বর্তমান সাহিত্য মানেই কি আবর্জনা ?

বর্তমান সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, সুকুমার রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের হাত ধরে যে বাংলা সাহিত্যের সূচনা ঘটেছিল, কালের বিবর্তনে সেই ঘরানার সাহিত্য বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। অনাদরে, অবহেলায় বর্তমান সাহিত্য তার ঔজ্জ্বল্য হারিয়েছে বহুগুণে। সময়ের সাথে তালে মিলিয়ে সাহিত্যের ধরণেও এসেছে পরিবর্তন, কমেছে সৃজনশীলতা, লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। তার মানেই কি বর্তমান সাহিত্য আবর্জনা বৈ কিছুই নয়? নাকি আমাদের সমাজ গতানুগতিক সাহিত্যের আদল থেকে বের হয়ে এসে বর্তমান সাহিত্যের পরিবর্তনকে সাদরে গ্রহণ করতে পারছে না?

শুরুতেই নজর দেওয়া যাক তৎকালীন সাহিত্যের দিকে অর্থাৎ বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগের দিকে। এই স্বর্ণযুগের কথা বলতেই যাদের কথা প্রথমে মাথায় আসে তাঁরা হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সুকুমার রায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সত্যজিৎ রায় সহ প্রমুখ প্রথম সারির লেখকদের যারা তাদের সৃষ্টিশীলতা এবং মননশীলতা দ্বারা বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে গিয়েছেন এক অনন্য স্থানে। তাঁরা তাদের লেখনী দ্বারা ছুঁয়ে গিয়েছেন পাঠকদের মনকে। রেখে গিয়েছেন এমন কিছু কালজয়ী রচনা, যা আজও পাঠকদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে আছে।

কী ছিল তাঁদের রচনায় যা বাংলা সাহিত্যকে এতটা সমাদৃত করেছে ? মূলত তাঁদের সকলেরই নিজস্ব স্বকীয়তা ছিল, যা পাঠকের মনকে একদিকে প্রশান্তি দিত, অন্যদিকে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতির সঞ্চার করত। তাঁদের রচনার সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁদের প্রত্যেকের লেখার আদল পরস্পরের থেকে ভিন্ন। কেউ গ্রামীণ সমাজের উপর বেশি দৃষ্টিপাত করলে অপরজন সামাজিক সমস্যার উপর দৃষ্টিপাত করেছেন। কেউ ছন্দময় শিশুতোষ গ্রন্থ রচনা করলে অপরজন গোয়েন্দা কাহিনী রচনা করেছেন। লেখার ধাঁচ আলাদা হলেও তাঁরা সকলেই তাঁদের এসকল কালজয়ী রচনার মাধ্যমে পাঠকদের কাছে অর্থপূর্ণ বার্তা প্রেরণ করে গিয়েছেন।

উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক আমাদের সকলের প্রিয় ফেলুদার কথা। বাস্তব জীবনে তার কোন অস্তিত্ব না থাকলেও ফেলুদা আমাদের কতই না আপন ! কারণ সত্যজিৎ রায় এতোটা আপনভাবেই ফেলুদার সাথে আমাদের পরিচয় করে দিয়েছেন। “পথের পাঁচালী” এর দুর্গা ও অপুর দুরন্তপনা, দুই ভাইবোনের জীবন সংগ্রাম – এসকলই আমাদের খুব পরিচিত কারণ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সফল হয়েছেন চরিত্র দুইটিকে জীবন্ত করে তুলতে। রকিব হাসানের কিশোর, মুসা ও রবিন তো আমাদের ছোটবেলার প্রিয় বন্ধু। কিংবা রবিঠাকুরের “হৈমন্তী” অথবা “অপরিচিতা”, যার মাধ্যমে রবিঠাকুর সেই আমলে যৌতুকের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁদের সৃজনশীলতা, কাহিনী প্রবাহ এবং অনবদ্য বাচনভঙ্গি এসকল কাল্পনিক চরিত্রকে এতবছর পরেও পাঠকের কাছে জীবন্ত করে রেখেছে।

বঙ্কিমচন্দ্র লিখতেন সাধু ভাষায়, অন্যদিকে শরৎচন্দ্র লিখতেন দুখী মানুষদের সংগ্রাম নিয়ে। মাইকেল মধুসূদন নিজস্ব ছন্দ তৈরি করেছিলেন, লিখতেন সনেট। সুকুমার রায় তার ছন্দের জাদুতে নিজেকে পরিণত করেছিলেন জনপ্রিয়তম শিশুসাহিত্যিকদের মধ্যে একজন। অর্থাৎ সবারই একটা নিজস্বতা ছিল। প্রত্যেকেই লিখতেন তাঁদের নিজস্ব ধাঁচে, যা তাঁদের যুগ যুগ ধরে পাঠকদের মনে জাগিয়ে রেখেছে।

এর পরবর্তী সময়ে সাহিত্য চলে যায় হুমায়ুন আহমেদ, হুমায়ুন আজাদ, জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, ইমদাদুল হক প্রমুখের হাতে। ফলে সময়ের সাথে সাথে সাহিত্যেও লাগে আধুনিকতার ছোঁয়া। লেখার ধাঁচে যোগ হয় নতুনত্ব। সাহিত্য প্রবেশ করে নতুন এক যুগে!

বর্তমান যুগের জনপ্রিয় তিনটি কাল্পনিক চরিত্রের কথাই ধরা যাক। হিমু, রূপা, এবং মিসির আলি – হুমায়ুন আহমেদের অনবদ্য সৃষ্টি। হুমায়ুন আহমেদ আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে সাবলীলভাবে চরিত্রগুলোকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তার মননশীলতা দ্বারা এসকল কাল্পনিক চরিত্রকে করে তুলেছেন জীবন্ত। ফলস্বরূপ পাঠকসমাজও ভালোবাসা দিয়ে আপন করে নিয়েছে এসকল চরিত্রকে। তাঁর সৃজনশীলতার জন্যই তাঁর বইগুলো এখনও পাঠকদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করছে। কারণ তিনি পেরেছিলেন তাঁর লেখা দ্বারা পাঠকের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে, পেরেছিলেন তাঁর লেখাতে আবেগ এবং ভালোবাসা ফুটিয়ে তুলতে, জীবন্ত করে তুলতে পেরেছিলেন কাল্পনিক সব চরিত্রগুলোকে।

জাফর ইকবালের দীপু, রাশা এবং রাশেদের কথা না বললেই নয়। বর্তমান শিশুদের কাছে জনপ্রিয় চরিত্র। বাস্তবে এদের কোন অস্তিত্ব না থাকলেও মনে হয় যেন এরা আমাদের কতদিনের চেনা। কিংবা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর রোবটগুলো! যুগের সাথে পা বাড়িয়েই তিনি কিন্তু সক্ষম হয়েছেন কালজয়ী কিছু চরিত্রের রূপদান করতে। পাঠকগণও সাদরে এসকল চরিত্রকে গ্রহণ করে নিয়েছেন।

এর পরবর্তী সময়ে সাহিত্যের হাল ধরেন সাদাত হোসাইন, ইমতিয়াজ মাহমুদ, আসিফ মেহ্‌দী, পিয়াস মজিদ প্রমুখ। উনাদের হাত ধরে সাহিত্য প্রবেশ করে তুলনামূলক নতুন এক যুগে। গতানুগতিক সাহিত্যের ধারা থেকে বের হয়ে তাঁরা যোগ করেন নতুন আদল। ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখনীতে গভীর মর্মার্থের ছাপ পাওয়া যায়। প্রতিদিনকার ঘটে যাওয়া ঘটনা খুব সহজ সাবলীল ভাষায় তুলে ধরার এক অসাধারণ সামর্থ্য আছে তাঁর। সাদাত হোসাইনের লেখাতে হুমায়ন আহমেদের প্রভাব লক্ষণীয়। তবে তার সাথে আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে সাদাত তৈরি করেছেন নিজস্ব লেখার ধাঁচ।

এখন হুমায়ুন আহমেদ কিংবা ইমতিয়াজ মাহমুদের সাথে যদি রবীন্দ্রনাথ কিংবা শরৎচন্দ্রের লেখার  তুলনা করা হয়, তবে তা অবশ্যই একরকম হবে না। কারণ তাঁদের পরস্পরের লেখার ধরণ আলাদা। প্রত্যেকের পারিপার্শ্বিক অবস্থা পরস্পরের তুলনায় ভিন্ন ছিল। তাই রবীন্দ্রনাথের সাথে হুমায়ুন আহমেদের লেখার যেমন পার্থক্য আছে, তেমনি হুমায়ুন আহমেদের সাথে ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখার পার্থক্য আছে। অর্থাৎ সময়ের পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে সাহিত্যেও।

কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হল আধুনিকতার নামে অনেক নতুন লেখক সাহিত্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। বলতে বাঁধা নেই যে পূর্বের ন্যায় ছন্দময় শিশুতোষ গ্রন্থগুলো এখন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। শিশুদের জন্য সৃষ্টি হচ্ছে না রসালো, কৌতুকপূর্ণ, শিক্ষণীয় ছোটগল্প। প্রতিভাবান লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা করার মত মানুষ কমে যাওয়াতে লেখকরাও লেখার আগ্রহ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছেন।

কালের পরিক্রমায় সাহিত্যেতে ভাষার বিকৃত বানান স্থান করে নিচ্ছে। বর্তমান সাহিত্যে শোভা পাচ্ছে “চিনস”, “খাইসি”, “কি হইসে”, “প্যারা নাই, চিল” এসমস্ত বিকৃতভাবে উচ্চারিত শব্দ। এসব বাংলা উচ্চারণ যা কিনা তথাকথিত “ফ্যাশন” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বর্তমান সাহিত্যেও, যা কোনভাবেই কাম্ম্য নয়। এভাবে সাহিত্যের মর্যাদাহানির পাশাপাশি বাংলা ভাষার অবমাননা করা হচ্ছে। ভাষার মাধুর্য, গাম্ভীর্য, রসবোধ নষ্ট হওয়ার ফলে তা পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি এই যে, আধুনিকতার নামে নিজেদের স্মার্টনেস প্রমাণ করার জন্য নতুন লেখকরা অবলীলায় অশুদ্ধ ও বিকৃত শব্দ ব্যবহার করে যাচ্ছে। নিজের ভাষার স্বকীয়তা নষ্ট করছে। সৃষ্টি হতে ব্যর্থ হচ্ছে কালজয়ী সাহিত্য। ফলে পাঠকদের সাথে লেখকদের যে মধুর সম্পর্ক আদিকাল হতে বিরাজিত ছিল, বর্তমানে তা লোপ পাচ্ছে। কারণ আগেকার সাহিত্যে পাঠক যে আবেগ অনুভব করত, বর্তমানে “খিচুড়ি” ভাষার সাহিত্যে তা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বলা যায়, লেখকদের মধ্যে মৌলিকতার অভাব ও পাঠকদের মধ্যে অসাড়তা এখন সমান হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সময়ের সাথে নতুন নতুন বিষয় মানুষের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে যার প্রভাব লক্ষ্য করা যায় সাহিত্যে। যেমন বর্তমান সময়ের আলোচিত সমস্যা “মানসিক স্বাস্থ্য” । তাই পাঠকদের এ সম্পর্কে সোচ্চার করার জন্য বর্তমানে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দিয়ে বই রচনা করা হচ্ছে। এমনই একটি বই হল “মনের যত্ন।“ পারিবারিক কলহও বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আজকালকার সাহিত্যেও এর দেখা মিলছে। অর্থাৎ সময়ের সাথে সমস্যার পরিবর্তন ঘটছে, গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে তার প্রভাব পড়ছে সাহিত্য রচনায়।

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় কিছু বই, যেগুলো আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে ভাষার মর্যাদা এবং গাম্ভীর্য অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছেঃ

বইগুলো সব একসঙ্গে পেতে এখানে ক্লিক করুন ! 

আধুনিকায়নের সাথে সাথে পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে মানুষের চিন্তা ভাবনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। তার প্রভাব পড়েছে সাহিত্যেতে। ফলে আগেকার রচনার সাথে বর্তমানের রচনাগুলোর তেমন একটা মিল পাওয়া যায় না। কিন্তু তাই বলে এখনকার সাহিত্যগুলো ফেলনা নয়। বর্তমান সাহিত্যকেও পাঠকগণ ভালমতোই গ্রহণ করেছে। কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা তখনই হারায় যখন আধুনিকতার নামে ভাষার মাধুর্য ও গাম্ভীর্য নষ্ট করা হয়।

– ইসরাত জাফরীন

rokomari

rokomari

Published 29 Jan 2018
Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.
  0      1
 

comments (1)

Leave a Comment

  1. Sokal Roy

    সাদাত হোসাইন, ইমতিয়াজ মাহমুদ, আসিফ মেহ্‌দী’র লেখালেখিকে যদি বর্তমানে সাহিত্যের হালধরা লেখক বলা যায় তাহলে বাঙলাদেশের বাঙলা সাহিত্যে পুনরায় অন্ধকার আসতে আর বেশী দিন বাকী নেই।

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png