বয়ঃসন্ধিকালে আপনার সন্তানকে দিন বাড়তি মনোযোগ

fotik keno mara giyechilo

সেই ক্লাসিক গল্প ‘ছুটি’ র অসাধারণ চরিত্র ‘ফটিক’! আজ কিশোর ফটিককে নিয়ে লিখতে বসে আরেকবার পড়লাম গল্পটি। ভেবেছিলাম বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যাগুলো সব হয়তো উঠে আসবে না কিছু যুক্ত করতে হতে পারে। কিন্তু না কবিগুরু তো আর ছেড়ে দেবার পাত্র নন। সবটাই ওনার সুসজ্জিত ভাষার ফোকরে ঠিক তুলে এনেছেন। বাদ দেননি কিছুই।

চলুন, আজ না হয় ফটিককে নিয়েই কথা বলি- 

‘বালকদিগের সর্দার ফটিক চক্রবর্তীর মাথায় চট্ করিয়া একটা নূতন ভাবোদয় হইল; নদীর ধারে একটা প্রকাণ্ড শালকাষ্ঠ মাস্তুলে রূপান্তরিত হইবার প্রতীক্ষায় পড়িয়া ছিল; স্থির হইল, সেটা সকলে মিলিয়া গড়াইয়া লইয়া যাইবে’

ফটিক কেন মারা গিয়েছিল

  • গল্পের শুরু হয়েছিল কিশোর ফটিকের সহজাত উচ্ছলতা দিয়ে। যা সব কিশোর কিশোরীর কাম্য।

তবে ফটিকের কষ্টের দিনগুলো শুরু হয় মামার বাড়ি কলকাতায় আসার পর থেকে…

‘সেও সর্বদা মনে মনে বুঝিতে পারে, পৃথিবীর কোথাও সে ঠিক খাপ খাইতেছে না; এইজন্য আপনার অস্তিত্ব সম্বন্ধে সর্বদা লজ্জিত ও ক্ষমাপ্রার্থী হইয়া থাকে’

  • যেহেতু বয়ঃসন্ধিকাল একই সাথে ছোট এবং বড়র মাঝামাঝি, তাই অস্তিত্বহীনতায় ভোগা খুব স্বাভাবিক। এ সময় যদি তার কথাগুলোকে, তার চাওয়াগুলোকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দেয়া হত তবে এই হীনমন্যতা ক্রমশ কমে আসতো।

‘এই বয়সে সাধারণত নারীজাতিকে কোনো-এক শ্রেষ্ঠ স্বর্গলোকের দুর্লভ জীব বলিয়া মনে ধারণা হইতে আরম্ভ হয়’

  • ১১-১৫ বছর বয়সের কিশোরদের শারীরিক পরিবর্তনের ফলে স্বাভাবিকভাবেই হরমোনজনিত কারণে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ জন্মে। অনেক সময় তা তীব্র আকার ধারণ করলে অনেক ভুল কাজও করে ফেলতে পারে তারা। তাই এ বিষয়ে ফটিকের বয়সী ছেলে-মেয়েদের সাথে খোলাখুলি আলোচনা করা উচিত।

‘মামী যদি দৈবাৎ তাহাকে কোনো-একটা কাজ করিতে বলিতেন তাহা হইলে সে মনের আনন্দে যতটা আবশ্যক তার চেয়ে বেশি কাজ করিয়া ফেলিত – অবশেষে মামী যখন তাহার উৎসাহ দমন করিয়া বলিতেন, “ঢের হয়েছে, ঢের হয়েছে। ওতে আর তোমায় হাত দিতে হবে না। এখন তুমি নিজের কাজে মন দাও গে। একটু পড়ো গে যাও।”

  • অথচ কাছের মানুষগুলোর কাছে একটু স্নেহ পাবার আশায় ফটিক যারপরনাই চেষ্টা করেছিল। এ বয়সের কিশোররা নিজেরাই বুঝে উঠতে পারে না তারা কতটুকু করবে, কতটা করবে না। আর তার মধ্যে যদি তিরস্কার স্বরূপ কথা বলে উদ্যম দমিয়ে দেয়া হয় তবে মানসিক যন্ত্রণা আরো বেড়ে যায়। এক্ষেত্রে উচিত তাকে উৎসাহ দেয়া। তবেই সে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারে  

‘ছেলেদের যখন খেলিবার ছুটি হইত তখন জানালার কাছে দাঁড়াইয়া দূরের বাড়িগুলার ছাদ নিরীক্ষণ করিত; যখন সেই দ্বিপ্রহর-রৌদ্রে কোনো-একটা ছাদে দুটি একটি ছেলেমেয়ে কিছু-একটা খেলার ছলে ক্ষণেকের জন্য দেখা দিয়া যাইত তখন তাহার চিত্ত অধীর হইয়া উঠিত।’

  • বয়ঃসন্ধিকালের ছেলে-মেয়েদের আবেগ বা উচ্ছাস দুটোই খুব বেশি। সে সময় যদি তাদের ফটিকের মত চার দেয়ালে বন্দী করা হয় তখন আবেগটাও একইভাবে তীব্র হয়ে ওঠে। এ সময় তাই তাদের সাথে বন্ধুর মত আচরণ করা উচিত যেন তাদের মনে কী চলছে তা নির্বিঘ্নে বলতে পারে।

‘মাস্টার প্রতিদিন তাহাকে অত্যন্ত মারধোর অপমান করিতে আরম্ভ করিলেন। স্কুলে তাহার এমন অবস্থা হইল যে, তাহার মামাতো ভাইরা তাহার সহিত সম্বন্ধ স্বীকার করিতে লজ্জা বোধ করিত।’

  • বয়ঃসন্ধিকালে মানুষ বিশেষ করে স্কুল এবং স্কুলের বন্ধুদের সবচেয়ে আপন মনে করে। সেই ছোট্ট গণ্ডিটাও যখন তার জন্য বিভীষিকাময় হয়ে ওঠে তখনই অবস্থা হয় ফটিকের মত। তাই এ বয়সের ছেলে মেয়েদের প্রতি শিক্ষকদেরও হওয়া উচিত অনেক যত্নশীল। তা না হলে আবেগের বশে ঘটে যেতে পারে যে কোন দুর্ঘটনা।

‘ফটিক কাঁদিয়া উঠিয়া কহিল, “আমি মার কাছে যাচ্ছিলুম, আমাকে ফিরিয়ে এনেছে।”

  • নিদারুণ আকুতি হলেও ফটিকের মায়ের কাছে একা একা যাওয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল। কেননা সে পথ চিনতো না। এ সময় তার এমন কোন বন্ধুর প্রয়োজন ছিল, যাকে সে তার ইচ্ছার কথা জানাতে পারে এবং ভুল বা ঠিক সিদ্ধান্তগুলো বুঝিয়ে সাহায্য করতে পারতো। কিন্তু ফটিকের এমন কেউই ছিল না। এ থেকে আমরা বলতে পারি, এই বয়সী কারো জন্য সব সময় একজন বন্ধু বা পরামর্শক দরকার, যারা বকাঝকা না করে সুন্দরভাবে সবকিছু বুঝিয়ে বলবে। 

সচেতনতার অভাবে ফটিক হয়তো চলে গেছে না ফেরার দেশে কিন্তু আমাদের সচেতনতা বাঁচাতে পারে আরো হাজার ফটিককে। আর কাউকে যেন বলতে না হয় মা, এখন আমার ছুটি হয়েছে মা, এখন আমি বাড়ি যাচ্ছি।” 

তথ্যসূত্র – (Sagari Gongala B.Sc., PG Diploma In Psychological Counseling)

ছবি- অন্তর্জাল

বয়ঃসন্ধিকাল সম্পর্কে জানতে সাহায্য করবে যে বইগুলো 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Published 05 Dec 2018
Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh
  0      0
 

comments (0)

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Loading