হাউজ অব উইজডম : মুসলমানদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার অনন্য সংগঠন

বাগদাদে মুসলিমদের জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার স্বর্ণালী সময়ের বয়ান
house-of-wisdom-feature-image-png0hhtuvhadd65bihswostut5l69ouk4laielgrs81

১২০০ বছর আগেকার বাগদাদ ছিল ইসলামি দুনিয়ার একটি সুখ ও সমৃদ্ধিশালী নগরী। খলিফা হারুন আর রশিদ, আল-মামুন, আল-মুতাহিদ এবং আল-মুক্তাফির শাসনকালে বাগদাদ প্রায় ৫০০ বছর নানান বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান এবং সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ ছিল। বাগদাদের এমন উন্নতির মূল কারণ ছিল এর খলিফাদের বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও জ্ঞান সংগ্রহের পেছনে তীব্র আকাঙ্ক্ষা। গ্রন্থ সংগ্রহের পাশাপাশি এসব খলিফারা মুসলিম পণ্ডিতদের একত্রিত করে বাগদাদে গড়ে তুলেছিলেন ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠান। যার নাম দেওয়া হয়েছিল— ‘হাউজ অব উইজডম’। বুদ্ধিবৃত্তিক এই প্রতিষ্ঠানটি বাগদাদকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। বাগদাদ হয়ে উঠেছিল শিল্প, বিজ্ঞান এবং চিঠি আদান-প্রদানের এক কেন্দ্রস্থল। বাগদাদ থেকেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ঘটেছিল এবং  চারিদিকে ছড়িয়ে যেতে শুরু করেছিল।

১৯৯৪ সালে সিরিয়ান ডাকটিকিটে হাউজ অব উইজডমের পণ্ডিত আল-কিন্দির ছবি। আল-কিন্দি এরিস্টটলের গবেষণালব্ধ জ্ঞান অনুবাদ করেছিলেন। 
১৯৯৪ সালে সিরিয়ান ডাকটিকিটে হাউজ অব উইজডমের পণ্ডিত আল-কিন্দির ছবি। আল-কিন্দি এরিস্টটলের গবেষণালব্ধ জ্ঞান অনুবাদ করেছিলেন।

‘হাউজ অব উইজডম দুটি নামে পরিচিত ছিল। প্রাথমিকভাবে খলিফা হারুন আর রশিদের সময় যখন এটি একটি একক হলে অবস্থিত ছিল, তখন এটির নাম ছিল খিজানাত আল-হিকমাহ (জ্ঞানের গ্রন্থাগার)। এরপর খলিফা আল-মামুনের সময়ে এটি একটি বিশাল একাডেমিতে পরিণত হয়। তখন নাম দেওয়া হয়েছিল বাইত আল-হিকমাহ (জ্ঞানের ঘর)। এখানে একটি বিশালাকার গ্রন্থাগার ছিল, যেখানে বিভিন্ন ভাষায় হাজারেরও বেশি বৈজ্ঞানিক বিষয়ের ওপর বই সংরক্ষিত ছিল। খলিফা মুহাম্মাদ আল-মাহদি তার যুদ্ধদিনের সময়গুলােতে পাণ্ডুলিপির ধারণার সাথে পরিচিত হওয়ার পর নিজেই পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ শুরু করেন। তার পুত্র খলিফা আল-হাদি তার কাজকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। এরপর আল-হাদির পুত্র খলিফা হারুন আর রশিদ (৭৮৬-৮০৯) এই বৈজ্ঞানিক কাজগুলােকে পূর্ণরূপ দিয়ে বিজ্ঞানের একটি একাডেমি গড়ে তােলেন।

খলিফা আল-মামুন (৮১৩-৮৩৩) হাউজ অব উইজডমকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান এবং বিজ্ঞানের জন্য একটি আলাদা অনুষদ বরাদ্দ করে দেন। ফলে পুরাে একাডেমিটি মুসলিম পণ্ডিতের ভিড়ে ক্রমশ পূর্ণ হতে হতে পরিপূর্ণতা লাভ করে। তাদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত অনুবাদক, কবি, বিজ্ঞানী, রসায়নবিদ এবং আরও অনেক মুসলিম পণ্ডিত । এই মানুষগুলাে প্রতিদিন একত্র হয়ে তাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক আলােচনা ও কার্যক্রম চালাতেন। এভাবেই শিক্ষা এবং জ্ঞান চারিদিকে ছড়িয়ে যায়। এটি জ্ঞানচর্চার একটি ব্যস্ত জায়গা হয়ে ওঠে এবং এখানে আরবি থেকে শুরু করে ফার্সি, হিব্রু, সিরিয়াক, গ্রিক, ল্যাটিন এবং সংস্কৃত— সব ভাষায় জ্ঞানচর্চা করা হতাে।

বিখ্যাত অনুবাদকদের মধ্যে ছিলেন ইউয়াহুন্না ইবনে আল-বিতরিক আল-তুরজুমান। তিনি দর্শনের চেয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে বেশি পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। তিনি অ্যারিস্টটলের লেখা ১৯ অধ্যায়ের ‘দ্য বুক অব অ্যানিম্যালস’ বইটি ল্যাটিন ভাষা থেকে অনুবাদ করেছিলেন। এ ছাড়া হিপােক্রেটাস এবং গালেনের মতাে গ্রিক চিকিৎসাবিদদের লেখা অনুবাদ করেছিলেন অনুবাদক হুনায়ন ইবনে ইশক।

 ১৯৩২ সালে তােলা ১১ শতকে হাউজ অব উইজডমের শহর বাগদাদের একটি ছবি। 
১৯৩২ সালে তােলা ১১ শতকে হাউজ অব উইজডমের শহর বাগদাদের একটি ছবি।

কথিত আছে, খলিফা আল-মামুন সিসিলির রাজাকে সিসিলির গ্রন্থাগারের সকল বই চেয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন। উল্লেখ্য, গ্রন্থাগারটি দর্শন ও বিজ্ঞানের বইয়ে সমৃদ্ধ ছিল । সিসিলির রাজা তার অনুরােধে সাড়া দিয়ে তাকে এই বইগুলাের একটি করে কপি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই বইগুলাে বাগদাদে বিভিন্ন উপায়ে আনা হয়। তবে জানা যায়, খলিফা আল-মামুন শত শত উটের পিঠে চড়িয়ে এই বই এবং হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিগুলাে ইরানের খােরাসান থেকে বাগদাদে এনেছিলেন। আল-মামুন বাইজেন্টাইনের সম্রাটের কাছেও একটি চিঠি লিখেছিলেন। তিনি তাদের দেশে গ্রিকদের রেখে যাওয়া মূল্যবান বইগুলাে অনুবাদ করার জন্য বিজ্ঞানী এবং অনুবাদক পাঠাতে চেয়েছিলেন। বাইজেন্টাইনের সম্রাট তার অনুরােধে রাজি হন এবং আল-মামুন বেশকিছু বৈজ্ঞানিক এবং অনুবাদক পাঠান। তারা ফেরত আসার সময় এসকল বই নিয়ে আসেন।

খলিফা আল-মামুন যে শুধু হাউজ অব উইজডমের পৃষ্ঠপােষকতা করেছিলেন তা নয়, তিনি বৈজ্ঞানিক এবং পণ্ডিতদের বিভিন্ন আলােচনায় অংশগ্রহণও করতেন। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের জন্য মার্সাদ ফালাকি বানিয়েছিলেন, যেখানে তার ব্যক্তিগত ইহুদি জ্যোতির্বিজ্ঞানী সানাদ ইবনে আলি আল-ইহুদি এবং মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইয়াহিয়া ইবনে আবি মনসুর নিয়ােজিত ছিলেন।খলিফা আল-মামুন তার শাসনকালে উচ্চতর প্রতিষ্ঠান, পর্যবেক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করার পাশাপাশি টেক্সটাইল কারখানা স্থাপন করেন। বলা হয়, তার সময়কালে বাগদাদে ৩৩২টিরও বেশি উচ্চতর প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি কিছু পণ্ডিতকে তার জন্য বিশ্বের একটি মানচিত্র তৈরি করার অনুরােধ করেছিলেন। তারা তার নির্দেশমতাে একটি মানচিত্র বানিয়েছিলেন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল— আল-সূরা আল-মামুনিয়াহ’।

এই মানচিত্রটি টলেমি এবং আরও বহু গ্রিক ভূগােলবিদের সময়কালে তৈরি করা মানচিত্রের চেয়ে বিস্তৃত ছিল। হাউজ অব উইজডমে সেই সময়ের আলােকিত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বনু মুসা ভ্রাতৃত্রয়— মুহাম্মাদ, আহমেদ ও আল-হাসান।  এরা তিনজনই ছিলেন গণিতবিদ। পাশাপাশি তারা অনেক বুদ্ধিদীপ্ত যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন। আমরা যা জানি, আজকের দিনের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভিত্তি তাদের হাতেই তৈরি হয়েছিল। তবে আব্বাসীয় ‘হাউজ অব উইজডম’ এবং ফাতিমীয় ‘হাউজ অব উইজডম সম্পর্কে পার্থক্য জেনে রাখতে হবে। পূর্বে আলোচিত সকল কিছু ছিল আব্বাসীয় ‘হাউজ অব উইজডম’ নিয়ে। ফাতিমীয় হাউজ অব উইজডম’ কায়রােতে খলিফা আল-হাকিমের শাসনামলে ১০০৫ সালে স্থাপিত হয়েছিল এবং এটি ১৬৫ বছর স্থায়ী ছিল।ইসলামি দুনিয়ার অন্যান্য শহরেও হাউজ অব সায়েন্স গড়ে উঠেছিল। আরও পরিষ্কারভাবে বললে, নবম ও দশম শতকের জ্ঞানঘরগুলাে মূলত। বাগদাদের ‘হাউজ অব উইজডম’-এর অনুকরণেই তৈরি হয়েছিল ।

একটি অতুলনীয় কেন্দ্র

২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান পত্রিকায় ব্রায়ান হুইটেকার লিখেছেন,

“মানবিক বিষয়, বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন, প্রাণিবিজ্ঞান, ভূগােল, জ্যোতির্বিজ্ঞান ইত্যাদি শেখার জন্য হাউজ অব উইজডম’ ছিল একটি অতুলনীয় কেন্দ্র। পার্সিয়ান, ভারতীয় ও গ্রিক রচনা, অ্যারিস্টটল, প্লেটো, হিপােক্রেটস, ইউক্লিড, পিথাগােরাস প্রমুখের জ্ঞান— সবকিছু পুঞ্জীভূত করে এসব কেন্দ্রের পণ্ডিতেরা নিজেদের জ্ঞানের সাহায্যে সেগুলােকে নিয়ে গেছেন আরও উন্নতির শিখরে।”

হাউজ অব উইজডম, একটি বুদ্ধিবৃত্তিক পাওয়ারহাউজ

প্রায় এক হাজার বছর আগে বাগদাদ ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এবং ধনী একটি শহর। এটি ধনসম্পদ বা টাকা-পয়সাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না– দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এটি ছিল হাউজ অব উইজডম’-এর কেন্দ্রস্থল; এটি এমন একটি শিক্ষায়তন– যা বহু দূরদূরান্ত থেকে পণ্ডিতদের আকৃষ্ট করেছিল। গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞান গবেষণা চিন্তা এবং তর্ক-বিতর্কের জন্য শিক্ষায়তনটি ছিল মুসলিম সভ্যতার অনন্য এক আদর্শ স্থান, যা একসময় বুদ্ধিবৃত্তিক পাওয়ারহাউজে পরিণত হয়ে উঠেছিল। এই একাডেমির পণ্ডিতদের কাছে বিজ্ঞান, চিকিৎসা এবং দর্শনের উপর লেখা অনেক গ্রন্থের বৃহৎ সংগ্রহ ছিল। যে খলিফারা হাউজ অব উইজডম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন; তারা একটি বিশ্বমানের গ্রন্থাগার নির্মাণ করেছিলেন, যেখানে প্রাচীন সভ্যতার লেখা গুরুত্বপূর্ণ বইগুলাে সংরক্ষিত ছিল। ৭৮৬ সাল থেকে রাজত্ব করে আসা খলিফা হারুন আর রশিদ তার পিতা এবং পিতামহের কাছ থেকে পাওয়া পাণ্ডুলিপি এই গ্রন্থাগারে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন।

তিন যুগ পর বইয়ের সমাহার এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল, হারুন অর রশিদের পুত্র খলিফা আল-মামুনকে আলাদা ‘হাউজ অব নলেজ’ বানাতে হয়েছিল। এরপর তিনি আরও বহু শিক্ষাকেন্দ্র এবং গবেষণাগার নির্মাণ করেছিলেন; যার মধ্যে অন্যতম ছিল ৮১২ সালে নির্মাণ করা পর্যবেক্ষণকেন্দ্র (অবজারভেটরি)। হাউজ অব উইজডমগুলােতে আরবি, ফার্সি, আরামাইক, গ্রিক এবং হিব্রুসহ বহু ভাষার চর্চা হতাে। বিশেষজ্ঞ অনুবাদকগণ ক্রমাগত পুরােনাে লেখাগুলােকে আরবিতে অনুবাদ করার জন্য কাজ করেছিলেন, যাতে পণ্ডিতরা বইয়ের ভাষা বুঝতে, তর্ক-বিতর্ক করতে এবং নিজেদের আরও ভালােভাবে তৈরি করতে পারেন। এই একাডেমির নেতৃত্বস্থানীয়দের অন্যতম ছিলেন বিজ্ঞানী আল-কিন্দি, যিনি অ্যারিস্টটলের লেখাকে অনুবাদ করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন এবং হুনায়ন ইবনে ইশাক অনুবাদ করেছিলেন হিপােক্রেটিসের লেখা। কথিত আছে, খলিফা আল-মামুন সকল পণ্ডিতকে প্রাচীন বই অনুবাদ করার জন্য আহ্বান করতেন এবং পুরস্কার হিসেবে তিনি বইয়ের ভারের সমতুল্য স্বর্ণ উপহার দিয়ে আরও উৎসাহ জোগাতেন । অনুবাদের মাধ্যমে জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার এই প্রয়াসের প্রতিফলন দেখা যায় ১২ শতাব্দীর স্পেনেও।

সেসময় টলেডােতেও আরবি থেকে ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করার একটি প্রথা চালু হয়েছিল। আরবি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন গ্রিক গ্রন্থের অনুৰাদ এই সময়ে প্রকাশিত হয় এবং খ্রিস্টান, ইহুদি ও মুসলিম পণ্ডিতরা এই শহরে আসতে শুরু করেন। তারা একসাথে প্রাচীন গ্রিসের লেখা ও মূল আরবি গ্রন্থগুলাে ল্যাটিন এবং পরে বিভিন্ন ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করার কাজ করেছিলেন। পুরাে দক্ষিণ  ইউরোপজুড়ে তখন শিক্ষার আলাে জ্বলছিল। অ্যারিস্টটলের বেশকিছু  কাজ ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন মাইকেল দ্য স্কট। আল-জাহরাভির মেডিকেল জ্ঞানকোষ এবং আল-রাজির রসায়ন অনুবাদ করেছিলেন জেরার্ড অব ক্রেমােনা খ্যাত এক ব্যক্তি।

বর্তমানেও হাউজ অব উইজডমের পণ্ডিতদের অবদানের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এ্যালজেবরা (বীজগণিত) শব্দটি আসে ‘আল-জাবর ওয়াল-মুকাবাজ’ গ্রন্থ থেকে। এই বীজগণিতের আবিষ্কারক ছিলেন আল-খাওয়ারিজমি। নবম শতাব্দীর গােড়ার দিকে হাউজ অব উইজডমে কাজ করার সময় তিনি বীজগণিতকে একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যান। আল-খাওয়ারিজমির উত্তরসূরি, আল-কারাজি, বীজগণিতের এই ধারাগুলােকে বিকশিত এবং পরিমার্জিত করে অবশেষে একটি বীজগণিতীয় ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করেন,  যা শত শত বছর ধরে আজও সমৃদ্ধ। আজকালকার কম্পিউটারের গণনা পদ্ধতি এই পন্ডিতগণের বিমূর্ত গাণিতিক চিন্তার ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত হয়েছে। শিক্ষা বিস্তার করার জন্য খলিফা আল-মামুনের দৃষ্টিভঙ্গি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারণাগুলাে এখনাে বেশ প্রশংসিত। চাঁদে ‘আলামানন’ নামক একটি গর্ত তার নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে।

গ্রন্থাগার ও বইয়ের দোকান

কথিত আছে, আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন সকল পণ্ডিতকে প্রাচীন বইসমূহ গ্রিক ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদ করার জন্য পুরস্কার হিসেবে বইয়ের ভারের সমতুল্য স্বর্ণ প্রদান করতেন। এভাবে বহু বই অনুবাদ করা হয়েছিল। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে পরবর্তী প্রজন্মকে মনোযোগ ও সম্মান ধরে রাখার নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। আব্বাসীয়দের রাজত্বকালে শত শত গ্রন্থাগার স্থাপিত হয়েছিল; যার মধ্যে বেশকিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থাপিত হয়েছিল । এইসব গ্রন্থাকারে অসংখ্য বই পাওয়া যেত, প্রায় প্রতিটি গ্রন্থাগারই শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

১২৫৮ সালে মঙ্গলদের হাতে ধ্বংস হওয়ার পূর্বে বাগদাদে ৩৬টি গ্রন্থাগার এবং শত শত বইয়ের ব্যবসায়ী ছিল । তারা বই সংগ্রহ করে এগুলাের কপি বানিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করত। কিছু কিছু প্রকাশক অনুলিপিকারও নিয়ােগ করতেন। কায়রাে, আলেপ্পোসহ ইরান, এশিয়া এবং মেসােপটেমিয়ার বড় বড় শহরে এরকম বহু গ্রন্থাগার ছিল। মসজিদ গ্রন্থাগারগুলাে ‘দ্বার আল-কুতুব’ নামে পরিচিতি ছিল। তৎকালে মসজিদগুলাে ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যকলাপের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে লেখক এবং পণ্ডিতরা তাদের অধ্যয়নের ফলাফলগুলাে তরুণ, অন্যান্য পণ্ডিতদের এবং আগ্রহী সাধারণ শ্রোতার উদ্দেশ্যে প্রকাশ করতেন। যে কেউ এখানকার আলােচনায় অংশ নিতে পারত। পেশাদার লিপিকারগণ (নুসাক) অর্থাৎ যারা বইয়ের কপি তৈরি করতেন, তারা পণ্ডিতদের গবেষণার ফলাফলকে বই আকারে লিখে প্রস্তুত করে দিতেন। এমনকি যখন অনেক বই খণ্ড হিসেবে প্রকাশ করা হতাে, সেগুলােও এই পদ্ধতির মধ্য দিয়ে নির্মিত হতাে। সিরিয়ার আলেপ্পোতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ গ্রন্থাগার রয়েছে। এটির নাম—সায়ফিয়া; যা শহরটির উমায়াহ মসজিদে অবস্থিত। এই মসজিদ গ্রন্থাগারে ১০ হাজারেরও বেশি প্রাচীন বই ছিল।

কথিত আছে, আলেপ্পোর সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসক শাহজাদা সায়ফাল আল-দাওলা এই বইগুলাে মসজিদে উপহার দিয়েছিলেন। ‘সায়ফিয়া’ যদিও সবচেয়ে বৃহৎ এবং পুরনাে মসজিদ গ্রন্থাগার ছিল, তবে তিউনিসে অবস্থিত জায়তুনা মসজিদ কলেজের গ্রন্থাগার ছিল সবচেয়ে সমৃদ্ধ। এখানে হাজার হাজার বই ছিল। আরও কথিত আছে, হাফসীয় বংশের খলিফারা এই গ্রন্থাগারের সম্মান বজায় রাখার জন্য একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযােগিতা করতেন।  প্রতিযােগিতার মূল বিষয় ছিল— কে কার তুলনায় বেশি প্রাচীন বইয়ের সংগ্রাহক হওয়া যায়। একসময়ে এই গ্রন্থাগারের পুস্তকসংখ্যা লাখ অতিক্রম করে ।

৮ম শতাব্দীর মুসলিম চিন্তাবিদ আল-জাহিজ বাগদাদে ৫০ বছর থাকার পর তার নিজ ঘর বসরাতে ফিরেছিলেন, এ সময়ে তিনি ২০০টিরও বেশি বই লিখেছিলেন। তার লেখা বইয়ের মধ্যে অন্যতম ছিল— সাত খণ্ডের বুক অব অ্যানিম্যালস,  যে গ্রন্থে পিঁপড়ার মধ্যকার সামাজিকতা এবং পশু-পাখিদের মধ্যে যােগাযােগ-খাদ্যাভ্যাস-পরিবেশ সম্পর্কে বিস্তারিত আলােচনা সংকলিত হয়েছিল।

আলেপ্পোর বর্তমান জাতীয় গ্রন্থাগার
আলেপ্পোর বর্তমান জাতীয় গ্রন্থাগার

তাঁর লেখা আরও বিখ্যাত বই ছিল ‘দ্য আর্ট অব কিপিং ওয়ানস মাউথ শাট’ এবং অ্যাগেইন্সট সিভিল সার্ভেন্টস’। তার গ্রন্থাগারের একটি বই ভর্তি আলমারি তার ওপর পড়ে গেলে ৮৬৮ সালে ৯২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তৎকালে রীতি ছিল, যখনই একজন বইপ্রেমী মারা যেতেন, তার সংগৃহীত বই এবং পাণ্ডুলিপি মসজিদ গ্রন্থাগারে দান করে দেওয়া হতাে। ইতিহাসবিদ আল-জাবুরি বলেছিলেন,

‘মুরাদ এফান্দির মৃত্যুতে তার তুর্কি স্ত্রী তার নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এই মসজিদে তিনি একটি স্কুল এবং গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আশ্রয় এবং খাবারের বিনিময়ে পথিক পণ্ডিতেরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মসজিদে তাদের মূল্যবান বই এবং পাণ্ডুলিপি দান করে যেতেন— আর এ কারণেই এই মসজিদ গ্রন্থাগারগুলাের সংগ্রহ ক্রমেই বাড়তে থাকত।’

ইরানের সিরাজ শহরে দশম শতাব্দীর গ্রন্থাগার ভবনগুলাের আশেপাশে জলাশয় এবং সুন্দর বাগান থাকত। মধ্যযুগের ইতিহাসবেত্তা আল-মুকাদ্দাসি বর্ণনা করেছিলেন, এই গ্রন্থাগারগুলােতে সুন্দরভাবে সজ্জিত কক্ষ থাকত এবং সাথে থাকত বিরাট গম্বুজ। এতে প্রায় ৩৬০টি কক্ষ থাকত এবং প্রতিটি কক্ষে আলাদা বিষয় নিয়ে পড়ানাে হতাে। প্রতিটি কক্ষই সজ্জিত থাকত অসাধারণ রঙিন কার্পেট দ্বারা। এসব কক্ষের সৌন্দর্য ছিল চোখ ধাঁধানাে। সিরাজ, কর্ডোভা এবং কায়রাের মতাে শহরের গ্রন্থাগারগুলাে মসজিদ থেকে আলাদা একটি ভবনে নির্মাণ করা হতাে। এই ভবনগুলাে ছিল চওড়া এবং এখানে বিভিন্ন কক্ষে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর লেখা বই সংরক্ষিত থাকত। এখানে বই পড়া থেকে শুরু করে বই লেখা, বইয়ের কপি বানানাে এবং এগুলাে সংরক্ষণ করার জন্য আলাদা আলাদা কক্ষ বরাদ্দ ছিল। প্রতিটি কক্ষ যথেষ্ট পরিমাণ আলাে-বাতাসের পাশাপাশি কার্পেট, গদি ও তাকিয়া দিয়ে সুসজ্জিত রাখা থাকত । আজকের গ্রন্থাগারের মতােই প্রাচীনযুগের গ্রন্থাগারগুলােতেও বইয়ের শৃঙ্খলা মেনে চলা হতাে। একেক বিষয়ের ওপর বই একেক আলমারিতে রাখা হতাে। আর এ কারণে পাঠকদের বই খুঁজে পেতে সহজ হতাে ।

বইয়ের ক্যাটালগ তৈরি করা হতাে। লাইব্রেরিয়ানের কাজ ছিল, তার গ্রন্থাগারে কী কী বই থাকবে, কী পরিমাণে থাকবে, তা ঠিক করা। ১০৫০ সালে কায়রাের আল-আজহার গ্রন্থাগারে ১ লাখ ১০ হাজার বইয়ের একটি বিশাল সমাহার ছিল। এই বইগুলাে ৬০টি পৃথক বইয়ের ক্যাটালগে সংরক্ষিত ছিল। সব বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা সম্মিলিতভাবে ৩৫০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল । অন্যদিকে স্পেনের আল-হাকাম গ্রন্থাগারে ৪৪টি ক্যাটাগরির বই ছিল।

ইরানের বর্তমান জাতীয় গ্রন্থাগার
ইরানের বর্তমান জাতীয় গ্রন্থাগার

প্রতিটি গ্রন্থাগারে লাইব্রেরিয়ান নিয়োগ দেওয়া হতাে। তৎকালে এটি ছিল একটি সম্মানজনক পেশা। বিদ্বান ব্যক্তিকে গ্রন্থাগারের রক্ষক এবং জ্ঞানের পথপ্রদর্শক হিসেবে এসব গ্রন্থাগারে নিয়ােগ দেওয়া হতাে। ১২ এবং ১৩ শতাব্দীতে উত্তর আফ্রিকার আলমােহাদ সাম্রাজ্যে গ্রন্থাগারের পরিচালকদের পেশাকে দেশের সবচেয়ে সম্মানজনক পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হতাে। এ সকল গ্রন্থাগার ছিল জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার। ১৯ শতাব্দীর মার্কিন লেখক রাফ ওয়াল্ডাে এমার্সন বলেছিলেন,

‘সবচেয়ে ছােট লাইব্রেরিতেও একটি বিশেষ জিনিস রয়েছে— জ্ঞান। একবার ভাবুন বিশ্বের অন্যতম পণ্ডিতদের সকল জ্ঞান এই বইয়ের কিছু অক্ষরের মধ্যে বর্ণিত রয়েছে। বই পড়ার মাধ্যমে এই জ্ঞানটি আমাদের মাঝেও অর্জিত হবে।’

জ্ঞান ছড়ানােতে বইয়ের দোকানগুলােও বেশ বড়সড় ভূমিকা পালন করেছিল । দশম শতাব্দীর প্রখ্যাত বই বিশেষজ্ঞ ও বিক্রেতা ইবনে আল-নাদিমের বইয়ের দোকান একটি বড় ভবনে অবস্থিত। ছিল। এখানে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এসে বই এবং পাণ্ডুলিপি কেনার পাশাপাশি জ্ঞানগর্ভ আলাপ-আলােচনায় মগ্ন থাকত। হাজার বছর আগের মুসলিম বিশ্বে এই বইয়ের দোকানগুলােতে লক্ষ লক্ষ বইয়ের বিশাল সমারােহ যেমন ছিল; তেমনি ছিল জ্ঞানচর্চায় মুখর সব আসর । এমন দৃশ্য রাষ্ট্রীয় গ্রন্থাগারের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা গ্রন্থাগারেও দেখা যেত।

কাগজকে আরবি ভাষায় ‘ওয়ারাকাহ’ বলা হতাে এবং ‘ওয়ারাকিন’ বলা হতাে এমন এক শ্রেণির মানুষকে যারা এই কাগজ তৈরি এবং বণ্টনের কাজের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। এ ছাড়া লেখক, অনুবাদক, অক্ষরজীবী, বই বিক্রেতা, গ্রন্থাগারিক প্রভৃতি ব্যক্তিকেও এই উপাধিতে সম্বােধন করা হতাে। ধারণা করা হয়, চীন থেকেই মুসলিম সভ্যতায় কাগজ বানানাের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি রপ্ত করা হয় এবং তৎকালে ‘ওয়ারাকিন’ পেশা অবিশ্বাস্য আকারে বেড়ে যায়। বাগদাদে ওয়ারাকি বইয়ের দোকান প্রথম গড়ে ওঠে। কাগজ তৈরি বৃদ্ধির ফলে এরকম বইয়ের দোকানের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছিল ।

দ্বাদশ শতাব্দীতে বইয়ের ব্যবসায়ী ও বই বাঁধাইকারীদের কুতুবিয়ান (মরােক্কান নাম) বলে ডাকা হতাে। ১২ শতকের মরক্কোর মারাকেশে একটি রাস্তা ছিল; যার দুপাশে ৫০টি করে মােট শখানেক বইয়ের দোকান ছিল। ইয়াকুব আল-মনসুরের রাজত্বকালে মরক্কোতে বইয়ের ব্যবসা আরও সমৃদ্ধতর হতে থাকে। তিনি ক্রমাগত বই মুদ্রণের বিস্তারকে উৎসাহিত করেন। সাধারণ মানুষকে বই পাঠের জন্যে উৎসাহ প্রদান করতে বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যকলাপ পরিচালনা করেছিলেন ইয়াকুব ।

এভাবেই নানান ধরনের জ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা এবং জ্ঞান-চর্চার মধ্য দিয়ে মুসলিম বিশ্ব একটি সম্মানজনক জায়গায় নিজেদের নাম লেখাতে পেরেছিল। তৎকালীন মুসলিম বিজ্ঞানীদের জ্ঞানের এবং আবিষ্কারের ধারা পরবর্তীতে উন্নততর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পথ সুগম করেছিল। কিন্তু সেসব জ্ঞান তাঁরা আহরণ করেছিলেন পূর্ববর্তী জ্ঞানী এবং বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে। যে কোনো উৎস থেকে দুহাত ভরে জ্ঞানের অপার ঐশ্বর্য নিতে তাঁরা মোটেই কার্পণ্য করেননি।

(তথ্যসূত্র : মুসলিম সভ্যতার ১০০১ আবিষ্কার)

আরও পড়ুন- 

কৃষিতে মুসলিম সভ্যতার অবদান সম্পর্কে কতটুকু জানেন?

বাগদাদ : ঐশ্বর্য ও জ্ঞানচর্চার প্রাণকেন্দ্র

 

মুসলিম সভ্যতার ১০০১ আবিষ্কার বইটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন 

সভ্যতার ইতিহাস নির্ভর জনপ্রিয় বইগুলো দেখুন 

 

Rokomari Editor

Rokomari Editor

Rokomari is one of the leading E-commerce book sites in bangladesh

Leave a Comment

You May Also Like This Article

Rokomari-blog-Logo.png
Join our mailing list and get the latest updates
Loading