গ্রেট স্কেপ অব আলকাট্রাজ – তারা কি শেষ পর্যন্ত পালাতে পেরেছিল?

অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময়েও সমাধান না হওয়া জেল পালানোর এক রহস্য
Alcatraz-Morris-Anglin-brothers

১১ জুন, ১৯৬২,আলকাট্রাজ ফেডারেল কারাগার

রোজকার মত বন্দিদের সেল পরীক্ষা করতে করতে এগিয়ে আসছে গার্ড। মরিস আর অ্যাংলিন ভাইদের সেলের কাছে এসে থমকে দাঁড়ালো সে। বহু বছরের অভিজ্ঞতা তাকে বলছে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে এই সেলে। বার কয়েক ডেকে সাড়া না পেয়ে সেলের ভেতরে প্রবেশ করলো গার্ড। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিলো তিন কয়েদিই নিজের বিছানায় চাদর গায়ে মুড়ে শুয়ে আছে। কিন্তু কাছে যেতেই বোঝা গেলো কিন্তু সেগুলো যে আসল মানুষ না, দিনের আলোয় ভালবিছানার উপর মানুষের মত দেখতে যে অবয়বগুলো পড়ে আছে সেগুলো আর যাই হোক মানুষ না! জেল ভেঙ্গে পালিয়েছে কয়েদিরা !

ষাটের দশকের অন্যতম সুরক্ষিত আর কঠিন এই কারাগার ভেঙ্গে বন্দি পালানোর চেষ্টা আগেও যে একেবারে হয় নি তা নয়, কিন্তু এবারের ঘটনা যেভাবে ঘটেছে তাতে কিছু সময়ের জন্যে হলেও হতবিহ্বল হয়ে পড়ে কারাগার কর্তিপক্ষ। শুরু হয় ফ্র্যাঙ্ক মরিস আর দুই ভাই জন অ্যাংলিন এবং ক্লারেন্স অ্যাংলিন নামের কয়েদিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকা এই তল্লাশি থেকে আজোও নিশ্চিত ভাবে জানা সম্ভব হয় নি ঠিক কি ঘটেছিলো তিন কয়েদির ভাগ্যে।

“দ্য রক” বা রকি আইল্যান্ড নামে পরিচিত ছোট একটি দ্বিপে অবস্থিত ছিল আলকাট্রাজ ফেডারেল কারাগার। সান ফ্রান্সিসকো থেকে মাইল খানেক দূরে এর অবস্থান। বেশ খানিকটা দ্বীপান্তর করার উদ্দেশ্যেই জনবহুল এলাকা থেকে কিছুটাদূরে তৈরি করা হয়েছিলো এই কারাগার। যুক্তরাষ্ট্রেরর গৃহযুদ্ধের সময় সামরিক বন্দীদের আটকে রাখতে ব্যবহার হতো আলকাট্রাজ। তারপর গত শতকের ত্রিশের দশকে আলকাট্রাজকে নতুন করে সারিয়ে নেয়া হয় তৎকালীন দাগী আসামীদের বন্দি রাখার জন্যে।

সাগরঘেরা আলকাট্রাজ

সুরক্ষার জন্যে মূল ভূমি আর কারাগারের মাঝে মাইল খানেকের বরফ শীতল জল তো ছিলোই সেই সাথে কারাগারের ভেতরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল সে সময় অনুযায়ী বেশ উন্নত। উঁচু পাচিল দিয়ে ঘেরা ছিল কারাগারের চারপাশ, সেই সাথে কায়দা করে ওয়াচ টাওয়ারগুলো এমন ভাবে তৈরি করা ছিল যাতে জেলের ভেতরের প্রায় সবটাই স্পষ্ট ভাবে নজরে আসে। দিনে রাতে সব মিলিয়ে বার দশেক গার্ডদের টহলও চলতো সমান ভাবে। প্রায় নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলা চলে। কিন্তু তাই বলে কয়েদিরা পালানোর চেষ্টা করবে না সে তো হতে পারে না। কারাগারের পুরনো নথি ঘেঁটে জানা যায় আলকাট্রাজ ফেডারেল কারাগার থেকে ত্রিশ বছরে ১৪ বার জেল থেকে পালানোর চেষ্টা করে কয়েদিরা। সেই ঘটনাগুলোয় জড়িত ছিল ৩৬ জন বন্দি।

তবে শেষ রক্ষা হয়নি এদের কারোই। পালাতে যেয়ে হয় গার্ডদের হাতে ধরা পড়ে আবারো বন্দি হয় তারা আর নাহয় বরফ শীতল জলে ঝাপ দিয়ে সাঁতার কেটে পালাতে যেয়ে নিজেদের ভবলীলা সাঙ্গ করে তারা। মোট কথা আলকাট্রাজ ফেডারেল কারাগার কর্তিপক্ষের বেশ একটা গর্ব ছিল এই কারাগার থেকে কেউ বেঁচে পালাতে পারবে না। কিন্তু সেই ঘটনাই বদলে যায় ১৯৬২ সালের ১১ জুন যখন মরিস আর অ্যাংলিন ভাইয়েরা এই ভয়ানক বন্দিশালা থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

কয়েদি পালানর ঘটনায় কিছু সময়ের জন্যে বিহ্বল থাকলেও দ্রুতই তৎপর হয়ে ওঠে কারাগার কর্তৃপক্ষ। শুরু হয় কয়েদি ধরার চিরুনি অভিযান আর কিভাবে জেল থেকে পালিয়েছে তিনজন সেই ব্যাপারের তদন্ত। ফ্র্যাঙ্ক মরিস আর সেই সাথে দুই ভাই জন এবং ক্লারেন্স অ্যাংলিন আলকাট্রাজে সাজা খাটছিলো ব্যাংক ডাকাতির করতে গিয়ে ধরা পরার কারনে। সেই কাজে ব্যর্থ হলেও বুদ্ধিতে কেউ কারো থেকে কম ছিল না তারা।

তার প্রমাণ মিলে জেল থেকে পালানোর সুনিপুণ পরিকল্পনায়। প্রথমেই ধরা যাক নিজেদের বিছানার উপর যে অবয়বগুলো তারা তৈরি করেছিলো রাতে গার্ডদের ধোঁকা দিতে। প্লাসটার দিয়ে মানুষের মাথার মতন মুখোশ বানিয়ে তাতে তারা চামড়ার মত দেখতে রং পর্যন্ত করেছিলো। সেখানেই শেষ না, মানুষের মাথার সত্যিকারের চুল যোগাড় করে সেগুলো তারা এঁটে দিয়েছিলো মুখোশগুলোর সাথে। যতেষ্ট সময় আর ধৈর্য নিয়ে সবগুলো কাজ তাদের করতে হয়েছিলো যাতে দিনের পর দিন সেই মুখোশ বিছানায় সাজিয়ে রেখে জেল পালানোর পরবর্তী ধাপে তারা কাজ করতে পারে নির্বিঘ্নে।

ডামি মুখোশ

৬২ সালের জুন মাসে পালালেও তাদের পরিকল্পনা শুরু হয়েছিলো আগের বছরের ডিসেম্বর থেকেই যখন তিন কয়েদির একজন কোনো ভাবে একটা পুরনো করাতের ব্লেড জোগাড় করতে সক্ষম হয়। ভাঙ্গা একটা ভ্যাকুম ক্লিনারের মোটরের সাহায্যে কাজ চালানোর মত একটা গর্ত খোঁড়ার যন্ত্র তৈরি করে নিতে সক্ষম হয় তারা। মরিস আর অ্যাংলিন ভাইদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো পেছনের দেয়ালে থাকা বাতাস চলাচলের জন্যে যে জালি বসানো আছে তার দিকে। পাকাপোক্ত ভাবে আটকানো সেই জালি খোলার জন্যেই তাদের এই তোড়জোড়। সেলের ভেতরে পালাক্রমে কাজ করে এক সময় এই জালি খুলে ফেলতে সক্ষম হয় তারা।

তবে এই জালি খোলার অংশ যাতে গার্ডদের সহজে চোখে না পড়ে সে জন্যেও কোনো ধরনের চেস্টার ত্রুটি রাখেনি তিন কয়েদির কেউই। কাডবোর্ডের নকল দেয়াল সাজিয়ে আর সেই সাথে নিজেদের ব্যবহার্য মালামাল দিয়ে জায়গাটাকে এমন ভাবে আড়াল করে রাখতো তারা যে বাইরে থেকে গার্ডদের নজরে আসতো না আসলে কি কাজ হতে চলেছে এই বিশেষ সেলে।

দেয়ালের যে অংশ থেকে জালি খুলতে সক্ষম হয়েছিলো মরিসরা তার ঠিক পেছনে ছিল আসলে একটি করিডর বা গলিপথ। যেহেতু সেখানে কয়দিদের যাবার কোনো ব্যবস্থা ছিল না তাই সেই করিডোরে আলাদা কোনো টহলের ব্যবস্থাও ছিল না। এ ব্যপারটাই বরং মরিস আর অ্যাংলিনের জন্যে কাজ সহজ করে দিলো। করিডোরটায় ছিল একটা ঘুলঘুলি বা বাতাস চলাচলের ভেন্টিলেটর। যেখান দিয়ে বের হয়ে পাইপ বেয়ে কয়েদখানার ছাদের বিশেষ একটা অংশে পৌঁছানো যেত যেখানে সাধারণত গার্ডরা কেউ যায় না। তবু সাবধানের মার নেই ভেবে তিন কয়েদির কেউ না কেউ সব সময় খেয়াল রাখতো হুট করে যেন কেউ চলে আসতে না পারে।

পরিত্যক্ত জিনিষপাতি আর চুরি করা সব সরঞ্জাম ছাদের এই লুকানো ওয়ার্কশপেই জমা করতে শুরু করলো তিনজন। কারণ সেখান থেকে পালানোর জন্যে চাই এমন কোনো জলযান যেটা বরফের মতন কনকনে ঠাণ্ডা পানি থেকে তাদের রক্ষা করবে। তাই প্রথমেই রাবারের ভেলা বা নৌকা জাতীয় কিছু বানানোর দিকে মনোযোগ দেয় তারা। এ কাজে কয়েদিদের ব্যবহারের জন্যে দেয়া রেইনকোটকে প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে তারা। গোটা পঞ্চাশেক রেইনকোট চুরি করে সেগুলোর সাহায্যে ৬ ফুট বাই ১৪ ফুটের একটি ভেলা আর নিজেদের জন্যে লাইফ জ্যাকেট তৈরি করে মরিস, জন আর ক্লারেন্স।

ধীরে ধীরে পরিকল্পনা বাস্তবতার কাছাকাছি চলে আসতে শুরু করে তাদের। ভেলা চালানর উপযোগী বৈঠা তারা বানিয়ে নেয় কাঠের কাজের ঘর থেকে চুরি করা কাঠের টুকরো দিয়ে। আর একটা বাদ্যযন্ত্র চুরি করে সেটিকে কাজে লাগায় ভেলা ফোলানোর জন্যে।

দেখতে দেখতে সব প্রস্তুতি শেষ করে তিন কয়েদির বিশেষ এই দল। এবার অপেক্ষা শুধু সময় মত জেল থেকে পালানোর। কিন্তু তখনো তারা জানতো না কি অপেক্ষা করছে তাদের জন্যে কয়েদখানার বাইরে।

কয়েদিদের সেলের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে সেদিনের মতন কাজের অনেকটাই শেষ করে এনেছে জেল নিরাপত্তা কর্মীরা। কোথাও তেমন কোনো সমস্যার ছাপ নেই। কিন্তু অপরদিকে ইতিহাস সৃষ্টি করতে সন্ধ্যা রাত থেকেই প্রস্তুত হচ্ছে মরিস আর অ্যাংলিন ভাইয়েরা। শেষ বারের মতন নিজেদের বিছানার উপর নিজেদের অবয়বগুলো তৈরি করে রেখে আর মুখোশগুলো মাথার মতন সাজিয়ে সেল থেকে বের হয়ে ছাদে চলে এলো তারা।

হিসেব কষে তারা আগেই বের করে রেখেছিল ঠিক কোন পথে উঁচু এই কারাগার থেকে মাটিতে নামা সহজ হবে, আর সাথের সব সরঞ্জাম সহ কোন পথে পাচিল ডিঙ্গিয়ে জলের ধারে যাওয়া সহজ হবে। শুধু কি তাই? এতো সব কাজ করতে হবে টহল দেওয়া গার্ড আর ওয়াচ টাওয়ারের আলোর মাঝের ব্লাইন্ড স্পট বের করে। তবে লম্বা সময় ধরে করা পরিকল্পনা নিখুঁত ভাবেই কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছিলো তিন আসামীর এই দল।

জেলের ছাদের সাথে যুক্ত রান্নাঘরের চিমনি বেয়ে ধীরে ধীরে মাটিতে নেমে এলো তিনজন। গার্ডদের টহল সামলে সাথের জলযান আর সরঞ্জাম নিয়ে চলে এলো আলকাট্রাজ কারাগার পাচিলের উত্তর-পূর্ব কোণে। ওয়াচ লাইটের আলো এদিকে খুব ভালোভাবে পড়ে না বলে প্রায় ব্লাইড স্পট মতন এই যায়গাটা বেছে নিয়েছিল তিনজন। সেদিক দিয়েই পাচিল টপকে সৈকতে বেরিয়ে আসে তারা।

জেলের ভেতর থেকে তখনো কোনো পাগলা ঘণ্টী বা গার্ডের চিৎকার চেঁচামেচি শোনা না যাওয়ায় তারা নিশ্চিত ভাবে বুঝতে পারলো এখন পর্যন্ত কাজে তারা সফল। তবে ভাগ্য কতক্ষণ সাথে থাকবে সেটা বলা যায় না। তাই দেরী না করে রাবারের ভেলা ভাসিয়ে সান ফ্রান্সিস্কোর মূল ভূখণ্ডের দিকে রওনা দিলো তারা। রেইনকোট আর রড দিয়ে বানানো এই ভেলা কতক্ষণ হিম শীতল এই জলে তাদের ভাসিয়ে রাখতে পারবে সে ব্যাপারে তারা যেমন নিশ্চিত ছিল না, তেমনি নিশ্চিত ছিল না দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বা কারো হাতে ধরা পরে তাদের কি অবস্থা হতে পারে।

তদন্দকারীদের পাওয়া নানান সূত্র, কয়েদিদের জবানবন্দি আর আলামতের উপর ভিত্তি করে এইটুকু ঘটনার বিবরণ অনেক নথিতেই থাকতে দেখা যায়। কিন্তু এর পরের ঘটনা সবটাই যেন ধোঁয়াশা। আলকাট্রাজের মতন কারাগার থেকে তিন তিনজন কয়েদি বেমালুম লাপাত্তা হয়ে যাবে আর এফ বি আই এর মতন তদন্দকারি সংস্থা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে তেমনটা হতে পারে না। কারাগারের ভেতরের তদন্তের শেষে তাই সানফান্সিস্কোতেও শুরু হলো এই জেল পালানো অপরাধীদের খোঁজার তোড়জোড়।

কারাগারের ভেতর থেকে গোপন সূত্রে যে খবর তদন্দকারীরা পেয়েছিলো, সে অনুযায়ী সৈকতের কাছের এক শহরে প্রথম যাবার ইচ্ছা ছিল মরিস আর অ্যাংলিন ভাইয়দের। সেখান থেকে গাড়ি চুরি করে লাপাত্তা হয়ে যাবে তারা। কিন্তু সেই শহরে ফাঁদ পেতে তিন কয়েদির কারো টিকিটিরও লাগল পাওয়া গেলো না। নানান যায়গায় মিলতে লাগলো এই ঘটনার সংশ্লিষ্ট সব আলামত। সান ফ্রান্সিস্কোর সৈকতের কাছে পাওয়া গেলো রেইনকোটের তৈরি লাইফজ্যাকেটের কিছু অংশ। কয়েক সপ্তাহ পর সান ফ্রান্সিস্কোর সৈকতের কাছেই এক যায়গায় ভেসে এলো জেলের কয়েদিদের মতন নীল পোশাক পরা একটা লাশ।

যদিও সে লাশ সনাক্ত করার মতন কোনো উপায় ছিল না। অবশেষে কারা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করলো, তিনজন বন্দি কারাগার থেকে পালানোর সময় নিখোঁজ হয়েছে এবং সম্ভবত জলে ডুবে মারা গেছে। সেই রিপোর্টে এটাও উল্লেখ করা হয় যে, সম্ভবত সান ফ্রান্সিস্কো এবং আলকাট্রাজ ফেডারেল কারাগারের মাঝের বরফ শীতল জলে ডুবে কয়েদিরা মৃত্যুবরন করেছে, যদিও তাদের মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি।

তবে এই ঘোষণা কারা কর্তৃপক্ষ নিজেরা যেমন হজম করতে পারে নি, তেমনি পারেনি তদন্তকারি দলের লোকেরাও। তাদের ধারনা ছিলো যে মরিস, জন আর ক্লারেন্স কেউ আসলে মারা যায় নি। বরং নাম পরিচয় পাল্টে কোনো না কোনো যায়গায় আত্মগোপন করে বহাল তবিয়েতেই বসবাস করছে। তারপর সময়ের সাথে ধীরে ধীরে এই কেসের উপর থেকে আগ্রহ কমে যেতে শুরু করে সবার। ১৯৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিক ভাবে এই ব্যপারে তদন্ত বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয় এফ বি আই। এবং এই কেস হস্তান্তর করা হয় ইউ এস মার্শাল সার্ভিসের কাছে।

তবে তারা কেস হস্তান্তরের আগে আর পরে নানান সময় উড়ো খবর আসতে থাকে জেল পালানো কয়দিদের বেঁচে থাকার ব্যাপারে। অ্যাংলিন্সদের মায়ের কাছে বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত কেউ ফুল পাঠাতো যাতে কোনো নাম বা পরিচয় লেখা থাকতো না। ধারনা করা হয় এফ বি আই এর কড়া নিরাপত্তা থাকা স্বত্বেও ১৯৭৩ সালে অ্যাংলিন্স ভ্রাতৃদ্বয়ের মা যখন মারা যায়, তখন মহিলাদের ছদ্মবেশ ধরে দুই ভাই তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। তবে যে সকল পরিচিত যায়গা বা আত্মীয়ের কাছে তাদের যাবার সম্ভবনা আছে ভেবে তদন্তকারীরা নজর রেখেছিলো সে সব যায়গায় কোনো হদিস মেলেনি মরিস আর অ্যাংলিন ভাইয়দের কারোই।

ইউ এস মার্শাল সার্ভিসের কাছে খোলা থাকা এই তিন কয়েদির জেল পালানোর কেস সময়ের সাথে উত্তরাধিকার সূত্রে এক তদন্তকারি থেকে অপর তদন্তকারীর কাছে হস্তানত হয়েই চলে। ইউ এস মার্শাল মাইকেল ডাইক, যিনি উত্তরাধিকার সূত্রে ২০০৩ সালে এই কেসটি হাতে পেয়েছিলেন, তিনি ২০১২ সালে প্রেসের সামনে দেয়া এক বক্তব্যে উল্লেখ করেন, তিনি আসলে জানেন না ৬২ সালে পালিয়ে যাওয়া তিন কয়েদিন কেউ আদৌ বেঁচে আছে কি না। কিন্তু এমন অনেক তথ্য প্রমাণ তিনি পেয়েছেন যার কারনে তার কাছে ব্যপারটা অসম্ভব মনে হয় না।

২০১৫ সালে বিখ্যাত এই জেল পালানোর ঘটনার উপর ভিত্তি করে হিস্টোরী চ্যানেল বিশেষ এক ডকুমেন্টারি তৈরি করে। যেখানে এমন একটি ছবি দেখানো হয় যা জন আর ক্লারেন্স অ্যাংলিনের ছবি হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। ছবিটি তোলা হয়েছিলো অ্যাংলিন ভাইয়েরা জেল থেকে পালানোর প্রায় ১৩ বছর পরে ব্রাজিলের কোনো এক স্থানে। ফরেনসিক এক্সপার্টদের দিয়ে সে ছবি পরীক্ষা করানো হলে তারা জানান ছবিতে থাকা মানুষ দুজন অ্যাংলিন সহোদর হবার সম্ভবনাই বেশি। তবে শতভাগ নিশ্চিত করে কিছু বলার উপায় ছিল না।

অপর এক সূত্র অনুযায়ী ২০১৬ সালে মৃত্যুপথযাত্রী এক ব্যক্তির জবানবন্দী থেকে জানা যায়, সে এবং তার এক সহযোগী মরিস, জন আর ক্লারেন্সকে আলকাট্রাজ জেল থেকে পালাতে সাহায্য করেছিলো। কিন্তু তার কথার সাথেও মিশে আছে আরো রহস্য। মৃত্যুপথযাত্রী সে ব্যক্তির দাবী অনুযায়ী তারা তিন কয়েদিকে জল থেকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে এলেও সেখানেই তারা তিনজন কে হত্যা করে এবং মহাসড়কের পাশে বিশেষ এক স্থানে তাদেরকে মাটি চাপা দিয়ে রাখে। কিন্তু পরবর্তীতে তদন্তকারী দল সেই নির্দিষ্ট স্থানে যেয়ে মাটি খুড়ে কোনো মৃতদেহ খুঁজে পায় নি।

তবে এ ব্যপারে সব চাইতে বড় আলোড়ন তৈরি করে সিবিএস সান ফান্সকোর ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসের একটি খবর। সে সময় তারা রহস্যময় একটি চিঠি প্রকাশ করে। চিঠিটির লেখক জেল পালানো তিন কয়েদির একজন জন অ্যাংলিন ! চিঠিতে লেখা ছিল কিভাবে তারা ভয়ানক দ্বিপ কয়েদখানা থেকে পালিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো। সিবিএসের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, এই চিঠিটি সান ফান্সকো পুলিশ ডিপার্টমেন্টের রিচমন্ড স্টেশন ২০১৩ সালে পেয়েছিলো এবং সেটি তারা এফ বি আই এর কাছে হস্তান্তর করে।

এফ বি আই এর রিপোর্টে উল্লেখ আছে, তারা চিঠিটির আঙ্গুলের ছাপ সনাক্তকারী পরীক্ষা করে কোনো গ্রহণযোগ্য ফলাফল পায়নি। কিন্তু তারপরও পরবর্তী পাঁচ বছরেও চিঠিটি কেন জনসমক্ষে না এনে আড়ালে রেখে রেয়া হয়েছিলো এ বিষয়ে নিশ্চিত ভাবে কিছু জানা যায় না।

কি লেখা ছিল সে চিঠিতে তার সক্ষিপ্ত রূপ কিছুটা এরকম,

আমার নাম জন অ্যাংলিন, আমি আলকাট্রাজ থেকে ১৯৬২ সালের জুন মাসে আমার ভাই ক্লারেন্স এবং ফ্রাঙ্ক মরিসের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলাম। বর্তমানে আমার বয়স ৮৩ আর শরীরের অবস্থা বেশ খারাপ। আমার ক্যান্সার হয়েছে। আর হ্যাঁ সে রাতে আমরা তিনজনই বেঁচে পালাতে সক্ষম হয়েছিলাম যদিও অতি কষ্টে।

চিঠিতে আরও লেখা ছিল, যদি আপনারা টেলিভিশনের ঘোষণা করেন যে, আমি যদি জেলে যেতে রাজি হই তাহলে আমাকে সর্বোচ্চ এক বছরের জন্যে সাজা দেয়া হবে এবং আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে, তাহলে আমি লিখে আপনাদের জানাবো আমি এখন ঠিক কোথায় আছি। এটিকে কৌতুক হিসেবে নিবেন না। চিঠিতে আরও উল্লেখ ছিল যে জেল থেকে পালানোর ৪৩ বছর পর ২০০৫ সালে ফ্রাঙ্ক মরিস আর ৪৬ বছর পর ক্লারেন্স মারা যায়।

তবে কাহিনীর শেষ কিন্তু এখানেই। এই চিঠির সত্যতা, ব্রাজিলে তোলা ছবির সত্যতা কিংবা অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় পরেও কেন এই কেস চালু অবস্থায় আছে এর ব্যখ্যা কোথাও পাওয়া যায় না। আলকাট্রাজ ফেডারেল কারাগার ১৯৬৩ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় অত্যাধিক ব্যয়বহুল হয়ে যাবার কারনে। নতুন করে চালু করার পর ১৯৩৪ সালের ১১ অগাস্ট থেকে ১৯৬৩ সালের ২১ মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় ত্রিশ বছর চালু ছিলো সেই কারাগারটি। তবে কারাগার হিসেবে বন্ধ হয়ে গেলেও ভ্রমণ পিপাসুদের জন্যে জেল পালানোর অর্ধসমাপ্ত কাহিনী, আলকাট্রাজ কারাগারকে করে রেখেছে অন্যতম দর্শনীয় স্থান।

প্রতি বছর লাখো দর্শনার্থী দ্য রক দ্বীপে উপস্থিত হন দেখার জন্যে কিভাবে এই অসম্ভব বেড়াজাল ভেঙ্গে পালাতে সক্ষম হয়েছিলো তিনজন কয়েদি, যাদের ভাগ্যে কি ঘটেছিলো যা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। ১৯৭৯ সালে “এস্কেপ ফ্রম আলকাট্রাজ” নামে একটি পুর্নদৈর্ঘ্য চলচিত্রও নির্মিত হয় এ ঘটনার উপর ভিত্তি করে, যা রহস্য রোমাঞ্চ প্রিয় মানুষের মনে আজো দাগ কেটে আছে। তাছাড়া জেলের যে কক্ষের দেয়াল কেটে মরিস, জন আর ক্লারেন্স পালিয়েছিলো সে কক্ষ দেখার জন্যেও মানুষের আগ্রহের কমতি নেই।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, সত্যিই কি তাহলে পালাতে পেরেছিলো সেই তিন কুখ্যাত কয়েদি? বহাল তবিয়েতে মুক্ত ভাবে বেঁচেই কি তবে তারা কাটিয়েছে জীবনের শেষগুলো? নাকি হাজারো বিভ্রান্তির তথ্যের মাঝে কোনটির সত্যতা অনুযায়ী বহু আগেই মারা গেছে তারা? এ সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর কিংবা এ ব্যপারে পরিষ্কার কোনো প্রমাণ না পাওয়া গেলেও অর্ধশতাব্দীর পুরনো জেল পালানোর এই রহস্য যে আজও পাঠকদের চিন্তার খোরাক জোগাবে সেটা বেশ জোর দিয়েই বলা যায়।

ইতিহাস আশ্রয়ী জনপ্রিয় বইগুলো দেখুন 

Rukaiya Ahmed

Rukaiya Ahmed

Studied Bachelor of Laws (LLB) at Green University of Bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading