার প্রকোপ কমানো একই কথা, যেমনটা সকল বদ্বীপেই হয়ে থাকে। আমি আমার জীবনে এত বিশ্বাসযোগ্য আর কিছু পড়িনি। এবং আপনারা দেখবেন, বাংলার প্লাবন- সেচ ব্যবস্থা তাঁর লেখা প্রতিটি শব্দকে সত্য প্রমাণ করবে।”

অনুবাদকের অনুভূতি

অনুবাদক ফারুক ওয়াসিফ বলেছেন, “উইলকক্স নদী, সেচ নিয়ে বলতে গিয়ে বাংলার ইতিহাস ছুঁয়েছেন, সেচের কাজে কীভাবে বাঙালি সংস্কৃতির এজমালি বিষয়গুলি তৈরি হয়েছে তা দেখিয়েছেন। ইংরেজের নদীশাসনের ভুলে কেন ম্যালেরিয়া ছড়ালো তা প্রমাণ করেছেন। কিছু কিছু জিনিস হয়তো পুরনো, সেটার ঘাটতি মিটিয়ে দিয়েছেন পশ্চিম বাংলার প্রখ্যাত নদী বিশেষজ্ঞ, সরকারি নদী কমিশনের অন্যতম কল্যাণ রুদ্র।”

প্রকাশকের কথা

প্রকাশক নাহিদ হাসান বলেছেন, “স্যার উইলিয়াম উইলকক্স, যাকে আধুনিক সেচব্যবস্থার অন্যতম জনক বলা হয়। তিনি তার ‘বাংলার নিজস্ব সেচ ব্যবস্থা’ (অনুবাদ : ফারুক ওয়াসিফ, ডাকঘর, ২০২১) গ্রন্থে ১৯২৮ সালেই বলেছেন, ‘সৌভাগ্যবশত বাংলায় সেচ চলত কেবল বন্যার সময়। তাই কেবল সঠিক পথটি গ্রহণের মাধ্যমে সহজেই এর পুনর্জীবন সম্ভব। এই কাজে প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো আর কিছু না, গত সত্তর বছরের ভুল। তারপরও এটা কঠিন কাজ নয়। আমরা জানি কী করতে হবে। প্রাচীনকালের বাঙালিরা যা করত আমাদের কেবল সে-সবই করতে হবে। …এখন কেবল তাদের মতো দায়িত্বশীল ভূমিকা আমাদেরই গ্রহণ করতে হবে এবং আবার পানি ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করে তুলতে হবে। আমরা দারুণ এক ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হয়েছি।”

লিখেছেন সুজন ঘোষ, চট্টগ্রাম থেকে। তিনি প্রথম আলোর চট্টগ্রামের স্টাফ রিপোর্টার।

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading