আপনার ছুটির দিনকে রাঙিয়ে তুলতে পারে যে বইগুলো

books on holiday

বাঙালীদের ছুটির দিনে আয়েশ করে খাবার-দাবার খাওয়ার বাইরেও অনেক কিছু করার গুণ আছে। তার মধ্যে একটি হলো, পছন্দের সিনেমা দেখা কিংবা পছন্দের বই নিয়ে আরাম করে বিছানায় আধশোয়া হয়ে পাতা ওল্টানো। সিনেমা দেখার পদ্ধতি সিনেমা হল থেকে ড্রয়িংরুমে ঝোলানো টেলিভিশন হয়ে এখন এসে দাঁড়িয়েছে হাতের মুঠোফোনে। কিন্তু বই পড়ায় অতটা রকমফের হয়নি। যদিও এখন ই-পাব থেকে শুরু করে ই-বুক, পিডিএফ ইত্যাদি বিভিন্ন নতুন নতুন পদ্ধতিতে বই পড়ার ব্যবস্থা এসেছে। কিন্তু তবুও বাঙালীদের কাছে কাগজে ছাপানো বইয়ের আবেদন বেড়েছে বৈ কমেনি। আর তাই চলুন, আজ আমরা এমন কিছু বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হই, যা ছুটির দিনে পড়ার জন্য পছন্দ করে ফেলতে পারি নির্দ্বিধায়।

শিশু-কিশোরদের জন্য

ছুটির দিনে শিশুদের হাতে তুলে দিতে পারেন অদ্ভুত সুন্দর সব বই। তাদের উপযোগী বিভিন্ন রঙিন বই, তাদের ছোট্ট মনকে আরো বেশি সুন্দর করে তুলবে। যে কোন বয়সী শিশুদের জন্য রূপকথা একটি দারুণ বিষয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে রূপকথার বইগুলোর মধ্যে একদম শুরুর দিকে থাকে ‘ছোট্ট রাজপুত্র’ বইটি।

স্যাঁৎ-একজ্যুপেরির লেখা ফরাসি ভাষায় এটি সর্বাধিক ভাষান্তরিত বই। সারা পৃথিবীর পাঠকের কাছেই এই চিরসবুজ আখ্যানের জাদুময়তা আর আবেদন এখন কিংবদন্তি। ছোট ও বড়ো, সকলের কাছেই ছোট্ট রাজপুত্র আধুনিক কালের এক সেরা ক্লাসিক। এটি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইলেও প্রকাশিত হয়েছে। লেখকের আঁকা রঙিন ছবি, বাহারি মলাট আর প্রাঞ্জল অনুবাদে ছোট্ট রাজপুত্র বইটি সব বয়েসী পাঠকেরই মন জয় করতে পারবে।

এছাড়াও দেশি প্রেক্ষাপটে লেখা শিশু-কিশোর উপযোগী দারুণ একটি গল্পের বই ‘টুপিটুন’। প্রায় বিশটিরও বেশি গল্প নিয়ে সাজানো বইটির মধ্যে থাকা ছয়টি গল্প আলাদা আলাদা ভাবে জিতেছে মীনা অ্যাওয়ার্ড সম্মাননা। মীম নোশিন নাওয়াল খানের অন্যান্য বইগুলোর মত এটিও বেশ ভিন্নধর্মী বই। শিশু থেকে কিশোর বয়সী যে কোন ছেলে মেয়ের কাছে বইটি ছুটির দিনে পড়ার মত একটি ভালো বই।

তবে আমরা সবাই বিভিন্ন সাহিত্যের চিরায়ত বইগুলো পড়েই মূলত বড় হয়েছি। যখন থ্রিলার বুঝতে শিখিনি তখনও সত্যজিৎ রায়ের ‘ফেলুদা’ কিংবা ‘প্রফেসর শঙ্কু’ পড়ে বেশ অ্যাডভেঞ্চার অনুভব করেছি। ছড়া কিংবা কবিতা বুঝতে শেখার আগেই পড়েছি সুকুমার রায়ের হেঁয়ালি ছড়াগুলো। আবোল তাবোল বইটি থেকে নেয়া অনেক ছড়াই এখনও আমাদের মুখস্থ। যেমন-

( যদি কুমড়োপটাশ নাচে)-
খবরদার এসো না কেউ আস্তাবলের কাছে;
চাইবে নাকো ডাইনে বাঁয়ে চাইবে নাকো পাছে;
চার পা তুলে থাকবে ঝুলে হট্টমূলার গাছে।

(যদি কুমড়োপটাশ কাঁদে)-
খবরদার ! খবরদার ! বসবে না কেউ ছাদে;
উপুড় হয়ে মাচায় শুয়ে লেপ কম্বল কাঁধে,
বেহাগ সুরে গাইবে খালি ‘রাধে কৃষ্ণ রাধে!’

(যদি কুমড়োপটাশ হাসে)-
থাকবে খাড়া একটি ঠ্যাঙে রান্নাঘরের পাশে;
ঝাপসা গলায় ফার্সি কবে নিশ্বাসে ফিস্‌ফাসে;
তিনটি বেলা উপোস করে থাকবে শুয়ে ঘাসে !

এরকম অদ্ভুত মজার মজার পরিচিত সব ছড়া কিন্তু ‘আবোল তাবোল’ বই থেকেই নেয়া। এছাড়াও বাংলা সাহিত্যের আরেকজন লেখক শিবরাম চক্রবর্তী, যার লেখায় রসবোধ অতুলনীয়। তার লেখা অন্য ধাঁচের একটি বই ‘এক মেয়ে ব্যোমকেশের কাহিনী’ ছুটির দিনের জন্য বেশ আনন্দদায়ক বই হতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছয়টি কিশোর উপন্যাস, যা আপনার পড়া উচিত

সব বয়সীদের জন্য

ছুটির দিনগুলোতে পাঠকরা অনেকেই অনেক ধরনের বই পড়তে পছন্দ করে থাকেন। তবে ছুটির দিনে সাধারণত সবাই ফুরফুরে মেজাজে থাকে, তাই বইগুলো হওয়া উচিত সেরকমই। এক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের হিমু সিরিজ সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকবে। বাংলা ভাষার সাহিত্যে হিমুর মত স্বতন্ত্র রচনা খুঁজে পাওয়া ভার। একদম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে নির্মিত সিরিজটিতে তারুন্যের আধিপত্য থাকলেও এতে রয়েছে সব বয়সী মানুষের আকর্ষণ করার এক অদ্ভুত ফর্মুলা।

তবে হুমায়ূন আহমেদের লেখার একটি অন্যরকম বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি সিরিয়াস সাহিত্যে হুট করেই এমন ঘটনাকে নিয়ে আসতে পারেন, যেটি প্রায় সিরিয়াস বিষয়ের মধ্যেই মজার উদ্রেক করতে সক্ষম। সেক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য লেখা থেকে অপেক্ষাকৃত সিরিয়াস চরিত্র হলো ‘মিসির আলী’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজির প্রফেসর মিসির আলী মুখোমুখি হন অদ্ভুত সব বিষয়ের। যেখানে আধ্যাত্মিক কিংবা ভৌতিক ইশারা থাকলেও মিসির আলী নিজেকে যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে জাহির করেন সবখানে। এবং এসব আধ্যাত্মিক বিষয়কেও যুক্তি দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করেন। অপরদিকে হিমু যুক্তি নিয়ে অত বেশি চিন্তিত নন। তিনি ফুরফুরে মেজাজ দিয়ে পৃথিবীকে দেখার চেষ্টা করেন। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশে বিশাল বাড়ি দেখে তিনি থেমে যান এবং ভাবেন বাড়িটায় একবার ঢুঁ মারলে কেমন হয়? তুলনামূলক বিচারে হুমায়ূন আহমেদের নির্মান করা চরিত্র হিমু এবং মিসির আলী একদমই দুই মেরুর। একজনের সাথে অন্যজনের কোনো মিলই নেই।

তবে হুমায়ূন আহমেদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অন্যদের থেকে আলাদা। তিনি অপেক্ষাকৃত একদম বিপরীত চরিত্রকে একসাথে আনার মত দুঃসাহসীক কাজও করেছেন। সেরকমই একটি বই ‘হিমুর দ্বিতীয় প্রহর’। যেখানে হিমুর একটি ভৌতিক অভিজ্ঞতার ব্যাখ্যা জানার জন্য মিসির আলীর সঙ্গে দেখা করতে আসেন স্বয়ং হিমু। দারুণ এই বইটি ছুটির দিনে যে কোনো বয়সী পাঠকের জন্য ভরপুর আনন্দ দেবে নিঃসন্দেহে।

গল্প

এবার আসা যাক গল্পে। অনেকেই উপন্যাস থেকে সাধারণত গল্প পড়তে বেশি আগ্রহী হন। সত্যিকার অর্থেই বাংলা সাহিত্য তো বটেই; পুরো বিশ্ব সাহিত্যে গল্প সবচেয়ে সনাতন একটি বিষয়। এছাড়াও খেয়াল করলে দেখা যাবে, পৃথিবীর সেরা ছোটগল্পকাররাই আমাদের মাঝে অধিক পছন্দের। ছুটির দিনগুলোতে গল্পগ্রন্থ হাতে নিয়ে ইচ্ছেমত গল্প পড়ে ফেলার আইডিয়াটা মনে হয় খুব বেশি মন্দ না। বাংলা ভাষায় অতীতে এবং বর্তমানে প্রচন্ড শক্তিশালী অনেক গল্পকার রয়েছেন। বর্তমান সময়ে লেখালেখি করা তেমনই একজন মোজাফফর হোসেন। তার লেখা নতুন প্রকাশিত গল্পের বই ‘মানুষের মাংসের রেস্তোরাঁ’ সমকালীন প্রায় একুশটি গল্প নিয়ে সাজানো।

মোজাফফর হোসেনের লেখার একটি বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর ছোটগল্পগুলো হয় মেদহীন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নামে ছোটগল্প হলেও সেগুলো আকারে বেশ বড়। এবং বর্ণনাভঙ্গিও রূপতাত্ত্বিকভাবে ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যকে বহন করে না। কিন্তু মোজাফফর হোসেনের গল্পগুলো কিংবা গল্পের বইগুলো সেরকম নয়।

তার লেখা অন্য আরেকটি বই ‘খুন হয়ে যাচ্ছে সব সাদেক’, যা বাস্তব ও পরাবাস্তবতা মেলবন্ধনে দারুণ একটি বই হয়ে উঠেছে। ছুটির দিনগুলোতে যারা গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তারা উপরের এই দুইটি বই বাদেও মোজাফফর হোসেনের যে কোনো গল্পগ্রন্থ পড়ে নিতে পারেন নির্দ্বিধায়। বলা তো যায় না, আপনার ছুটির দিনটি হয়ে উঠতে পারে একটি পরাবাস্তব দিন!

গল্পের ঝাঁপি শেষ করার আগে আরেকটি গল্পের বইয়ের কথা বলা যাক। এটি বেশ ছোট একটি বই। পেপারব্যাক হওয়ায় বইটি হাতে নিয়ে পড়ার আলাদা আনন্দ আছে।

মাত্র বারোটি গল্প নিয়ে প্রকাশিত বইটি মুলত বাস্তবতা ও সামাজিক জীবনের সংকট নিয়ে লেখা। পেন্ডুলাম প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত জান্নাতুন নাঈম প্রীতির লেখা বই ‘তালা ভাঙার পালা’ ছুটির দিনে শেষ করে ফেলার মত দূর্দান্ত একটি বই হতে পারে।

রহস্য

তবে অনেকের কাছেই রম্য কিংবা জটিল বিষয়ের গল্প নিয়ে তেমন আগ্রহ নেই। তারা ছুটির দিনগুলোতে রহস্যময়তার ছোঁয়া পেতে চান। ছুটির দিনের ফুরফুরে সকাল কিংবা অলস বিকেলে কোনো একটি থ্রিলার বই হাতে নিয়ে টানটান রহস্যের দুনিয়ায় হারিয়ে যেতে পারলে আসলেই বেশ হয়। এক্ষেত্রে অনেকেই বিদেশী ভাষার থ্রিলারগুলোকে এগিয়ে রাখলেও বর্তমান সময়ে কিন্তু এই বিষয়ে বাংলা ভাষায় বেশ দুর্দান্ত সব বই প্রকাশিত হচ্ছে।

আওলাদ মিয়ার ভাতের হোটেল সেরকমই একটি বই। নিয়াজ মেহেদীর লেখা বেশ অদ্ভুতুড়ে একটি বই এটি। রাতদুপুরে পলাশবাড়ি পৌছে বিস্ময়ে অবাক হয়ে যায় অরিন্দম। জনবিরল বাজারে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে রাতটা কাটানো যায়। এদিকে তাপমাত্রা পারদের হিসেবে চড় চড় করে নামছে, ঘনীভূত হচ্ছে কুয়াশা, বুকে কাঁপন ধরাচ্ছে। রাতচরা পাখির ডাক। উদভ্রান্ত অরিন্দমকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে এক রহস্যময় বেটে মানুষ। অনেকগুলো গলি-ঘুপচি পেরিয়ে লোকটা তাকে নিয়ে যায় আওলাদ মিয়ার হোটেলে, যেখানে অরিন্দমের মতো আটকপড়া আরো পাঁচজন মানুষকে একাট্টা করা হয়েছে। হোটেলের মালিক আওলাদ মিয়ার চাওয়া খুব সামান্য। কী সেই চাওয়া? তা নিয়েই নির্মিত হয়েছে ‘আওলাদ মিয়ার ভাতের হোটেল’। ছুটির দিনকে রহস্যময় করে তুলতে এরকম একটি বই-ই যথেষ্ট।

আরেকটি দুর্দান্ত রহস্যের বই হলো, জাহিদ হোসেনের লেখা ‘এক জোড়া চোখ খোঁজে আরেক জোড়া চোখকে’। এক রাতে বিগুদা গ্রামে জুডিথ ডারহাম অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখে। প্রথম প্রথম কেউ পাত্তা দেয়নি। স্বপ্ন তো অনেকেই দেখে, তাতে অত পাত্তা দেয়ার কী আছে! কিন্তু বিগুদার সবাই যখন ঐ একই স্বপ্ন দেখা শুরু করে তখন সবার টনক নড়ে। তারপর এক ভয়াল রাতে গ্রামটি তছনছ হয়ে যায়, পড়ে থাকে স্রেফ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন কিছু দেহ। গ্রামের একমাত্র গির্জায় কে জানি এক জোড়া চোখের ছবি এঁকে রেখেছে। নিচে লেখা-পীংক্রী রীট্রিক্রা ক্রেয়ীৎ স্পাক্রা লিক্রিৎ…….।

এ কাহিনী জনপ্রিয় লেখক মোহাম্মদ আসগর আলীর, এ কাহিনী বনশ্রী’র মক্ষীরাণী অ্যালিসের, এ কাহিনী সাইবেরিয়ার ললনা নাতাশা’র, এ কাহিনী খোঁড়া ক্রিমিনোলজিস্ট রেহমান সিদ্দিকের-সর্বোপরি এ কাহিনী ত্রীতের! কারা এই ত্রীৎ? ত্রীৎ তারা, যারা ছিলো, যারা আছে, যারা থাকবে….। জাহিস হোসেনের রহস্যময়ী এই বইটি আপনার ছুটির দিনকে নিয়ে যাবে অন্য এক মাত্রায়!

সমকালীন উপন্যাসগুলো দেখতে ক্লিক করুন 

শিশু-কিশোরদের মজার বইগুলো দেখুন 

 

rokomari

rokomari

Rokomari.com is now one of the leading e-commerce organizations in Bangladesh. It is indeed the biggest online bookshop or bookstore in Bangladesh that helps you save time and money.

Leave a Comment

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading