বুশম্যানের খোঁজে , আঙ্গুল ছোঁয়া পাঠ

bushman er khoje feature image

বাংলাদেশের কথাসাহিত্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল পাঠক মাত্রই মহীবুল আজিজ ও তার বহুল আলোচিত গ্রন্থ ”বুশম্যানের খোজে” গল্পগ্রন্থের কথা জানেন। গল্পগ্রন্থটিতে মহিবুল আজিজের  নিজস্বতা ও শৈল্পিক সাক্ষরতার চিহ্ন সুস্পষ্ট।

বইটির প্রথম গল্প ”জিগস”। এটি আখতারী নাম্মী এক এনজিও কর্মীর অপমৃত্যুর রহস্যঘেরা গল্প। পুলিশ শেষ পর্যন্ত হত্যাকারীদের বের করতে না পারলেও তাকে নিয়ে চলা গুঞ্জনের শেষ  হয় না। গল্পটি যেন বাস্তবের হুবহু প্রতিরুপ। বাস্তবে যেমন হত্যাকারী ধরা না পড়লেও তাকে নিয়ে চলা গুঞ্জনের ডালপালা বন্ধের কোন লক্ষণ দেখা যায় না,গল্পটিও তেমনি। এবং বাস্তবকে যেন সম্পূর্ণ করতেই পুলিশ শেষতক নিতাইকে হত্যাকারী হিসেবে ধরে নিয়ে যায়, অর্থাৎ উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চড়িয়ে গল্প শেষ  হয়।

”কালের যাত্রার ধ্বনি” গল্পগ্রন্থের দ্বিতীয় গল্প। গল্পে লেখক যেন  ইতিহাসবিদ। ‘কুগেল’ নামক খাবারের পেছনে ২য় বিশ্বযুদ্ধের যে মর্মান্তিক ইতিহাস লেপ্টে  আছে, বর্তমানের বিন্দুতে লেখক তা প্রত্যক্ষ করিয়েছেন।

”পূষণের জীবনের কয়েকটি তথ্য” গল্পটি আমাদের বিচ্ছিন্ন  নাগরিক সমাজের একটি পরিবারের প্রতিচ্ছবি। পূষণের পিতামাতা চাকুরীজীবী।তাকে সঙ্গ ও ঘর পাহারা দেয়ার অভিপ্রায়ে কাজের ছেলে হিসেবে কিশোর বয়েসি রমিজকে রাখা হয়। বাসায় জমে যাওয়া চিপস ও চকলেট পাড়ার দোকানে  বিক্রির মাধ্যমে রমিজ যেন এক নতুন জগতের স্বপ্ন দুয়ার খোলার চাবি পায়। এসবের মাঝে একদিন দুর্ঘটনা ঘটে। চকলেটের স্তূপকে কীটনাশকমুক্ত করতে গিয়ে রমিজ  ভুলবশত নিজের মুখে স্প্রে  করে বসে। ঘর অরক্ষিত রেখে পূষণ – রমিজ হাসপাতালে যাওয়ায় বাসায় চুরির ঘটনা ঘটে। গল্পটি পড়ে প্রথমে মনে হতে পারে আগাগোড়া রমিজের বর্ণনায় ভরপুর গল্পটি পূষণের নামে কেন হতে গেল? গল্পের শেষ পর্যায়ে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। যখন হাসপাতালে পূষণের মা বাবা রমিজের টেস্ট না করিয়ে  শুধুমাত্র আইড্রপ কিনে বাসায় চলে আসে। রমিজ শেষ পর্যন্ত ত কাজের ছেলেই! পুষণের মা বাবার আচরণের মধ্য দিয়ে শ্রেণিসুলভ মানসিকতা স্পষ্ট ফুটে উঠে। প্রসঙ্গত একটি কথা বলতে হয়। রমিজ  ভবিষ্যতে দুর্ঘটনায় পরবে তার একটা ইঙ্গিত গল্পের বর্ণনায় দু জায়গায় দেয়া হয়েছে। যার কোন প্রয়োজন ছিলনা। ইশারা ছাড়াই গল্পটি স্বাভাবিক গতিতে আগাতে পারত।

চালচিত্র গল্পগ্রন্থের সবচেয়ে ছোট গল্প। নেতার জন্য রাস্তায় তোরণ  বানানো ও এ উপলক্ষে চলমান  নানা আয়োজনকে লেখক তার স্বভাবজাত বর্ণনার মাধ্যমে ব্যঙ্গ করেছেন।

বুশম্যানের খোঁজে
বুশম্যানের খোঁজে

BUY NOW

”পাহাড়ে ওঠানামার দিন” গল্পে বর্তমান পাহাড়ি জনপদের চালচিত্র বর্ণিত। দেশের অংশ হয়েও এ জনপদ যেন ঠিক দেশের অংশ নয়,নিজ ভূমে পরবাসী হবার একটা অনুভূতি গল্পে পাওয়া যায়।সবুজ সতেজ পাহাড়ি অঞ্চল যেন জলপাই রঙের অন্ধকারে ঢাকা।

”বুশম্যানের খোঁজে” গল্পটি প্রথম গল্পটির মতই সমসাময়িক বাস্তবতার গল্প। গ্রামে সংঘর্ষের খবর পেয়ে ওসি আব্দুল আহাদ কম্বিং অপারেশনে এসে কিংকর্তব্যবিমূঢ হয়ে যান। ঘটনা, সুত্র, অপরাধী বিষয়ক তথ্যে সব তালগোল পাকিয়ে যায়। গল্পের শেষ  দিকে ওসির বলা – এক্সিডেন্ট স্যার, বুশম্যান স্যার, … এক্সিডেন্ট স্যার, বুশম্যান স্যার, ওভার….যেন  সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ব্যঙ্গ করে।

গল্পগ্রন্থের শেষ গল্প ”বংশবিস্তার”বেশ চমকপ্রদ।রোমান একজন চোর। কিন্তু তার ভাল হবার সাধ যায় না। একদিকে ভাল হয়ে সংসার করার ইচ্ছে আরেকদিকে চুরি ছাড়া আর কিছু না পারার অভ্যাস তাকে বেশ দ্বিধাগ্রস্থ করে তোলে।ভাল হবার বাসনায়  এক পর্যায়ে সে  সিদ্ধান্ত নেয় বাশ চুরি করে কিছু নগদ আগে কামিয়ে  তারপর ভাল একটা কাজ বেছে নেবে।এই বিবেচনায় এনজিও থেকে ঋণ নেয়া হয়।তবে তার পরিকল্পনা মত ঘটনা ঘটে না।তার চুরিকর্মে ভাটা পরে সেই সাথে  ঋণের জালেও  আটকে পরে রোমান। তারপরও সব ছেড়ে  ছুড়ে  ভাল হবার পথে ঘটে বিপত্তি। একদল চোরের হাতে মার খায় সে।রোমানের  বৃত্তবন্দী হয়ে থাকার মাধ্যমে গল্পের ইতি ঘটে।গল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতি রোমানের  ভাল হবার ইচ্ছেকে  উপহাস করে যায়।

মহীবুল আজিজের লেখার ভঙ্গি নির্লিপ্ত। বিষয়বস্তু থেকে অনেকটা দূরত্ব তৈরি করে লেখেন। তবু ”অনবয়ব” গল্পে হৃদয় দ্রবীভূত হতে  কোন  কিছুই আটকায় না। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া সাজ্জাদের মুখাবয়ব আকার  ভার পরে দেশসেরা শিল্পী শিমূলের ওপর। আর তাতেই শিল্পী তার জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।কেননা সাজ্জাদের কোন ছবি নেই, আর ত্রিশ বছর পর সাজ্জাদের অবয়ব কারো কাছে পরিস্কার নেই। কারো মতে তিনি দেখতে বাবার মত, কারো মতে তিনি মার মত। শেষ পর্যন্ত শিল্পী অসাধ্য সাধন করে।প্যারালাইজড মা নাদিরা খাতুনের চোখের  বারিধারা বলে দেয় শিল্পী শিমূল ভট্টাচার্য সফল হয়েছেন। নাদিরা বেগমের আবেগ পাঠক মনেও সঞ্চারিত হয়। বর্ণনার উৎকর্ষে, হৃদয়গ্রাহিতায়,অন্তর্নিহিত ভাব ও তার ব্যঞ্জনায় এই গল্পটি বইয়ের সেরা গল্প।

গল্পের বর্ণনা ধারায় লেখক চূড়ান্ত রকমের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। গল্পটির অন্যভাবেও পাঠ নেয়া যায়। দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে আজতক মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয়নি। জাতি শিমূল ভট্টাচার্যের মত কারো অপেক্ষায় আছে যিনি খন্ড খন্ড সুত্র জোড়া লাগিয়ে একটি পরিপূর্ণ ছবি উপহার দিতে সক্ষম হবেন।বাংলা সাহিত্যে মুক্তিযুক্তভিত্তিক নানা গল্প লেখা হয়েছে। ”অনবয়ব” গল্পটি তার মধ্যে একটি সমুজ্জ্বল ও আলাদা আসন নিয়ে থাকবে সন্দেহ নেই।

মহীবুল  আজিজের লেখার যে জিনিসটা প্রথমেই আকর্ষণ করে তা হল তার নিজস্ব বলার ধরণ।শান্ত,ধীরস্থির। বর্ণনার অন্তঃস্রোতে চোরা হাসি, ব্যঙ্গ।এক্ষেত্রে তিনি সন্দীপনের সমগোত্রীয়। গুমোট,স্থবিরতা,ব্যঙ্গের সুনিপুণ রুপ  দিতে বাক্যে তার তৎসম শব্দব্যবহার। মহিবুল আজিজ গল্প বলার জন্য গল্প বলেন না।গল্পের অভিপ্রায়কে খোলাসা  করার কোন কসরত তার গল্পশরীরে নেই। গল্পের মাধ্যমে যে চিত্র তিনি আমাদের মাঝে তুলে ধরেন তার অভিমুখ বহুমুখী ও বিশ্লেষণী। তার গল্পে কেবল প্রতিফলন নয়, প্রতিসরণও আছে। সে সাথে তার গল্প দীক্ষিত পাঠকের স্পর্শ কামনা করে।

গল্পগ্রন্থের গল্পগুলিকে সমাজের বহিরঙ্গের প্রতিচ্ছবি বলা চলে। বিজ্ঞান – প্রযুক্তির কল্যাণে এ বহিরঙ্গ যেমন কালীক বা স্থানিক ভূগোলে আটকে না থেকে  বৈশ্বিক ভূগোলের সাথে যুক্ত, মহিবুল আজীজের গল্পগুলো ও প্রয়োজনমত বৈশ্বিক ভূগোলের পথে পা মাড়িয়েছে।

নানা মাত্রায়, নানা তলে আলোচিত  হবার মত যোগ্যতা ”বুশম্যানের খোঁজে”র রয়েছে। গ্রন্থটি সেই উম্মোচনকারী ও অনুধাবনকারী পাঠকের অপেক্ষায় আছে।

লেখক- মাহমুদ রহমান। গল্পকার ও সমালোচক। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘ফাদ ও সমতলের গল্প’(২০১৫)

বুশম্যানের খোঁজে সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন 

মহীবুল আজিজের অন্যান্য বই দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading