স্টিফেন কিং এবং জর্জ মার্টিন: অদ্ভুত ও আধিভৌতিক সাহিত্যের দুই কিংবদন্তী

স্টিফেন কিং এবং জর্জ আর আর মার্টিন

জর্জ আর আর মার্টিন, বিখ্যাত টেলিভিশন সিরিজ গেম অব থ্রোনসের স্রষ্টা এবং ভৌতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও টান টান উত্তেজনাকর লেখনীর জন্য বিখ্যাত লেখক স্টিফেন কিং কিভা অডিটোরিয়ামে এক বৈঠকে বসেছিলেন ২০১৬ সালে। বন্ধুসুলভ সেই আড্ডা উপস্থিত দর্শকদের জন্য হয়ে উঠেছিল বেশ উপভোগ্য।

এঁদের মধ্যে একজন লেখক (স্টিফেন কিং) লেখালেখির ক্ষেত্রে কোনো অবসর নেন না, তো অপরজনের (জর্জ আর আর মার্টিন) একেকটি বই শেষ হতে অনেক বছর লেগে যায়। কিন্তু, কিছুটা বিপরীত মেরুর এই দুজনের মধ্যে কোথাও গিয়ে একটা সাধারণ ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়। দুজনেই মানবমনের অন্ধকার দিক বিশ্লেষণ করেন, অন্ধকারের মধ্য থেকে খুঁজে আনতে চান অজানা ও অকর্ষিত কিছু সত্য।

সময়ের হিশেবে তাঁদের এই গপ্পোসপ্পো খানিকটা দীর্ঘ মনে হলেও যথেষ্ট তথ্য, হাস্যরস ও গভীর অনুভবে তা যেন কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। স্টিফেন কিংয়ের কাছ থেকে জানা যায়, লেখালেখির বিষয়টা শুরু থেকেই তাদের পরিবারের মধ্যে ছিল। লেখালেখিকে তিনি এক্ষেত্রে অনেকটা ‘জিনগত উপাদান’ বলে আখ্যা দেন, যা সহজাতভাবেই তাঁর মধ্যে এসেছিল। সেজন্য কোনো কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তাঁকে। তিনি ও তাঁর সহধর্মিণী, উভয়েই লেখালেখির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ।

“এ্যামেচাররা বসে বসে অনুপ্রেরণার অপেক্ষা করে, অন্যরা স্বপ্ন দেখে এবং কাজ শুরু করে দেয়”

– স্টিফেন কিং

তাঁর বাবাও একজন আগ্রহী লেখক ছিলেন, যদিও তার কোনো লেখা কোথাও ছাপা হয়নি। বাবা হিসেবে স্টিফেন কিংয়ের কাছে সন্তান লালন-পালনের মূলমন্ত্র হচ্ছে তাদের ওপর কোনো নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে তাদের সামনে ভালো ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করা। নিজের জীবনে এ অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে বলেই জানান তিনি। হয়তো এ সূত্র ধরে এগিয়েছেন বলেই তাঁর ছেলে জোসেফ হিলস্ট্রম কিং ওরফে ‘জো হিল’ সাহিত্যজগতে নিজের একটি জায়গা করে নিয়েছেন ইতোমধ্যেই।

সৃজনশীলতাকে আজও রহস্য মনে করা স্টিফেন কিংয়ের লেখালেখির শুরুটা বেশ চমকপ্রদ। এইচপি লাভক্রাফটের ‘থিং ফ্রম দ্য টম্ব’ বইটি পেয়েছিলেন বাবার ফেলে যাওয়া গুপ্তধনের বাক্সে। বইটি দেখেই তাঁর মনে নকশা বুনতে শুরু করেছিল আগামীর এক লেখক সত্ত্বা। নিজেকেই নিজে বলেছিলেন, “আমি এটাই হতে চাই!” ১২ বছরের কিশোর স্টিভ একটার পর একটা গল্প লিখে স্থানীয় ম্যাগাজিনে জমা দিতে থাকেন, আসে একের পর এক প্রত্যাখ্যানও। তবে এতে তাঁর কিছু যেত-আসত না। শেষমেশ ১৯ বছর বয়সে প্রথম তাঁর একটি লেখা ছাপা হয় এবং এজন্য তিনি পেয়েছিলেন ৩৫ ডলার।

স্টিফেন কিং

বাস্তবের সাথে কতটুকু কল্পনার ডোজ মেশালে লেখা উপভোগ্য হয়, সেটা স্টিফেন কিং খুব ভালো করেই জানেন। তাই পুরোটা কল্পনার ভিত্তিতে নয়, তিনি বরং আস্থা রাখেন তাঁর লেখালখির এই নিজস্ব মিশ্রণে। অপরাধ নিয়েই তাঁর বেশিরভাগ রচনার সৃষ্টি। তবে ব্যক্তি যখন অপরাধ করে, তখন নির্দিষ্ট সেই ব্যক্তিটিই শুধু অপরাধ করে না; এর পেছনে তাঁর পরিপার্শ্বও জড়িয়ে থাকে এবং এ বিষয়টির ব্যাখ্যাও অনেক ক্ষেত্রে তাঁর লেখনীর উপজীব্য হয়ে উঠেছে। মানুষের মধ্যকার ভয় জাগিয়ে তুলতে পারদর্শী এই লেখকের বই পড়লে পাঠকেরা স্বস্তি পাবেন না, তবু সেই অদ্ভুত অস্বস্তি অনুভবের জন্যই পড়বেন- এমনই জাদুময় তাঁর লেখনশৈলী ও প্লট।

গুণগত লেখনীর সাথে পরিমাণগত বিষয়ের উপরও সাধারণত জোর দিয়ে থাকেন তিনি। কোনো বই লেখা শুরু করলে তিনি চেষ্টা করেন প্রতিদিন তিন-চার ঘণ্টা সময় মনোযোগ দিয়ে অন্তত ছয় পৃষ্ঠা লিখতে। তবে, লেখক হিসেবে সাফল্যের প্রত্যাশা যে কখনো কখনো কলমকে থামিয়ে দেবার মতো মুহূর্তের সৃষ্টি করে, এ কথাও অবলীলায় স্বীকার করেন তিনি।

স্টিফেন কিং শুধু লেখালেখিতেই পারদর্শী, তা নয়। সিনেমায় অভিনয় করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর। এবং সে অভিনয়ের অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নেন পুরোনো তাস খেলার সাথী মার্টিনের সাথে।

অন্যদিকে মার্টিনের সাহিত্যজগতে প্রবেশের চাবিকাঠি ছিল তাঁর উৎসুক ও বিপুল কল্পনাশক্তি। ছোটবেলায় তাঁর জগতটা ছিল বাসা থেকে স্কুলে যাবার পথের পাঁচটা ব্লক, এর বাইরে যাওয়া হতো না। প্রতিদিন একই পথে হাঁটলেও সংকীর্ণ সেই ভৌগলিক গণ্ডি তার মনের গণ্ডিকে বেঁধে রাখেনি, তাঁর মাথায় সবসময়ই চলত- এই ব্লকগুলোর ৮ নং ব্লকে কী আছে, বা তারও বাইরে? জানালার বাইরে থাকা শহুরে বাতিগুলো তাঁকে মনে করিয়ে দিত দূর প্রবাসের কোনো বাতিঘরের কথা, যার আলোয় তিনি নিজের মনেই বুনে যেতেন গল্পের পর গল্প।

তাঁর খেলার উপকরণ হিসেবে কিছু এলিয়েন আকৃতির প্লাস্টিক পুতুল ছিল, তিনি সেগুলোকে বিভিন্নভাবে চরিত্রায়িত করতেন; তাদের কেউ হতো সাধারণ জলদস্যু, তো কেউ দলনেতা! আসলে অনেকেই ছোটবেলায় প্রচণ্ড কল্পনাপ্রবণ হয়ে থাকে, কিন্তু বড় হতে হতে একদিন সেটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। সৌভাগ্যবশত সাহিত্যিক জর্জ আর আর মার্টিনের ক্ষেত্রে তা হয়নি, বরং ছোটবেলার সেই পেলব কল্পনাকে পুঁজি করেই তিনি এগিয়ে গেছে পরবর্তী জীবনের পথে।

এই লেখক সুপরিচিত তাঁর গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলোকে মেরে ফেলার জন্য। পাঠক যখনই কোনো চরিত্রকে খুব পছন্দ করে ফেলে, তখনই তিনি সেই চরিত্রের কোনো না কোনো নিদারুণ মৃত্যু ঘটিয়ে দেন- এমন ধারণাই প্রচলিত তাঁর পাঠকমহলে। তাঁর এই অভ্যাস হাল জমানার উদ্ভব নয়, বরং জীবনের প্রথম ভাগ থেকেই তিনি এই কৌশলের চর্চা করে যাচ্ছেন। স্কুলে পড়ার সময় সাহিত্যের ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট হিশেবে তিনি একটি গল্প লিখেছিলেন, যার শেষে মূল চরিত্রকে একটু একটু করে খেয়ে ফেলে কিছু ইঁদুর। এতেই শেষ হয়নি সেই দুর্ভাগার জীবন, শেষমেশ এক বিশাল পেন্ডুলাম এসে তার শরীরের অবশিষ্টাংশকে দু’ভাগ করে ফেলে আর এভাবেই কিশোর লেখক তাঁর গল্পের ‘মধুরেণ সমাপয়েৎ’ ঘটান! “উঠন্তি মুলো পত্তনেই চেনা যায়”- বাক্যটি বোধহয় এই লেখকের ক্ষেত্রে একদম প্রমাণিত সত্য।

বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন জ্ঞানের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতেন কল্পনাকে। কল্পনা আছে বলেই বোধহয় বহু দূষণ, বহু জরা-ব্যাধি-মৃত্যু’র মধ্যেও আমরা খানিকটা সময় পাই জীবন নিয়ে আকাশ-কুসুম ভাবার। কল্পনা করার শক্তি বেঁচে থাকুক, কল্পনাপ্রবণ এই দুই লেখকের কলম চলতে থাকুক, কালজয়ী সব সাহিত্যে ভরে উঠুক বিশ্বসাহিত্যের ভাণ্ডার আর দূষণের পৃথিবী কুড়িয়ে পাক একটুখানি স্বস্তি।

জর্জ আর আর মার্টিনের এর সকল বই দেখুন

স্টিফেন কিং-এর সকল বই দেখুন 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading